বেলাশেষের আলো

বাইরে উত্তাল ঝড়। সঙ্গে মুষলধার শিলাবৃষ্টি। কন্‌কনে ঠান্ডা। আবহাওয়ার দপ্তর বলছে সারাদিন ধরে চলবে প্রকৃতির এই তান্ডব।

সকাল সাড়ে দশটা। সান্যাল বাড়ির তিন বাসিন্দা রেণুকা আর সৌমেন তাদের পাঁচ বছরের ছেলে রণদীপকে স্কুলে নামিয়ে নিজের নিজের গন্তব্যের দিকে পাড়ি দিয়েছে। বিকেল সাড়ে তিনটের সময়ে বাসন্তী হেঁটে গিয়ে রণকে স্কুল থেকে তুলে আনবেন।

বাসন্তী, সৌমেনের দূর সম্পর্কের খুড়তুতো কাকীমা। এবং বলাই যায় যে তিনি সৌমেনরেণুকার সংসারে আশ্রিতা। আজ পাঁচ বছর হয়ে গেল কলকাতা থেকে বাসা তুলে সৌমেনের আশ্রয়ে এসে উঠেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরে।

রেণুকার বছর দেড়েকের মেয়ে মায়া, বাসন্তীর ঘরে পাতা বেবি কটে বসে খেলা ক’রছে। আর নিজের ঘরের মস্ত জানালাটার ওপর দুই হাত রেখে বৃষ্টি দেখছেন বাসন্তী।

বৃষ্টির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছিল কতকগুলো টুক্‌রোটুক্‌রো, অসংলগ্ন ছবি। তাঁর অতীতের সঙ্গে কোন না কোন সূত্রে বাঁধা সেই সব ছবি কিন্ত ওঁর কাছে এই মুহূর্তে ছবিগুলো নিরর্থক।

ভাসমান ছবির টুকরোগুলো অর্থহীন, অথচ সেই সব ছবি যখন তখন বাসন্তীর চোখের সমুখে চলে আসে। ঘুমের মধ্যে আক্রমণ ক’রে তাঁর অবচেতনকে।

অতীত এবং বর্তমানের মাঝে সেতু বন্ধন ক’রতে গিয়ে তাই দিশেহারা হয়ে যান তিনি।

হঠাৎ ফোনের আওয়াজে বাসন্তীর মগ্নতা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। ছুটে খাবার ঘরে গিয়ে ফোনটা ধরলেন।

আমি রেণুকা বলছি”, ওপার থেকে কোমল অথচ স্টীলের মত ধারালো কন্ঠস্বর ভেসে এলো, “বৃষ্টি দেখছিলে নিশ্চয়ই”? বাসন্তী নির্বাক।

জানালা থেকে প্রকৃতির কতশত রূপ দেখতে দেখতে বাসন্তীর আচম্‌কা টুক্‌ ক’রে নিজের মধ্যে হারিয়ে যাবার অভ্যেসটা রেণুকা জানে। সে আবার বলল, “কাকী, আজ আর বৃষ্টি দেখে সময় নষ্ট কোরো না, প্লীজ। আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে আজই সন্ধ্যেবেলা মৌসুমীরা আমাদের বাড়ি ডিনর খেতে আসবে। ওরা চারজনেই আসছে

বাসন্তী ধাক্কা খেয়ে অস্ফুটে বললেন, “চারজন!”

হ্যাঁ, চারজন। মানে মৌসুমী, অভীক, তাদের ছেলে কিরণ আর কাকাবাবু অভীকের বাবা।

অপ্রত্যাশিত এই সংবাদ প্রতিধ্বনির মত বাজতে লাগল বাসন্তীর কানে।

আর কাকী”, রেণুকার গলা আবার ভেসে এলো, “দ্যাখো, রণকে যখন পিক্‌ আপ ক’রতে যাবে, মায়ার স্ট্রোলারটা যেন ভালভাবে ওয়াটার প্রুফ দিয়ে ঢ়াকা থাকে। ঝড়বৃষ্টির দিন আজ।“

আচ্ছা,” বলে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন বাসন্তী। সারাদিনের সমস্ত করণীয় মনে আলোড়ন তুলল। মায়াকে স্নান ক’রিয়ে, খাইয়ে, ঘুম পাড়ানো। সোয়া তিনটে নাগাদ স্ট্রোলারে মায়াকে নিয়ে রণর স্কুলে যাওয়া ও বাড়ি ফেরা। ফিরেই মায়ার ন্যাপি চেঞ্জ ক’রে, গরম দুধের বোতল ওর হাতে ধরিয়ে শুইয়ে দেওয়া। রণকে স্নান করানো, খাওয়ানো।

তারপর রাতের রান্না আরম্ভ করা। রেণুকাকে প্রসন্ন রাখতে হ’লে আমিষনিরামিষ মিলিয়ে গোটা ছয়েক পদ রাঁধতেই হবে। ভাবতে গিয়ে হিমশিম খেলেন তিনি!

ক্ষিপ্রহাতে রান্নার যোগাড় খানিক গুছিয়ে নিলেন অতঃপর। ফিরে এসে রান্না চাপাবেন।

তারপর ওয়াটপ্রুফে মায়া আর তার স্ট্রোলারকে সযত্নে ঢ়েকে স্কুল উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন বাসন্তী। ঠিক তখুনি আকাশ ভেঙ্গে আর একবার বৃষ্টিটা নেমে এলো। দু’হাত দিয়ে স্ট্রোলার ঠেলছেন, অতএব নিজের মাথাটি বাঁচাতে ছাতা ধরার উপায় নেই। ওদিকে উন্মত্ত বাতাসের দাপট সামলে এগিয়ে যাওয়া দুষ্কর। তাও, বৃষ্টি আর ঝড়ের হিংস্র আক্রমণ উপেক্ষা ক’রেই অগ্রসর হ’লেন তিনি।

সবে গোটা দশেক পা এগিয়েছেন, একটা ছোট্ট হন্ডা সিভিক থম্‌কে দাঁড়িয়ে পড়ল বাসন্তীর পাশে।

সন্ত্রস্ত হয়ে চেয়ে দেখলেন গাড়ি থেকে ছাতা হাতে নেমে আসছেন এক সুপুরুষ, সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক। পরিষ্কার বাংলায় তিনি বললেন, “ঈস্‌, একেবারে ভিজে কাক হয়ে গ‌েছেন। নিন্‌, বেবিকে নিয়ে উঠে আসুন গাড়িতে। স্ট্রোলারটা আমি বুটে রেখে দিচ্ছি”।

আপনি”? অস্ফুটে বাসন্তী বললেন।

আপনাদের প্রতিবেশী। আমি অভীকের বাবা অজয় মুখার্জী। নাতিকে তুলতে রণদের স্কুলেই যাচ্ছি।

সন্ধ্যাবেলায় অভীক, কিরণ, মৌসুমীর সঙ্গে অজয় মুখার্জীও এলেন সৌমেনরেণুকার বাড়ি। ওদের টেবিলে বসিয়ে বাসন্তীই পরিবেশন করলেন খাবারদাবার। পরম তৃপ্তি সহকারে খাওয়া সারল সকলে। খাওয়ার মাঝে একবার অজয় মুখ তুলে বলেছিলেন, “আপনিও আমাদের সঙ্গে বসে পড়ুন”।

রেণুকা তৎক্ষণাৎ বলল, “না, না। কাকী পরিবেশন ক’রে দিলে খাবারের স্বাদই আলাদা। আমাদের খাইয়ে তবে বসবে কাকী। রোজই তাই করে”।

সে রাতে বাড়ি ফেরার পথে মৌসুমী হঠাৎ বলল, “ইশ, রেণুকাটা কি লকি”!

হঠাৎ কেন মনে হ’ল এ কথা”? অভীকের প্রশ্ন।

নইলে বাসন্তী আন্টির মত এফিসিয়েন্ট হাউস কিপার ক’জনে পায়, বলো”। ছোট্ট একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল মৌসুমী।

কি যে বলো তুমি! বাসন্তী আন্টি তো সৌমেনের কাকীমা। শুনেছি যথেষ্ট শিক্ষিতাও। কোলকাতা ইউনিভার্সিটির অনার্স গ্র্যাজুয়েট। ওঁর স্বামীও ইংলিশ সাহিত্যের নামী স্কলার ছিলেন।

রাখো তো! আসলে বিধবা হবার পর কাকীকে ওরা নিয়ে এসেছে নিজেদের স্বার্থেই। বিনি পয়সার হাউসকীপার আর কোথায় পাবে?

* * * * *

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুকাল ওয়েস্টর্ন দর্শন অধ্যাপনা করার পর তিন বছর হ’ল অবসর নিয়েছেন অজয় মুখার্জী। আর অবসর নেবার কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর স্ত্রী বিয়োগ হ’ল। দক্ষিণ কলাকাতায় মস্ত পৈতৃক বাড়িতে এখন তিনি একাই থাকেন। সঙ্গে থাকে দীর্ঘদিনের ভৃত্য কার্ত্তিক। তার তদারকিতে দু’বেলা রান্না ক’রে দিয়ে যায় সাবিত্রী। বাড়িঘর ঝাড়ামোছা, কাপড় কাচা আর বাসন মাজার জন্য বহাল আছে এক ঠিকে ঝি।

কয়েক মাস আগে অভীকমৌসুমী আর কিরণ কলকাতা বেড়াতে গিয়ে দেখল অজয় ভারি নিঃসঙ্গ। সারা জীবন অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনার জগতে কাটিয়ে এখন রিটায়রমেন্ট স্ত্রী বিয়োগের দুদুটো ধাক্কা সামলাতে গিয়ে তিনি অবসাদে ডুবে যাচ্ছিলেন। ছেলেবৌয়ের পীড়াপীড়িতে অজয় অগত্যা মেলবোর্নে একটা বছর কাটিয়ে যেতে রাজি হয়েছিলেন। মেলবোর্নের নতুন পরিবেশ, নাতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং হাঁটাপথে লাইব্রেরির নাগাল পেয়ে অজয়ের অবসন্নতা অনেকখানি কেটে গেল।

বাসন্তীর সঙ্গে পরিচয়ের ক্ষণেই অজয় তাঁর নিঃসঙ্গতার আভাস পেয়েছিলেন। জীবনের এক বৃহদংশ অধ্যাপনার পরিবেশে কাটিয়ে তাঁর বিবেকে সমাজচেতনা এবং মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াবার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। সৌমেনের বাড়ি থেকে ফিরে আসা অবধি বাসন্তীর একাকীত্ব কীভাবে কাটানো যায়, তাই নিয়ে ভাবনাচিন্তা ক’রে, একদিন দুপুরে লাইব্রেরি থেকে গোটাকয়েক বাংলা এবং ইংরিজি বই নিয়ে তিনি সান্যালাবাড়ির দোরে এসে কলিং বেল টিপলেন।

ওঁকে দেখে বাসন্তী চম্‌কে উঠলেন।

খুব আশ্চর্য হয়েছেন তো”? হাসিমুখে বললেন অজয়, ভেতরে আসতে পারি কি”?

নিশ্চয়ই”, একপাশে সরে দাঁড়িয়ে বাসন্তী বললেন, আসুন”।

ভেতরে ঢ়ুকে হাতে ধরা বইগুলো বাসন্তীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, পড়ে দেখবেন। দু’সপ্তাহ পরে এসে এগুলো ফিরিয়ে নিয়ে আরও বই দিয়ে যাব। কি ধরনের বই আপনার পছন্দ একটু জানালে . . .

সত্যিই”? আচম্‌কা বলে ফেললেন বাসন্তী। নিজের সংসারে যখন থাকতেন তখন বইয়ের পোকা ছিলেন তিনি। কি ক’রে জানলেন ভদ্রলোক!

আপনার কাজে বাধা দিলাম না তো?

না, না, অজয়ের প্রশ্নের উত্তরে বাসন্তী বললেন, ব্যাকইয়ার্ডে আমার ভেজিপ্যাচ আছে। ফুলের বাগানও। তাদেরই পরিচর্যা ক’রছিলাম। দেখবেন আমার বাগান?

বাসন্তীর বাগান দেখে, তাঁর সঙ্গে লাঞ্চে টমাটো স্যুপটোস্ট খেয়ে বাড়ি ফিরলেন অজয়। মনে পড়ল প্রয়াত স্ত্রী সুস্মিতার কথা। তিনিও ছিলেন বাগান পাগল। সেই দিনগুলোয় কর্মব্যস্ততার দরুন সুস্মির সুন্দর সাজানো বাগানের দিকে ফিরে চাইবার সময় হ’ত না তাঁর। অথচ এখন তাঁর অফুরন্ত সময় কিন্তু সঙ্গীহীন জীবন।

এরপর থেকে বই নেওয়াদেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে অজয় চলে আসতেন বাসন্তীদের বাড়ি। বাগানের কাজে, ছোট্ট মায়ার দেখভালে সাহায্য ক’রতেন। বাসন্তীর জন্য লাঞ্চ নিয়ে আসতেন কত সময়ে। রান্না করার নতুন শখ হয়েছে তাঁর।

ঝড়বৃষ্টিবিপর্যয়ের দুপুরগুলো ওঁরা কাটাতেন স্ক্র্যাব্‌ল খেলে। সুডোকুর ধাঁধাঁ সমাধানে। অজয়ের আই ফোনে গান শুনে। অথবা হোয়াট্‌স্‌ অ্যাপে অজয়ের বন্ধুদের নানা ধরনের পোস্টিং দেখে।

আজকাল দুই বাড়ির নাতিদের স্কুল থেকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব অজয়য়ের।

এইভাবেই ওঁদের দুপুরগুলো কেটে যাচ্ছিল। আন্তরিক সখ্যতা গড়ে উঠছিল দু’জনের মধ্যে। কতগুলো মাস কেটে গেল অতঃপর। একদিন অজয় হঠাৎ বললেন, আমার বাড়ি ফেরার সময় এসে গেল। আর তিন সপ্তাহ”।

এই সম্ভাবনাটির কথা বাসন্তীর মনে আসেই নি।

কেন? আপনি অভীকদের বাড়িতে স্থায়ী বাসিন্দা নন”? থম্‌কে বললেন বাসন্তী।

নাহ্‌। আমি এসেছিলাম ট্যুরিস্ট হয়ে এক বছরের জন্য। এবার বাড়ি ফিরব।

ও”, বিষণ্ণকন্ঠে বললেন বাসন্তী। বুকের ভেতরটা তাঁর তোলপাড় ক’রে উঠল।

আপনি যে আবার একা হয়ে যাবেন, সে খেয়াল আছে?

মুহূর্তে বাসন্তীর বিষণ্ণ সুন্দর মুখখানা রক্তবর্ণ। আনত মুখে বললেন, আছে”।

যদি অভয় দেন একটা প্রস্তাব ক’রি?

– কী?

আপনি আমাকে বিয়ে ক’রে আমার সঙ্গে কলকাতা চলে আসুন। দিব্যি কাটিয়ে দেব বাকী জীবনটা দু’জনে মিলে”।

আজীবনের অর্জিত সংস্কার, বিশ্বাস, আশা, আকাঙ্খা  একসঙ্গে জেগে উঠে ঘুরপাক খেতে লাগল বাসন্তীর মনে। তিনি নির্বাক্‌ দাঁড়িয়ে রইলেন।

একটা কথা ভেবে দেখুন”, দৃঢ়স্বরে বললেন অজয়, আমরা দুজনেই প্রবীন মানুষ। পৌঢ়ত্ব পার ক’রে বার্ধক্যের দিকে এগুচ্ছি। এই সময়ের নিঃসঙ্গতা বড় কষ্টের। আমরা অনায়াসে হাত ধরে চলতে পারি পরস্পরের বন্ধুত্ব, সাহায্য এবং বিশ্বাসের জোরে। এর বেশী প্রত্যাশা তো থাকবে না আমাদের।

* * * * *

সেই রাতেই অজয় মুখার্জীর অচিন্তনীয় প্রস্তাবখানার সামনে দাঁড়াতে হ’ল সৌমেন আর অভীককেও। নিভৃতে ওদের দু’জনকে ডেকে তিনি বললেন, একটা বয়সের পর আমরা সকলেই এই পরিবর্তনশীল জীবন এবং সময়ের গতির সঙ্গে ঘুরতে থাকা মূল্যবোধের দোটানার মোকাবিলা করি। সমঝৌতাটাও ক’রি নিজেদের মত ক’রে। আমার প্রশ্ন, এই বয়সে নিজেদের মত ক’রে বেঁচে থাকার অধিকার চাওয়াটা কি অপরাধ? বাসন্তীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা স্বামীস্ত্রীর সম্পর্কে যদি বেঁধে নিই? আপত্তি আছে তোমাদের?

অভীক আর সৌমেন প্রথমে স্তব্ধ, হতভম্ব। তারপর কয়েকটা দিন সময় চেয়ে নিল ওরা। এবং একান্তে দু’জনে একদিন বাসন্তীর মুখোমুখি হ’ল।

কাকী, সৌমেন বলল, অজয় অংকল তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন”।

জানি”, মৃদুকন্ঠে বললেন বাসন্তী, ক’দিন ওঁর প্রস্তাবখানা নিয়ে আমিও ভাবনাচিন্তা ক’রছি”।

পরস্পরের দিকে চাইল ওরা। বাসন্তী বলে চললেন, এই সবে বাহান্ন পেরিয়েছি আমি। অজয়বাবুও বোধ ক’রি আমারি বয়সী। আজকের যুগে মেডিকল রিসর্চের দৌলতে গিফ্‌ট অফ্‌ লাইফ মানে জীবনপরিসীমা যে গতিতে বিস্তার পাচ্ছে, তাতে আমরা দু’জন সবেমাত্র জীবনের মধ্য বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছি। তাই ভাবছি আগামী কতগুলো বছর নিজের মত ক’রে বাঁচতে চাওয়ার ইচ্ছেটা কি অন্যায্য?

* * * * *

কোলকাতা ফিরে যাবার আগের দিন সন্ধ্যায় সৌমেনদের বাড়ি গিয়ে কলিং বেল টিপলেন অজয়। দরজা খুলল রেণুকা।

বাসন্তীর সাথে একটু কথা ছিল, অজয় বললেন।

পিসি ব্যাক্‌ইয়ার্ডে। গাছে জল দিচ্ছেন, রেণুকা বলল, আপনিও চলে যান না সেখানে”।

অজয়কে দেখে বাসন্তী আশ্চর্য হ’লেন না। যেন তিনি আশাই ক’রছিলেন অজয় বিদায় নিতে আসবেন।

আপনাকে গুড বাই ব’লতে এলাম, হাসিমুখে অজয় বললেন।

জানি”।

পকেট থেকে একটা স্মার্ট ফোন বার ক’রে বাসন্তীর হাতে দিয়ে অজয় বললেন, এটা আপনার জন্য। আমার নিজের স্বার্থেই। হোয়াট্‌স্‌অ্যাপে নিয়মিত যোগাযোগ রাখব”।

বাসন্তীর মুখে হাসির ঝিলিক। স্বচ্ছন্দ বোধ ক’রছিলেন তিনি।

জানেন, কলকাতায় আমাদের যৌথ জীবনের পরিকল্পনা অলরেডি আরম্ভ ক’রে দিয়েছি।

তাই?

আমরা দু’জনে হাত লাগিয়ে দারূণ এক বাগান তৈরি ক’রব। রংবেরঙের অনেক পাখী আসবে আমাদের হাত থেকে মধু আর দানা খেতে।

রোজ সকালে উঠে ন্যাশনাল লাইব্রেরি যাব। ডায়মন্ড হার্বরে যাব পিকনিক ক’রতে। মাঝেমধ্যে চিড়িয়াখানাতেও যেতে হবে, বুঝলেন! কেমন হবে বলুন তো?

আর থিয়েটার? গানের ফংশন? সিনেমা”? কৌতূক চিক্‌চিক্‌ ক’রল বাসন্তীর দুই চোখের তারায়।

সব হবে। সব হবে। আমি অপেক্ষা ক’রে থাকব আপনার জন্য।

বাসন্তীর সুমুখে তখন শুধুই ভবিষ্যতের স্বপ্ন। অজয়ের হাত ধরে নতুন পথে হাঁটার স্বপ্ন।

ছন্দসী বন্দ্যোপাধ্যায়
ছন্দসী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম বারাণসীতে। শৈশব ও ছাত্র জীবন কাটে ইলাহাবাদে। বিবাহের পর স্বামীর হাত ধরে অস্ট্রেলিয়া ঢলে আসেন। সেই থেকে অস্ট্রেলিয়া বাসী। তাঁর রচিত সম্প্রতিতম উপন্যাস "অভিযান", "ছায়া পরিসর" ও "মায়াজাল"। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কয়েকটি ছোটগল্পের ইংরেজি অনুবাদ এবং তাঁর নিজের লেখা একুশটি গল্প নিয়ে "নির্বাচিত গল্প" নামে একটি সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here