গোপাল মিস্ত্রি
জন্ম ২৬ মে, ১৯৬৩। মেমারির এক উদ্বাস্তু কলোনিতে। শ্রীরামপুর কলেজ থেকে দর্শনে সাম্মানিক স্নাতক। পেশা সাংবাদিকতা। বারো বছর বয়সে প্রথম কবিতা লেখা, প্রায় একইসঙ্গে গল্প লেখায় হাতেখড়ি। ২০১২ সালে শারদীয়া পত্রিকায় উথালপাথাল উপন্যাস প্রকাশ। এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছোটবড় সাতটি উপন্যাস এবং অসংখ্য গল্প প্রকাশিত।

ঘরের দরজাটা বন্ধ। তবে তালা দেওয়া নয়।  আজ রবিবার, বিনম্রর থাকারই কথা। যদি না গ্রামের বাড়িতে কিংবা অন্য কোথাও গিয়ে থাকে। জানে না আছে কিনা। তবে দরজায় যখন তালা ঝুলছে না, তখন ভরসা করাই যায়, বিনম্র আছে। কিন্তু ডাকতে গিয়েও ডাকল না তনয়া।

Banglalive

প্রায় দশ বছর যোগাযোগ নেই বিনম্রর সঙ্গে। তার এই ঘরে একদিনই এসেছিল তনয়া। সেই প্রথম আর সেই শেষ। তারপর আর কোনও যোগাযোগ ছিল না। তার কাছে বিনম্রর মোবাইল নম্বরটা ছিল। কিন্তু এই দশ বছরের মধ্যে মোবাইলেও কোনও যোগাযোগ রাখেনি সে। প্রথম প্রথম বিনম্র ফোন করত, ধরত না তনয়া। টেক্সট পাঠাত। তারও কোনও উত্তর দিত না সে। তারপর ফোন করা ছেড়ে দিয়েছিল বিনম্র। তনয়াও আর কোনওদিন খোঁজ নেয়নি। ইচ্ছে করেই আজও আসার আগে সে ফোনটা করেনি। শুধু জেনেছিল, বিনম্র এখনও এই বাড়িতেই থাকে এবং মোবাইল নম্বরটাও বদলে ফেলেনি। তাই সে আছে কি নেই, কোনও খবর না নিয়েই তার খোঁজ করতে চলে এসেছে তনয়া।

নিঃশব্দে দু’ধাপ সিঁড়ি ডিঙিয়ে খোলা বারান্দায় উঠে এল। পাশের ছোট্ট জানলা দিয়ে ঘরের ভিতরটা লক্ষ্য করল। ঘরের ভিতরটা দিনের বেলাতেও খুব আলোকিত নয়। তবু দেখতে পেল, খাটের ওপর গোটাকতক বই ছড়ানো। আর সেই বিছানার ওপর বইয়ের মাঝে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে বিনম্র। বাইরে থেকে তার  পা দু’টো দেখা যাচ্ছে।

এঘরেই একা থাকে বিনম্র। কলেজে অধ্যাপনার চাকরিটা পেয়ে এই ঘরটা ভাড়া নিয়েই শহরে চলে এসেছিল। এখান থেকেই কলেজ করে। কথা ছিল বিয়ে করার পর একটা ভালো ফ্ল্যাট নেবে। তনয়া শহরের মেয়ে। বিনম্র হয়তো ভেবেছিল, সে গ্রামের ছেলে বলে তাকে কোনওদিন প্রস্তাবই দিতে পারবে না। তাই তাকে সেই স্বপ্নের কথা শোনাত।

কিন্তু সেটা যে বিনম্রর জীবনে আর হয়নি তা জানা ছিল না তনয়ার। দশবছর আগে যার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেছে তার কী হল না তা জানার কোনও আগ্রহও ছিল না। বরং ধরেই নিয়েছিল, এতদিনে বিনম্র  কাউকে বিয়ে করে নতুন ফ্ল্যাটে সংসার পেতেছে। বহু বছর পর সেদিন গ্রামে পিসির বাড়ি গিয়ে জেনেছিল, বাবা মায়ের হাজার অনুরোধ সত্ত্বেও বিনম্র বিয়ে করেনি। গ্রামেও খুব একটা আসে না। সে যেমন ছিল, তেমনই আছে, একা। ঠিকানাটাও নাকি বদলায়নি।

তাতে তনয়ার কিছু যায় আসে না। দশ বছর যার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই সে কী করল, না করল তা নিয়ে ভাবতে বসবে কেন তনয়া? যে বিনম্রর প্রতি শুধু ঘুণাই পুষে রেখেছে তার কথা মনে আনবে কেন?

কিন্তু তবুও কেন যেন বারবার মনে পড়েছে বিনম্রর কথা। হঠাৎ তার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছে। ইচ্ছে করে ভুলতে চাওয়া সব কথাই বন্ধ কুলুঙ্গির কপাট খুলে বেরিয়ে এসেছে। প্রায় স্কুল জীবন থেকে চেনা বিনম্রর সঙ্গে পড়ন্ত বিকেলে দামোদরের চর কিংবা ভরা জ্যোৎস্নায় পিসির বাড়ির উঠোনে আড্ডার মুহূর্তগুলো ছায়াছবির মতো আবার ফিরে এসেছিল তার চোখের সামনে। অত চেনা বিনম্র তবু মনের কাছে এসেছিল অনেক পরে, পিসতুতো দাদার বিয়ের বরযাত্রী যাওয়ার পথে। আর বউভাতের দিন তনয়াকে প্রথম বলেছিল সে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি তনু।’

তারপর যেন তনয়াও বদলে গেল। যখন তখন পিসির বাড়ি যাওয়ার অজুহাত খুঁজত সে। বিনম্রর সঙ্গে দেখা করার বাসনাই তাকে আনমনা করে রাখত। তখনও মোবাইল ছিল না কারও। অতএব যখন তখন মনের কথা বলার সুযোগ ছিল না।  কিন্তু দু’জনের আলাদা কলেজ হলেও বিনম্র চাকরি পেয়ে শহরে আসার পর দেখা হওয়াটা বেড়েছিল। ততদিনে দু’জনের হাতেই মোবাইলও এসেছে। এক অধ্যাপক আর এক ছাত্রীর দেখা হয়েছে পার্কে, রেস্টুরেন্টে। কিংবা নিছকই রাস্তায় হেঁটে বেড়িয়েছে দু’জনে। গভীর রাতে ইথারতরঙ্গে ভাসিয়ে দিয়েছে দু’জনের অন্তরের কথা।

আরও পড়ুন:  জামাই ষষ্ঠী পালা

বিনম্রর ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল তার সঙ্গে দেখা হওয়ার শেষ দিনটা।

তনয়াকে বহুবার এ বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছে বিনম্র। বলত, চলো দেখবে, কেমন করে থাকি আমি। কিন্তু কখনও আসা হয়নি। তেমন সুযোগও হয়নি। তাছাড়া তনয়া বলত, যেদিন পাকাপাকিভাবে তোমার বাড়ি যাব, সেদিনই তোমার সংসার দেখব। সেদিন থেকে আমিই সামলাব সব। এখন একা সংসার কর। আমি দেখতে যাব না।   

কিন্তু একদিন এসেছিল তনয়া। তার আর ক্লাস ছিল না। দেখা হবে কিনা জানতে ফোন করেছিল বিনম্রকে। বিনম্ররও হয়তো ক্লাস ছিল না। বলেছিল, আজ আমার বাড়ি চলো। ‘দেরি হয়ে যাবে’ বলার দরকার হবে না। আজ তোমাকে নিজের হাতে অনেক কিছু করে খাওয়াব।

শেষ পর্যন্ত এসেছিল তনয়া। বাস থেকে নেমে দুপুরের নির্জন পথ বিনম্রর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে এসেছিল। কেউ দেখছে কিনা সে খেয়াল করেনি।

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল বিনম্র। বন্ধ জানলার শার্শি দিয়ে আসা আলোটুকুতে ঘরের ভিতর যেন রাতের স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়েছিল। জানলা খোলা কিংবা আলো জ্বালানোর অপেক্ষায় ছিল তনয়া। কিন্তু কিছুই করেনি বিনম্র। নিঃশব্দে তনয়াকে জড়িয়ে ধরেছিল। সেই প্রথম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তনয়ার কমলা কোয়ার মতো অধর নিজের দুই ঠোঁটের ফাঁকে ঢুকিয়ে নিয়েছিল বিনম্র। দাঁত বসে গিয়েছিল তার পেলব ঠোঁটে। কয়েক মুহূর্ত। ঘোর কাটার আগেই তনয়াকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তার বিছানায়। সে যেন তার সমস্ত ভালোবাসার রসে ভিজিয়ে দিতে চাইল তনয়াকে।

এতদিন হাতে হাত কিংবা গা ঘেঁষে বসার স্নিগ্ধ শিহরণ নয়, বিনম্রর শরীরে যেন অন্য উষ্ণতা।

তার একলা ঘরে তনয়া আত্মসমর্পণ করতে পারত। একটা নিরালা দুপুর তাদের জীবনে অন্য আবেশ নিয়ে ধরা দিতে পারত। কিন্তু সে বিদ্রোহ করল। কোনওরকমে বিনম্রকে ঠেলে তিরের মতো ছিটকে উঠে গেল সে। ‘একি করছ বিনুদা?’

‘কেন? তোমার ওপর আমার কোনও অধিকার নেই্‌?’

‘কীসের অধিকার?’

‘তোমাকে পাওয়ার। আমি যে তোমাকে ভালোবাসি তনু।’

‘কাউকে ভালোবাসলেই বুঝি তার প্রতি এভাবে অশ্লীল আচরণ করার অধিকার জন্মায়?’

‘অশ্লীল বলছ কেন?’

‘এটাকে তাহলে কী বলে?’

‘এটা তো ভালোবাসারই অঙ্গ।’

‘না, এরমধ্যে তোমার কোনও ভালোবাসা নেই। আছে শুধু আমার দেহের প্রতি আসক্তি। এইজন্য তুমি বারবার এখানে আসতে বলতে? ছিঃ। আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি বিনুদা। কিন্তু তুমি তার মর্যাদা রাখলে না।’

‘ভুল ভাবছ তনু। তুমি আমাকে ভালোবাসো না?’

‘বাসি, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুমি আমার সঙ্গে যা খুশি তাই করতে পার।’

‘আমি কী করেছি? এটুকু তো সবাই করে।’

‘কিন্তু আমি এসবকে ঘেন্না করি।’

‘তাহলে আমার প্রতি তোমার কোনও ভালোবাসা নেই। থাকলে ঘেন্না করতে পারতে না।’

আরও পড়ুন:  গুরুতর অসুস্থ ‘হিমাদ্রি’! অস্ত্রোপচার হতে পারে যীশু সেনগুপ্তর?

‘আছে কিনা সে তুমি বুঝবে না। তুমি শুধু বোঝ শরীরের চাহিদা।’

‘শরীর বাদ দিয়ে ভালোবাসা হয় নাকি?’

‘ভালোবাসা মানে শুধুই শরীর?’

‘ আমি তা বলছি না। আমি বলছি শরীর বাদ দিয়ে ভালোবাসা হয় না। তাহলে সে ভালোবাসা ব্যর্থ। সার্থক প্রেম দাঁড়িয়ে আছে শরীরের শক্ত ভিতের ওপর। শুধু মন দিয়ে সত্যিকারের ভালোবাসা হয় না তনু। আমি অন্তত বিশ্বাস করি না প্রেমের বসত শুধু মনে। শরীর না থাকলে যেমন কোনও মন অস্তিত্বহীন, তেমনি দেহের আকর্ষণ না থাকলে প্রেম ভালোবাসাও অর্থহীন।’

‘তুমি কী বিশ্বাস কর তা দিয়ে ভালোবাসা বিচার করতে যেও না। তোমার মনে কোনও ভালোবাসা নেই। তোমার ভালোবাসা শুধু দেহে।’

‘তুমি আমাকে ভুল বুঝছ তনু। আমরা কি ব্যর্থ প্রেমের কুশীলব? যে প্রেমে আমাদের কখনও মিলন হবে না? সফল প্রেমে শরীর থাকবে না, তা হতে পারে না। দু’জন মানুষ যখন ভালোবেসে কাছে আসতে চায়, তখন কি ছোঁয়া বাঁচিয়ে শুধু চেয়ে বসে থাকার জন্য? সেই কাছাকাছি আসার মধ্যেও তো থাকে দৈহিক আকর্ষণ। তুমি মানো আর না মানো, সেটাকে অস্বীকার করা যায় না। দু’জন নরনারীর প্রেম আছে অথচ কামনা নেই তা হতে পারে না। তাহলে আমি যদি তোমাকে একটু ছুঁয়েই থাকি, তাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল?’

‘তারজন্য সময় আছে। ততদিন তো অপেক্ষা করতে পারতে।’

‘তুমি মানছ, আমাদের প্রেমের পরিণতি মানে সেই দেহের মিলনের কাছেই আত্মসমর্পণ। তুমি আর আমি বিয়ে করব কেন? আমাদের সার্থক প্রেমের চূড়ান্ত রূপ দিতে। আমাদের ভালোবাসা যদি দেহের কাছে আত্মসমর্পণ না করে তাহলে তা তো ব্যর্থ হয়েই থাকে। দু’জন নারী পুরুষের নিষ্কাম প্রেম বলে কিছুতে আমি বিশ্বাস করি না। কারও মিলন না হলে তা ব্যর্থ প্রেম। আমাদের প্রেম যদি সার্থক হয় তাহলে আমি আজকে তোমাকে একটু ছুঁয়ে কি খুব কিছু অন্যায় করেছি?’

‘হ্যাঁ করেছ। তুমি যা বিশ্বাস কর আমি তা বিশ্বাস করি না। অন্য অনেক মেয়ের মতো আমাকে তুমি এক ভেবে ফেলো না। তুমি আমার ভালোবাসার মর্যাদা রাখতে পারলে না। তুমি আর কখনও আমার সামনে আসবে না। আমি তোমাকে ঘেন্না করি।’

‘তনু, আমাকে অন্যভাবে নিও না। আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

‘আর আমি আজ থেকে তোমাকে ঘেন্না করছি। আমাদের আর দেখা হবে না।’

সেদিন এতদিনের চেনা বিনম্রও যেন তার কাছে অচেনা হয়ে গিয়েছিল। সেদিনই তনয়ার সব বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিল বিনম্র। যার ওপর ভরসা করে এতটা পথ চলে এসেছে, বাকি জীবনটাও কাটানোর স্বপ্ন দেখত, সে যেন বিনম্র নয়, অন্য কেউ। একঝটকায় হাত ছাড়িয়ে দরজা খুলে বিনম্রর ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল তনয়া। আর দেখা হয়নি।

তারপর দশটা বছর পেরিয়ে গিয়েছে। তনয়াও এখন চাকরি করছে। স্কুলের শিক্ষিকা। কেন যেন বিনম্রকে সে আর ক্ষমা করতে পারেনি। তারপর থেকে সমস্ত পুরুষ মানুষের প্রতি অদ্ভূত একরকম ক্রোধ বাসা বেঁধেছিল তনয়ার মনে। সব পুরুষ মানুষই একরকম। পুরুষের কোনও মন নেই। আছে শুধু শরীরের চাহিদা। আর কোনও পুরুষ মানুষকে বিশ্বাসও করতে চায়নি সে। পুরুষ মানুষ ভালোবাসতে জানে না। ওরা ভালোবাসাটা মাপতে চায় শরীরের বাটখারা দিয়ে।  পুরুষ মানুষের লোলুপ দৃষ্টি বুঝিয়ে দেয় তার ভিতরের খিদেটা। সব পুরুষই তার চোখে নারীখাদক। নারীর শরীর ছাড়া ওরা আর কিছু বোঝে না। ওর স্কুলের অনেক টিচারই ওর প্রতি আকৃষ্ট। এই মধ্য তিরিশেও সে যে কম আকর্ষণীয় নয় তা বুঝতে পারে কো টিচারদের চোখের চাহনি দেখে। তাদের লোলুপ দৃষ্টি ঘুরে বেড়ায় তনয়ার শরীরের ওপর। যদিও আজ আর সেজেগুজে থাকতে ইচ্ছে করে না। অত্যন্ত সাদামাটা সাজগোজেই থাকে তনয়া। এক সময় যার জন্য সাজত, তার প্রতি এতটাই বিতৃষ্ণা জন্মেছিল, যে তাকে ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রূপসজ্জাও ছেড়েছে সে। পুরুষ মানুষের প্রতি সীমাহীন সেই ঘূণাই তাকে আর কারও কাছে যেতে দেয়নি।

আরও পড়ুন:  সলমন খানকে খুনের চক্রান্ত ফাঁস! জাতীয় এথলিট সম্পত নেহেরাকে ‘সুপারি’ দেওয়া হয়েছিল?

অথচ এত বছর পর আজ আবার বিনম্রর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল তনয়া। কেন এল সে? কীসের টানে? দশ বছর আগে  যাকে সে চিহ্নিত করেছে এক দেহসর্বস্ব প্রেমিক হিসেবে, যার কাছ থেকে এক কথায় দূরে সরে গিয়েছে, তার জন্য আবার কীসের কৌতৃহল? তাহলে কি জানতে ইচ্ছে করছে, কেন বিনম্র এতদিনেও বিয়ে করল না? কেন সে সন্ন্যাস নিল। তা তো ফোনেই জানতে পারত। মোবাইল নম্বরটা তো তার কাছে আছেই। অন্তত একবার ফোন করেও তো দেখতে পারত।

দূর থেকে হয়তো সবই জানতে পারত সে। কিন্তু না, আজকে কেন যেন এতদিন পর বিনম্রর সামনে এসে দাঁড়াতে ইচ্ছে করল তার। তনয়া ডাকল, বিনুদা।

বিনম্র বোধহয় শুনতে পায়নি। কোনও সাড়া পেল না তনয়া। আবার ডাকল, বিনুদা।

এবার দরজা খুলল। চল্লিশোর্ধ বিনম্রর গলায় অপার বিস্ময়, তুমি?

‘কেন, আসতে নেই?’

‘না মানে হঠাৎ। কোনও খবর না দিয়ে। অবশ্য আমার ফোন নম্বরটা যদি থেকে থাকে।’

‘আছে। কিন্তু খবর দিয়ে এলে কী করতে? আমার জন্য বরণডালা নিয়ে পথ চেয়ে বসে থাকতে?’

‘না মানে আমি তো নাও থাকতে পারতাম, কোথাও বেরিয়ে গেলে তোমাকে ফিরে যেতে হতো।’

‘গেলে যেতাম। বুঝতাম তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হওয়ার নয়।’

‘মিছিমিছি কষ্টটা তো হতো।’

‘থাক, আমার  কষ্ট নিয়ে ভাবতে হবে না। বসতে বলবে না?’

‘তাই তো। কোথায় বসতে বলি বল তো?’

‘কেন, তোমার এই বিছানায় বসলে অসুবিধা আছে?’

‘আমার কিছু অসুবিধা নেই। তোমার তো থাকতে পারে।’

‘খোঁচা দিচ্ছ?’

‘না, তোমার তো ছুঁতমার্গ আছে, তাই বললাম।’

‘সব পুরনো কথা মনে রেখে দিয়েছ?’

‘বারে, ভুলে যাব কী করে? যে কথাগুলো আমার জীবনটাকে ওলোটপালোট করে দিয়েছে, সেকথা অতসহজে ভুলে যাওয়া যায়? যাকগে ছাড়ো। বল কী করতে এসেছে? এতদিন পরে আমাকে হঠাৎ মনে পড়ল কেন?’

‘তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।’

‘কেন? আমার কাছে তোমার ক্ষমা চাওয়ার কী আছে। তুমি তো কোনও অন্যায় করনি। অন্যায় করেছিলাম আমি। তুমি তার শাস্তি দিয়েছ।’

‘যদি বলি তোমাকে শাস্তি দিয়ে আমিও শাস্তি ভোগ করেছি, তুমি বিশ্বাস করবে?’

‘তোমার আবার কীসের শাস্তি।’

‘তুমি যেমন আমার বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিলে, তেমনি আমার ভুলও ভাঙিয়ে দিয়েছে। তাই তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে এসেছি। তুমি কি শুনবে?

‘বল।’

জীবনটা যে মরুভূমির ধূ ধূ বালির মতো তৃষ্ণার্ত। সে বৃষ্টির অপেক্ষায় চেয়ে থাকে, কখন আসবে সজল মেঘের ছায়া নিয়ে। আজ দরজাটা বন্ধ করল তনয়া।

4 COMMENTS

  1. Valo laglo.bolishtho lekhoni tobe onek lekhar songei onek jaygay kiichu kichu meel ache.

এমন আরো নিবন্ধ