বেনোজল

796

দুর্গা ঠাকুরের মঞ্চের দিকে তাকাতেই আমার ভুরু কুঁচকে গেল। পুরোহিতের সাজে হাতমুখ নেড়ে মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে যে-ছোকরা বেশ খবরদারি করছে, সেটা আমাদের ধনা-ই তো! ধনা অবশ্যই সংক্ষিপ্ত নাম … ধনঞ্জয় থেকে। ধনঞ্জয় পাঠক পুরো নাম। তো সে যাক্‌ কিন্তু ধনার এই ভূমিকা কবে থেকে!

মঞ্চ থেকে বেশ খানিকটা দূরে হলেও, এবং ইদানিং দেখাসাক্ষাৎ অপেক্ষাকৃত কম হলেও, এবং সাদা গরদের ওই ধুতি-চাদর-উড়ুনি পোশাকটি অভিনব হলেও, ধনার শাঁসে-জলে ঢলঢল দোমালি বপুটি আমি কিছুতেই ভুল দেখতে পারি না, জানি। তাসত্বেও বিভ্রান্তি এবং অবাক হওয়ার খট্‌কাটা এমনই বাজছে, যে, চাঁদা-তোলা পার্টিদের একটা ছেলেকে জিগ্যেস না-করে পারলাম না।

শেফিল্ড-এ এখন দুর্গাপুজোর আয়োজন, ব্যবস্থাপনা সব জুনিয়র ছেলেমেয়েরাই করে থাকে। আমরা সবাই প্রায় পিছনের সারিতে। কিন্তু আছি। মোটামুটি চিনিও অনেককে এবং প্রবাসী এইসব বঙ্গসন্তানরা অধিকাংশই এদেশের চিকিৎসক। অল্প কিছু ইঞ্জিনিয়র, আই টি বা অ্যাকাউন্ট্যান্ট … ইত্যাদি।

চাঁদা তোলার ডেস্ক্‌-এর সামনে বসে পুজোর স্যুভেনির গোছাচ্ছিল অর্থোপেডিক সার্জেন সন্দীপ দত্ত। খুব ভাল ছেলে এবং এখন ও এক পাণ্ডা গোছের ভূমিকায় আছে। ওকেই জিগ্যেস করলাম।

হ্যাঁরে … ঠাকুরের স্টেজ-এর ওপর ওটা কে! ধনা-ই তো নাকি?

একটু মিচকে হেসে সন্দীপ বলল, কেন শুভেনদা … চিনতে অসুবিধে হচ্ছে নাকি!

বললাম, একটু তো হওয়ারই কথা। দেখে চিনতে পারলেও মেলাতে তো অসুবিধে হচ্ছে বটেই।

সন্দীপ বুদ্ধিমান ছেলে। আমার কথার অন্তর্নিহিত অর্থ ধরতে পেরেছে বলেই মনে হল। বিশেষ করে, ধনা অর্থাৎ ধনঞ্জয় পাঠক ওদেরই সমসাময়িক চিকিৎসক এদেশে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ সাইকিয়াট্রিষ্ট-এর কাজ করে। অবশ্য ধনা তার চেয়ে বেশি পরিচিত … অথবা পরিচিত হতে চায় ‘কমরেড’ হিসাবে। এবং সেই ব্যাপারে ও কিছু অতিরিক্ত সোচ্চার … আড্ডা-আলোচনা এবং ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ-এ। নিজেকে কট্টর কম্যুনিস্ট, ছেলেবেলা থেকে সিপিএম-এর সমর্থক, জ্যোতি বসুদের ভাবশিষ্য … ইত্যাদি বলে বলে আমাদের এই ইয়র্কশায়ারের প্রবাসী বঙ্গসন্তানদের মধ্যে ধনঞ্জয় যাহোক নিজের একটা আইডেন্টিটি দাঁড় করিয়েছে। জীবনযাপনে তার কোনো প্রতিফলন নেই অবশ্য। তো সে যাক্‌।

ইংল্যান্ডের মত দেশে তাইতে কিছু যায় আসে না। নিয়মতান্ত্রিক কাজের দেশে কারুর ব্যক্তিগত বোধ-বিশ্বাস নিয়ে অন্য কারুর মাথা ঘামাবার ফুরসৎ নেই। ওসব নিয়ে আড্ডাবাজি-তে কিছুক্ষণ সময় কাটানো, পেছনে লাগা কিংবা রং তামাশা হয়। বিষয় হিসাবে গুরুত্ব পাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। এদেশের জীবনযাপন রাজনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় না। সে ব্যাপারে আমাদের দেশের সঙ্গে এদেশের আকাশপাতাল তফাৎ।

আমার কথা শুনে সন্দীপ বলল, মেলানর চেষ্টা কোরো না শুভেনদা … ধনাকে সবাই জানে।

আমিও হেসে বললাম, তা-বলে ইনকিলাব আর লালপতাকা ছেড়ে একেবারে … গরদ পরা, পৈতাধারী পুরুতগিরি!

সন্দীপ বলল, আচ্ছা তুমিও যেমন …। ধরেছিল কবে, যে ছাড়বে?

তা কি আর জানি! ও নিজেই বলে … সেই থেকেই জানা। ও নাকি বাম দুর্গের ছাত্রনেতা ছিল। লড়াকু … জনদরদী!

এদেশে এসে অনেকেই অমন ঢাক পেটায় শুভেনদা। আবার দরকার মতো পালটেও নেয়। বোসো তো। তোমার সঙ্গে বিজয়ার অনুষ্ঠান নিয়ে কথা আছে।

আমি বসতে বসতে বললাম, ধনার ঢাকটা এবার ফেঁসে না গেলেই ভাল। …

সন্দীপ সঙ্গে সঙ্গে বলল, ওর ঢাক আর নতুন করে ফাঁসার কিছু নেই শুভেনদা। সবাই জানে।

কিন্তু এবারের রোলটা বড় বেশি কনট্রাডিক্টরি হয়ে গেল না! ওকে পুরোহিত বলে লোকে মানবে কেন!

আর কী করা যাবে! তোমরা তো শেফিল্ড-এর পুজোয় প্রথম থেকেই সকলের অবারিত দ্বার …।

কথাটা শেষ না করেই থেমে গেল সন্দীপ। তারপর যোগ করল, আচ্ছা বাদ দাও না ধনার কথা। জালি মাল!

ষষ্ঠী পুজোর সন্ধ্যা। এবার দিনটা বেশ ভাল পড়েছে। আজ শুক্রবার। একমাত্র ঠাকুরের বোধন ছাড়া আর বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান নেই। তা সত্বেও ভাল জনসমাগম হবে আমরা জানি। কাজ শেষ করে অনেকেই বাড়ি ফিরে, পোশাক পাল্টে পুজোর হল-এ আসবে। রাতে ভুরিভোজের আয়োজন তো আছেই। লোকজন আসা শুরু হয়েছে।

আমি তার মধ্যেই সন্দীপকে বললাম, আসলে দ্যাখ … সবাই আসবে বলেই তো দুর্গাপুজো করা। কিন্তু তারমধ্যেই যে … যে-কোনো কেউ মঞ্চে উঠে পৌরাহিত্য করবে … তা তো হয় না। আবার জাত গোত্রে শুধু বামুন হলেও হয় না। অভিজ্ঞতা, ডিসিপ্লিন ছাড়া জ্ঞানেরও দরকার আছে। ধনা তো ওসবের ধারপাশ দিয়ে যায় বলে শুনি নি কোনোদিন …। তাছাড়া ধর্মীয় পুজোটুজোর সঙ্গে ওর তো নাকি …! কট্টর বামপন্থী বলে কথা!

ধান্দাবাজি শুভেনদা … সবটাই ধান্দাবাজি। পুজোর ক’টা দিন আছো তো … দ্যাখো এখানে কত রঙ্গ হয় এখন। আমরাও সব খেয়াল রাখছি।

আমার বেশ ভালই মনে আছে, শেফিল্ড-এ আমাদের এই দুর্গোৎসব শুরু হয়েছিল ছাব্বিশ বছর আগে। লীডস-এ একটা পুজো হতো। সেখান থেকে ভাঙ্গাভাঙ্গি হয়ে শেফিল্ড-এ চলে এসেছিল। আমরা হাল ধরেছিলাম। প্রথম দু-তিন বছরের পরে, বরাবর এই ওয়েলফেয়ার সেন্টার হল-এই দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। অক্টোবর মাসে ভালই ঠাণ্ডা পড়ে যায় … তাহলেও বঙ্গসন্তানরা থাকলে দুর্গাপুজো তো হতেই হবে। লন্ডন পর্যন্ত যাওয়া পোষায় না। সময়- ক্লান্তি- খরচ সবেতেই চাপ পড়ে।

ইদানিং বোঝা যাচ্ছে বিলেতের উত্তর-পূর্বে আমাদের দুর্গাপুজোটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কাছেপিঠে অন্যান্য ছোটখাট শহর এবং শহরতলি থেকে প্রবাসী বাঙালিরা যোগ দিতে আসেন। দেশের মতো অলিতে গলিতে দুর্গাপুজো এ দেশে সম্ভব না। প্রয়োজনও নেই। আগে শুধু লন্ডনে হতো। এখন সব বড় মাঝারি শহরেও হচ্ছে। এখানে মাঠে বা পার্কে পুজো করা সম্ভব না। আচার আয়োজনের অনুমতি দেবে না কাউন্সিল। তার ওপর ঠাণ্ডা এবং বৃষ্টি।

সুতরাং আমাদের হল ভাড়া করতে হয়। বিশেষ অনুমতি নিতে হয় প্রতিমা রাখার জন্য, ধূপধুনো জ্বালানো এবং যজ্ঞ-হোম করার জন্য এবং ঢাক বাজানো – সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদির জন্যও। তাছাড়াও বিশেষ আয়োজন করতে হয় আড়াইশ-তিনশ লোকের অন্তত একবেলা(রাতে) খাওয়ার জন্য … যাকে ডিনার-ই বলা উচিত। বাঙালির পুজো মানে কব্জি ডুবিয়ে পেটপুজো তো বটেই … নয়তো শুধু ধর্ম কিংবা সংস্কৃতি করতে লোক আসবে না।

তবে একথা অবশ্য বলতেই হবে, পুজোর শুদ্ধতা এখানে দেশের তুলনায় বেশি। জাঁকজমক, আড়ম্বর, আলোকসজ্জা, প্যান্ডেল, প্রতিযোগিতা – দলে দলে মিডিয়ার আদিখ্যেতা – লোক দেখানো গরিবসেবা – তলেতলে রাজনৈতিক প্রচার … এসব তো হয় না। নীলাকাশ, মেঘের ভেলা, শিউলি ফুলও নেই। তা সত্ত্বেও উদ্যোগী কিছু ছেলেমেয়ে থাকে বলেই দুর্গাপুজো হয়। তারা অমানুষিক পরিশ্রম করে। পুজোর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কঠোরভাবে এদেশের নিয়ম মেনে চলা খুব মুখের কথা নয়। বিশেষ করে, একটানা চারদিন ধরে। আমাদের দেশীয়-ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার সঙ্গেই এদেশীয় আইন এবং শৃঙ্খলাকে পূর্ণ গুরুত্ব দিয়ে চলতে হয়। আবার পৌরহিত্য করার জন্য সৌমেন্দুর মতো সাত্ত্বিক, নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণও ঠিক জুটে যায়। আমি জানি, দুর্গাপুজো করাটা সৌমেন্দু একটা স্নিগ্ধ, পবিত্র কর্তব্য হিসাবে গ্রহন করেছে। মাঝে মাঝে সংস্কৃত মন্ত্র ইংরিজিতে তর্জমা করে ও বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে। তাইতে পূজোর আবহ একটা উদার মাত্রা পায়।

তবে কিছু কিছু বেনোজল যে সম্প্রতি আমাদের ধারাপ্রবাহে মিশছে তা টের পাওয়া যাচ্ছে। আসলে পুজোর দল হোক বা যে কোনো সংস্থা, বড় হয়ে ছড়াতে শুরু করলেই, গা ঘেঁষাঘেঁষি করার জন্য কিছু সুযোগসন্ধানীও হেঁ হেঁ করতে করতে সেখানে এসে জোটে। প্রথম থেকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, ওই লোকগুলো কোনো দায়বদ্ধতা কিংবা সম্পৃক্ত হওয়ার আনন্দ থেকে এই সংস্থায় এসে জোটেনি। এসেছে কোনো লোকদেখানো ধান্দাবাজির স্বার্থে, অথবা নিজেকে জাহির করার উদগ্র, চাপা বাসনা থেকে। সাদা বাংলায় পাত্তা পেতে। পেছনে কিছু কারণও থাকে।

ধনঞ্জয় পাঠক, তথা ধনা যে এহেন একটি চরিত্রেরই আদর্শ উদাহরণ তাইতে কোনো সন্দেহ নেই।

আসলে ধনাকে আমি বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে এদেশে কাছাকাছির মধ্যে এখানে সেখানে দেখছি বলেই, ও মানুষটা সম্পর্কে খানিকটা ধারনা আছে। ও নিজেকে দ্রুত এদেশের বঙ্গসন্তানদের মধ্যে বিশিষ্ট(!) করে তোলার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিল। তার মাধ্যম হিসাবে বামপন্থী – সিপিএম- মেহনতি জনতা – লাল দুর্গ … ইত্যাদি শব্দাবলীর প্রয়োগ করেছিল নিজের সম্বন্ধে যথেচ্ছভাবে। আবার কখনও ভিন্ন মতাবলম্বী কাউকে কিঞ্চিৎ অশালীন ভাষায় সমালোচনা করেও নিজের নামটা ফেবু-তে বারংবার তুলেছিল। নেতিবাচক প্রচার আর কি।

প্রবাসে অনেকদিন থাকতে থাকতে এসব মানসিকতার লোকজনকে বেশ চেনা যায়। হীনমন্যতা এদের অধিকার করে, কখনও কাজের ব্যর্থতা কিংবা বেঢপ চেহারা কিংবা আরও কোনো গোপন দুর্বলতা ঢাকার জন্য। আমার মতো প্রান্তবাসী এবং বয়স্ক প্রবাসী-ই যখন এসব টের পায়, আমি জানি, ধনাদের নতুন প্রজন্ম এসব আরও অনেক ভাল বোঝে।

কিন্তু ধনার এবারের চালটা যে ওর পক্ষেই ব্যুমেরাং হতে পারে, সেটা ওর বোঝা উচিত ছিল। ষষ্ঠীর দিন সন্ধেবেলা হল-এ বসে বারবার সেই কথা আমার মনে আসছিল। ইতিমধ্যে জনসমাগম বৃদ্ধি পাচ্ছিল। শুক্রবার বলেই একটু দেরিতে হলেও আজ হল ভর্তি হয়ে যাবে। সৌমেন্দুও কাজ সেরে আসবে এবং ঠাকুরের বোধন সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করবে এসে। আমি এটাও বেশ বুঝতে পারছি, হল-এ ঢুকে যথারীতি অনেকেরই মঞ্চে প্রতিমার দিকে দৃষ্টি যাচ্ছে। কিন্তু আগন্তুক বামপন্থী পুরোহিতটি(!)কে দেখে ভুরু-ও কুঁচকে যাচ্ছে সকলেরই নিশ্চয়ই। মনোভাবটা যেন এইরকম – নিজেকে ঘোর কম্যুনিস্ট বলা ধনা আবার গরদের জোড় পরে দুর্গা ঠাকুরের মঞ্চে উঠে কী ন্যাকামো করছে রে! দেশোদ্ধার, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও … নাকি স্রেফ হিপোক্রিসির ঢপবাজি!

যেখানেই জনসমাগম হয়, সেখানেই মানুষের স্বাভাবিক আচরন ও মানসিকতার নিরিখে কতকগুলো ব্যাপার স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ঘটতে থাকে। আলাপচারিতা, দেখা এবং দেখানো তার মধ্যে অন্যতম। এই সবই তো সামাজিকতার অঙ্গ। আমরা সমাজবদ্ধ প্রাণী এবং সেই কারনে আমাদের জন্য সমাজ এবং সমাজের জন্য আমরা … দুটোই ঠিক। আমরা প্রবাসী বলেই আবার, বিশেষ করে, সমাজের গুরুত্বটা দেশের থেকে বেশি বুঝতে পারি। কেননা, সব দেশ, জাতি এবং ভাষাভাষির মানুষের কাছে তাদের ‘নিজস্ব’ সামাজিকতার একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে … বিশেষ প্যাটার্ন আছে। দেশে সবটাই আমাদের এবং তা নিজস্ব। এখানে তা নয়। এখানে আমরা নিজস্বতার একটা আবহ রচনা করে নিই আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মাধ্যমে … আর তার ফলেই প্রবাসও দিব্যি বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। উপভোগ্যও বটে।

ওয়েলফেয়ার সেন্টারের হল এর মধ্যেই প্রায় অর্ধপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেখতে পাচ্ছি। এ-ও-সে আসছে … কী খবর, কেমন আছো/ আছেন … ইত্যাদির সৌজন্য বিনিময় চলছে। আমি জানি, ইদানিং এই পুজোর সমাবেশে এদেশে পাত্রপাত্রী দেখাও চলে। তা মন্দ কী! একসঙ্গে এতো প্রবাসী এবং বঙ্গসন্তানের দেখা অন্য কোথাও কী করে মিলবে!

কিন্তু সবকিছুর মধ্যেই মঞ্চের ওপর আজ ধনার উপস্থিতি যে একটা বিরক্তিকর গুঞ্জন সৃষ্টি করেছে, তা বেশ টের পাচ্ছি। 

কেউ কেউ এসে আকারে ইঙ্গিতে আমাকে প্রশ্নও ছুড়ে দিয়ে গেল … কী ব্যাপার শুভেনদা! ইত্যাদি।

কিন্তু আমি এবং আমরা তো এখন, যাকে বলে, ব্যাক বেঞ্চার। আছি আবার নেই-ও। সবই দেখছি, বুঝতেও পারছি। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে কিছু করার প্রশ্ন ওঠে না। নতুন ছেলেমেয়েরা যা করার করবে। … দেখতে পাচ্ছি, ধনার গরদ পরিহিত স্ফীতোদর চেহারাটি এখন একটি ধুনুচিতে নারকেল ছোবড়া আর একটু ধুনোর ধোঁওয়া নিয়ে মঞ্চের এপাশ থেকে ওপাশে যাতায়াত করছে। মাঝেমাঝে হাতের সঞ্চালনে চওড়া উপবীতটিও দৃশ্যমান করে তুলছে …।

কী আর বলব! পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স হবে ধনঞ্জয়ের। ছেলেটার পেজোমি এবং হীনমন্যতার কারণে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা দেখে যুগপৎ বিরক্তি ও লজ্জার শিকার হতেই হচ্ছে। মনে হচ্ছে ধনার এতদিনের সব ভূমিকাই লোক দেখানো। পাশে চেয়ার টানার শব্দ হতেই দেখি, কমিটি মেম্বার তূর্ণী আমার পাশে এসে বসেছে। চোখেমুখে উত্তেজনা। একেবারে ভনিতা ছাড়াই বলল, কাণ্ডটা দেখেছো শুভেনদা! শো অফ করতে একেবারে স্টেজের ওপরে!

তূর্ণী এদেশে চোখের ডাক্তার। বলিয়ে-কইয়ে, সপ্রতিভ মেয়ে, দেখতে ছিমছাম। আমাদের পরে এরাই এখন পুজো কমিটির কর্মকর্তা-কর্ত্রী হয়েছে। তাহলেও সব ব্যাপারে যোগাযোগ রাখে। ধনা এবং ওরা প্রায় সমসাময়িক। সবাই সবাইকে ভালই চেনে। সুতরাং তূর্ণীর ফ্রাস্ট্রেশন এবং রাগের কারণটা আমি বুঝতে পারছিলাম।

বললাম, দেখছি তো বটেই … তোরা আসার আগে থাকতে। কিন্তু ওর উদ্দেশ্যটা কী বল তো?

আবার কী ! দেখানো যে … আমি এইসব পবিত্র, ধর্মীয় কাজেও কতখানি ইনভলভড্‌ …।

কিন্তু পুরোহিত তো সৌমেন্দু ব্যানার্জি। ধনার রোলটা তাহলে কী?

বুঝতে পারছো না … সাইডলাইন দিয়ে … অ্যাসিসট্যান্ট–এর মতো ঢোকার ধান্দা। দৃষ্টি আকর্ষণ।

তাও বুঝলাম … কিন্তু ঢুকতে এবং ষ্টেজে উঠতে অ্যালাও করল কে?

তূর্ণী একটা বিরক্তির শ্বাস ফেলে বলল, কী বলব বলো … সেইটাই তো হয়েছে আমাদের পুজোর একটা সমস্যা। মধুশ্রীদির কোমর বেঁকে গেলেও, এখনও তো পুজোর আয়োজন আর স্টেজের ম্যানেজমেন্টটা ছাড়ছে না। ওকেই কীভাবে …।

আমি সোজাসুজি বললাম, তোরা ছাড়িয়ে দে … অন্য সব দায়িত্ব যখন তোদের …।

পনের-ষোল বছরের সিনিয়র … মুখের ওপর কথা বলা যায়!

এখন আর ওর ষ্টেজে উঠে লাভ কী?

ওহ্‌ বাবা … দ্যাখো না … সেজেগুজে, শাড়ি-গয়না পরে, এখনও কী ন্যাকামো আর গিন্নিগিরি করে! শো অফ।

চেহারা তো হয়েছে খেজুর গাছের মতো … তা সত্ত্বেও …।

এতক্ষণে তূর্ণী একটু হেসে উঠল আমার উপমা শুনে। তারপর বলল, ধনা তো ওই মধুশ্রীদিকে ম্যানেজ করেই … সৌমেন্দুদাকে হেলপ্‌ করবো … বলে-টলে ভিড়েছে। গতমাসেই কলকাতা থেকে ওই গরদের জোড় আনিয়েছে …।

আমি বললাম, কিন্তু মধুশ্রী কি জানে না, যে, ধনা কট্টর কম্যুনিস্ট, ঘোর বামপন্থী বলে নিজেকে! এতকাল বলে এসেছে, ও এসব পুজোপাজা – শুদ্ধাচার – ধর্মীয় অনুষ্ঠান মানে না … গরু শুয়োর খায় …।

আমাকে থামিয়ে দিয়ে তূর্ণী বলল, শোনো শুভেনদা মধুশ্রীদি তোমাদের কন্টেম্পোরারি … কী জিনিস তুমি জানো না! যে ওকে ঠিকমতো তেল মারতে পারবে …। প্রিন্সিপল নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যাথা আছে নাকি?

কিন্তু ধনারই বা হঠাৎ এই ভেক্‌ ধরা কেন বলতো?

ও মা … জানো না! ওদের সেই নাটকের দল থেকে ঝাড় খেয়েছে যে! খুব নাকি পাকামো মারছিল … এমনকী মাঝেমাঝে কাকে যেন ইনসাল্টিং কথটথা-ও বলেছিল। তখন ওদের প্রেসিডেন্ট জোর ধমক দিয়েছে। সেইজন্যেই তো এখানে …।

আমি মাথা নেড়ে বললাম, তার মানে … ধনা এখন নতুন ঠেক খুঁজে বেড়াচ্ছে। সত্যি … কি আইডেন্টিটি ক্রাইসিস!

ঠিক ধরেছো। তূর্ণী বলল। তবে এটা ঠিক শুভেনদা, পুজোর এখানে ঢুকে ওকে আমরা ওস্তাদি মারতে দেব না। এটা বন্ধ করতে হবে।

কী করবি? পুজোর হল-এ কাউকে আসতে বারণ করা তো যাবে না।

বারণ করব না তো! কিন্তু এবার ওর হিপক্রিসি, ঢপবাজি … এগুলো সব এক্সপোজ্‌ করে দেব … দ্যাখো না কী করি।

আমি একটু ম্রিয়মান হয়েই বললাম, দ্যাখ। তবে …। আসলে এই ধনারা হচ্ছে অন্যরকম একটা ক্লাস … বিশ্বাস ব্যাপারটা নেই বললেই চলে। এঁরা খানিকটা রোলিং স্টোন-এর মতো। শাস্তি দেওয়ার থেকে এদের করুনা করাই ভাল হয়তো। …

তুর্ণী একটু ভেবে নিয়ে বলল, ঠিক আছে, তোমার অ্যাডভাইসটা মনে রাখব শুভেনদা। তবে এটাও কিন্তু জেনো, ধনার মতো লোকদের করুণা দেখালে, সেটা ও আমাদের দুর্বলতা মনে করবে। ভাববে ওর ছ্যাঁচড়ামিটাই জিতেছে।

আমি হেসে বললাম, ছ্যাঁচড়ামি করে আত্মপ্রসাদ লাভ করা যায় … জেতা যায় না রে…।

সৌমেন্দু মঞ্চের ওপর উঠে ঠাকুরের বোধন শুরু করেছে। মহাষষ্ঠীর পুজোয় হল একেবারে গমগম করছে। তূর্ণী উঠে পড়ল আমার পাশ থেকে। বলল, কিচেনে অনেক কাজ শুভেনদা … রুমাদিকে বোলো কাল দেখা হবে … এখন আসি। …

আমার চোখে পড়ল, ঠাকুরের মঞ্চের ওপর ধনার বউ পৌষালী ওর কানে কানে কিসব বলছে …।

*********************

মহাসপ্তমী, শনিবার। পড়ন্ত বিকেল থেকেই আজ আমাদের ওয়েলফেয়ার সেন্টার হল-এ জনসমাগম শুরু হয়েছে। পুজোতে উইকএন্ড পড়লেই হল উপছে পড়ে। আজ কপালগুনে আবহাওয়াটাও চমৎকার। এখনও গাছের পাতা ঝরা শুরু হয় নি; কিন্তু রং বদলে প্রকৃতিতে লাল-হলুদ ছোপ ধরিয়ে দিয়েছে। গভীর নীলাভ আকাশে মেঘ নেই। খুব ঠাণ্ডা। তবে হলের ভেতরে বেশ আরামদায়ক উষ্ণতা।

সকালের দিকে একপ্রস্থ পুজো হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের আসল পুজো … সেই সঙ্গে অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, আরতি … সবই হবে সন্ধে থেকে, কেননা তখনই লোকজন আসে, জমজমাট ভাব হয়। খাওয়াদাওয়া সেরে সবাই রাতে ফেরে। একটা ব্যাপার টের পাচ্ছি। মঞ্চের ওপর পুজোর সময় হলেও, কর্মকর্তা /কর্ত্রীরা যেন একটু সময় নিচ্ছে। বোধহয় কিছু প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছে। মঞ্চের ওপর দুজন মহিলা ছাড়া আর কেউ নেই। ধনা আজও সাদা গরদের ধুতি, উড়ুনি পড়ে পৈতে দুলিয়ে এসেছে। সামনে ঘোরাঘুরি করছে কিন্তু ষ্টেজে ওঠার ভরসা পাচ্ছে না। তাহলেও ভাবখানা – এই তো একটু পরেই এবার মঞ্চারোহন করব এবং নিজের ভূমিকা জাহির করব। নাটকের দলে ঝাড় খেলেও আমি কি কম্‌তি আছি …। দ্যাখো কেমন ভোল পালটে আবার ফিল্ড-এ নেমে পড়েছি …। দেখতে পাচ্ছি, চেনা-অচেনা এর –ওর –তার সঙ্গে ধনা যেচে-যেচে গিয়ে আলাপ করছে … কথা বলছে, হাসছে। ব্যাতিক্রমী পোশাকেও – ও যে কিঞ্চিৎ নজর কাড়ছে তাও সত্যি। পাত্তা পেতে গেলে এসব করতে হয়।

চোখে পড়ল, নতুন কর্মকর্তা কয়েকটা ছেলেমেয়ে একসঙ্গে মঞ্চের নিচে দাঁড়িয়েছে। তারমধ্যেই তূর্ণীর হাতে কর্ডলেস মাইক্রোফোন। সমবেত সকলের উদ্দেশে ও কিছু একটা ঘোষণা করতে উদ্যত। … লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন … মে আই হ্যাভ য়োর অ্যাটেনশান প্লিজ  …।

হল বেশ চুপচাপ হয়ে গেল। তারপর পুজো কমিটির সম্পাদক হিসেবে ও কথা বলতে শুরু করল। বুঝলাম তৈরি হয়ে এসেছে। খুব স্পষ্ট এবং পরিচ্ছন্নভাবে তূর্ণী ওর বক্তব্য জানাচ্ছে।

বন্ধুগন, শারদীয় উৎসবের আন্তরিক প্রীতি ও নমস্কার জানাই আপনাদের সকলকে। প্রবাসের দুর্গাপূজায় এতো মানুষের যোগদানে আমরা অভিভূত। … এ বছরে বেশ কয়েকজন ভোলেন্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবী, নিজেদের পজিশন পরিচয় … এমনকী পার্সোনাল বোধ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস পর্যন্ত জলাঞ্জলি দিয়ে, আমাদের পুজোর কাজে সাহায্য করতে চলে এসেছেন – এ খুবই আনন্দের কথা। … তূর্ণীর কথা শেষ হতে না হতেই হল জুড়ে হাততালি পড়ল।

ও আবার শুরু করল – বন্ধুগন এতো বড় পুজোর অনুষ্ঠানে কত কাজ থাকে আপনারা জানেন। কাজের মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকাও খুব দরকার, নয় তো আমরা পুজো কমিটি এতো বড় দায়িত্ব পালন করতে পারব না। রব উঠল – শিওর শিওর।

তূর্ণী বলল, সেইজন্য আমরা কাজের ভাগ করে, নতুন নতুন ভলেন্টিয়ারদের হাতে কিছু কিছু দায়িত্ব তুলে দিয়েছি। হল-এর ড্রেসিংরুমের পাশের বোর্ড-এ আমরা সেই কাজ এবং ভলেন্টিয়ারদের নামের তালিকা টাঙ্গিয়ে দিয়েছি। সবাই দেখে নেবেন। এখন নিঃস্বার্থভাবে দুর্গাপূজার কাজে যারা সামিল হয়েছেন, কমিটির তরফ থেকে আমি তাদের অভিনন্দন, প্রীতি ও নমস্কার জানাই। এবার আমরা মহাসপ্তমীর বাকি পূজা ও অঞ্জলির আয়োজন করছি … ।

আবার হাততালিতে ভরে গেল ওয়েলফেয়ার সেন্টারের হল। সঙ্গে ঢাক এবং কাঁসর ঘণ্টাও বেজে উঠল। রীতিমত জমজমাট পুজোর আবহে প্রাণময় হয়ে উঠল বাঙালির চিরন্তন উৎসব।

আমাদের আড্ডা জমে উঠেছে কাছেপিঠের বন্ধু-পরিচিত দলবল এসে পড়ায়। ধনাকে মঞ্চে দেখতে পেলাম না। সম্ভবত ওখানে কোনও দায়িত্ব পালনের ভার ওকে পূজাকমিটি দেয়নি। তূর্ণীরা এক অবিশ্বাসী পুরোহিতকে খুব বিনয়ী চালে সরিয়ে দিয়েছে বুঝলাম। কিছু করার নেই। ‘গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়ল’–দের এই অবস্থাই হয়। নিশ্চয়ই গরদের জোড়, উড়ুনি, পৈতে … সব গুটিয়ে ভেগে পড়েছে ধনঞ্জয় পাঠক। … সত্যি বলতে কি মনটা একটু খারাপ-ও লাগল … পুজোর দিন …।

ওহ মা … তা নয়। চা খাব বলে কিচেনে গেছি। স্বাভাবিকভাবেই ওখানে রীতিমত ব্যস্ততা। আড়াইশ-তিনশ লোকের রান্না হচ্ছে। দেখি, এক কোনে জিনস্‌ আর টি শার্ট পরে একতাল ময়দা মাখছে ধনা। বেশ মানিয়েছে ওকে। কিন্তু মুখে হাসি নেই …। আমি নিঃশব্দে সরে এলাম।                   

Advertisements
Previous articleসাগর, আই লাভ ইউ
Next articleডাক্তারবাবু রবীন্দ্রনাথ
নবকুমার বসু
জন্ম ১০ ডিসেম্বর, ১৯৪৯ | চূড়ান্ত অভাবের মধ্যে কেটেছে শৈশব ও বাল্যকাল | কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এস পাশ করার পর শল্য চিকিত্সক হিসেবে প্রতিষ্ঠা | ’৯৩ সাল থেকে ইংল্যান্ডে প্রবাসী | বিদেশে বাংলা ভাষার প্রসারে সদা উত্সাহী | অজস্র ছোটগল্প ছাড়াও লিখেছেন ভ্রমনকাহিনি, রহস্য কাহিনি ও ধারাবাহিক উপন্যাস |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.