মহুয়া সেন মুখোপাধ্যায়
জন্ম, বড় হয়ে ওঠা কলকাতায়। গত একুশ বছর ম্যাসাচুসেটস,আমেরিকা প্রবাসী। বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক। এখন পর্যন্ত লেখা বেরিয়েছে ওয়েব ম্যাগাজিন পরবাসে এবং আনন্দবাজারে।

 

Banglalive

বড়ো নদী খাঁড়ি  হয়ে ঢুকেছে,চলেছে নিজের মনে ধীর গতিতে – দু’পাশে নিবিড় সবুজ তট রেখা।  এই জলপথ দিয়ে অনেক অনেক দূর যাবার শেষে আসে এই গ্রাম- গ্রামের কাছে নদীকে কোনো এক অদৃশ্য জাদুকাঠি যেন কেউ ছুঁয়ে দিয়েছে। এর জলে একটা গহিন  ডুব দিলে  জল কোথাও শ্যাওলা সবুজ,কোথাও থমথমে কালো,কোথাও আবার পান্নার মতো স্বচ্ছ। সূর্যের আলো আর জলজ গুল্মলতাতে এখানে তৈরী হয় এক আশ্চর্য রসায়ন,যা জন্ম দেয়  অজস্র প্রাণের। তারই কিছু ভাগ ধরা দেয় রুপোলি শস্য হয়ে – জেলেদের জালে।

 গ্রীষ্মের গনগনে রোদে পোড়ে এই গ্রাম,আবার ভরা  বর্ষায়,শরীরে জল আর মাটির গন্ধ মেখে ফসল বোনে চাষিরা। লেবু ফুল রঙা জ্যোৎস্নার কোনো কুয়াশাভরা হেমন্ত রাত্রে শোনা যায় গান অথবা বাঁশির সুর…সেই সুর যেন আকাশ থেকে চাঁদকেও টেনে আনে কিছুটা মাটির কাছে। অনেকে বলে,সেসব রাত্রে ওই গাঙের বুক থেকে উঠে আসে এক মৎস্যকন্যা,পাড়ে বসে আকাশের ওই মায়া-চাঁদের দিকে তাকিয়ে শোনে ওই অলৌকিক সুর..গাঁয়ের বাচ্চারা ধুলোমাটি মেখে কাটায় তাদের চিরশৈশব। গ্রামের প্রান্তে এক বিরাট মাঠ -সেখানে যারা গরু চরাতে যায় তাদের কেউ কেউ গল্প করে গাছের তলায় শুয়ে আধো ঘুমে শুনতে পাওয়া দুই পাখির কথোপকথন। গ্রাম তাদের ছোট ছোট কুঁড়েঘরে,ফুলে ফলে,ঝুপসি বনে,কুয়াশাভাঙ্গা রোদ্দুরে ,ঝমঝমে বৃষ্টিতে,এলোমেলো  হাওয়ায়,সুখে দুঃখে ছলছলে – মায়ার ওম মাখানো চাদর জড়িয়ে এই পৃথিবীর  মধ্যেই ….হয়তো  আবার নয়। 

গ্রামের শেষ প্রান্তে নদীর ধারে কুঁড়েটা-মাটির ঘর,খড়ের চাল,পরিপাটি নিকোনো উঠোন,দাওয়াতে আলপনা -উঠোনের ধারে একটা গরু আর বাছুর বাঁধা,উঠোনের একপাশে সারিসারি ফুলের চারা। এক চোখ জুড়োনো  লাবণ্যে ভরা সংসার।

কিন্তু চোখ যা দেখে -কান কি তা শোনে? 

সত্যি কথা বলতে কি,এই বাড়ির মানুষদুটোর মধ্যে ঝগড়া শুনলে সুখশান্তির বাষ্পটুকুও উড়ে যায়..সকালে বাড়ির পাশ  দিয়ে যেতে যেতে দেখা যায় গিন্নীকে শাড়ি গাছকোমর করে পরা,কোঁকড়ানো চুলে মস্ত খোঁপা,দাওয়ার একপাশে বসে চাল বাচ্ছে বা শাক কুটছে। মাথায় ঝুড়ি নিয়ে  ফিরল কর্তা …ঝুড়িতে ভরা রুপোলি মাছ;কর্তা  ঝুড়ি নামিয়ে দাওয়ার একপাশে বসে গামছা ধরিয়ে ঘুরিয়ে হওয়া খাচ্ছে আর আড়ে আড়ে  দেখছে গিন্নিকে। ঝুড়ির দিকে তাকাতে, গিন্নির চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠলো…কিন্তু ঠোঁট  তখনও টেপা। কর্তা  ইশারা করল-ঝুড়ির একদিকে তাজা সরপুঁটির দিকে,এগুলো গতকাল রাত্রের ঝগড়ার সন্ধি – গিন্নির বড়ো প্রিয়। গিন্নির জোড়া ভুরুর নীচে ডাগর চোখেও হাসি-রান্নাঘরের দিকে উঠে গেলো সে, বেলা বয়ে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে কর্তার মুখেও হাসি সংক্রামিত হলো-প্রথম বেলায় কর্তার জিত। 

আরও পড়ুন:  শাড়ি

কিন্তু আধঘন্টা বাদে বাড়ির পিছন দিয়ে গেলে দুজনের ঝগড়াতে বাড়িতে কাক চিল  বসতে পারে না…ধুপধাপ করে পা ফেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় কর্তা।

“যাচ্ছো যাও| আমি কিন্তু চৌপর বেলা অব্দি ভাত কোলে করে বসে থাকতে পারবো না” আছড়ানো বাসনের মতো ঝনঝন করে ওঠে গিন্নির গলা পিছনে। তারপর দিন পার হয় ,আকাশে ফুটে ওঠে একটি দুটি তারা- ঝিকিমিকি বেলায় কর্তা ফিরে আসে – দাওয়ার  দেওয়ালে  কুলুঙ্গিতে গিন্নির হাতে বানানো অপূর্ব নকশা করা মাটির প্রদীপের আলোয় আবছা উঠোন,উনুনে টগবগে ফুটন্ত ভাতের গন্ধ সারা বাড়িময়। কিন্তু বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই প্রায় দিনই কর্তা গিন্নির আবার ঝগড়া-

“গাঁয়ের সব মানুষ কখন বাড়ি ফিরে এসেছে,শুধু তোমার এতো দেরি। বাড়ি ফিরতে ইচ্ছেই করে না ” অথবা 

“বাছুরটা এতো কাঁদছে,বারবার বলছি ওকে একবার বদ্যির কাছে নিয়ে যাও.. ”

ছোট কথা বড়ো হয়ে যায়- বাঁধা  গত,কিন্তু ঝালা বড়ো তীব্র। ঠিক সেই সময় নদী থেকে ডিঙি বেয়ে এই বাড়ির কাছে ঘাটে এসে নামেন তিনি। দিনের কাজ সেরে,মাথায় এক বড়ো ঝুড়ি নিয়ে এই বাড়ির পাশ দিয়ে তার নিত্য যাতায়াত- প্রায়ই তার কানে আসে এই তীব্র কথোপকথন। তাঁর  মুখের প্রশান্তিতে একটা ছায়া পড়ে,পাশ কাটিয়ে চলে যান তিনি, কিন্তু তাঁর কপালে পরে কয়েকটা বিরক্তির আঁচড় ,দু’দিকে মাথা নড়ে ওঠে আনমনে।

কিন্তু কান যা শোনে চোখ কি তাই দেখতে পায়?

রাত  বাড়ে,গাছপালার মধ্যে দিয়ে শনশন বাতাস বয়-ঝোপেঝাড়ে জোনাকি জ্বলে.. প্রথম রাত্রে এই বাড়ির উঠোন থেকে ছড়িয়ে পরে বাঁশির সুর,সেই সুর যেন হাওয়ার প্রত্যেকটা স্তর বেয়ে আগুনের শিখার মতো মতো উঠতে থাকে-…কী আকাঙ্খা,কী না পাওয়া  সেই সুরে-জন্মান্তরের যন্ত্রনা। তারপর রাত্রি নিবিড় হয়ে আসে,গিন্নির বানানো প্রদীপ নিভে  আসে…তখন হাওয়ায় শুধু  চুড়ির রিনিরিন, মৃদু আওয়াজ- সোহাগের,আশ্লেষের। রাতও  বাড়ে,গাঙের বুক থেকে আসা হুহু হওয়ার মধ্যে  দুজন দুজনকে আঁকড়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।

এভাবে দিন যায়,এক সন্ধেতে কর্তা  আসে,দুই এক কথা বেড়ে দাঁড়িয়ে যায়  তুমুল অশান্তিতে…শোবার ঘর থেকে গিন্নির আঁকা মাটির  পাত্র ভেঙে চুরমার হয়ে যায়;গিন্নি রাগ করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো কর্তার প্রিয়  বাঁশি …ভয় পেয়ে জোরে ডেকে ওঠে বাছুরটা। ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে, জোনাকি কণাগুলোও যেন চমকে চমকে ওঠে। ঠিক সেই সময়ে উঠোনের দরজাটা হাট  করে খুলে যায় হঠাৎ,উনি এসে দাঁড়ান ভিতরে। ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ওরা,মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি,ভয়,লজ্জাও -পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন:  দিনে নায়িকা...রাতে হাই-ফাই গণিকা!!

“কী বলি বল তো তোদের? কী বলি?”একসাথে দুজন কথা বলে ওঠে-হাত তুলে দুজনকেই নিরস্ত করেন উনি…

“স্বর্গে থাকা দেখছি তোদের ভাগ্যে নেই,একসাথে থাকাও নয়। যা ফিরে যা-আবার ওখানেই তোদের থাকতে হবে।” 

স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ওরা – দুজনের মুখই  বিবর্ণ ,গিন্নির মুখে ভাংচুর শুরু হয়…ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ে সে। উনি দরজার দিকে হাটতে শুরু করেন,হঠাৎ কী মনে হওয়ায় পিছন ফিরে তাকান,ওদের দেখেন কয়েক মুহূর্ত, সমাহিত চোখে ফুটে ওঠে করুণা… তারাভরা আকাশের দিকে তাকান একবার,তারপর ওঁর  ঠোঁটে ফুটে ওঠে একটা সংকেতময়   হাসি।

 

*****************************************************************************************

 

ডালাসের সাবআর্বে একটা সমৃদ্ধ টাউন। একটা মনোরম প্রাসাদসম বাড়ি,ম্যানিকিওর করা লনের মাঝখানে। শনিবার সন্ধে,বাড়ির সামনে প্রচুর গাড়ি পার্ক করা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে এই বাড়ির প্রতিটি  জানলাও যেন আজ আলো, হাসি,সুগন্ধে ঝলমল করছে। আজ বাড়িতে উৎসব। বাড়ির মালিক মিস্টার আর মিসেস চ্যাটার্জীর বিয়ের রজত  জয়ন্তী। বেনারসী,সিল্ক,তসর,ক্রেপ,পাঞ্জাবি,স্যুট,দেশী বিদেশী খাবার,পানীয়,তরল গল্প হাসিতে সন্ধে ক্রমশ হয়ে উঠছে রঙিন ।

লিভিংরুমের একপাশে একটা গ্র্যান্ড  পিয়ানো। তার সামনে  বসে তৃষা। বহু বছর ধরে পিয়ানো তার প্যাশন। তাই যেকোনো উৎসব অনুষ্ঠানে যখন তখন বসিয়ে দেয় লোকজন  তাকে- ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের  মতো বাজাতে থাকে সে, বাকি সবাই কথা বলে, দিনের পর দিন,বছরের পর বছর তাই হয়ে চলেছে,মুখচোরা তৃষা কিছু বলতে পারে না..ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার..কত  স্বপ্ন ছিল বার্কলে স্কুল অফ মিউজিকে শেখার,কোনো সিম্ফনি অপেরায় বাজানো। এখন বাচ্চাদের পিয়ানো শেখানোর মধ্যেই আটকে গাছে তার স্বপ্ন,ছেলেবেলায় দেখা ছাদের এন্টেনায় আটকানো  ছেঁড়া ঘুড়ির মতো। আজও তাই- কিছু বাচ্চারা দৌড়োদৌড়ি করে খেলছে;তার থেকে বড়োরা ফোনে  মগ্ন, জটলা করে কিছু  অতিথিরা গল্প করছে নিজেদের মধ্যে। কয়েকধাপ সিঁড়ি  উঠে গিয়ে আর একটা বড়ো লিভিং রুম, সেখান থেকে ভেসে আসছে তুমুল পলিটিক্সের তর্ক। কোণের দিকে একটা সোফায় তারই কিছু বান্ধবীরা নিজেদের মধ্যে নীচু স্বরে কিছু আলোচনা করছে-একজনের কাঁচ ভাঙা  হাসির শব্দ চমকে দিলো ফোনে নিমগ্ন কয়েকজনের  মনোযোগকেও,একটু ঘুরে  তাকালো কেউ কেউ। আজকাল অভ্যস্ত হয়ে গেছে তৃষা,এইভাবেই বাজিয়ে যায় সে -এই অন্যমনস্কতা,এই অমনোযোগের মাঝখানেই । ভাগ্যিস,তার হাতের আঙুলগুলো  সাদা কালো এই অষ্টআশিটা   রিডের  সাথে তৈরি করে নিয়েছে এক চেষ্টাহীন  বোঝাপড়া।

আরও পড়ুন:  কেতজেল পাখি (দ্রোহজ ২) পর্ব ৩

একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজলো  সে…ওই তো হলের শেষ প্রান্তে আরো দু-তিনজন অতিথির  সাথে দাঁড়িয়ে শুভাশীষ,তার স্বামী। তিন পেগ শেষ হবার পর তার হাসি আর গলায় ফুটবলের আলোচনা এখন থেকেও শোনা যাচ্ছে। অন্যমনস্ক আঙ্গুল খেলা করছে রীডে,কোঁকড়ানো অবাধ্য চুল ছড়ানো তার পিঠে। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন হাত রাখলো কাঁধে…একটু চমকে ফিরে  তাকালো সে,পিছনে সহাস্যমুখে  এই অনুষ্ঠানের হোস্ট রজত চ্যাটার্জী।

“তৃষা,তোমার বাজনা শুনে আমার এই বন্ধু অনেকক্ষন থেকে আলাপ করতে চাইছে।” 

হাত তুলে দেখালো সে।

 “এই আমার বন্ধু সুতনু আর ওর ওর বৌ কমলিকা। এই বছরই এসেছে ওরা  ডালাসে। সুতনু আর্ট কলেজের প্রফেসর, দারুন আঁকে। আরে  কতক্ষন  থেকে জিজ্ঞাসা করছে আমাকে কে বাজাচ্ছে রে ,কি চমৎকার হাত …..” 

সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মানুষটা। কাঁচাপাকা  চুল এলোমেলো ,চশমার আড়ালে জ্বলজ্বলে  দুটো চোখ- বড় চেনা …ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়  তৃষা।  

তার জোড়া ভুরুর  নীচে দুই চোখে জ্বলে ওঠে  কবেকার মাটির প্রদীপ..ছলছল করে কোথায় যেন বইতে থাকে এক গহিন গাঙ,দুজনকে ঘিরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে জন্মান্তরের কুয়াশা। শুধু বাইরে ওনার মুখের সেই মৃদু হাসি আজ যেন  পূর্ণ চাঁদের মায়ায় রেণু রেণু হয়ে মিশে  যাচ্ছে। 

3 COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ