অভিনয়

787
Bangla Galpo

(১)

বেশ অবাক শেখর। আজ নিয়ে তিনদিন। ছ’মাসে কোনওদিন হয়নি। একদিন হয়তো মর্ণিংওয়াকে আসেনি মোহিত, পরেরদিন এসেই ক্ষমা চেয়েছে। জানতে পেরেছে শেখর, মোহিত ঘুম থেকেই উঠতে পারেনি। কিন্তু টানা তিনদিন যখন এল না, হয় শরীর খারাপ না হলে কোথাও গেছে। সক্কাল বেলাতেই ভিক্টোরিয়ায় ভিড় বেশ ভালই জমে উঠেছে। এই ভিড়ে ছেলে-ছোকরারা যেমন আছে, আছে বয়স্করাও। ছোটাছুটি। হাঁটাহাঁটি। ভোরের শীত পরশের পাশাপাশি স্বাস্থ্য’এর আশ্বাস। আর দেরি করল না শেখর। বেঞ্চ থেকে উঠে হাঁটা দিল। এক পাক ঘুরেই বসে পড়ল একটা বেঞ্চে আবার আজ। ভাল লাগছে না। সেটা শরীর না মন – বুঝে উঠতে পারছে না। অন্যান্য দিন সঙ্গে মোহিত থাকে। সমরেশ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ‘গুড মর্নিং’ জানিয়ে গ্যালো। একইভাবে ছ’মাস আগে উইশ করেছিল মোহিত। আর ঠিক এইভাবেই বসেছিল বেঞ্চটায় শেখর। সপ্তাখানেক পরেই একদিন পাশে ধপ করে বসে পড়েছিল মোহিত। – রোজই আসা হয়? ভাববাচ্যে প্রশ্নটা ভেসে এসেছিল প্রথম মোহিতের কাছ থেকেই। – হ্যাঁ, আপনি বোধহয়……, হেসে পাল্টা আলাপটা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল শেখরই। – কিছুদিন হল আসা শুরু করেছি। হাসি ফিরিয়ে দিয়েছিল মোহিত।

(২)

ভাল লেগেছিল শেখরের। দাঁতগুলো বেশ সুন্দর মানুষটার। আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসতে দেরি হয়নি। এরপর দু’জনে হাঁটা শেষ করে প্রায় রোজই ফেরার পথে কোথাও না কোথাও বসেছে শেষ ছ’মাসে। হরিশ মুখার্জি রোডের গুরুদ্বোয়ারার পাশের দোকানটায় চা খেয়েছে অসংখ্যবার। পরস্পরের জীবনের অনেক কথাই জানতে পেরেছে। মোহিতের বাড়ি চেতলা। একছেলে। ইঞ্জিনিয়ার। ভাল মাল্টিন্যাশনালে চাকরি করছে। ছেলের বিয়েও দিয়েছে। নিজে ছিল ডিভিসি-তে। বছর দু’য়েক রিটায়ার্ড। শরীরে হঠাৎই সুগারের থাবা। সকালে এখন তাই নিয়ম করে হাঁটা। মোহিত বিপত্নীক প্রায় বছর চারেক। এই একটা জায়গাতেই শুধু মোহিতকে সাবলীল মনে হয়নি। শেখর নিজে এই যন্ত্রণাটা বোঝে। সুলতা চোখ বুঝতেই ওর মূল্যটা আজ পরিস্কার। কোনও কোনওদিন মোহিতের ছেলে ভিক্টোরিয়ায় মোহিতকে আনতে এসেছে। ভালো লাগাটা বেড়েছে শেখরের। আধুনিক প্রজন্মের সবাই মোটেও খারাপ নয়। সংস্কার কারোর কারোর মধ্যে যে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে, তা মোহিতের ছেলেকে দেখলেই বোঝা যায়। পরের দিন কথাটা বলতেই মোহিতের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। একটু চুপ করে থেকে বলে উঠছে, – আমার পরম পাওয়া। আমার শান্তির নীড়। একমাত্র আশ্রয়…. অন্যমনস্ক হয়েছে শেখর। তার নিজের আশ্রয়টা যে কত ঠুনকো, তা আর বলার সাহস হয়নি। শুধু বলেছে, – আমারও একটা নীড় আছে। জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে মোহিত ওর মুখের দিকে তাকাতে আপনা থেকেই চুপ করে গেছে। কথা আর এগোয়নি।

বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে শেখর। যতদূর মনে পড়ছে, মোহিত অ্যাড্রেসের সাথে সাথে একটা ফোন নাম্বারও দিয়েছিল।

(৩)

হরিশ মুখার্জি রোডের উপর ড্রি‌মল্যান্ড অ্যাপার্টমেন্ট। চাকুরি জীবনের শুরুতেই এই ড্রি‌মল্যান্ডে ফ্ল্যাট নিয়েছিল শেখর। কী খুশিই না হয়েছিল সুলতা! দাদার সংসারে তখন তিনভাই’এর স্থান সংকুলান আর হচ্ছিল না। সেই ড্রি‌মল্যান্ড এখন ওর অবসর জীবনে নাইটমেয়ারে পরিণত হয়েছে। এ বয়সে এখন বেগ সামলাতে একটু সমস্যা হয় শেখরের। বাথরুমে সময়ও নেয় বেশ খানিকটা। বাথরুম থেকেই ছেলের গলা। এখন সে গলায় গর্জন। মাঝেমধ্যেই এ গলা গর্জে উঠছে আজকাল। – নিজে যতদিন অফিস গেছে, সকালে বেরিয়ে ঠিক মাছটা আনা হয়ে যেত। নিয়ম করে সকালে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সময় আছে। ফেরার পথে কেবল মাছটা আনতেই যত আপত্তি। ইউজলেস…… কানে গরম হাওয়া ঢোকে। টের পায় শেখর। স্কুল রোড দিয়ে ঢুকে জগুবাবুর বাজারে গিয়ে মাছটা আনাই যায়। কিন্তু ততক্ষণে শেখর বেগের দাপটে কাবু হয়ে পড়ে। ফ্ল্যাটে ফিরে বাথরুমে কিছু সময় ব্যয় না করলে শরীরে স্বস্তি আসে না। ছেলেকে দু’একবার বোঝানোর চেষ্টাও করেছে। ছেলে যে বোঝেনি, দায়ভারটা শেখরের নিজেরই মনে হয়। অথচ অফিসের দেরি হলেও ছেলে যে এলগিন রোডে বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ গেঁজানোর পর অফিসের বাস ধরে সেটা ভালমতোই জানা আছে। মাছ না আনলেও ভাত খাওয়া যায়। ছেলে পারে না। কেননা মাছ-ভাত খাওয়ায় ছেলে একেবারে বিড়াল।

একমাত্র ছেলে শেখরের। কী করেনি ছেলের জন্য! মাধ্যমিক থেকে এম.এ – ছেলের পরীক্ষা মানেই নিজের অফিস কামাই করে বাড়িতে থেকেছে। রাত জেগে ছেলে পড়াশোনা করেছে। ছেলের সঙ্গে শেখরও রাত জেগেছে। মাঝরাতে কোনওদিন সুলতাকে ঠেলেছে, – শুনছ, ছেলেটাকে একটু হরলিকস্‌ করে দিয়ে এসো না।

(৪)

বিরক্ত হয়েছে সুলতা – ঢঙ! কারোর ছেলে যেন আর ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা দেয় না!

পীড়াপীড়িতে শেষ ওবধি সুলতা উঠে কিচেনে গেছে। ফিরে এসে অবশ্য বিরক্তি দেখিয়েছে,- তোমার ছেলে হরলিকস্‌ খেয়ে রাত জাগে না। সিগারেটের ধোঁয়ায় দিব্যি পড়া তৈরি করে ফেলে…… চিন্তায় পড়েছে শেখর। ছেলের শরীর নিয়ে। কোনওকালেই নিজের এসব অভ্যেস ছিল না। কোথা থেকে ছেলে যে শিখেছে…… আজকাল ছেলে আর ছেলের বউ’এর ব্যবহারে অস্বস্তি বেড়েই চলেছে। আড়ালে-আবড়ালে যে আলাদা ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা চলছে, তার আঁচ আসছে। কথায় কথায় ছেলে আর পুত্রবধূর মুখঝামটানিতে ঘুরে ফিরে সুলতার মুখটা খুব মনে পড়ে। খুব তাড়াতাড়িই চলে গ্যালো। থাকলেই বা কী হত! আদর-যত্ন সেভাবে পেত বলে তো মনে হয় না। অত শক্তিশালী হৃদয়ও যে সুলতার কী করে দূর্বল হয়ে পড়ল! শেষদিকটায় শেখরের কথাও ভাবত খুব। মাঝে মধ্যে স্বগতোক্তি, – আমি চলে গেলে তুমি যে কীভাবে সব….। বিরক্ত লাগতে শেখরের। সরবিট্রেট, মনোট্রেট, ডেকাড্‌ন, ডেরিফাইলিনে এত বিশ্বাস ছিল যে অন্যকিছু ভাবতেও পারত না। তবুও এই দূর্বল হৃদযন্ত্রটাই এক গ্রীষ্মের দুপুরে এইসব অস্ত্রধারী সৈন্যগুলোকে হারিয়ে দিল। শেখরকে একেবারে একা করে দিয়ে। মোহিতের ফোন নাম্বারটা ঠিক কোথায় যেন রেখেছে। ধূসরতায় রং ভরতে চেষ্টা করল শেখর। বাইরে কলিংবেল।

কমোডের ফ্ল্যাশ টেনে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই অবাক। সোফায়, বসে মোহিত। লাজুক মুখে একটুকরো হাসি। শেখর একই সঙ্গে খুশি আবার অপ্রস্তুতও। পুত্রবধূর মেজাজ-মর্জি ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। ভয় লাগে। লোকজন বা বন্ধুবান্ধবদের সামনে যদি দুম করে কিছু বলে দেয়! অপমান আর লজ্জার একশেষ। আত্মীয় স্বজনদের ফ্ল্যাটে ডাকা আজকাল বন্ধ করে দিয়েছে। মোহিত

(৫)

একেবারে না জানিয়ে চলে এসেছে। ভেতরে ভেতরে প্রার্থনা করল শেখর, কোনও অঘটন যেন না ঘটে। মোহিত ওর ফ্ল্যাটে এই প্রথম।

রিমি এসে দাঁড়িয়েছে। পুত্রবধূ এবং এ ফ্ল্যাটের সুপ্রিমো এই মুহূর্তে। মুখে মিষ্টি হাসি। অন্যসময় থাকে না। মোহিতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল শেখর।

– আমার মেয়ে, তারপর রিমির দিকে ফিরে বলল, আর ইনি আমার সকালের হাঁটার সঙ্গী। মোহিত ঘোষ।

শেখরকে অবাক করে দিয়ে মোহিতের পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করে রিমি। তারপর শেখরকে।

– নেচারে তো একেবারে আমার বউমার কার্বন কপি গো। বেশ খুশি হয়েছে মোহিত, বোঝা যাচ্ছে। শেখরের দিকে তাকিয়ে আছে রিমি। মৃদু হাসল শেখর।

– তোমার বউমা কেমন, জানি না। কিন্তু আমার মেয়েকে নিয়ে কোনও কমপ্লেন নেই।

হেসে ফেলে মোহিত, – ঠিক, ঠিক। তখন থেকে যে কী বউমা, বউমা করছি। আসলে আমার মেয়ে বলাই উচিত।

– এতক্ষণে ঠিক বলেছ।

রান্নাঘরের দিকে চলে যায় রিমি। শেখর জানে, রিমির কান এখন এদিকেই থাকবে। কথাবার্তা অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করল শেখর।

– তাহলে? ডুব দিয়েছিল কোথায় তিনদিন!

– আর বোলো না…….. ছেলে হঠাৎ ঠিক করল, দীঘা যাবে। কম ছুটি। এর থেকে ভাল শর্ট ট্যুর আর হয় না। বউমা, সরি মেয়ে বলল, বাবাও যাবে। একা থাকলে বাবার খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধে। যেতাম না। কিন্তু ছেলেও এমন জোর করতে লাগল….., পরিতৃপ্তির ছাপ মোহিতের মুখে।

(৬)

– আর এদিকে আমি মরছি চিন্তা করে।

ছ’মাসে মোহিতও যে ঘনিষ্ঠ হয়েছে শেখরের সঙ্গে প্রমাণ বেরোয়।

– ওইজন্যই তো ফিরেই চলে এলাম দেখা করতে।

নিঃশব্দে আবার ঢুকে পড়েছে রিমি। ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট সমেত চা’এর কাপ আর প্লেটটা এগিয়ে দেয় মোহিতের দিকে। তারপর শেখরের দিকে ফিরে বলল, – আপনাকে আর দিলাম না। দু’কাপ হয়ে গেছে সকাল থেকে। কোটা শেষ।

ঘাড় নাড়ে শেখর। কিচেনের দিকে এগিয়ে যায় রিমি। এখনও ওবধি অভিনয়টা প্রশংসনীয়।

চায়ে চুমুক দিয়ে মোহিত বলে, – যাই বলো শেখর, বউমা তোমার দারুণ। ছেলে তো বেরিয়ে গেছে?

– হ্যাঁ।

– ছেলে যেন তোমার কোথায় বেশ –

– পোষ্টাল।

চা শেষ করে উঠে দাঁড়ায় মোহিত।

– আজ তাহলে এলাম?

– এসো। দাঁড়াও, তোমাকে একটু এগিয়ে দিই।

নিজের ঘরে গিয়ে স্যান্ডো গেঞ্জির ওপর পাঞ্জাবিটা গলিয়ে বেরিয়ে আসে শেখর। পেছন থেকে ভেসে আসে রিমির স্বর।

– দেরি করবেন না, বাবা। তাড়াতাড়ি খেয়ে নেব দু’জনে।

শেখরও অভিনয়ে যোগ দেয়।

– চিন্তা কোরো না। তাড়াতাড়ি আসছি। হরিশ মুখার্জি রোড ধরে হরিশ পার্কের দিকে হাঁটতে শুরু করল ওরা দু’জনে। নিশ্চিত হতে চাইল শেখর, – কাল আসছ তো?

(৭)

– বোধ হয়।

– বোধ হয়!

– দীঘা থেকে ফেরার পরেই ছেলে-মেয়ে বলছিল, দু’একদিন রেষ্ট নিয়ে আবার মর্ণিংওয়াকটা শুরু করতে। আসলে, ভীষণ টেন্সড্‌ থাকে আমার শরীর নিয়ে।

মোহিতের মুখের দিকে একবার আড়চোখে তাকায় শেখর। মোহিতও কি ওর মতোই অভিনয় করতে পারে না! ধন্ধে পড়ে যায় ও। হরিশ মুখার্জি জুড়ে গাড়ির ভিড়। প্রেটোলের গন্ধে আর ধোঁয়ায় দম যেন বন্ধ হয়ে আসে।

হাঁটতে হাঁটতেই মোহিতের হাতটা ধরে নেয় শেখর।

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.