প্রবহমান

545

-কী করছ ?

-সকালের পূজোর ব্যবস্থা করছি।তুমি কী করছ ?

-আমি এই জলখাবার বানালাম, এবার সবাইকে দেব, তারপর রান্না চাপাব।যে জন্যে ফোন করলাম, গতকালও বেরিয়েছিল।

-তাই!

-হ্যাঁ। ঐ পাঁচটা নাগাদ বেরোল, আর সাতটা পনেরো কী কুড়ি ফিরল।

-বাবা, এখন অনেক বেশি সময় থাকছে।দাদাকে বলেছ?

-আর তোমার দাদা, কিছু বললেই আমার ওপর এখনি খেপে বোম হয়ে যাবে।

-ঠিক আছে, আমি বলব।

-নানা, কিছু বলবার দরকার নেই, এক্ষুনি আমাকে জিজ্ঞেস করবে, তুমি এত সব জানলে কী করে?

-বৌদি, বলছি মায়ের আবার প্রেম-টেম হল না তো?

-কী করে বলব বল ?

-ঠিক আছে আমি তো পরের মাসে একবার যাব, তখন না হয় ব্যাপারটা খোলসা করা যাবে।প্রয়োজনে আমরা মায়ের পিছন পিছন গিয়ে দেখব, ফলো করব।

ব্যালকনিতে দাঁড়ালেই নিজেকে আরো বেশি একা মনে হয়।আশেপাশে সব গম্বুজের মত আকাশ ফুটো করে ফ্ল্যাট উঠেছে।যত বড় তত বেশি একা।মাঝে মাঝে নিজের শ্বাস কষ্ট হয়।ছেলে বিম্বিসারের বিয়ে হয়ে ঘরে বৌমা শ্রুতি এসেছে।তাও যেন কেমন একা একা।বিম্বি যেদিন শ্রুতির কথা বলল, রুমা একবারের জন্যেও অমত করেনি।যদিও শ্রুতিরা অব্রাহ্মণ।আসলে বাসব মারা যাওয়ার পর প্রথম দু’বছর এতবড় চার কামরার ফ্ল্যাটে দুজন বাঁচবার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে।মেয়ে বিদীপ্তা তো বছরে একবার আসে সেটা বাসব বেঁচে থাকতেই।একবছর মাত্র দু’বার এসেছিল।বাসব কিছু জিজ্ঞেস করলে বলত,‘বাবা, আসতে তো ইচ্ছে করে, কিন্তু নিজের কম্পানিতে কাকে সব ভার দিয়ে আসব বল?তাছাড়া বাবা খুব কম্পিটিশন।একটু এদিক ওদিক হলেই অন্য কম্পানি গেম খেলে নেবে।’বাসব সব বুঝত, অথবা বোঝার ভান করে ঘাড় নাড়ত, আর নীরবে মানুষের থেকে মানুষের সরে যাওয়ার রাস্তা দেখত।বাসব মারা যাওয়ার পরে বিদীপ্তা এলেও জামাই প্রণয় আসেনি।বিদীপ্তা রুমার কাছে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে,‘তোমার জামাই-এর আসার খুব ইচ্ছে ছিল, কিন্তু উপায় নেই।একটা টাস্ক এসে পড়েছে।’ সেসময় কয়েকটা দিন লোকজন ছিল।তারপর আস্তে আস্তে সব কেমন চলে গেল।ফ্ল্যাটের মধ্যে পড়ে রইল ছেলে বিম্বি আর রুমা।তাও বিম্বি অফিস বেরিয়ে যায় সেই সকালে, ফেরে রাতে।এতো বড় ফ্ল্যাটের শূন্যতাকে আঁকড়ে ধরে থাকে একা রুমা।মাঝে মাঝে বই পড়ে, পুরোনো ছবি দেখে।সেই ছবি দেখতে দেখতেই বিয়ের ঠিক পরেই শহরের একটু দূর দিয়ে বয়ে চলা একটা ছোট নদীর তীরে বসে বাসবের বলা কথাগুলো মনে পড়ে।‘যত দিন এই নদীটা থাকবে জানবে ততদিন আমিও আছি, হয়ত শারীরিক নয়, কিন্তু নদীকে স্পর্শ করলেই তুমি আমাকে স্পর্শ করতে পারবে।’সেদিন আবার বাসবের জন্মদিন ছিল, জন্মবারও, শনিবার।তারপর থেকেই প্রতিমাসের শেষ শনিবার বিকাল চারটে সাড়ে চারটের সময় সেজেগুজে নদীটার পাড়ে গিয়ে রুমা বসে থাকে।জলে পা ডোবাতেই শরীরে যৌবন নেমে আসে।চোখ বন্ধ করে বসে থাকবার সময় ঘাড়ের কাছে বাসবের নিঃশ্বাসের স্পর্শ পায়, চুলে বিলি কেটে দেওয়ার আনন্দ।বিম্বিসারের বিয়ের আগে পর্যন্ত রুমা বিম্বির বাড়ি ফেরবার অনেক আগেই নিজে বাড়ি পৌঁছে যেত।কোনদিন কোন কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন না পড়লেও ঐ একটি দিনের নদীর সাথে সঙ্গম মাসের বাকি দিন গুলোর একাকিত্বের সব জ্বালা জুড়িয়ে দিত, মুছিয়ে দিত।প্রথম দু’মাস একদিন করে গেলেও তারপর পনেরোদিন অন্তর নদীর কাছে যেতে আরম্ভ করল।বাকি চোদ্দটা দিন চলল পনেরোতম দিনটার যাওয়ার প্রস্তুতি।মাস ছয় পরে এক রবিবার দুপুরে খেতে বসে বিম্বিসার রুমাকে দেখে বলে,‘বাবা চলে যাওয়ার পর তোমাকে দেখে আমার খুব ভয় লাগছিল।কেমন যেন মুষড়ে পড়েছিলে।এখন দেখে একটু ভালো লাগছে।’রুমা মুচকি হেসে উত্তর দেয়,‘প্রথম কয়েকটা দিন সব গোলমাল হয়ে গেছিল।এখন সব ঠিক আছে বলব না, তবে মনে হয় যেন তোর বাবা আমার সঙ্গেই রয়েছে, আমার সাথে, আমার পাশে।’

-শুনছ, একটা কথা অনেকদিন ধরেই তোমাকে বলবার জন্যে ভাবছি, কিন্তু যদি রেগে যাও তাই বলতে……..

-বল বল, অতো ন্যাকামি করতে হবে না।

-মা প্রতিমাসের দুটো শনিবার বিকাল দিকে কোথাও বেরিয়ে যান, ফেরেন সন্ধেবেলা।

-তো?

-মানে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিন্তু উত্তর পাইনি।মা এড়িয়ে গেছেন।

-তোমার জিজ্ঞেস করবার দরকারটাই বা কী?তুমি যে হুটহাট সেজেগুজে এখানে ওখানে বেরিয়ে যাও মা কি তোমাকে কোনদিন কিছু জিজ্ঞেস করেছে?

শ্রুতি একটু আমতা আমতা করে উত্তর দেয়,‘তা করেনি, তবে আমি একটা অন্য কথা ভাবছিলাম।’

-তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না।

শ্রুতি ঘাড় ঘুরিয়ে চলে যাওযার সময় বলে ওঠে,‘পাশের স্ট্রিটে কনকের মায়ের কেসটা জানো?পাড়াতে এক্কেবারে ঢি ঢি পড়ে গেছে।তোমার মায়েরও যদি….’

‘শ্রুতি!’ নিজের লিমিট ছাড়াবে না।রেগে উঠল বিম্বিসার।

একটু পরেই নিজেকে সামলে শ্রুতির মুখের দিকে তাকিযে বলল,‘কী বলতে চাও স্পষ্ট করে বল।ঐ রকম অর্ধেকটা বোলো না।’

-আমার অর্ধেক বা পুরো, তুমি কি একটাও শুনবে, কখনও শুনেছ?তোমার কাছে মা মানে তো….

-কী বলতে চাও বল।

-আমি আবার কী বলব, কয়েকদিন আগেই তোমার বোনের সাথে কথা হচ্ছিল…

-ও, তুমি একা নও, মন্থরাও রয়েছে।

-সে তুমি যাই বল, তোমার বোন কিন্তু তোমার থেকে অনেক বেশি প্র্যাকটিক্যাল, সত্য মিথ্যার একটা বোধ রয়েছে।

-কী আলোচনা হল?

-নিন্দে মন্দ করিনি, ভালো কথাই বলছিলাম এই যে তোমার মা হুটহাট করে বেরিয়ে যাচ্ছে বদনাম রটতে তো দেরি লাগে না।তোমার মা এখনও বেশ সুন্দরী, সার্কেলও রানিং…

-তোমরা খুব নোংরা, এটাই মনে হয় তোমাদের শিক্ষা, আমি কিন্তু তোমার মায়ের ব্যাপারে কিছু ভাবিনা, অথচ তুমি!ভাবতে ঘেন্না লাগছে।

-দুটো স্ট্রিট পরেই পঞ্চান্ন বছরের একটা বুড়ি পাশের বাড়ির একটা ছেলের সাথে পালিয়েছে, শুনেছ?তাঁরও ছেলে, ছেলের বৌ, নাতি, নাতনি সব রয়েছে।

বিম্বিসার কোন উত্তর না দিয়ে মুখ দিয়ে একটা বিরক্তির স্বর প্রকাশ করে বলে উঠল,‘তুমি একটা কাজের ব্যবস্থা কর, আর তোমার ননদটিকেও একটা ব্যবস্থা করতে বল।’

সব কিছু কেমন যেন রহস্যময় লাগছে।বিম্বি কোনদিন কোন প্রশ্ন করে না, করেওনি, আগে বহুবার বিম্বি রুমাকে ঘরে থাকা অবস্থাতেই বাইরে বেরিয়েছে ঐ যেমন বলতে হয়,‘আমি একটু আসছি।’সেদিন করল।রুমা ঠিক শাড়ি পরে বের হবে ঠিক সেসময় জিজ্ঞেস করে বসল,‘মা কি কোথাও বেরোচ্ছ?’রুমা প্রথমে একটু থতমত করে উত্তর দিল,‘হ্যাঁ।মানে ঐ একটু দরকার আছে।’

-বাসে যাবে নাকি?

– হ্যাঁ, ঐ বাস অটো মিলে।

– তা কেন, আমি গাড়ি বের করছি।

-না না ঠিক আছে।তুই বিশ্রাম কর, এই ফিরলি।

রুমা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলেও একটা খটকা লেগে রইল।বিম্বি তো কোন দিন এরকম ভাবে কোন প্রশ্ন করেনি।তাহলে কি কিছু সন্দেহ করছে?কিন্তু সন্দেহ করলে কী করবে, মায়ের কোন সম্পর্ক?এবার হাসি লাগছে, সত্যি যেদিন ওরা জানবে অবাক হয়ে যাবে।কিন্তু ওদের কি জানানো উচিত?জেনে যাওয়ার পরে তো হো হো করে হেসে উঠবে, পাগল ভাববে, ছেলে মানুষ।

কিছু বোঝা যাচ্ছে না।দীপা যেভাবে বলছে তাতে তো সব হিসাব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।মা যেন কেমন রহস্যময় হয়ে উঠেছে।বাবা বেঁচে থাকবার সময় কিন্তু কোন দিনই মায়ের মধ্যে কোন রকম আপত্তিকর কিছু দেখা যায়নি।বাবা মায়ের সাথে সে রকম ঝগড়া করবার ঘটনাও মনে করতে পারা গেল না।মা তো চিরকাল এই সংসারটাকে নিজের আঁচলের ছায়াতে রেখে দিয়েছে।বাবা মারা যাওয়ার পরেও স্বাভাবিক শোক কাটিয়ে উঠে বেশ শক্ত ভাবেই দাঁড়িয়ে বিম্বির বিয়ে দিয়েছে।কোনদিন কোন অযাচিত কাকু, বা মামার উপদ্রব তো নজরে পড়েনি।তাহলে মা কি কোথাও পার্ট টাইম চাকরি করছে, তবে শুধু মাসে দুটো শনিবার কেন?কিছু কি শিখছে, গান, আবৃত্তি, কম্পিউটার!বন্ধু রঘুর কম্পিউটার সেন্টারে অনেক বুড়ো বুড়ি কম্পিটার শেখে, বিম্বি নিজে বহুবার দেখেছে।তাহলে কি মা এখন কম্পিউটার শিখছে?উফঃ পাগল পাগল লাগছে।কয়েকদিনের মধ্যে বোন আসবে দেখা যাক, একটা আলোচনাতে বসতে হবে।

বুড়ো বয়সে মাঝে মাঝে মানুষের মতিভ্রম হয়।কোথাও কিছু নেই কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে যাচ্ছে, আরে বাবা কিছু একটা অঘটন ঘটলে প্রণয়ের কাছে মুখ দেখাতে পারা যাবে না।একেই শ্বশুর বাড়ি আসাটাকে এক্কেবারেই পছন্দ করে না।মেয়েদুটোও বড় হচ্ছে।এই সময় আচমকা কিছু হলে তো এক্কেবারে সবার ক্ষতি।বৌদির সাথে তো কথা হচ্ছে।কিন্তু দাদা কতটা শুনবে, সেটাতেই সন্দেহ্।দেখি কয়েকদিনের জন্য ঘুরে আসা যাক।মেয়েদুটোর হস্টেলের ছুটির কোন চান্স নেই, মাকে নিয়ে দাদা বৌদির মাঝেই না অশান্তি আরম্ভ হয়ে যায়।যাক যাওয়া তো হচ্ছে দেখা যাক কত দূর কী করতে পারি।মায়ের সাথেও একটা বোঝাপড়া দরকার।

তোমাদের সব আলোচনা শুনলাম, কিন্তু একটা ব্যাপার তো মানবে যা বলছ, ভাবছ সবটাই অনুমান।কোন বাস্তব ভিত্তি নেই।অন্তত আমার তাই মনে হচ্ছে।মাকে সোজাসুজি কোন প্রশ্নও করা যায়না, তাহলে কী করা যাবে?

-সেটা তুই ভাব, আমি আর বৌদি, তোকে ব্যাপারটা জানালাম, এখন কিছু একটা সমস্যা হলে আমাদেরকেই তো সামলাতে হবে।তার থেকে……

-কিন্তু কী করা যেতে পারে বল।মায়েরও বয়স বাড়ছে।এখনই উত্তেজনাতে শরীর খারাপ হয়ে গেলে কী হবে বল তো?

-না না তুমি ওরকম ভাবে বলবে কেন, দীপু যা বলছে শোন।মা প্রতিমাসের প্রথম আর তৃতীয় শনিবার বেরিয়ে যান।ঠিক চারটে থেকে চারটে পনেরোর মধ্যে বেরোন আর ফেরেন সাতটা থেকে সাতটা পনেরো বা সাড়ে সাতটা।আমরা যদি পিছু নি, ধর আগে থেকেই তিনজনে বেরিয়ে গেলাম, মা আরেকটা চাবি নিয়ে যাবেন, এবার মাকে একটু ফলো করব।

-মা কীসে যায়?

-অটো বা টোটোতে।

-তুমি কীভাবে জানলে?

-পাশের বাড়ির বৌদি একদিন বলেছিল।মাকে, কোথায় গেছিল জিজ্ঞেসও করেছিল।মা নাকি উত্তর দেয় নি, হেসে এড়িয়ে গেছিল।

-মা, তুমি সন্ধেবেলা একা একা এই ফাঁকা জায়গায় বসে কী করছ?

রুমা বিম্বিসারের কথাগুলো শুনে কিছু সময় কোন জবাব না দিয়ে বসে রইল।বিম্বির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দীপু জিজ্ঞেস করল,‘মা কী হল, কিছু বল……’

একটা লম্বা শ্বাস ফেলল রুমা। “আমাদের বিয়ের এক মাস পরেই এক বিকালে এখানে ঘুরতে এসে তোর বাবা বলেছিল,‘যতদিন এই নদীটা থাকবে ততদিন জানবে আমিও আছি।’আমি তাই চলে আসি।আমি জলে পা ছোঁয়লেই মনে হয় তোদের বাবা আমাকে ছুঁয়ে আছে।নদীটা তো রোগা হয়ে গেছে, আগে এক্কেবারে অন্য রকমের ছিল।একটা বাঁধানো ঘাট ছিল।আমরা প্রায়ই বিকালের দিকে এখানে এসে বসতাম।ও যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন অত কিছু ভাবিনি।কিন্তু মারা যাওয়ার পর নিয়ম করে আসতে আরম্ভ করলাম।এর জন্য তোরা হয়ত অনেক কিছু ভাবতে আরম্ভ করেছিস।কিন্তু ওর মৃত্যুর শোক ভুলে থাকবার আর আমার কোন উপায় ছিল না।খুব কষ্ট হয়ে ছিল তো।মানুষটাকে তো খুব ভালোবাসতাম।”

বিকালের ঘাড়ে সন্ধে নিঃশ্বাস ফেলতে আরম্ভ করল।সামনে ক্ষীণকায় বয়ে চলা একটা নদীর তিরে একজন, আরো বাকি তিনজনের কেউই কোন কথা বলল না।অন্ধকারও বুঝতে দিল না কারোর চোখে নোনতা জল এসেছে কিনা?

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.