মহুয়া সেন মুখোপাধ্যায়
জন্ম, বড় হয়ে ওঠা কলকাতায়। গত একুশ বছর ম্যাসাচুসেটস,আমেরিকা প্রবাসী। বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক। এখন পর্যন্ত লেখা বেরিয়েছে ওয়েব ম্যাগাজিন পরবাসে এবং আনন্দবাজারে।

গ্লাসডোরটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই আওয়াজ করে খুলে গেল ………. কীরকম একটা রাবার আর মেটালের ভোঁতা আওয়াজ। সুইশ সুইশ। হাওয়ার একটা হলকা ভেসে এলো – ওদিক থেকে বেরিয়ে আসছে ব্যস্ত স্যুট, স্কার্ট, হাই হিল। ক্লিপ ক্ল্যাপ, ক্লিপ ক্ল্যাপ। পুল অন টেনে নিয়ে যাবার একটা মেটালিক আওয়াজ। …. আবার আর একটা দরজা খুলে গেল, তারপর চারদিক খোলা – খুব খোলা। অনেকটা উঁচুতে সিলিং, স্কাইলাইট দিয়ে আসা আলোয় উজ্জ্বল রুপোলি। ……. ওপর থেকে এস্কালেটর উঠছে নামছে …. যান্ত্রিক মসৃণতায়। বিশাল ইলেকট্রনিক বোর্ডগুলিতে লেখা নেমে আসছে …. পাল্টে যাচ্ছে –

Banglalive

আর শুধু মানুষ …. ব্যস্ত পায়ে হাঁটা মানুষ, আমিও হাঁটতে শুরু করলাম সবার মতো ‘মার্চ মার্চ মার্চ’ …. কাঁধের ব্যাগটা বেশ ভারী …. মার্চ মার্চ ….সামনে এলি হাঁটছে, এগিয়ে যাচ্ছে অনেক –

‘এলি, এলি’

  • থমকে গেল এলি – ওর পিঙ্ক রঙের পুল-অনটা একটু ডিসব্যালান্স হয়ে গেল। চাকাগুলো ঘুরে গেল …. কিন্তু পড়লো না
  • ‘ইয়েস ডার্লিং’
  • ‘একটু আস্তে হাঁটো, আমি পারছি না’, বললাম আমি।
  • এলি বলে উঠলো,’আমাদের ফ্লাইটের খুব সময় বাকি নেই কিন্তু’।

তারপর পিছিয়ে এলো কয়েক পা …. এসে হাত ধরলো আমার, সরে এলাম আমরা জনস্রোত থেকে একটু কোণে। তাকিয়ে আছে এলি আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে …. ওর মাস্কারা লাগানো চোখদুটোতে চেনা আশঙ্কা ফুটে উঠেছে, চোখের দুপাশের রেখাগুলো গভীর।

  • ‘ ম্যাট …. তুমি আজ সকালের ওষুধগুলো খেয়েছিলে তো ? পিলবক্সটাতে রাখা ছিল – আমি স্নান করতে যাবার আগে তোমাকে দিয়ে গেলাম। …. তুমি ঠিক আছো তো ?’

এখন ওর পুরো দাঁড়িয়ে থাকাটার মধ্যেই দুশ্চিন্তা …. সতর্কতা।

 

ওষুধ ….

সাদা-চোট ট্যাবলেট, সাদা-বড়ো ট্যাবলেট, পিঙ্ক-গোল ট্যাবলেট, গ্রীন আর ইয়েলো ক্যাপসুল – সকালে খাই।

খেয়েছিলাম ?

ট্যাবলেটগুলো হাতে নিয়েছিলাম। …. সেই সময় কী যেন একটা হলো …. খেয়েছিলাম কি ?

এলিকে তড়িঘড়ি উত্তর দিলাম, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ডোন্ট ওরি’

  • ‘তাহলে চলো ম্যাট। বাড়ি ফিরতে হবে তো, ফ্লাইটের আর দেড় ঘন্টা আছে …. তার মধ্যে চেক-ইন, সিকিউরিটি। …. এখন সব কিছুতে এতো সময় লাগে। তুমি সিওর, তুমি ঠিক আছো?’

 

ঠিক আছি কি ?

বেশির ভাগ সময় নিজেই বুঝতে পারি না, তবে ঠিক থাকতে চাই প্রাণপণ। তাই আবার হাঁটতে শুরু করলাম।

আরও পড়ুন:  প্রেম, ভূত ও চুমু

‘মার্চ মার্চ’।

এইভাবে এগিয়ে চলাতেই আমার পুরো মনোসংযোগ।

খানিকটা দূর থেকে দেখতে পেলাম বাচ্চাদের দলটাকে। হেঁটে আসছে এই দিকে। ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট মেয়ে, বিরাট লম্বা উজ্জ্বল কমলা রঙের চুল; একসাথে, ঠিক একই ছন্দে হাঁটছে বাচ্চাগুলো …. কীরকম গুনগুন একটা সমবেত গান ভেসে আসছে দলটার থেকে। তাকিয়ে ভাবছি, এদের সাথে বড়ো কেউ নেই ? এদের বাবা-মা রা কোথায় ?

আমার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে দলটা।

যেতে যেতে একদম শেষের বাচ্চাটা ঘুরে তাকালো আমার দিকে ….

আরে ব্যারি না?

আমার ছোটবেলার বন্ধু, ব্যারি …. আমার নেবারহুডে থাকতো। …. ছোটবেলায় ছ’বছর আমরা আরিজোনাতে থাকতাম …. তখনকার। কত যে খেলেছি একসাথে – কত দুষ্টুমি করেছি …. কত আডভেঞ্চার ….

আমি জোর করে মুখটা ঘুরিয়ে এলির দিকে তাকালাম – ও হেঁটে চলেছে ব্যস্ত পায়ে। কোনও দিকে না তাকিয়ে, নির্বিকার ….

বাচ্চাদের দল মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে …. অন্য দিকের হলওয়েতে …. এখনো একটা সমবেত গুনগুন হাওয়ায় …. মথের পাখার মতো কাঁপছে।

না, না না …. প্লিজ না ….

আমি ওষুধ ডেফিনেটলি খেয়েছি। …. কিছু শুরু হয় নি …. কিচ্ছু হবে না।

 

আমি নিজেকে ভীষণ শক্ত করে চেক-ইন লাইনে দাঁড়ালাম। ভালোভাবেই সব হয়ে গেল …. ঘটনাবিহীন । স্যুটকেস চেক-ইন করে …. হ্যান্ড ব্যাগেজেও নিজেই ট্যাগ লাগালাম – এলির ব্যাগেও। কোনও অসুবিধে হলো না …. এলিকে এতক্ষনে একটু রিল্যাক্স লাগছে।

  • ‘ম্যাট, তুমি এখানে একটু বোস, কোথাও যেও না ……. আমি একটু বাথরুম থেকে ঘুরে আসি, কেমন ?’

চেয়ারে বসলাম। সামনের জায়গান্টিক টিভি স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে আছি ……. কত  রঙ হাওয়াইন এয়ারলাইন্সের কমার্শিয়াল চলছে। ……. ওহ! কী ভীষন রঙ। নীল, সবুজ, কমলা – আমার রেটিনা জ্বলে যাচ্ছে। …….

নিজের জুতোর দিকে তাকিয়ে আছি ……. আর প্রানপনে হাতড়াচ্ছি –

‘ওষুধ সাদা, সাদা-গোলাপি, সবুজ-হলুদ, ……. খেয়েছি ?

পাশে একজন মানুষ এসে বসলো- স্নিকার্স জোড়া দেখতে পাচ্ছি। ……. হাওয়াইয়ান শার্ট আর শর্টসের একটা দিক ……. ওদিক থেকে আবার নিজের জুতোর দিকে।

‘কিছু একটা গন্ডগোল হবে আজ প্লেনে। ……. খুব কিছু ।……. কী? মেকানিক্যাল ম্যালফাংশন? হয়তো প্যাসিফিকের জলেই …….

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ‌ (পর্ব ২৬)

কে বলছে এসব কথা ? পাশের লোকটা ? নাকি ওরা। …….  মাথার মধ্যে ?

  • ‘ম্যাট, ম্যাট। ……. তুমি বাথরুম যাবে ?’ এলি ফিরে এসেছে।
  • ‘না’।
  • ‘ঠিক আছে, তাহলে চলো সিকিউরিটিতে যাই’।

প্রায় লাফিয়ে দাঁড়ালাম, ‘হ্যাঁ, তাই চলো’।

সিকিউরিটির লাইনে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম স্যামুয়েলকে। স্যামুয়েল জ্যাকসন।

দাঁড়িয়ে আছেন আর একটা লাইনে। মন দিয়ে কনভেয়র বেল্টে ঢোকানোর আগে, এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির দেওয়া ট্রেতে সাজিয়ে রাখছেন সেলফোন, ট্যাবলেট, ওনার ঘড়ি …….  আমি চারদিক তাকিয়ে দেখছি …….  এতো জনপ্রিয় অভিনেতা – কেউ খেয়াল করছে না ? উনি আমারও বেশ প্রিয় অভিনেতা; অনেক সিনেমা দেখেছি ওনার। দ্বিতীয়বার তাকাতে চোখাচোখি হলো ওনার সাথে। …….  দেখি আঙুল থেকে একটা বেশ বড়ো রিং খুলে ট্রেতে রাখছেন। তারপর ওনার মুখে একটা চেনা হাসি ফুটে উঠলো। আমি যন্ত্রচালিতের মতো রিংটার দিকে তাকালাম। রিংটা তো আমার বড়ো চেনা – আমার হাইস্কুলের ক্লাস রিং …….  বছর কুড়ি আগে হারিয়ে গেছে, একটা বাড়ি বদলের সময়।

  ওহ ভগবান !

না, না, আবার না …….

 

প্লেন ওঠার আগে ভেস্টিবিউলে পা দেওয়া মাত্র ……. সামনের ফ্লোরটাকে মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ তরল ……. টলমল করছে ……. দুলছে … ছোট ছোট ওয়েভ এখানে ওখানে – ঠিক যেন একটা ক্যানাল।সমস্ত মানসিক শক্তি একত্রিত করে পা দিলাম ফ্লোরে। … তারপর নিঃশ্বাস বন্ধ করে … এক পা … কোনোভাবে পৌঁছে গেলাম প্লেনের গেটে।

  • ‘গুড আফটারনুন স্যর’, মিষ্টি হেসে গেটে এয়ারহোস্টেস বলে উঠলো।

হাসিটা ফিরিয়ে দিলাম এক সাময়িক স্বস্তিতে।

সিটে পৌঁছলাম। উইন্ডো সিট।বসে দেখি সামনের কয়েকটা সিট আগে উল্টোদিকের কর্ণারে ওভারহেডে নিজের ব্যাগ রাখছেন স্যামুয়েল – একটা পরিচিত হাসি হাসলেন আমার দিকে তাকিয়ে ……. এতো দূর থেকেও ওনার আঙুলে কলেজ রিঙটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

ক্লান্ত চোখ ফেরালাম জানলার দিকে।

……. হে ঈশ্বর, একটু ঘুম দাও ……. বড়ো ক্লান্ত আমি –

 

এলির ডাকে চোখটা খুললো।

  • ‘তোমার টেবিলটা খোলো। অলরেডি খাবার সার্ভ করতে শুরু করেছে। আর চেয়ারটা সোজা করো, পিছনের মেয়েটি ওভারহেড থেকে কিছু নামাবে বলেছিল।‘

কিছুক্ষণ বাদে খাবার সার্ভ করতে শুরু করলো। স্ট্যান্ডার্ড এয়ারলাইন্সের একঘেয়ে খাবার। ম্যাশড পটেটো মুখে দেওয়া মাত্রই হটাৎ মনে হলো ওপর থেকে কিছু পড়লো মাথায় ……. চুলে হাত দিতেই ……. কি যেন একটা বিজাতীয় স্পর্শ …….

  • ‘এলি আমার মাথায় এটা কি ?’
আরও পড়ুন:  দিনে নায়িকা...রাতে হাই-ফাই গণিকা!!

আঙুল দিয়ে টেনে আনতেই দেখি কিলবিল করছে একটা মারাত্মক দেখতে স্করপিওন ……. জানি এটা সত্যি নয়, ……. একদম সত্যি নয় –

তাও সারভাইভাল ইনস্টিংকটে ওটাকে বিদ্যুতবেগে হাত থেকে ঝেড়ে ফেলতেই ……. ব্যথাটা টের পেলাম। একটা আগুনে ব্যথা আঙুলের ডগায়। যেন কেউ অ্যাসিড ইনজেকশন বিঁধিয়ে দিলো। একসাথে জ্বলে গেলো, পুড়েও গেলো।

তারপর শুরু হল একটা প্রচন্ড গন্ডগোল …….  লোকজন, ক্রূর দৌড়োদৌড়ি হইচই – তার মধ্যেই কে যেন ওটাকে ধরে ফেললো – নিয়ে গেলো। যাত্রীদের উত্তেজিত চিৎকার চারপাশে।

  • ‘কীভাবে একটা স্করপিয়ন চলে এলো প্লেনে’
  • ‘এতো নাকি পরিষ্কার করা হয় !’ এটা কী ধরণের পরিষ্কার ?’
  • ‘কেউ দেখতে পেলো না এতো বড়ো একটা স্করপিয়ন ? এটা কি একটা – না আরও আছে?’
  • ‘ঈশ কি অবস্থা দেখতো ওনার ……. ‘

এরই মধ্যে একজন স্টাফ আমাকে ভীষণ যত্ন করে কোচে নিয়ে গেলো। এলি এসে বসলো আমার পাশে, চোখে জল …….  এখনো হতভম্ব ভাব কাটেনি।

  • ‘তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে?’

ক্রূ মেম্বাররা ফোনে এবং নিজেদের মধ্যে প্রচুর কথা বলছে। কোথাও থেকে ইন্সট্রাকশন নিচ্ছে ওরা।

কয়েক মিনিট বাদে একজন এসে আমাকে বললো, আমাকে একটা এন্টিভেনাম ইনজেকশন নিতে হবে ……. আমি নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে দিলাম।

  • ‘একদম ঠিক হয়ে যাবেন আপনি স্যর। … কোনও ভয় নেই – আমরা চিকিৎসার সবরকম ব্যবস্থা নিচ্ছি’, বললো ক্রূ মেম্বারটি।

ইনজেকশন নেওয়ার পর তীব্র যন্ত্রনাটা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে … একটু হাত পা ছড়িয়ে হেলান দিয়ে শুলাম আস্তে আস্তে। … আমার চোখে নিজের অজান্তে নেমে আসছে জল … কোনও কন্ট্রোল নেই আমার।

পাশে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা মেয়েটি জিজ্ঞাসা করলো, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে স্যর? উই আর সো সরি’।

না রে মেয়ে। কোনও কষ্ট হচ্ছে না আমার।

এই প্রথমবার জীবনে অন্য মানুষেরা সেই জিনিষটা দেখতে পেলো … যা আমার

স্কিৎজোফ্রেনিক ব্রেন সব সময় দেখে।

এই প্রথম, আমি ভুল দেখিনি।

2 COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ