দীপান্বিতা রায়
বাংলা সংবাদ চ্যানেলের দায়িত্বপূর্ণ চাকরি সামলে নিয়মিত কলম ধরেন শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য | বঞ্চিত হন না সাবালক পাঠকমহলও | উল্লেখযোগ্য বই ‘রূপকথার অরূপরতন’, ‘গুপীবাঘার পোলাপান’, ‘বাহনের বায়নাক্কা’ এবং ‘স্বপ্নে বাঁচা’ |

অনেকক্ষণ মেয়েটার কোনও সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। রান্নাঘরে রুটি করতে করতে বার দুয়েক কান খাড়া করল মালতী। রুটি বেলছিল সবসবময়ের কাজের মেয়ে ঝিনি। শেষপর্যন্ত তাকেই বলল,

Banglalive

যা তো দেখে আয় দিদি কী করছে।

ঝিনি ফিরে আসতে না আসতেই দরজায় এসে দাঁড়াল ঝুম্পা। মুখটা কেমন যেন একটু শুকনো, ক্লান্তমত। মেয়েকে দেখে একটু বিরক্ত গলাতেই মালতী বলল,

কী করছিলি ? সাড়া-শব্দ নেই।

পড়ছিলাম, কাল অঙ্কের ক্লাস টেস্ট আছে।

কাকার কাছে যা, গিয়ে অঙ্ক কর। ভুল হলে দেখিয়ে দেবে তক্ষুণি।

কাকার কাছে যাওয়ার কী দরকার। আমি নিজেই পারব।

মুখ গোঁজ করে বলল ঝুম্পা। মেয়ের বেয়াড়াপনায় বিরক্ত হল মালতী। মেয়েটা কেমন যেন অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। এবার রেজাল্টও বেশ খারাপ করেছে। অথচ বুদ্ধি-সুদ্ধি নাকি ভালই। অন্তত এমনটাই মত সুনন্দা মানে মালতীর ছোট জা-এর । ঝুম্পার বাবারা দুই ভাই। হরিশ আর রমেশ। হরিশের চালকল আছে তিনখানা এছাড়া একখানা কোল্ডস্টোরেজ। তবে পড়াশোনায় তেমন মাথা ছিল না কোনোওকালেই। অল্পবয়সেই ব্যবসায় নেমে পড়ে। রমেশ কিন্তু কলেজ পাস, করে ইউনিভার্সিটিও ঘুরে এসেছে। এখন  হাইস্কুলের মাস্টার। পড়ালেখা জানা ভাইকে একটু সমীহই করে হরিশ। মালতীর কাছেও, গ্লাসের তলার মত মোটা কাচের চশমা পরা  ঠাকুরপোর বাড়তি কদর আছে। তাই ঝুম্পা ক্লাসে নাইনে ওঠার পর রমেশ যখন নিজে থেকেই বলল,

ঝুম্পার আলাদা মাস্টার দেওয়ার দরকার নেই বউদি, সায়েন্স গ্রুপটা আমিই পড়িয়ে দেব,

তখন মনে মনে বেশ একটু খুশিই হয়েছিল মালতী।

 তিন মেয়ে মালতীর। রুম্পা,টুম্পা আর ঝুম্পা। বড় দুটোর বিয়ে দিয়েছে কুড়ি পেরোনর আগেই। ঝুম্পার বেলাতেও অন্যরকম কিছু ভাবেনি মালতী। কিন্তু সুনন্দা মানে রমেশের বউ তাকে বুঝিয়েছে যে ঝুম্পার পড়াশোনায় আগ্রহ আছে। কালে-দিনে সেও কাকার মত বিদ্বান হতে পারে। সুনন্দার কথাটা পুরো বিশ্বাস না হলেও শুনতে মন্দ লাগেনি। সুনন্দা মেয়েটাকে ভালোওবাসে খুব। ছোট জা-কে মালতী বেশ পছন্দই করে। যদিও রমেশের সঙ্গে তার বউয়ের কিন্তু তেমন বনিবনা নেই। ঝগড়া-ঝাঁটি হয় না ঠিকই, কিন্তু সম্পর্কের শীতলতা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

তবে মনে যাই-ই ভাবুক, বাড়ির রীতি মেনে মেয়েকে কড়া শাসনে রাখে মালতী। স্কুল ছাড়া কোথাও একলা যাওয়ার হুকুম নেই। শুধু ওই অলকা, ঝুম্পার ক্লাসেই পড়ে, পাশের পাড়ায় থাকে। ওর বাড়িতে মাঝে-মধ্যে যায়। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই, তিনতলা থেকে রমেশের হাঁক শোনা গেল,

বউদি, ঝুম্পা কোথায় ? কাল অঙ্ক পরীক্ষা আছে বলছিল।

যা যা শীগগির যা…..মেয়েকে তাড়া দেয় মালতী।

মায়ের কথাগুলো কেমন যেন কানেই ঢোকে না ঝুম্পার। মুখখানা তেলো হাঁড়ির মত করে উঠে যায়। মেয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে ফের রুটি সেঁকায় মন দেয় মালতী। সুনন্দার ফিরতে এখনও খানিকটা দেরি আছে। হরিশের বাবার করা এই তিনতলা বাড়িতে দুই ভাই একসঙ্গেই থাকে। একতলাটা ভাড়া দেওয়া । দোতলায় হরিশ থাকে। সেখানেই রান্না-খাওয়ারও ব্যবস্থা। দুখানা ঘর আর একটা ন্যাড়া বারান্দা সুদ্ধ তিনতলাটা রমেশের।

 সুনন্দার মা বহুদিন ধরেই অসুস্থ, শয্যাশায়ী। কাছেই থাকেন। তাই মায়ের দেখাশোনা করতে সুনন্দা প্রায় প্রতিদিনই বিকেল নাগাদ ঘন্টা দুয়েকের জন্য বাপের বাড়ি যায়। রমেশ আর সুনন্দার একটিই ছেলে। আপাতত সে কলকাতায় হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে।

দিদি কিন্তু পড়তে যায়নি।

সেঁকা রুটিগুলো একটা পরিষ্কার কাপড়ে মুড়ে ক্যাসারোলে ভরে রাখছিল মালতী। ঝিনির কথা শুনে একটু চমকে উঠে বলে,

আরও পড়ুন:  বাঘ-টাঘ

কী করছে তাহলে ?

ঘরে শুয়ে আছে।

বেশ গনগনে মেজাজেই ভিতরে যায় মালতী। নিজের ঘরে শুয়ে আছে ঝুম্পা। আলো নেভানো,

কী ব্যাপার শুয়ে আছিস যে ?

শরীরটা ভালো লাগছে না। বমি হল একটু আগে……

আসলে পড়তে না বসার অজুহাত, মনে মনে ভাবে মালতী। কিন্তু শরীর খারাপের ওপর তো কিছু বলা যায় না। তাই রাগটা গিলে নিয়ে বলে,

তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়। কাল সকাল সকাল উঠে পড়তে বসবি।

………………

মালতী যাই-ই ভাবুক, শরীরটা কিন্তু সত্যিই ভালো যাচ্ছে না ঝুম্পার। পরদিন স্কুলে গিয়েও গা গোলানো ভাবটা গেল না। গলার কাছে যেন একটা অস্বস্তি। অলকা বলছিল স্কুল ফেরতা তাদের বাড়ি যেতে। রাজি হল না ঝুম্পা। আসলে অলকাদের বাড়িতে তার পিসতুতো দিদি এসেছে। সে নাকি সাইকিয়াট্রিস্ট। অলকা ঝুম্পাকে বলেছিল,

জানিস, চিনিদিদি স্বপ্নের মানে বলতে পারে।

সেটা আবার কীরকম ?, ঝুম্পা তো অবাক।

ধর্, তুই একটা স্বপ্ন দেখেছিস। সেটা চিনিদিদিকে বললে, কেন সেই স্বপ্নটা দেখলি, তার পিছনে তোর মনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনও ইচ্ছে-অনিচ্ছে আছে কিনা, চিনিদিদি বলে দিতে পারে।

শুনেই ঝুম্পার প্রবল আগ্রহ হয়েছিল চিনিদিদিকে দেখার। সেইজন্য সেদিন বিকেলে অলকার সঙ্গে হাজির হয়েছিল তাদের বাড়িতে।

তুমি নাকি স্বপ্নের মানে বলতে পারো ?

ঝুম্পার কথা শুনে হেসে চিনিদিদি বলেছিল,

মানে বলাটা ঠিক নয়। আসলে অনেক সময়ই মানুষের মনে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটে স্বপ্নের মধ্যে। আমরা মানুষের মনের এইসব গোপন ভাবনাগুলো বোঝার চেষ্টা করি। তাই স্বপ্নের কথা শুনলে তার পিছনে কী আছে সেটা আন্দাজ করার চেষ্টা করি।

আমি জানো তো মাঝে মাঝেই একটা অদ্ভূত স্বপ্ন দেখি…….

কী স্বপ্ন শুনি ?, জানতে চায় চিনিদিদি

একটা গুহার মুখ…..তার ভিতরে নীল আলো জ্বলছে….. আমি গুহাটার দিকে যেতে চাইছি না….কিন্তু ত কে যেন আমাকে ঠেলছে…… হঠাত্ গুহা থেকে একটা হাত বেরিয়ে আমাকে এক টানে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল…..তারপর কী হল জানি না…..গুহার ভিতরটা কিন্তু দেখতে পাই না, তার আগেই ঘুম ভেঙে যায়…..

 কথাগুলো শুনতে শুনতে মুখটা গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিল চিনিদিদির। শেষ হতে একটু চুপ করে থেকে বলে,

তুই খুব ভিতু মেয়ে নাকি রে ঝুম্পা ?

ঝুম্পা কিছু বলার আগেই অলকা বলে উঠল,

হ্যাঁ গো, ও ভারি ভিতু। আসলে ওদের বাড়িতে এত শাসন….সারাক্ষণ কাকিমা বলছে, এখানে যাবে না, ওর সঙ্গে কথা বলবে না……কোথাও বেরোতে দেয় না। শুধু ওর কাকিমা খুব ভালো….

ঝুম্পাকে এগিয়ে দিয়ে আয় অলকা। সন্ধে হয়ে এল। ওর বাড়িতে আবার বকাবকি করবে…..

চিনিদিদির কথা শুনে অবাক হয়ে ঝুম্পা বলে,

স্বপ্নের মানেটা বললে না তো।

বলব পরে। ওরকম শুনেই কী বলা যায়। একটু ভেবে বলতে হবে……

চিনিদিদি মানেটা বলল না বলে একটু মন খারাপ করেই বাড়ি ফিরেছিল ঝুম্পা। তারপর আজ স্কুলে অলকার কাছে শুনল, চিনিদিদি বলেছে ফেরার পথে ঝুম্পা যেন অবশ্যই তাদের বাড়ি হয়ে যায়। কিন্তু স্কুল ছুটির পর শরীরটা এত খারাপ লাগছিল যে যাওয়াই হল না। বাড়ি ফিরেও নিজের ঘরে চুপ করে শুয়ে ছিল। এমন সময় মা এসে বলল, অলকা তার দিদিকে নিয়ে এসেছে।

…………

অলকাকে মালতী বেশ পছন্দই করে। তাই অলকা দিদিকে নিয়ে তাদের বাড়ি আসাতে প্রথমটায় খুশিই হয়েছিল। কিন্তু একটু পরেই মালতীর মনে হতে লাগল মেয়েটা বড্ড বেশি পাকা। কেমন যেন পুলিশি জেরা করছে তাকে। ঝুম্পাকে নিয়ে নানা অবান্তর প্রশ্ন। তার সঙ্গে আবারও জ্ঞানও দিচ্ছে। আজকালকার মেয়েদের অতিরিক্ত শাসনে রাখা নাকি ভাল নয়…..। হাঁটুর বয়সী মেয়ের মুখে এমন সব কথা শুনে মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল মালতীর। দিব্যি করে চা, ভেজিটেবল্ চপ সাঁটিয়ে ওঠার সময় আবার আর এককাণ্ড। ঝুম্পা অলকার সঙ্গে নিচে নেমে গেছিল। মেয়েটা সিঁড়ির কয়েক ধাপ নেমেও আবার উঠে এসে ফস্ করে মালতীকে বলল,

আরও পড়ুন:  শাড়ি

আমার মনে হচ্ছে ঝুম্পার সঙ্গে কেউ কোনও খারাপ কাজ করার চেষ্টা করছে। ও ভয় পাচ্ছে বলে আপনাদের বলছে না। আপনি একটু চোখে চোখে রাখবেন……

চিনির কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝেনি মালতী। চোখে চোখে আর কীভাবে রাখবে ?  একমাত্র স্কুলে যাওয়া ছাড়া সারাক্ষণ তো মেয়ে চোখের ওপরেই আছে। খারাপ কাজের চেষ্টা করছে মানে কী ? ডেঁপো মেয়েটার কথাগুলোকে মোটেই গুরুত্ব দেয়নি মালতী।

কিন্তু ঝুম্পার শরীর খারাপের ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিতেই হল। কিছুই প্রায় খাচ্ছে না মেয়ে। চোখ-মুখ বসে গেছে। স্টেশনের রাস্তায় একজন লেডি ডাক্তার বসেন । স্কুল থেকে ফেরার পর ঝুম্পাকে নিয়ে তার কাছেই গেছিল মালতী। ফিরল যখন তখন সন্ধে গড়িয়ে গেছে। রিকশা থেকে মা-মেয়েকে নামতে দেখে এগিয়ে গেছিল ঝিনি। কিন্তু মালতীর দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল। মালতীর মুখখানায় কে যেন কালি মেড়ে দিয়েছে। আর ঝুম্পার শরীরে যেন প্রাণ নেই। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে ফ্যাকাসে-বিবর্ণ মেয়েটাকে টেনে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল মালতী। তারপর ধাক্কা মেরে ঝুম্পাকে খাটের ওপর ফেলে দিল। আসলে হাতে-পায়ে যেন বশ নেই মালতীর। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। প্রাণপণে ভাবতে চাইছে একটু আগে লেডি ডাক্তার যে কথাগুলো তাকে বলেছে সেগুলো সব মিথ্যে। এরকমটা যে হতে পারে সেকথা তার কল্পনাতেও ছিল না। ঝুম্পাকে টেবিলে শুইয়ে ভালো করে পরীক্ষা করেছিলেন ভদ্রমহিলা। তারপর ফিরে এসে নিজের চেয়ারে বসে বললেন,

মেয়ে কার সঙ্গে মেলামেশা করে জানেন কিছু ?

অবাক হয়ে মালতী বলেছিল,

মেলামেশা তো তেমন কারুর সঙ্গে করে না। স্কুলের বন্ধু-বান্ধব আছে কিছু……..

আমি খুব স্যরি,  কিন্তু বলতে তো আমাকে হবেই। আপনার মেয়ে কিন্তু প্রেগন্যান্ট, পেটে বাচ্চা এসেছে ওর। আমার ধারণা মাস-দুয়েক পেরিয়ে গেছে। কমাস মাসিক হয় নি তোমার, দুমাস ?

প্রশ্নের উত্তরে নিঃশব্দে ঘাড় নাড়ে ঝুম্পা। আর মালতী বুঝতে পারে না তার সামনে এটা কী ধরনের ভোজবাজির খেলা চলছে।

মিসেস সামন্ত, আমার মতে ওর যত দ্রুত সম্ভব অ্যাবর্শন করানো দরকার। আমার নার্সিংহোমে করাতে পারেন। ভয়ের কিছু নেই। ঘন্টাখানেকের ব্যাপার। দুপুরের মধ্যেই বাড়ি চলে যাবে। ওটি চার্জ আর সব কিছু মিলে হাজার পাঁচেক লাগবে……..

আরও কী কী যেন বলেছিলেন ভদ্রমহিলা। কিছুই মাথায় ঢোকেনি মালতীর। ঝুম্পার পেটে দুমাসের বাচ্চা, শুধু এই তথ্যটাই যেন তার মাথাটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছিল।

ফেরার সময় গোটা রাস্তায় একটাও কথা বলেনি মালতী। এবার ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় মেয়েকে বলল,

ছেলেটা কে ? কার সঙ্গে মাথা মুড়োলি ?

কোনও উত্তর নেই। এতক্ষণের পুঞ্জিভূত রাগটা যেন বোমার মত ফেটে পড়ল মালতীর মাথার ভিতর। হাতের প্রবল টানে পড়পড় করে একগোছা চুল উঠে এল ঝুম্পার মাথা থেকে। এলোপাথাড়ি চড়ে ঠোঁটের কোণা কেটে রক্ত বেরিয়ে গেল, তবু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বেরোল না। মালতী যেন পাগল হয়ে গেছে । প্রাণপণে অভিশাপ দিচ্ছে আর মারছে মেয়েকে। দু-চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে ঝুম্পার। কিন্তু মুখে একটা শব্দ নেই।

আরও পড়ুন:  জামাই ষষ্ঠী পালা

ভয় পেয়ে বাইরে থেকে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিল ঝিনি। বাপের বাড়ি থেকে ফিরে অবস্থা দেখে সুনন্দা হতবাক্। জা-এর গলা শুনে দরজা খুলে সুনন্দাকে টেনে ভিতরে ঢুকিয়ে নেয় মালতী। তারপর সুনন্দার দু-হাত ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠে বলে,

কী করব বল ? এই মেয়েকে নিয়ে আমি কী করব বল ? কী পাপ করেছি আমি যে এমন মেয়েকে পেটে ধরতে হল ?

সব কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায় সুনন্দাও। কিন্তু তবু যতখানি সম্ভব শান্তভাবে বলে,

মাথা ঠান্ডা কর দিদি। ওর কাছ থেকেই জানতে হবে যে ছেলেটা কে ? এভাবে মারধর করে লাভ হবে না। বুঝিয়ে বলে নামটা বার করতে হবে। আমার মনে হয় আমি ওর কাকাকে ডাকি, সে যদি বুঝিয়ে-সুঝিয়ে…….

না, কাকাকে ডাকবে না, কক্ষনও ডাকবে না কাকাকে, আমি কক্ষণও কাকার কাছে পড়তে যাব না আর……

ঝুম্পার তীক্ষ্ণ চিত্কারে চমকে ওঠে মালতী, সুনন্দা দুজনেই। এলোমেলো চুল, ঠোঁটের কোণ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়া মেয়েটার বিস্ফারিত দুচোখে অসম্ভব আতঙ্ক। ফের চিত্কার করে ঝুম্পা,

কক্ষণও আমি পড়তে যাব না কাকার কাছে……যাব না আমি……

মালতী হতচকিত। সুনন্দা স্থির, শিলীভূত। সময় যেন থমকে গেছে কয়েক মুহূর্তের জন্য । তারপর আস্তে আস্তে ঝুম্পার দিকে এগিয়ে যায় সুনন্দা। দুহাতে মেয়েটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিয়ে বলে,

তিনতলায়, কাকার কাছে একা পড়তে যাবি না….তাই না রে ঝুম্পি…..

কাকিমার কোলের মধ্যে মুখ গুঁজে পাগলের মত মাথা নাড়ে ঝুম্পা,

না না কিছুতেই যাব না আমি……

কোথাও যেতে হবে না তোকে।……. দিদি তুমি কাল ওকে নার্সিংহোমে নিয়ে যেও। টাকার জন্য ভেবো না । আমি ব্যবস্থা করব। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।

সুনন্দার গলার স্বর অদ্ভূত রকম শীতল, কঠিন। ছোট জা-এর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন গা শিরশির করে ওঠে মালতীর।

…………….

নার্সিংহোম থেকে দুপুরের পরেই ফিরে এসেছিল দুজনে । রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়েও পড়েছিল । কিন্তু হঠাত্ একটা প্রবল চিত্কার-চেঁচামেচির শব্দে ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল মালতীর। বাইরে যেন অনেক লোকজন। একটা অজানা আশঙ্কায় ছুটে বারান্দায় আসতেই গলা দিয়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এল তার । একতলার খোলা চাতালে উপুড় হয়ে পড়ে আছে রমেশ। মাথা থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত আর ঘিলু মাখামাখি হয়ে জমে আছে চারপাশে। প্রাণ নেই বুঝতে অসুবিধা হয় না।

এক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে প্রাণপণে ছুটে তেতলায় ওঠে মালতী। রমেশেদের শোওয়ার ঘরের খাটে একা  বসে আছে সুনন্দা। মালতীকে ঘরে ঢুকতে তার দিকে তাকায়, তারপর শান্ত গলায় বলে,

চশমাটা কাল রাতে সরিয়ে রেখেছিলাম। রোজই তো বাথরুম যেতে ওঠে। চশমা খুঁজে না পেয়ে আমায় ডাকল। বাথরুমের বদলে ন্যাড়া বারান্দার ধারে নিয়ে গিয়ে বললাম, তুমি ঢুকে পড়ো, আমি দাঁড়াচ্ছি। ও সোজা এগিয়ে গেল সামনের দিকে। পড়ে যাওয়ার আওয়াজটা শুনলাম। কিন্তু আর পিছন ফিরে তাকাইনি………

3 COMMENTS

  1. গা শিরশির করা গল্প। উঃ। অসাধারন লেখা।

এমন আরো নিবন্ধ