স্বাধীনতার স্বাদ

2558

রোজ এই সময়টা আশালতা বাইরের ব্যালকনিতে এসে বসেন । হাতে থাকে মালারাধারী । হাতে যদিও মালা থাকে এবং হাতটাও চলতে থাকে,কিন্তু মনটা ঠিক জপে থাকে না । মালা জপতে জপতে মন চলে যায় অন্য কোথাও ।

গড়িয়ার এই অঞ্চলটা বেশ নিরিবিলি । আশেপাশে সব মডার্ন ডিজাইনের বাড়ি । ছেলে রণজয় অফিসের সুবিধার জন্য এখানে বাড়ি বানিয়েছে । তাও হয়ে গেল বারো বছর । আশালতারা যখন এখানে এলেন তিতলির তখন ছয় বছর । এখানে এসে ক্লাস ওয়ান এ ভর্তি হল । তিতলির কথা মনে পড়তেই আশালতা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন । তিতলি তার এক মাত্র নাতনিএ বছরে কলেজে ভর্তি হয়েছে । সাধারণত সাড়ে চারটায় বাড়িতে ঢুকে পড়ে । আজ পাঁচটা বাজতে চলল ….. আরে ঐ তো তিতলি । ওটা কার বাইক থেকে নামছে ? ছেলেটা কেমন ভাবে চুল কেটেছে !! চারিদিকটা প্রায় নেড়া,মাঝখানে কগাছা চুল । কি যে বিচ্ছিরি সব স্টাইল হয়েছে আজকাল আশালতা মনে মনে বিড়বিড় করলেন । কলিংবেল বাজলে আশালতা আইহোল দিয়ে তিতলিকে দেখে দরজা খুললেন । বৌমার কড়া নির্দেশ,আইহোল দিয়ে আগে ভালো করে দেখে দরজা খুলতে হবে । দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ঢুকে ঠামমিকে জড়িয়ে ধরল তিতলি ।

আরে ছাড় ছাড়, পড়ে যাব যে ,কী ব্যাপার ,আজ এত খুশি ?” ছেলেটা কে রে ? নতুন বয়ফ্রেন্ড ?

ধ্যৎ,কি যে বল তুমি ! বয়ফ্রেন্ড হতে যাবে কেন । জাস্ট ফ্রেন্ড । তিতলি উত্তর দিল ।

আজ আমরা যা এনজয় করেছি না ! কলেজ বাঙ্ক করে সাউথ সিটি মলে গিয়েছিলামতুমি কিন্তু আবার মাকে বলে দিও না ।

ঠিক আছে ,কাঊকে বলব না । এখন যাও,হাত মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নাও ।”

না ঠামমি,আজ অনেক খেয়েছি । এখন আর কিছু খাব না । বলে নিজের রুম-এ চলে গেল ।

আশালতা আবার ব্যালকনিতে গিয়ে বসলেনএ বাড়িতে কয়েকটা ইংরাজি কথা খুব চলেএনজয় করা, চিল , কুলডাউন, ডিসগাস্টিং, ফ্রিডম আশালতাও মাঝে মাঝে চেষ্টা করেন বলতে , কিন্তু উচ্চারণটা ঠিক ওদের মত হয় না ।

এই তো সেদিন যখন তনিমা তিতলিকে বকল দেরী করে বাড়ি ফেরার জন্য, তিতলি নিজের রুমে ঢুকে মায়ের উপর রেগে গজগজ করছিল । আশালতা তাকে আদর করে, মাথায় হাত দিয়ে বললেন ‘ চিল ডাউন ,চিল ডাউন । শুনে তো তিতলি রাগ ভুলে খিল খিল করে হেসে ঊঠল –‘ওটা চিল ডাউন নয় ঠামমি,কুল ডাউন’ । সেই কবে মাধ্যমিক পাসের পর বিয়ে হয়েছে আশালতার .তার স্বামী আর্মিতে কাজ করতেন,বছরে তিন মাসের ছুটি পেতেন । বাকি সময় বাইরে বাইরে থাকতেন । গ্রামের বাড়িতে শ্বশুর, শাশুড়ি, ছেলেকে নিয়ে থাকতেন আশালতা

মানুষটা বড় ভালো ছিল পাগলের মত ভালবাসত আশালতাকে,যে ক’দিন বাড়িতে থাকত সারাক্ষণ আশালাতার পিছু পিছু ঘুরত ।শাশুড়ি মা রাগ করতেন, গজগজ করতেন, বলতেন কেমন মেনিমুখো ছেলে হয়েছে আমার।

আশালতা দেখলেন টাইট জিন্স আর ঢোলা গেঞ্জি পরা একটা মেয়ে রাস্তা পার হচ্ছে আজকালকার মেয়েরা শাড়ী পরে না বেশিরভাগ সময় জিন্স ,গেঞ্জি আর কুর্তি পড়ে। বৌমাও তাই পরে, খারাপ লাগে না আশালতার। একবার আশালাতারও খুব ইচ্ছে হয়েছিল ছেলেদের মত পোশাক পরার। রণর বাবাও মানা করেনি,নিজের জামা প্যান্ট পরিয়ে দিয়েছিল,ক্যামেরা দিয়ে ছবিও তুলেছিল,খারাপ হয়ে গেছে ছবিটা নিজের অজান্তে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল আশালতার বুক থেকে।

সন্ধে হয়ে এল, আশালতা ব্যালকনি থেকে উঠে এলেন সন্ধে দিতে । কোনোদিনই আশালতার ঠাকুর দেবতার প্রতি অগাধ ভক্তি ছিল না , অশ্রদ্ধাও করেন নি কখনও । বিয়ের ২৫ বছর পর যখন রণর বাবা মারা গেলেন, আশালতার বয়স তখন ৪৩ । শাশুড়ি মা গুরুদেবের কাছে নিয়ে গিয়ে দীক্ষা দিলেন । সবসময় যে খুব মন দিয়ে ঠাকুরের নাম করেন তা নয় । নিতে হয় তাই নেন ।

আশালতার তার বৌমার জীবনটা খুব ভালো লাগে । একদিকে চাকরি করছে , স্বামীর সঙ্গে সেজেগুজে পার্টিতে যাচ্ছে, আবার মেয়েকেও মানুষ করছে । আশালতাকেও কখনও অনাদর করে না ।

নিজের জীবনটা বড্ড একঘেয়ে লাগে আশালতারখুব কষ্ট হয় যখন ছুটির দিনেও ওরা বেরিয়ে যায় । আশালতার খুব ইচ্ছে হয় ছুটির দিনগুলোতে অন্তত সবাই এ্কসঙ্গে কাটাতেএই কথা দুঃখ করে একদিন বলেছিলেন আশালতা । শুনে তিতলি বলল , ঠাম্মি মন খারাপ করে কিছু হবে না । জীবনটা এনজয় কর । এই এনজয়টা যে কী করে করবে, সেটাই আশালতা বুঝতে পারেন না ।

রণও মাঝে মাঝে বলে , “ মা , জীবনটাকে নিজের মত এনজয় কর, যা করতে ইচ্ছে হয় তাই কর ,”

কিন্তু একা একা কী করবে আশালতা ? একা একা যে কীভাবে এনজয় করা যায় আশালতার তা জানা নেই ।

বৌমা মিষ্টি করে হেসে বলেছিল , “ আপনারই তো ভাল মা, সারাদিন ঠাকুরের নাম নেবেন , কেউ ডিস্টার্ব করবে না। আপনার মত এতটা স্বাধীনতা কজন পায় বলুন ।”

আশালতা মনে মনে ভাবে, সত্যিই কি সে স্বাধীন ? যা খুশি করতে পারে ? তিতলি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছে । প্রথমে তো আশালতা কম্পিউটার খুলতেই পারত না । তিতলিই সব শিখিয়ে দিয়েছে ।

তিতলি বলেছিল , “ দেখবে ঠাম্মি , তোমার কত্ত বন্ধু হবে ।”

আশালতা হেসে বলেছিল, “ এই বয়সে আমাকে কে বন্ধু করবে রে ?”

দেখই না তুমি , তিতলি উত্তর দিয়েছিল

ও মা সত্যিই তাই , কত ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে

তিতলি আবার সাবধান করে দিয়েছে – খবরদার ঠাম্মি , কাউকে বাড়ির ঠিকানা দেবে না বা মনের কথা বলবে না তারপর থেকে আশালতার ঐ ফেসবুক না কি , ওটাও করতে ভালো লাগে না ।

আজ ১৫ই আগস্ট , রণর বাবা যখন বেঁচে ছিলেন , ছুটিতে বাড়ি থাকলে ঐ দিনটায় সকাল সকাল উঠে , ছেলেকে নিয়ে জনগণ মন …… গান টা করতেন । বিখ্যাত মানুষদের গল্প ছেলেকে শোনাতেন । এখন তো এটা শুধুই ছুটির দিন মনে হয় আশালতার । রণ অফিসের কাজে দু’দিনের জন্য বাইরে গেছে । আজ রাতে ফিরবে । তিতলি আজ বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবে । তনিমার আজ বন্ধুর বাড়ি গেটটুগেদার আছে । এই গেটটুগেদার ব্যাপারটা আগে ঠিক বুঝতেন না আশালতা । এখন বোঝেন । বৌমার সব বান্ধবীরা আসে । কখনও রণ বাড়ি থাকলে তাদের স্বামীরাও আসে । প্রচুর খাবার দাবার আনা হয় বাইরে থেকেআর তার সঙ্গে থাকে বিয়ার আর ওয়াইন সবাই মিলে গল্প গুজব হাসি ঠাট্টা চলে আর সবাই যাওয়ার সময় বলে যায় , “বাই তনিমা , বাই রণ , খুব এনজয় করলাম

বৌমার এই মদ খাবার ব্যাপারটা আশালতার একদম ভালো লাগে না , এই কথা তনিমাকে একদিন বলেছিলেন আশালতা ।

তনিমা শান্ত অথচ গম্ভীর স্বরে বলেছিল , “ মডার্ন সোসাইটিতে মিশতে হলে এসব একটু আধটু করতেই হয় মা , আর তা ছাড়া আমি চাই না , আমার স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করুক ।”

তারপর থেকে বাড়িতে গেটটুগেদার হলে , আশালতা রুমের বাইরে বের হন না ।

আশালতার মনে পড়ে সেও একদিন রাম খেয়েছিল । রণর বাবা আর্মিতে কাজ করার সুবাদে , ছুটির সময় নিয়ে আসত । মাঝে মাঝে রাতে শোবার সময় খেত । একদিন আশালতা জিজ্ঞেস করেছিল – এটার স্বাদ কেমন ?

রণর বাবা হেসে বলেছিল , “ একটু খেয়ে দেখ , তাহলেই বুঝতে পারবে ।”

জোর করে একটু খাইয়েও দিয়েছিল । বাব্বা ! কি বিচ্ছিরি খেতে । আশালতা একটা দীর্ঘ– নিঃশ্বাস ফেললেন ,কত বছর আগের কথা সব জ্বলজ্বল করছে এখনও ।

১১ টার সময় বৌমা বেরিয়ে গেল । তিতলি আগেই বেরিয়ে গেছে । যাওয়ার সময় বৌমা বলে গেল –

কেউ এলে , না দেখে, দরজা খুলবেন না ।

এখন আশালাতা বাড়িতে একা সবাই ফিরবে ছ’টার পর।কী করবেন সারাদিন আশালাতা, গুন গুন করে জনগণমন গানটা গাইলেন খানিক্ষন , না কিছু ভালো লাগছে না , টি ভি খুললেন, চলছে না ,কেবল লাইনে গণ্ডগোল হয়েছে । কী যে করবেন , এখন ব্যালকনিতে রোদ ওখানে বসা যাবে না, আশালাতা নিজের রুমে এসে বসলেন। খানিক্ষন জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকলেন , বাইরে দুটো চড়ুই কিচির মিচির করছে ,আচ্ছা ওরা কি স্বামী স্ত্রী ?

কী মনে হল হঠাৎ খাটের নিচ থেকে ট্রাঙ্কটা বের করলেন আশালতা , স্বামীীর পুরনো জামা প্যান্ট বের করলেন, তার থেকে একটা নিয়ে পরলেন ,আহা এখনও যেন গন্ধ লেগে আছে মানুষটার প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলেন , তারপর ড্রইংরুমে কাঁচের শোকেস থেকে একটা বোতল বার করে এক চুমুকে বেশ খানিকটা খেয়ে নিলেন ,কেমন যেন তেতো লাগল মুখটা ,আবার চুমুক দিলেন , হঠাৎ কলিং বেলের আওয়াজ ,আশালতা তাড়তাড়ি দরজা খুলতে গেলেন , কিন্তু কেমন যেন মাথাটা ঘুরে গেল,টাল সামলাতে পারলেন না।

অনেকক্ষণ বেল বাজানোর পর , শাশুড়িকে দরজা খুলতে না দেখে তনিমা ঘাবড়ে গেল ,হঠাৎ করে সুমিতার বাড়িতে গেস্ট এসে যাওয়ায় আজ আর তার বাড়িতে গেটটুগেদার হল না তাই সব বান্ধবীদের নিয়ে তনিমা নিজের বাড়ি চলে এসেছে , কিন্তু শাশুড়ি দরজা খুলছেনা কেন , ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি, তনিমা নিজের পার্স থেকে চাবি বার করে দরজা খুলে বান্ধবীদের বলল ,আয় ভেতরে আয় । ভেতরে ঢুকে তো তনিমার চক্ষুস্থির একি! কে পড়ে আছে এভাবে !!

একি পোশাক শাশুড়ি মাএর ,তাড়াতাড়ি ছুটে গেল তনিমা। বান্ধবীরাও ছুটে গেল,কেউ মুখে জল দিল ,কেউ পাখার স্পিড বাড়িয়ে দিল ,তনিমা শাশুড়ির মাথা কোলে নিয়ে ডাকলমা কী হয়েছে আপনার ? কোনো সাড়া নেই আশালতার ,হঠাৎ এক বান্ধবী বলল তনিমা তোর শাশুড়ি ড্রিংক করে ?

তনিমা গরজে উঠল– কী যা তা বলছিস? বিধবা মানুষ সারাক্ষণ মালা জপছেন।

বান্ধবী বলল – ঐ দেখ বোতল, আর ওনার মুখ থেকেও গন্ধ বের হচ্ছে

তনিমা অবাক, সত্যি তো, মুখ থেকে গন্ধ বের হচ্ছে, কী লজ্জার কথা,তনিমার মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে,[তনিমা ভুলে গেছে যে সেই একদিন বলেছিল হাই সোসাইটিতে মিশতে হলে এসব একটু আধটু…]

সব বান্ধবীরা হাসাহাসি করতে থাকল , কেউ বললবুড়ি দেখাল বটে , কেউ বলল—স্নান করিয়ে দে,তনিমা আজকের মত অপমান জীবনে হয় নি। হাসাহাসি করে সবাই বাড়ি চলে গেল।

পরের দিন যখন আশালতার ঘুম ভাঙল ,অনেক বেলা হয়ে গেছে। ধড়ফড় করে উঠে বসলেন, মাথাটা কেমন ভার হয়ে আছে, বাড়িটা যেন কেমন থমথম করছে, আশালতা মনে করার চেষ্টা করলেন,কী হয়েছে আগের দিন।

তনিমা খাবার টেবিলে খাবার দিয়ে রণকে বলল , তোমার মাকে ডাকো।

মা খেতে এস,রণ গম্ভীর ভাবে ডাক দিল।

আশালাতা আস্তে আস্তে খাবার টেবিলে এসে বসলেন,বড্ড খিদে পেয়েছে,চুপচাপ রুটি ছিঁড়ে খেতে থাকলেন।

তনিমা গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল,কাল এটা আপনি কী করলেন?সব বান্ধবীদের কাছে লজ্জায় আমার মাথা কাটা গেল। রণ, তুমি কিছু বলবে না?

রনজয় বলল, “ ছি: মা, এটা তুমি কী করলে ?আর কেনই বা এমন করলে? বলো?”

আশালাতার খাওয়া হয়ে এসেছিল। খুব করুণ মুখে ছেলে আর বউমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আসলে ছুটির দিন, তোরা সবাই বাইরে ছিলি, তাই, …।”

তাই?

তোদের কথা মত একা একা স্বাধীনতা এনজয় করছিলাম ।

Advertisements

1 COMMENT

  1. লেখিকা কে ধন্যবাদ এই চমৎকার গল্পটি উপহার দেওয়ার জন্য। লেখার পরিমিতিবোধ প্রশংসনীয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.