সৌরভ মুখোপাধ্যায়
শূন্য-দশকে উঠে-আসা কথাকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম। জন্ম ১৯৭৩, আশৈশব নিবাস হাওড়ার গ্রামে, পেশায় ইংরাজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক। গত দেড় দশক নিয়মিতভাবে সমস্ত অগ্রণী বাংলা পত্রিকায় গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। পাঠক-প্রশংসিত উপন্যাস ‘ধুলোখেলা’, ‘সংক্রান্তি’ ও ‘প্রথম প্রবাহ’ এবং অনেক জনপ্রিয় ছোটগল্প তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। লিখতে ভালবাসেন ছোটদের জন্যেও, ‘মেঘ-ছেঁড়া রোদ’ তাঁর এক স্মরণীয় কিশোর-উপন্যাস। সাহিত্য ছাড়াও সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রে অনুরাগ প্রবল। ঘোর আলস্যবিলাসী ও আড্ডাপ্রিয়।

গলির মুখে এই-যে ল্যাম্পপোস্টের বাল্‌বটা বছরের বেশির ভাগ সময়ই ভাঙা থাকে— এর নিচে ঝুপসি অন্ধকারে লোকজন দাঁড়ায় না বড়-একটা। যারা দাঁড়ায়, তারাও একটু এদিক-ওদিক চোরা চাউনি ছুঁড়ে দিয়ে সুট করে পাশের গলিটায় ঢুকে পড়ে।

Banglalive

          আপনি কিন্তু আজ একটু বেশিক্ষণই দাঁড়িয়েছিলেন। উসখুস করছিলেন একটু। কালো চাদরটা ঘাড়ে-মাথায় আষ্টেপৃষ্টে মুড়ে গরমই লাগছিল নিশ্চয়ই— অতটা ঠান্ডা তো এখনও পড়েনি মশাই! তবু মুখটা পুরোপুরি বেআব্রু করতে পারছিলেন না।

          স্বাভাবিক। এটা আপনার সবে দ্বিতীয় দিন। আপনার মতো ভদ্দরলোকেদের আড় ভাঙতে দেরি হয়।

          আপনি সেই লোকটাকে খুঁজছিলেন। সেই বুড়ো— যে আপনাকে আগের দিন এই গলির পথটা চেনায়। আপনি দিব্যি বড়রাস্তার ফুটপাথে একাবোকা দাঁড়িয়ে ছিলেন, ফস্‌ করে আপনার সামনে এসে দেশলাই চাইল, তারপর ওই দেশলাইয়ের আলোতেই আপনাকে একটু মেপেজুপে নিয়ে চাপা গলায় বলে উঠল, ‘পছন্দসই জিনিস লাগবে? একদম চাবুক মাল!’ তারপর, পানের দোকানের পাশ দিয়ে এই খোয়া-খাবলা রাস্তা, সস্তা রেস্টুরেন্টের কষা-মাংসের গন্ধ পেরিয়ে কাঁচা কয়লার ধোঁয়ায় আধো-অন্ধকার এই গলি। দু-পাশে ছোট ছোট খুপরি ঘর। যার একটাতে, আপনার হাতেখড়ি হল সেই সন্ধেয়।

          আজ আপনি গলি চিনে নিজেই এসেছেন। কিন্তু চেনা লোকটাকে পেলে একটু ভরসা হয়, এই ভেবে ইতিউতি তাকাচ্ছিলেন কেবলই। নামটা প্রথমে মনে পড়ছিল না আপনার, পরে স্মৃতিতে উদয় হল। একটু অদ্ভুত নাম। জনক দাস।

          হ্যাঁ, আগের দিন গলিতে ঢোকার সময় হাঁটতে হাঁটতে লোকটা ভ্যাজভ্যাজ করে বকছিল খুব, তখনই আপনি শুনেছেন ওর বৃত্তান্ত। বুড়ো দালাল একটু বকাবাজ বটে। পেটে এক-দু পাত্তর পড়লেই গলগল করে আত্মজীবনী শোনায়। আপনিও শুনেছেন, একটু টেনশনে ছিলেন বলে পুরোটা মাথায় নিতে পারেননি। তা, গল্প এমন কিছু নতুনও নয় বিশেষ। কেষ্টপুর না বিষ্টুপুর কোন্‌ গ্রামে ওর আদি নিবাস, মড়কে উজাড় হয়ে গেল গ্রাম, মা-মরা কচি মেয়েকে বুকে করে অচেনা শহরের ইস্টিশনে নামল, তারপর ভিড়ের মধ্যে মেয়ে গেল হারিয়ে। আর খুঁজে পায়নি। যেমন হয় আর কী। পাগলের মতো ঘুরতে-ঘুরতে বহু ঘাটের জল খেয়ে অবশেষে এই গলিতে এসে ঠেকা, বেদানা-মাসির দয়ায় এই পাড়ায় আশ্রয়, জীবিকা।      সেই চোদ্দ বছর আগে, তখন সদ্য এ-পাড়ার সর্বেসর্বা ‘মাসি’-র জায়গাটি কায়েম করেছে বেদানাবালা।

          বেদানামাসির কথা আপনার মনে আছে নির্ঘাত। দেখেছেন আগের দিনই। আর, একবার বেদানামাসিকে দেখলে ভোলে না কেউ।

          আপনি একটু ভয়ই পেয়েছিলেন ভয়ঙ্করী মাঝবয়সিনীর বিশাল বপু দেখে। মুখে ঠাসা পান, চোখ ঘুরছে ভাঁটার মতো— একবার হাঁকাড় দিয়ে উঠলে সব্বার পিলে থরথরিয়ে ওঠে। জনক দাস আপনাকে ফিসফিস করে সব বলেছিল। এ মহল্লার শেষ কথা হচ্ছে বেদানাবালা। সব্বাই যমের মতো ডরায়। পান থেকে চুন খসার উপায় নেই। তার হাতের মুঠোয় আছে নিজস্ব মস্তানবাহিনী। পুলিশ আর নেতাদের সঙ্গেও নাকি লাইন ফিট করা আছে।

          শুনতে শুনতে আপনি সিঁটিয়ে যাচ্ছেন দেখে জনক দাস আপনাকে সাহসও জুগিয়েছিল। বলেছিল, তাকে নাকি আলাদা করে খাতির করে বেদানা, তার সঙ্গে থাকলে কোনও চিন্তা নেই। নিজের আস্তানাটাও দেখিয়েছিল জনক দাস, একেবারে মাসি’র ঘরের লাগোয়া। 

          তা, আজকেও আপনি হাঁটি-হাঁটি পায়ে মাসির কোঠার কাছেই এসে পড়েছেন চেনা লোকের খোঁজ করতে করতে— এও খুব স্বাভাবিক। আপনি তো আর জানেন না যে, আচমকা এমন একখানা বেআক্কেলে ঝামেলা পাকিয়ে বেদানার মগজে আগুন ধরিয়ে বসেছে আপনার জনক দালাল!

         ভাঙা পাঁচিলের পিছনে চোরের মতো দাঁড়িয়ে আপনি চমকে উঠছেন দৃশ্যটা দেখে।

আরও পড়ুন:  প্লাস প্রেম আর ফ্লাইং কিস  

         মাসি’র পর্বতপ্রমাণ চেহারাটার সামনে জনক দাসের খেঁকুরে শরীরটা কেমন নুয়ে রয়েছে, আর মাসি’র গলা থেকে বেরোচ্ছে গালাগালের টাকনা দেওয়া রাম-ধমক!

         “কী তখন থেকে ঘ্যানঘ্যান কচ্চিস রে বুড়ো ভাম? চিতেয় ওঠার বয়েস হল, ঢ্যামনা… অ্যাদ্দিনে তোমার রস উথলে উঠেচে! অ্যাদ্দিনে ভাগাড়ের শুকনির নজর পড়েচে— কোন্‌ ছুঁড়ির গালে তিল, কোন্‌ মাগির পেটে দাগ? শালা চুল্লুখোর, যা ভাগ… হারামি!”  

         প্রথম চোটে আপনি ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারেননি। ওই আড়ালে দাঁড়িয়েই, থতমত খেয়ে সভয়ে জনক দাসের মুখের দিকে তাকিয়েছেন। বেদানার দাওয়ার ষাট পাওয়ারের বাল্‌বের আলো পড়েছে ওর মুখে, চোয়ালের তোবড়ানো রেখাগুলো কেঁপে উঠছে, শুকনো কালো ঠোঁটগুলো কী যেন বলতে গিয়েও গিলে ফেলছে বারবার! বেদানামাসি ক্ষেপলে সারা মহল্লা থতিয়ে যায় ভয়ে।

         কিন্তু আপনি অবাক হয়ে দেখছেন, জনক দাস নড়ছে না। পালিয়ে যাচ্ছে না। চোখে ভয়-পাওয়া বাচ্চা-ছেলের মতো চাহনি, কিন্তু মুখ নড়ছে! নেশাড়ুর মতো  কী যেন বলছে বার বার!

        আশ্চর্য, আপনি শুনতেও পেলেন! বলছে, “কিন্তু… বাঁ-গালে দুটো তিল… পাশাপাশি… নতুন মেয়েটার…”

        ফের গর্জন করে ওঠে বেদানা। “তাতে তোর কী রে, ক্যালানে মড়া? নতুন মেয়ের গালে তিল না দাবনায় জড়ুল, তুই তা নিয়ে কী ছিঁড়বি?” চোখ ঘুরিয়ে অশ্লীল ভঙ্গি করে, তারপর বলে, “অমন আরও কত তিল আছে রে বাঞ্চোৎ বুড়ো, ঢাকাঢুকি দেওয়া! সে সবও দেখতে চাস নাকি, হ্যা? মতলব কী, তোর? ওর নথ তুই ভাঙবি? দু’কৌড়ির ভিখিরি, শালা, শখ হল নাকি অ্যাদ্দিনে, অ্যাঁ… নয়া চীজের সিল-কাটার শখ?”

        দেখছেন আপনি, কথাগুলো শুনতে শুনতে যেন ঝাঁকুনি খেয়ে ফুলে-ফুলে উঠছে জনক দাস! চোয়াল শক্ত হচ্ছে এক-একবার, ঝুলে যাচ্ছে ফের! নাকের পাটা ফেঁপে উঠছে মুহূর্তে মুহূর্তে। কিন্তু না, মুখে রা’টি নেই!

        আর, ওদিকে কী বিচ্ছিরি হ্যা হ্যা করে হাসছে বেদানাবালা, বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে বলছে, “দে না তবে, চারখানা কড়কড়ে নোটের বান্ডিল তুইই দে না গুখেগোর ব্যাটা! ধক থাকলে মাল্লু ছাড়, ঐ যে-বাবু আগে কনটেরাক্ট করেচে ওনাকে ক্যানসিল করে তোকেই বসাই নতুন ছুঁড়ির ঘরে! তুইই ভাঙ না নথ, আর তিল গোন টর্চ জ্বেলে জ্বেলে, হ্যা! আছে ধক? …শাল্‌লা নি-মুরুদে বুড়ো!”

        আপনি নেহাত গবেট নন, তাই কথাবার্তা থেকে ব্যাপারটা হালকা-হালকা আঁচ করে ফেললেন। এ-রকম সিস্টেমের কথা আপনি শুনেছেন লোকমুখে। এসব পাড়ায় নতুন ‘ফ্রেশ’ মেয়ের বউনি হলে, তার সঙ্গে প্রথম রাত কাটানোর জন্যে বড় বড় মহল থেকে নিলেমের দর আসে। অনেকের ধারণা থাকে, ভার্জিনের সঙ্গে শুতে পারলে নাকি গুপ্তরোগ সেরে যায়। তাই রেটও চড়া, স্পেশাল আচার-অনুষ্ঠানও আছে কিছু, সব মিলিয়ে ‘নথ ভাঙা’ একটা বেশ বড়সড় অকেশন। আজ নির্ঘাত তেমনই কোনও কেস আছে এখানে।

        ছেঁড়া-ছেঁড়া কথাবার্তা শুনতে শুনতে পুরো ঘটনাটা আপনার আন্দাজে চলে আসছে এখন। আজ সম্ভবত নতুন কোনও মেয়ের কৌমার্য বিক্রি হবে, বড় কোনও রইস বাবু নিলেম জিতেছেন, তাঁকে ডেকে এনে একটা আলাদা সাফসুরত ঘরে আপ্যায়ন করে বসানোও হয়েছে ইতিমধ্যে। আর, বেদানার নিজের ঘরে নতুন মেয়েকে ‘রেডি’ করা চলছে। বেদানার এখন মরার ফুরসৎ নেই। এই সময় হঠাৎ কিনা আধবুড়ো দালালটা হাজারো ফ্যাঁকড়া তুলে পাগল করে তুলছে তাকে! কোত্থেকে মেয়েটা এল, বয়েস কত, ঠিকুজি-কুলুজি… সব ওর জানা চাই! তার ওপর কেবলই ওই ‘বাঁ-গালে দুটো তিল’ বলে বিড়বিড় করছে! কী যে দাবি বোঝা দায়। মাসি যে চটে লাল, তাতে দোষ দেওয়া যায় না।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ২৪)

        আপনার ভুরু দুটো নিজের অজান্তেই কুঁচকে গেছে। গলির দালালিতে হাড়মাস পাকিয়ে-ফেলা লোকটা আজ হঠাৎ এমনধারা খোকামি করে কেন, সেই রহস্যটা ভেদ করতে পারছেন না।

        আপনার মনে পড়ে যায়, এক পণ্ডিত একবার কোথায় যেন বলেছিলেন, মানুষের মন ব্যাপারটা বড় গোলমেলে। ওই যে বড় রাস্তার গা থেকে একের পর এক গলি ঢুকে আসছে এদিক-ওদিক— আলো কম, স্যাঁতসেঁতে, ঘিঞ্জি— মানুষের মনের ভেতরেও নাকি হুবহু সেই রকম। সেইসব গলিঘুঁজিতে, ঘুপচিতে কত কী উল্টোপাল্টা বেমক্কা ভাবনাচিন্তার আনাগোনা! সব সাদা চোখে বোঝাই মুশকিল।    

         এইসব ভেবে আপনি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন, হঠাৎ চমকে উঠে দেখলেন, জনক দাসকে এক লাথিতে ছিটকে ফেলে দিল বেদানা, আর নিজের ঘরে ঢুকে দরজা এঁটে দিল।

         আপনি বুড়ো জনক দাসের দিকে তাকালেন। গায়ের ধুলো ঝেড়ে সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর উল্টোদিকে হাঁটা দিল। আপনি দূর থেকে তাকে অনুসরণ করে দেখলেন, একটা ঘরের সামনে গিয়ে থামল সে, দাওয়ায় উঠল, পর্দা সরিয়ে কী যেন বলল খসখসে গলায়।

         তারপর? আপনি ফের অবাক হয়ে দেখলেন, পুরো চোরের মতো একটা হাফ-দৌড় দিয়ে গলির ও-প্রান্তের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল জনক!   

         আর, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে, পর্দা-ঢাকা সেই দরজার ফ্রেম জুড়ে উঠে এল লম্বা-চওড়া একটা পুরুষ-চেহারা! ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে সে কী চিৎকার-গর্জন!

         আপনার দেরি হয়নি অনুমানে। হ্যাঁ, ঠিক বুঝে নিয়েছেন। ইনিই বেদানা-কথিত সেই ‘বাবু’, যিনি কিনে নিয়েছেন নতুন মেয়ের প্রথম রাত। ফার্স্ট-নাইট কাস্টমার, স্পেশাল গেস্ট।

         কিন্তু ইনি এমন ফোঁসফোঁস গজরাচ্ছেন আর মুখ খারাপ করছেন কীজন্যে? জনক দালাল কী এমন বলে গেল দরজায় এসে?

         বেদানামাসি হন্তদন্ত হয়ে থপথপিয়ে হাজির, লোক জড়ো হচ্ছে আরও। দূর থেকে হল্লাহাটি শুনতে পাচ্ছেন আপনি, কিন্তু বিষয়টা ধরতে পারছেন না। কাছে যাবেন, এমন বুকের পাটাও নয় আপনার।

         এতক্ষণে বেদানার একটা বাক্য আপনি স্পষ্ট ধরতে পারলেন। খ্যানখেনে গলায় সে চেঁচিয়ে উঠেছে, “কী বলছেন বাবু? আজকের দিনে কেউ ডেকে এনে জালি জিনিস দেয়? আমাদের ইমান ধরম নেই নাকি? আমাদের কি আজকের কারবার?”

        বাবুর মুখটাও আপনি দেখতে পেলেন এক ফাঁকে। থমথমে। ভারী গলায় বলছেন, “আমি কি বানিয়ে বলছি? তোমাদের লোকই ত চুপিচুপি রিপোর্ট দিয়ে গেল… মাল ডিফেক্টিভ…”

        “আমাদের লোক!!” বেদানার হাঁ বন্ধ হচ্ছে না, “কে লোক? কী রিপোর্ট দিলে? শুনি একবার!”

        “ওই যে বুড়ো দালাল… বললে খারাপ অসুখ আছে নাকি মেয়ের… তোমরা চেপে রেখেছ…”

         এবার যে কী লঙ্কাকাণ্ড হবে সেটা ভেবে আপনি শিউরে উঠলেন, আপনার বুক দুরুদুরু করতে লাগল। আপনি ফের পিছু হটে ভাঙা পাঁচিলের পিছনে ছাইগাদায় সেঁটে গেলেন। নিশ্বাস চেপে শুনতে লাগলেন বেদানার আকাশ-ফাটানো গলা। খিস্তির ফোয়ারা আর রণহুঙ্কার! হ্যাঁ, সে ডাকছে তার ‘ছেলের দল’কে। ওই যে, চুল্লুর ঠেকের পাশের মাচা থেকে দৌড়ে আসছে মাসির অনুগত গুণ্ডারা! আঙুল তুলে আর পা ঠুকে তাদের নির্দেশ দিচ্ছে বেদানা। আর ওরা ছড়িয়ে পড়ছে গলির সব খাঁজখোঁজে— চিরুনি তল্লাশি শুরু হল।

         আপনি উদ্বিগ্ন হচ্ছেন। মনে মনে প্রার্থনা করছেন, যেন ধরা না পড়ে জনক দাস! কেন কে জানে, আপনার কেমন মায়া পড়ে গেছে লোকটার ওপর, টের পাচ্ছেন হঠাৎই।

আরও পড়ুন:  গেঁটে বাত কমবে, চোখ ভালো থাকবে...আর কী কী রোগ কমবে উচ্ছে খেলে?

          কিন্তু হায়, আপনিও জানেন, মানুষের প্রার্থনার শক্তি কত কম! আপনার প্রার্থনাবাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই আপনার চোখে পড়ে যায়, বলির পাঁঠার মতো ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে লোকটাকে নিয়ে আসছে ওরা।

         ইশ, কী মারটাই না মারছে! নাকটা ফেটে গেল বোধ হয়। আহ্‌, দাঁতগুলোও কি…? ঘুসি, লাথি, কিল— এক একটা মার পড়ছে আর বেচারা গড়িয়ে লুটোপুটি খাচ্ছে রাস্তায়। আপনি দেখছেন আর আড়ালে দাঁড়িয়েই কেঁপে কেঁপে উঠছেন। ওহ্‌! কপালটা তাজা রক্তে মাখামাখি…

         বেদানার পায়ের কাছে ফেলে দেওয়া হল আধমরা শরীরটাকে। ঘিরে দাঁড়িয়েছে মস্তান দল। আপনি মনেপ্রাণে চাইছেন, পায়ে ধরে ক্ষমা-টমা চেয়ে নিক জনক দাস, তাতে হয়তো ছাড় পাবে এ-যাত্রা। কিন্তু আপনি স্তম্ভিত হয়ে শুনলেন, ওই উত্থানশক্তিহীন অবস্থাতেই একেবারে উন্মাদের মতো ফাটা গলায় শির ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল লোকটা, “বাবু, সত্যি বলছি… অসুখ আছে… ছোঁবেন না বাবু… ছুঁলেই মরবেন…”

        কথাটা ফুরনোর আগেই বুট-পরা একটা পা সবেগে আছড়ে নামল পাঁজরের ঠিক নিচে। ‘আঁক্‌’ করে একটা শব্দ, নাক মুখ দিয়ে ভল ভল করে রক্ত— এইটুকু দেখে আপনার গা পাক দিয়ে উঠছে, মুখে হাত চাপা দিয়ে আপনি থর থর কাঁপছেন, এমন সময় আপনার বিস্ফারিত চোখের সামনেই লোহার বালা-পরা লোমশ একটা হাত জনক দালালের টুঁটিতে চেপে বসে ওর শেষ কাঁপুনিটাও থামিয়ে দিল। তারপর বুটের ঠেলাতে কাটা কলাগাছের মতো নর্দমায় গড়িয়ে গেল নিথর শরীর।            

        হ্যাঁ, এবার আপনি ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখানে আর এক দণ্ডও নিরাপদ নয়। এবার কেস জটিল হয়ে উঠবে। খুনোখুনি, পুলিশি হ্যাঙ্গাম থেকে যত দূরে পালানো যায়, আপনি পালাতে চাইছেন। চাদর মুড়ি দিয়ে পিছনের দিকে ঘষটে ঘষটে গোলমালের জায়গাটা পেরোবেন, তার পর হনহনিয়ে বড়রাস্তায় উঠে পড়বেন, এমনই লক্ষ্য। এবং, মনে মনে নাকখৎ দিচ্ছেন। আর জীবনে গলিমুখো হবেন না। বাপরে বাপ!        

        হঠাৎ, আপনার পা থেমে যায় এক সেকেন্ডের জন্যে।

        বেদানার ঘরের পাশ দিয়ে ভাঙ্গা পাঁচিলের আড়ালে-আড়ালে সুড়ুত করে কেটে পড়ার ফাঁকে, ওই আধো-অন্ধকার থেকেই আপনার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে আলোকিত দাওয়ায় দাঁড়িয়ে-থাকা সন্ত্রস্ত একটা মূর্তির ওপর।  সাজগোজ-করা, ফর্সা, নিতান্ত কমবয়সী একটা মেয়ে। চুমকি-বসানো গোলাপি শাড়ি, ঠোঁটে-মুখে প্রসাধনের রং। গোলমাল শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। কেমন হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে!

        আপনার মাথায় কী যেন একটা চিন্তা চিড়িক দিয়ে ওঠে। সদ্য পাওয়ার চেঞ্জ-হওয়া নতুন চশমার মধ্যে দিয়ে আপনি স্পষ্ট দেখতে পান, হ্যাঁ— ঝুলন্ত বাল্‌বের আলোতে বেশ পরিষ্কারই বোঝা যায়, বাঁ-দিকের গালটায়, পাশাপাশি দুটো তিল। নেহাৎ ফুটকি-মতো ছোট্ট নয়, আর গাঢ় কালো। ফর্সা গালে, চোখে পড়ার মতোই!

        ওই চশমার দৌলতেই আপনি আরও দেখতে পান, মেয়েটার মুখে ভয়চকিত ভাব ছাড়াও একটা কেমন অবাক বিহ্বলতা রয়েছে। সম্ভবত ও বুঝতে পারছে না, খামোখা বুড়ো দালালটা ওর নামে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে এত ঝামেলা পাকাতে গেল কেন! এমনকী মরার সময়েও…

        এই ‘কেন’-টা আপনিও ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি, তাই না?

        তবে এখন আপনার অত ভাবাভাবির সময়ও নেই। ঠিক কথা। এসব অন্ধকার গলির কারবার। কত কী যে অদ্ভুত ঘটনা ঘটে অন্ধকার গলিঘুঁজিতে— সবসময় ঠাউরে ওঠা মুশকিল।

        আপনি যে বেশি না-ভেবে দ্রুত পা চালিয়ে দিয়েছেন, একদম ঠিক করেছেন।।

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ