মশাসুর

এবার দুর্গাপুজোয় আমাদের রুচি সংঘের থিম ছিল মশাসুর। মহিষাসুরের লেটেস্ট ভার্সান হিসেবে মশাকে নামানো নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। রুচি সংঘের পুজোর বরাবরই একটা নামডাক আছে। পুরস্কার মিলুক বা না মিলুক, তাদের থিম যে বেশ রুচিসম্মত তা তাদের অতিবড় শত্রুরাও স্বীকার না করে পারে না। সেখানে মশার মত এমন অরুচিকর একটা বিষয়কে থিম করা যায় কী না সে নিয়ে বেশ কথা কাটাকাটি হয়েছিল ক্লাবের পয়লা বৈশাখের মিটিংয়ে।

গত তিন বছর ধরে ক্লাবের পুরস্কার-ভাগ্যে গেরণ লেগেছে। আমাদের পুজোর থিম সেভাবে টানতে পারেনি পুরস্কারদাতাদের। সমালোচকেরা ঠোঁট উলটে বলে গেছেন যে থিম নাকি বড্ড ক্লিশে। প্রতিবেশী দুই ক্লাব ‘আমরা কজন’ আর ‘সংহতি সংঘ’ এই তিন বছরে আমাদের টেক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। ক্লাবের কমবয়সী সদস্যদের মধ্যে তাই একটা চাপা অসন্তোষ ছিলই। এ বছরে তাদের দাবি ছিল আনকোরা নতুন থিমের। তাই রথীনদার নেতৃত্বে আমরা কমবয়সী বেশ কজন মিলে মশাসুর নিয়ে একটা আলোচনা ক্লাব-মিটিং-এর আগেভাগেই করে রেখেছিলাম।

মিটিং-এর শুরুতে রথীনদাই প্রথম বললেন, প্রাণঘাতী মশার দাপট যেভাবে দিন দিন বাড়ছে, তাতে সে আর অসুরের থেকে কম কী! অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে মশাকেই বরং এবারের থিম করে দিন। এবারের থিম হোক মশাসুর।’

ক্লাব সদস্যদের কেউ কেউ এটাকে রথীনদার রসিকতা ভেবে খিক খিক করে হেসে উঠলেন। বয়স্করা একটু ভ্রুকুটি করলেন। বৃদ্ধ ইংরেজির শিক্ষক রসময়বাবু বেজার মুখে বললেন, মশাকে অসুর বানানো? এটা কি প্যারডি হচ্ছে, না কি মক হিরোয়িক?

রথীনদা একটুও না ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, অনেক হিরোইক, অ্যান্টি-হিরোইক থিম তো হল। মহিষাসুর লাদেন সেজেও এলো আবার বীরাপ্পনও হলো, কিন্তু ক্লাবের ব্যাগে কিছু এলো কি? প্রাইজের বেলায় তো সেই ঠকঠকি, তা এবার একটু মক হিরোইকই হোক না। মকারিতে যদি মোক্ষ মেলে তাতে দোষের তো কিছু নেই’।  

আমরা এ কথায় চাপা হাসি হাসলাম। মকারির শিকার হচ্ছেন ভেবে রসময়বাবু একটু দমে গিয়ে থম মেরে বসে গেলেন। আমরা ভাবলুম ‘মশারি-রা’ মানে মানে বোধহয় রণে ভঙ্গ দিলেন। কিন্তু না, মশাসুরের ভাগ্য অত সহজে খোলেনি।

এবার মশাসুর বধে নামলেন আদিত্য মজুমদার। ইনি নিজেকে পাক্কা থিম বিশেষজ্ঞ বলে প্রচার করে বেড়ান। কমবয়সীরা অবশ্য বলে, তিনি নাকি থিমের ব্যাপারে বিশেষ ভাবে অজ্ঞ। গত তিন বছর ধরে এনার কপোলকল্পিত-থিম ক্লাবের প্রেস্টিজে একেবারে গ্যামাকসিন ঢেলে দিয়েছে।

আদিত্যবাবু রথীনদাকে বললেন, আচ্ছা, আপনি খোলসা করে বলুন তো দেখি থিমটাকে ঠিক কীভাবে দাঁড় করাবেন?

রথীনদা বললেন, খুবই সোজা থিম। সুররিয়্যাল একেবারেই নয়, বরং ভীষণ রিয়্যাল কিছু দেখাতে চাই আমি। মা দুর্গাকে দশহাতে দেখাবই না, তিনি দু’হাতি মহিলা। ছাপোষা বাঙালির বউ-এর মতো। মশা মারতে তার উদ্যোগটাই এখানে বড় কথা। আলোর কায়দায় দেখানো হবে দুর্গা রাতের বেলায় তার ছেলেমেয়ের ঘুমের ব্যবস্থা করছেন। স্বয়ংক্রিয় কায়দায় মশারি নামবে ছেলেমেয়েদের উপরে, সিলিং থেকে সুতো বাঁধা বিভিন্ন সাইজের স্বয়ংক্রিয় ডানা-ঝাপটানো মশা ঝুলবে। দুর্গা সমেত তার চার হৃষ্টপুষ্ট ছেলেমেয়েদের দেখে মশাদের উল্লাসের ধ্বনি শোনা যাবে বক্সে। আলোর কায়দায় মা দুর্গা আস্তে আস্তে এগিয়ে আসবেন মশাসুরদের দিকে। তারপর হাতে একটা ছোট্ট সিলিন্ডার তুলে তা থেকে মশাদের ওপর স্প্রে করবেন মারণগ্যাস। ধোঁয়ার কল্যানে একটা ‘ফগি’ পরিবেশ নেমে আসবে চারপাশে। ব্যাকগ্রাউন্ডে মশাদের আর্ত চিৎকার। শেষ দৃশ্যে দিনের আলো ফুটবে, মশারি স্বয়ংক্রিয় কায়দায় আস্তে আস্তে উঠে যাবে আবার। আলোর কারসাজি বন্ধ হলে দেখা যাবে আসল দুর্গা প্রতিমা। এছাড়া, প্যান্ডেলের চারপাশে আলো আর মডেলের সাহায্যে মশার উপদ্রব থেকে বাঁচার অন্য আর সব উপায়গুলো আমরা তুলে ধরব।

আদিত্যবাবু বললেন, থিমে বৈচিত্র্য নেই বলব না, তবে খুব একটা মৌলিক বলেও মনে হচ্ছে না। অনেকটাই যেন মশাঘাতী স্প্রের বিজ্ঞাপন থেকে ধার করা বলে মনে হচ্ছে।

রথীনদা বললেন, থিম বিজ্ঞাপনের মত হলে ক্ষতি তো কিছু নেই। বরং তার বেশ একটা ভালো দিক আছে। এই থিমের ব্যাপারটা যদি আমরা কোনও মশাঘাতী স্প্রে-মেকারদের কাছে ঠিকঠাক তুলে ধরতে পারি, তাহলে তারাই হয়তো গোটা পুজোর স্পনসরের দায়িত্ব নিতে পারেন। সেটা হবে আমাদের কাছে একটা উপরি পাওনা।

শুধু থিমের কারণে পুরো পুজোটাই কেউ স্পনসর করতে পারে – এটা একটা অসাধারণ ব্যাপার বলে মনে হল অনেকের কাছে। যে মশাইরা এতক্ষণ মশা’য় স্বস্তি পাচ্ছিলেন না, তারাও থিমের সমর্থনে মত দিতে লাগলেন। তবুও বেশ কয়েকজনের গোঁ আর নামে না। শেষে ভোটাভুটিতে মশাসুরের জয় হল ১০০-২৫ ভোটে। রথীনদা বললেন, ১০০ ভোট পাওয়াটা কিন্তু খুব সিম্বলিক। দেখবেন, এ থিম সেঞ্চুরির মতোই গৌরব আনবে।

কিন্তু মিটিংয়ের বাধার মতোই মশাসুরকে আরও একটা বাধার মুখে পড়তে হোলো। সেটা হলো মিউনিসিপ্যালিটির বাধা। থিমে মশা আসছে শুনে চেয়ারম্যানের মুখ ব্যাজার হয়ে গেল। একেই তিনি মোটাসোটা মানুষ, গলকম্বল ঝুলে পড়ে মুখে সর্বদাই একটা মশা-গলা ফাঁক তৈরি করে রাখেন। আমাদের প্রস্তাব শুনে তার সে ফাঁক যেন আরও বেড়ে গেল। রসগোল্লার মত চোখ করে বলে ফেললেন, আবার মশা? না না, এক্কেবারে না, মশা নিয়ে আমার এলাকায় কোনও চর্চা হোক, তা আমি চাই না।

আমরা তার অস্বস্তিটা বুঝলাম। এলাকার ডেঙ্গির দাপট যতই বাড়ছে, ততই তিনি ব্যাকফুটে খেলছেন। এ নিয়ে মাঝে মাঝেই তাকে সাংবাদিকদের-গুঁতোর মুখে পড়তে হচ্ছে। তাদের আদরের ঠ্যালায় এতটাই জেরবার চেয়ারম্যান যে পারলে তিনি ম্যানহোলের তলায় ঢুকে হাঁফ ছাড়েন। সাংবাদিকদের কাছে তার একটাই বক্তব্য, আমার এলাকায় কোনও ডেঙ্গির মশা নেই। এ এলাকায় যদি কেউ এ রোগে ভুগছেন, তাহলে জানবেন অন্য কোনও এলাকার মশার কামড়ে তিনি আক্রান্ত।

নিন্দুকে অবশ্য বলে বেড়াচ্ছে চেয়ারম্যানের সহধর্মিনী যিনি ওভার ওয়েটের কারণে অন্তঃপুরবাসিনী হয়েই থাকেন, তিনিও নাকি সদ্য ডেঙ্গি আক্রান্তের দলে রয়েছেন। সাংবাদিকদের ভয়ে তাকে হাসপাতালে না পাঠিয়ে চেয়ারম্যান নাকি ঘরেই ডাক্তার ডেকে তাঁর চিকিৎসা করাচ্ছেন।

মশাসুরকে পাশ করানোর জন্য আমরাও নাছোড়বান্দা। অফিসে না গিয়ে একদিন সকলে মিলে তার বাড়িতেই হাজির হলাম। মুখে অনুরোধের সুর, একটু দেখুন স্যর, পারমিশন না দিলে আমাদের ঢের ক্ষতি হয়ে যাবে।

চেয়ারম্যান গলকম্বল ঝুলিয়ে ডিফেন্স শুরু করলেন, আপনারা শুধু নিজেদের ক্ষতিটাই দেখছেন, আমার ক্ষতির কথাটা একবার ভাবুন। মিডিয়া কী বলবে? তারা তো বলবে যে আপনার এলাকায় মশার এত দাপট যে মা দুর্গা পর্যন্ত মশা মারতে নেমেছেন।

মশাসুরকে পাশ করাতে অবশেষে মাঠে নামলেন রথীনদার শ্বশুরমশাই। চেয়ারম্যানের ছোট বয়সের বন্ধু তিনি। তাঁর চেষ্টায় অনেক কষ্টে চেয়ারম্যানকে বোঝানো গেল যে পুজোর থিমটা মোটেই এলাকার মশার দাপট সংক্রান্ত অপপ্রচার নয়। বরং নির্ভেজাল মশা বিরোধী প্রচার। সব বুঝে চেয়ারম্যান আবার এতোটাই খুশি হলেন যে হাঁফ ছেড়ে আগে একগাল হেসে নিলেন। তারপর নিজেই পুজো উদ্বোধন করবেন বলে প্রস্তাব দিলেন।

আমাদের অন্য প্ল্যান ছিল। ভেবেছিলাম মেডিক্যাল থিম যখন তখন কোনও ডাক্তারবাবুকে দিয়েই উদ্বোধনটা করাব, কিন্তু চেয়ারম্যানের উচ্ছ্বাসের বহর দেখে সে ইচ্ছায় রাশ টানতে হল।

নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে মশাসুর কিন্তু বাজারে বেশ হিট হয়ে গেল। বেশ বড় মাপের এক বহুজাতিক সংস্থা দায় নিলেন পুজো স্পনসরের। উদ্বোধনের আগেই পুজোর থিম নিয়ে হিড়িক পড়ে গেল শহর জুড়ে। টিভি চ্যানেলগুলো প্রচার করলো – মশা যে এ রাজ্যে সত্যিই আসুরিক শক্তি নিয়ে হাজির, তা আবার প্রমাণিত হল এই থিমের মাধ্যমে। উদ্বোধনের দিন চেয়ারম্যান ফিতে কাটবেন বলে হাজির হলেন। কিন্তু তার মুখে সে হাসি কই? টকটকে লাল চোখ, শরীর টলোমলো। আমাদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ না দিয়ে দূরত্ব বাঁচিয়ে হাঁটতে লাগলেন তিনি।

আমাদের মনিদা কাঁচি সমেত ট্রে তার হাতে তুলে দেওয়ার সময় একবার তার গায়ে হাত দিয়ে ফেলেছিলেন। তাতেই তিনি যেন আঁতকে দূরে সরে গেলেন। মনিদার মুখে শুনলাম, চেয়ারম্যানের গা নাকি জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। হয়ত জ্বরের খবর জানাজানি হলে পুজোর বাজারে ফের সাংবাদিকদের মুখে পড়তে হবে ভেবেই হয়তো তিনি আঁতকে উঠছেন।

পুজো শুরুর দু’দিনের মধ্যেই তিনটে প্রাইজ উঠে এলো রুচি সংঘের ব্যাগে। বিদগ্ধ সুঁটকে সমালোচকেরা পর্যন্ত কমেন্টবুকে সেকুলার থিমের প্রশংসা করে গেলেন। লোকের ঢল নামলো প্যান্ডেলে। রাস্তায় জ্যামজট। বেশ ক’বছর পর রুচি সংঘের পুজো বেশ জমে উঠলো এবার। আমাদের আনন্দের শেষ নেই। মানুষ দেখতে দেখতে ভল্যান্টিয়াররা টিফিন খেতে পর্যন্ত ভুলে গেলাম। টেলি সাংবাদিক এক মহিলা থিম, সাবেকি ইত্যাদি বিষয়ে মধ্যরাতে প্রশ্ন করছিলেন। কিছু বুঝে, কিছু না বুঝে হেসে হেসে উত্তর দিচ্ছিলাম। ‘এলাকায় মশার দাপট কেমন?’ – প্রশ্ন করতেই জিনস-এর ওপর শুধুশুধুই একটা ডান হাতের চাপড় দিয়ে মশা মারার ভঙ্গি করে বলে ফেললাম, দেখতেই তো পাচ্ছেন।’ মশার এমন দাপট লাইভ ক্যামেরার সাহায্যে দেখানোর সুযোগ পেয়েও তা না দেখিয়ে তিনি কেন যে চট করে কেটে পড়লেন তা বলতে পারব না।

রথীনদার নামে ‘যুগ যুগ জিও’ আওয়াজ উঠল ক্লাবে। হিরোয়িক থিমের সমর্থকেরা এটাকে ‘হুজুগের জয়’ বললেও আমরা কিছু মনে করিনি। জয় জয়ই, হুজুগের হলেই বা ক্ষতি কী! আমাদের এই থিমের দাপটে পাশের দুটো ক্লাব কেমন যেন মিইয়ে গেছে এবার। তারা রটাতে লাগল, ‘ওটা মোটেও এমন কিছু আহামরি থিম নয়। আসলে মশার কামড় থেকে নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থার জন্যই নাকি এবারে লোক টেনেছে রুচি সংঘ।’ যাক, এসব অরুচিকর কথায় আমাদের অন্তত রুচি নেই।

এত আনন্দের একটা পুজোর ঠিক পরেই একটা খবর পেলাম, যেটা মোটেও ভালো লাগল না। কোনও এক অজ্ঞাত কারনে আমাদের মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যানকে সরিয়ে নতুন একজনকে সে পদ দেওয়া হল। কানাঘুষো শোনা গেল যে আমাদের মশাসুরকে প্রশ্রয় দেওয়ার মাশুল গুনতে হল তাকে। তবে চেয়ারম্যান নিজে অবশ্য এ ব্যাপারে কারোর কাছে মুখ খোলেননি। তাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করার মত দমও ছিল না আমাদের। রথীনদা শুধু বললেন, মশাসুর আসলে তো সেই আসুরিক শক্তিরই প্রতীক, তার দাপট ছোট করে হলেও দেখিয়ে গেল আর কি! সেই কতকাল আগে মহিষাসুর দেবরাজের চেয়ার কেড়েছিলেন, এখন মশাসুর হয়ে চেয়ারম্যানের চেয়ার কাড়বেন এতে আর আশ্চর্য হওয়ার কী আছে ? সে যাই হোক, চেয়ারম্যানের জন্য সত্যিই খুব খারাপ লাগছে।’ রথীনদার খারাপ-লাগাটা আমাদের মনকেও ছুঁয়ে গেল।     

Advertisements

8 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.