তাঁর মতো অভিনেতাকে ছাড়া অর্জুনের তনখা বাড়াতেন না মগনলাল মেঘরাজ

বাহারি লম্বা ঝুলপির পাশে শখের কাগজফুল | এক ঝটকায় ফেলে দিলেন ডক্টর হ্যাজরা | টিকটিকি সন্দেহ করছে | আর ভূপর্যটকের কিনা সাজের ঘনঘটা ! অবশ্য ভূপর্যটক নিজেও এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়েছিলেন সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব | সটান গিয়ে হাজির বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়ির দরজায় | আপাদমস্তক বই ঠাসা বিখ্যাত বৈঠকখানায় বসা দীর্ঘদেহী পরিচালককে সরাসরি বলেছিলেন‚ ‘ আমি আপনার ছবিতে কাজ করতে চাই ‘ |

তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের বৃত্ত থেকে বহুদূরে থাকা তাঁর মতো একজন চরিত্রাভিনেতার পক্ষে এ কম দুঃসাহস নয় ! জহুরির চোখ বুঝেছিল সেই দুঃসাহসের দৌড় বহুদূর | সেই কারণেই হয়তো এসেছিল হরলিক্সের খালি বোতলে বিছে ধরার সিকোয়েন্স | সোনার কেল্লা ছবির শ্যুটিং-এ সত্যি ওভাবে বিছে ধরেছিলেন কামু মুখোপাধ্যায় | কিন্তু পরে তা বাদ চলে যায় সম্পাদকের কাঁচিতে | কারণ পরিচালকের মনে হয়েছিল‚ ওই দৃশ্য ছবিতে থাকলে প্রদোষচন্দ্র মিত্রর তুলনায় মন্দার বোসকে বেশি সাহসী মনে হবে | শোনা যায়‚ মানিক দা’র এই সিদ্ধান্তে কিছুটা হলেও মনক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন কামু | কিন্তু কোনওদিন তার জের বয়ে আনেননি সম্পর্কে | কারণ তিনি জানতেন মানিক দা’র মতো জেম কাটার তো শত পূর্বজন্মেও মিলবে না |

আর জানতেন যেকোনও প্রয়োজনে‚ যৎসামান্য ভূমিকাতেও নিজেকে নিংড়ে দিতে | প্রথম ছবি ‘সোনার হরিণ’ থেকেই সেই বৈশিষ্ট্য টাল খায়নি একবারের জন্যেও | ছবি বিশ্বাস‚ উত্তম কুমার‚ কালী বন্দ্যোপাধ্যায়‚ ভানু বন্দ্যোপধ্যায়ের পাশাপাশি নজর কেড়ে নিয়েছিলেন নবাগত অভিনেতা | সেই অভ্যাস রয়ে গিয়েছিল অভিনয়জীবনের আগাগোড়া | পোড় খাওয়া চেহারার সঙ্গে কঠিন চোখ | ঝুলিতে খলনায়ক চরিত্র বেশি | তাই দিয়েই একের পর এক পালক জুড়েছেন তাজে |

‘নায়ক’-এর প্রীতীশ সরকার থেকে হংসরাজ-এর দালাল | চাহনিতে খামতি নেই খল ও ছলের | কিন্তু সেই চোখই ফটিকচাঁদ-এর ভরসার হারুণ-অল-রশিদ | যে নাকি প্রত্যাশা ছাড়াই নিঃস্বার্থভাবে আগলে রাখে ঠিকানা বিস্মৃত অপহরণের ফাঁদে পড়া কিশোরকে | শুধু ফটিকচাঁদ বা বাবলুরই নয়‚ কামু মুখোপাধ্যায় বড় ভরসার জায়গা ছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের কাছেও | কামু আছেন জেনে‚ চিত্রনাট্যে ইচ্ছেমতো পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারতেন তিনি | গুগাবাবা ট্রিলজি‚ জয় বাবা ফেলুনাথ‚ সোনার কেল্লা ছাড়াও কামু অভিনয় করেছেন শাখা প্রশাখা‚ চারুলতা‚ শতরঞ্জ কে খিলাড়ি-তে |

হারুণ তাঁর মাদারির খেলা দেখিয়েছিলেন সত্যজিতের চিত্রনাট্যের পাশাপাশি গৌতম ঘোষ‚ বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত‚ অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনাতেও | তাঁর অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে ‘পার’‚ ‘ফেরা’‚ ‘কখনও মেঘ’‚ ‘কমললতা’‚ ‘নিশাচর’ অন্যতম |

অভিনয়ের মতো ব্যক্তি কামু নিজেও ছিলেন স্পষ্টবাদী | রেহাই ছিল না রায় দম্পতিরও| একবার বিস্কুটে কামড় দিয়ে বিজয়া রায়কে কামুর প্রশ্ন‚ ‘ বৌদি‚ বিস্কুটে কি সাইলেন্সর লাগিয়েছেন‚ নাকি ?’ হতভম্ব বিজয়া রায়কে হাসি থামিয়ে সত্যজিৎ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বিস্কুট মিইয়ে গেছে | তাই মুচমুচে শব্দ ভ্যানিশ ! এভাবেই আপেলে কামড় দিতে দিতে আসল ডাক্তার হাজরাকে ভ্যানিশ করে দিয়েছিলেন ভূপর্যটক | তার আগে অবধি অবশ্য নাহাড়গড় কেল্লায় গিয়ে তাঁর স্পেনের কথা মনে পড়ছিল |

কিন্তু ম্যাট্রিকে ভূগোলে ছাপ্পান্ন পাওয়া মন তো | বিশ্বাসঘাতকতা করতে কতক্ষণ ! খেয়ালই থাকে না অ্যাফ্রিকায় নেকড়ে নেই | তারপর শনি মনসা-চায়নায় হায়না-সাহারায় সীতাহরণ কত কী বলে ড্যামেজ কন্ট্রোল ! কিনিয়ায় হাতির দাঁতের ব্যবসা করা মন্দার বোস বাস্তব জীবনে কিন্তু কেবল মুখেন মারিতং ছিলেন না | বরং তাঁর মতো সপ্রতিভ ও দুঃসাহসী একজন কুশীলব ছিলেন বলেই পরিচালক রামদেওরা থেকে চলন্ত ট্রেনে ওঠার দৃশ্য ভাবতে পেরেছিলেন |

অতি কঠিন সিকোয়্ন্সও নিজগুণে নাজুখ করে নেওয়ার সহজাত ক্ষমতা ছিল অভিনেতা কামুর | নইলে হরবংশপুরের রাজা বা মগনলাল মেঘরাজের মতো জাঁদরেল মনিব সামলানো অর্জুনের পক্ষে চাট্টিখানি কথা নয় | থোড়া বুখার আর ঝুঁকে পড়া শরীর নিয়েও অর্জুনের জামায় পদকের ঝনঝনানি আর ধারাল ছোরার শনশনানি পাল্লা দেয় | শ্যুটিঙের সেটে প্রশিক্ষিত জাগলার নেপথ্যে থাকলেও কামু মুখোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতা না থাকলে মগনলাল অর্জুনের তনখা বাড়াতেন না |

ছোরার মতো কামুর রসিকতার নিশানাও ছিল অব্যর্থ | গুপী গাইন বাঘা বাইনের শ্যুটিং-এ গিয়ে সবার নাগরাই জুতো বস্তাবন্দি করে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন সিলিং থেকে | শেষে তিনি শিকে থেকে জুতো পাড়তে শুরু হয়েছিল শ্যুটিং | এভাবেই নিজের জীবনকেও মজায় ভরিয়ে রাখতেন কামু | কেরিয়ারে কতদূর এগোলেন‚ নাকি একই জায়গায় থেমে থাকলেন‚ আদৌ ভাবতেন না | সাপলুডোর বোর্ডকে ট্রেনের কামরার বাইরে আর আনেননি | সেখানে তাঁর জীবন মন্দার বোসের রুইতন-হরতন-ইস্কাবন জামার মতোই জটিল অথচ ফুরফুরে | 

১৯৩১ সালের ১৪ জুন থেকে ২০০৩-এর ৬ ডিসেম্বর অবধি পৃথিবীতে জারি ছিল গ্লোবট্রটারের সফর | শেষ কিছু বছর আর্থ্রাইটিসে শয্যাশায়ী | তবে বয়স বাহাত্তরে পৌঁছলেও মনকে বাহাত্তুরে হতে দেননি | বাতের ব্যথায় ন্যুব্জ শরীর না-ই বা পারুক নড়তে | ভণ্ড ভবানন্দের অপোগণ্ড চ্যালার পাখির পালকের মতো মন ঘুরে বেড়াত বেলুচিস্তান থেকে কামচাটকা হয়ে আরাবল্লীর আনাচে কানাচে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.