জাদু নয়

362

হালকা বেগুনি রঙের জারুল ফুলের গোছাটা নিয়ে বাড়ি ঢুকতে ঢুকতেই শম্পা ভাবছিল, এক্সুনি বাবা অফিস থেকে ফিরেই ফুলের গোছাটা দেখে ভারি রেগে যাবে | কিন্তু ক্ি করতে পারে শম্পা? জারুল ফুল তার চিরকালই ভারি ভালো লাগে | বসন্তকালে গাছগুলো যখন গোল গোল হালকা সবুজ কুঁ্ড়িতে ভরে যায়, তখন শম্পা র্িতিমত অপেক্সা করে কবে কুঁ্ড়ি ফুটে হালকা বেগুনি রঙের পাপড়ি বেরিয়ে াসবে | প্রথমে একটা দুটো মঞ্জর্ি, তারপর তো গোটা গাছ ফুলে ছেয়ে যায়্ | এমন চমৎ্কার দেখায় তখন্ | শম্পার স্কুল যাওয়ার পথে বেশ কয়েকটা জারুল গাছ াছে | যতদিন সেগুলো ফুলে ভরে থাকে, ততদিন অঙ্ক পর্িক্সা থাকলেও কেমন যেন একটুও ভয় করে না শম্পার্ | কিন্তু জারুল বেশ বড় গাছ্ | তাই ইচ্ছে থাকলেও শম্পা কোনওদিন জারুল ফুলের গোছা হাতে পায়নি | মাটিতে দু-একটা ফুল কখন-সখনও পড়ে থাকলে, তাই কুড়িয়ে নিয়ে পাপড়িগুলো বইয়ের পাতায় যত্ন করে রেখে দিয়েছে | কিন্তু আজ স্কুল থেকে ফেরার সময় দুটো ছেলে গাছে উঠে ফুল পাড়ছে দেখে সে ার লোভ সামলাতে পারেনি | রিকশা থেকে নেমে তাদের কাছ থেকে দুটো মঞ্জর্ি চেয়ে নিয়ে প্রায় নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরেছে |

ফুল দেখে মা বলে উঠলেন, এই রে, অবার ফুল এনেছিস্ | এখুনি তোর বাবা বাড়ি ফিরে রাগারাগি শুরু করবে |

মায়ের কথার কোনও উত্তর না দিয়ে শম্পা চুপচাপ স্কুলের জুতোর ফিতে খুলতে বসল্ | মা অবশ্য় ততক্সণে ঘরের ভিতর থেকে মোরাদাবাদি কাজ করা পুরোনো ফুলদানিটা বার করে এনেছে | জল ভরে তাতে ফুলের গোছাগুলো সাজিয়ে টেবিলে রাখতেই পুরো ঘরটা যেন হেসে উঠলো | মাও ার থাকতে না পেরে বলে উঠলেন, ক্ি সুন্দর রঙ্টারে ফুলের্ | চমৎ্কার দেখাচ্ছে | এখন তোর বাবা এসে চেঁ্চামেচি না করলেই বাঁ্চি |

শম্পার নিজের মনেও অবশ্য় সেই ভয় াছে ষোল ানার ওপরে াঠারো ানা | াসলে তার বাবা এমনিতে বেশ ভালো মনুষ্ | অঙ্কে খারাপ নম্বর পেলে বকাবকি করেন না মোটেই | বরং গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে াইসক্রিম খাইয়ে এনে, াদর করে বলেন, পরের বার পর্িক্সার সময় ার একটু মন দিয়ে করিস, তাহলেই দেখবি নম্বর ভালো হয়েছ্ | অঙ্কতে একটু মন দিতে হয়, ছটফট করলেই ভুল হবে |

ছোটবেলা থেকেই শম্পাদের বাড়িতেই পাড়ার সব বাচ্চাদের খেলার াড্ডা | কারণ তাদের বাড়িতে ক্য়ারম, চাইনিজ চেকার, ব্য়াগাডোলি কিং্বা বেশ কয়েকরকমের ভিডিও গেম, এসব তো অছেই | এছাড়াও ব্য়াডমিন্টন ার ভলিবলের সেটও তাকে বাবা কিনে দিয়েছেন্ | ার শম্পার বন্ধুরা যদি হৈ চৈ করে বাড়িতে ঢুকে সেসব নিয়ে খেলে, তাহলে ঘর নোং্রা হচ্ছে বলে মা মাঝে মাঝে একটু বিরক্ত হলেও বাবা র্িতিমত খুশিই হয়্ | এছাড়া শম্পাকে সিনেমা কিং্বা ক্রিকেট খেলা দেখাতে নিয়ে যাওয়া, রেস্তোরাঁ্য় খাওয়ানো এসব কিছু নিয়েই বাবার বিরুদ্ধে শম্পার সামান্য়তমও কোনও অভিযোগ নেই | তার ক্লাসের অনেক বন্ধুই বাবাকে যেরকম যমের মতন ভয় পায়, তাদের বাবারা যেরকম হাঁ্ড়িমুখো, গম্ভ্ির প্রকৃতির বেরসিক মানুষ শম্পার বাবা মোটেই সেরকম নন্ | কিন্তু তাঁ্র একটা ভ্িষণ বিচ্ছিরি সমস্য়া হল গাছ কিং্বা ফুল মোটেই পছন্দ নয়্ | শম্পাদের ছোট্ট দোতলা বাড়িটার চারপাশে একটুখানি খোলা জায়গা াছে | কিন্তু সেখনে সবুজের কোনও চিহ্ণ নেই | পুরোটাই সিমেন্ট দিয়ে বাঁ্ধানো, ঝকঝকে পরিষ্কার্ | মা একবার ছাদে রাখার জন্য় কতগুলো টবের চারাগাছ কিনেছিলেন, কিন্তু বাবা এমন চেঁ্চামেচি শুরু করলেন যে সেগুলো শেষপর্যন্ত পাশের বাড়ির কাকিমাকে দিয়ে দিতে হল্ | পারলে বাবা বাড়ির সামনের রাস্তার গাছগুলো, কাটলে বে-াইনি কাজ হবে, হিং্সুটে প্রতিবেশ্িরা খবর দিয়ে দিলে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যেতে পারে, তাই পেরে ওঠেন না | তবে মাঝে মাঝেই লোক ডাকিয়ে নিজের গাঁ্টের পয়সা খরচ করে সেগুলোকে ছেঁ্টেছুটে যথাসম্ভব রোগাসোগা করে রাখেন্ | কারণ বাবার মতে এইসব গাছপালা মাত্রই যত রাজ্য়ের পোকামাকড়ের ডিপো | মাকড়সা, কাঠ পিঁ্পড়ে ার শুঁ্য়োপোকার াস্তানা | বাড়িতে গাছ থাকলেই সেগুলো ঘরে ঢুকবে ার তারপর নানারকম সমস্য়া তৈরি করবে | ঠাম্মা বলতো, ছোটবেলায় একবার সজনে ফুল কুড়োতে গিয়ে বাবার গায়ে নাকি শুঁ্য়োপোকা উঠে পড়েছিল্ | তারপর গোটা গায়ে শুঁ্য়ো লেগে, চুলকে, লাল হয়ে ফুলে গিয়ে সে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড্ | অবস্থা সামাল দিতে দাদুকে শেষপর্যন্ত বাবাকে নিয়ে হাসপাতালেও যেতে হয়েছিল্ | তারপর থেকেই বাবার এরকম গাছপালায় াতঙ্ক্ | মা অবশ্য় াতঙ্ক বলে না, বলে বাতিক্ | তা সেই বাতিকটা এমনই বেশি, যে বাবা ঘরে ফুলদানিতে ফুল পর্যন্ত রাখতে দেন না | তাজা ফুল রাখলেই তার সঙ্গে নানারকম পোকামাকড় াসবে | ফুলদানিতে জল রাখলে তাতে মশা ডিম পাড়বে | তার থেকে প্লাস্টিকের ফুল রাখা ভালো | দেখতে সুন্দর, শুকিয়ে যাওয়া, পচে যাওয়া, জল বদলানো এসবের ঝামেলা নেই মোটেই | মাঝে-মধ্য়ে শুধু সাবন দিয়ে ধুয়ে নিলেই দিব্য়ি ঝকঝকে পরিষ্কার্ | এগুলো হচ্ছে বাবার যুক্তি |

এদিকে শম্পার াবার ওরকম প্লাস্টিকের ফুল একটুও পছন্দ নয়্ | তার খালি ইচ্ছে করে ফুলদানিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানারকম মরশুমি ফুল রাখতে | সব সময় যে ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা কিং্বা গোলাপের মত দামি ফুলই রাখতে হবে তার কোনও মানে নেই | রাস্তাঘাটে যেসব অনাম্ি ফুল ফোটে সেগুলো সাজিয়ে রাখলেও তো চমৎ্কার দেখায়্ | কিন্তু বাবাকে সেসব কথা বলে কোনও লাভ নেই | াজ তাই ঝোঁ্কের মাথায় ফুলগুলো নিয়ে এসে শম্পার একটু বুক দুরদুরুই করছিল্ |

ঘটনা অবশ্য় যা ঘটার ছিল তাই ঘটল | অফিসের মিটিং সেরে বেশ একটু করে বাড়ি ফিরেই ফুলদানিতে বেগুনি রঙের জারুল ফুলের বাহার দেখে বাবা একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন্ |

কে এনেছে এইসব হাবিজাবি ফুল? রাস্তার গাছে ফোটে, যত রকমের ময়লার ডিপো | এক্সুনি বাইরে ফেলে দিয়ে এস |

মা অনেক কষ্টে বাবাকে শান্ত করিয়ে, শেষ পর্যন্ত রফা করলেন রাতে আর ফুলগুলো ফেলা হবে না | তবে পরের দিন সকালে স্কুল যাওয়ার আগেই শম্পা সেগুলোকে পাড়ার ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসবে | রাগে-দু, একটা ডালায় নানা রঙের ফুল নিয়ে এক বুড়ি বসে আছে | শম্পা স্কুল থেকে বেরোনমাত্রই তার হাতে এক গোজা ফুল গুঁ্জে দিল | আঁ্তকে উঠে ঘুমটা ভেঙে গেল শম্পার্ | সেদিন দুধ্-রুটি খেয়ে, কারোর সন্গে কোনও কথা না বলে, এমনক্ি মাকে পর্যন্ত হাত না নেড়ে, গম্ভ্িরভাবে ফুলের গোছাটা হাতে নিয়ে রিকশায় গিয়ে উঠল শম্পা | তারপর কোনওরকমে চোখের জল চেপে পাড়ার ডাস্টবিনে ফুলগুলো ফেলে দিয়ে স্কুলে চলে গেল |

বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে | স্কুলে পরপর ইউনিট টেস্ট চলছে | তার তাড়ায় ফুলের কথা ভুলে গেছে শম্পা | বাবার ওপর রাগটা অবশ্য় বেশ কিছুদিন ছিল | বাবা সেটা বুঝতেও পেরেছিলেন বলে নানারকম তোতানো-পাতানো

হাফ্-ইয়ার্লি পর্িক্সা শেষ্ | পর্িক্সাও ভালই হয়েছে | শেষ দিন তাই বেশ ফুরফুরে মেজাজে বাড়ি ফিরছে শম্পা | কিন্তু স্কুলের গেট দিয়ে বেরোতেই চোখ আটকে গেল | গেটের কাছে ডালা নিয়ে বসে আছে এক খুনখুনে বুড়ি | ডালায় সাজানো গাঢ় কমলা রঙের গোছা গোছা ফুল্ | ঠিক যেমনটি সে সেদিন স্বপ্নে দেখেছিল | ক্ি একটা অদ্ভুত টানে পায়ে পায়ে বুড়ির কাছে গিয়ে দাঁ্ড়াল শম্পা | বুড়িও যেন তার জন্য়ই অপেক্সা করছিল | অমনি ফোকলা মুখে হেসে বলল, ফুল নিবি তো? তাজা ফুল্ | দাঁ্ড়া, ভাল দেখে একগোছা বেছে দিচ্ছি | কিন্তু ততক্সণে বাবার রাগ্ি মুখটা মনে পড়ে গেছে শম্পার্ | তাই তাড়াতাড়ি বলল, না না, নেব না | এমনি দেখতে এলাম একটু | ক্ি ফুল গো এগুলো, আগে কখনও দেখিনি তো |

বুড়ি কিন্তু শম্পার আপত্তিকে মোটেই পাত্তা না দিয়ে দিব্য়ি একগোছা তাজা ফুল বেছে নিয়ে সুতলি দিয়ে বাঁ্ধতে বাঁ্ধতে বলল, একডজনই দিলাম্ | দশটা টাকা দে |

রিকশাওয়ালা তাগাদা দিচ্ছে | শম্পা যেন ক্িরকম আর কিছু না ভেবেই স্কুলের ব্য়াগ থেকে দশটা টাকা বার করে বুড়ির হাতে দিয়ে দিল | আর বুড়িও ওমনি ফুলের গোছাটা তার হাতে দিয়ে ফের একগাল হেসে বলল, নিয়ে যা | এ হল গিয়ে স্বর্গের ফুল্ | মন ভালো করে দেয় |

ফুলের গোছাটা হাতে নিয়ে রিকশায় উঠল শম্পা | ভারি সুন্দর দেখতে ফুলগুলো | কচি সবুজ ডাঁ্টার ওপর উজ্জ্বল কমলা রঙের পাঁ্চটি পাপড়ি | ভিতরে আবার একটা বেগুনি রঙের সরু পাপড়ি | সোনালি হলুদ রঙের পরাগদন্ডের মাথায় ঝুরো ঝুরো পরাগ লেগে আছে | হালকা একটু মিষ্টি গন্ধও আছে ফুলটার্ |

কিন্তু ফুল নিয়ে বাড়ি ঢুকতেই মা বকাবাকি শুরু করল, কেন শুধু শুধু অশান্তি করিস্ | জানিস যখন তোর বাবা পছন্দ করে না | সারাদিন খেটেখুটে মানুষটা বাড়ি ফিরবে, তখন তাকে রাগিয়ে দেওয়া কি ভাল কথা? কোনও কিছুতে তো তোমাকে বারণ করা হয় না, একটা সামান্য় কথা শুনতে এত অসুবিধা ক্িসের বুঝি না |

ফুলগুলো কিনে ফেলে নিজেও একটু অপরাধ্ি হয়েছিল শম্পা | কিন্তু মায়ের এহেন বকাঝকা শুনে, হঠাৎ কেন জানি না তার মেজাজ বিগড়ে গিয়ে জেদ চড়ে গেল | মায়ের কথার কোনও উত্তর না দিয়ে ফুলদানিতে জল ভরে ফুলগুলো সাজিয়ে রেখে নিজের ঘরে চলে গেল | সেদিন সন্ধেয় বাবা বাড়ি ফেরার পরও খুবই অশান্তি হল বাড়িতে | কিন্তু এবার বাবার হাজার বকাঝকাতেও শম্পা কিছুতেই ফুলগুলো ফেলে দিতে রাজি হল না | শেষ পর্যন্ত অনেক কান্নাকাটির পর বাবার সন্গে রফা হল এই শর্তে যে এই ফুলগুলো যতদিন না শুকিয়ে যায় ফুলদানিতেই থাকবে, ফেলে দিতে হবে না | তবে এর বিনিময়ে শম্পাকে কথা দিতে হবে যে সে আর কোনওদিন বাড়িতে ফুল নিয়ে আসবে না | দাঁ্তে দাঁ্ত চেপে, চোয়াল শক্ত করে বাবার শর্তে রাজি হয়ে গেল শম্পা |

পর্িক্সা শেষ হয়েছিল বুধবার্ | সেদিনই ফুলগুলো নিয়ে এসেছিল শম্পা | শুক্রবার অফিসের কাজে বাবাকে বাইরে যেতে হল | মন্গলবার রাতের ফ্লাইটে বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকেই তাঁ্র চোখ পড়ল ফুলদানির ওপর্ | ঝকঝক করছে ফুলগুলো | প্রায় এক সপ্তাহ পরেও একইরকম তাজা | তুমি নিশ্চয়ই আগের ফুলগুলো ফেলে দিয়ে ঠিক একইরকম আর এক গোছা ফুল এনে রেখেছো?

বাবার কথা শুনে ভারি বিরক্ত হল শম্পা, মোটেই না | আমি এরকম কখনও করি না | কথার খেলাপ করা আমার স্বভাব নয় | হ্য়াঁ, ফুলদানির জলটা অবশ্য় এরমধ্য়ে দু

মেয়ের গম্ভ্ির উত্তর শুনে বাবা চুপ করে গেলেন্ | শম্পা যে মিথ্য়ে কথা বলে না সেটা তারও জানা | কিন্তু ব্য়াপারটা ক্ি? এক সপ্তাহ ধরে ফুলগুলো ক্ি করে একইরকম তাজা থাকল? তাহলে কি মেয়ের মন রাখতে শম্পার মা ফুলগুলো বদলে দিয়েছে? কথাবার্তার সময় তার মুখে ক্ি রকম একটা মুচকি হাসি দেখা যাচ্ছিল না?

শম্পার বাবা ঠিক করে ফেললেন রহস্য়ের সমাধান করতে হবে | সেদিন রাতে অন্য়রা ঘুমিয়ে পড়লে, তিনি চুপিচুপি উঠে, প্রতিটা ফুলের ডাঁ্টিতে মার্কার পেন দিয়ে খুব ছোট্ট একটা ফুটকি দিয়ে রাখলেন্ | ভাল করে লক্স্য় না করলে সেটা বোঝা যাবে না | কিন্তু ফুল যদি বদলানো হয় তিনি ঠিক সেটা ধরে ফেলতে পারবেন্ | আরও চার্-পাঁ্চদিন কেটে গেল | ফুলগুলো ঠিক একইরকম তাজা রয়েছে | ব্য়াপারটা শম্পার নিজেরও ভারি অদ্ভ্ুত লাগছে | আবার বাবা জব্দ হচ্ছে বুঝে বেশ মজাও লাগছে | আজকাল অফিস থেকে বাড়ি ফিরেও বাবা যে আগে ফুলদানিটা দেখে সেটা সে দিব্য়ি বুঝতেও পারে |

শম্পার বাবা সুন্িলবাবুর কাছে কিন্তু ব্য়াপারটা এখন আর মজার পর্যায়ে নেই | তার ক্িরকম যেন মনে হচ্ছে ফুলগুলো যেন তাঁ্কে জব্দ করার জন্য়ই ওরকম তাজা থাকছে | প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে ফুলদানিটার দিকে তাকালেই তাঁ্র মনে হয়, ঝকঝকে ফুলগুলো যেন তাঁ্কে ভেং্চি কাটছে | ইতিমধ্য়েই তিনি বেশ কয়েকবার চুপিচুপি পর্িক্সা করেও দেখেছেন্ | মার্কারের দাগ ঠিক একই জায়গায় আছে | তার মানে ফুলগুলো বদলানো হয়নি | কিন্তু প্রকৃতির কোনও নিয়মে এগুলো দিনের পর দিন এরকম তাজা থাকছে সে রহস্য়ের সমাধান হয়নি | সম্ভব হলে ফুলের গোছাটা তিনি টান মেরে কর্পোরেশনের ময়লার গাড়িতে ফেলে দিতেন্ | কিন্তু তাতে মেয়ের কাছে ছোট হয়ে যেতে হবে | তাই সে রাস্তায় হাঁ্টা যাচ্ছে না | আর সেই সুযোগ নিয়ে ফুলগুলো যেন দিনের পর দিন তাঁ্র সন্গে মস্করা করে যাচ্ছে | না, এরকমভাবে তো আর চলতে পারে না | সুন্িলবাবু ক্রমাগত মনে মনে ফুলগুলোকে শুকিয়ে ফেলার নানারকম মতলব ভেঁ্জে যাচ্ছেন্ | এরমধ্য়ে হঠাৎ একদিন সুযোগও জুটে গেল | সেদিন বেশ বৃষ্টি পড়ছে | শম্পার শর্িরটা ভাল নেই | তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়েছে | শম্পার মা ভিতরের ঘরে বসে টেলিফোনে বোনের সন্গে গল্প করছেন্ | বসার ঘরের সোফায় বসে একা একাই কাগজ পড়ছিলেন সুন্িলবাবু | পড়ার ফাঁ্কে ফাঁ্কে অবশ্য় মাঝেমাঝেই চোখ চলে যাচ্ছিল ফুলদানিটার দিকে | হঠাৎ তাঁ্র মাথায় একটা মতলব খেলে গেল | কিছুক্সণ আগেই তিনি দেখেছেন শম্পা শুতে যাওয়ার আগে ফুলদানিটার জলটা বদলে দিয়েছে | সুন্িলবাবু ঠিক করলেন ফুলদানির জলটা তিনি ফেলে দেবেন্ | কারণ শম্পা এখন অন্তত তিনদিন জল বদলাবে না | আর তিনদিন জল না পেলে যত শক্ত ফুলই হোক না কেন শুকিয়ে যাবেই | যেমন ভাব তেমনই কাজ্ | তক্সুনি উঠে চুপিচুপি বাথরুমের বেসিনে ফুলদানির জলটা ফেলে দিয়ে বেশ খুশিখুশি মনে শুতে গেলেন সুন্িলবাবু |

কিন্তু মাঝরাতে তাঁ্র ঘুম ভেঙে গেল | সুন্িলবাবু বুঝতে পারলেন তাঁ্র সাং্ঘাতিক জলতেষ্টা পেয়েছে | গলা-বুক সব শুকিয়ে কাঠ্ | বাইরে বৃষ্টি পড়ছে বেশ জোরে | বাড়ির আর সকলে গভ্ির ঘুমে | সুন্িলবাবু বিছানার পাশের টেবিলেই জলের বোতল আর গ্লাস রাখা থাকে | ঘুম চোখে তিনি টেবিল হাতড়ালেন্ | কিন্তু বোতল পাওয়া গেল না | ততক্সণে তাঁ্র ঘুম পুরোপুরি ভেঙে গেছে | উঠে বসে মাথার কাছে রাখা টর্চের আলো ফেললে টেবিলে | না, গ্লাস রয়েছে, কিন্তু জলের বোতলটা তো নেই | গেল কোথায় বোতলটা? এদিকে তেষ্টা এমন পেয়েছে যে মনে হচ্ছে গলা-বুক যেন ছিঁ্ড়ে যাচ্ছে | বাধ্য় হয়েই খাট থেকে নামলেন সুন্িলবাবু | স্লিপার পায়ে গলিয়ে এদিক্-ওদিক টর্চের আলো ফেলতে লাগলেন্ | কোথাও বোতল নেই | পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন বসার ঘরের দিকে | টেবিলের দিকে টর্চের আলো ফেলতেই দেখা গেল ফুলদানির ঠিক পাশেই রাখা রয়েছে জলের বোতল | এখানে ক্ি করে এল বোতলটা? ভারি অবাক হলেন সুন্িলবাবু | কিন্তু তখন আর ভাবার সময় নেই | তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে বোতলটা তুলে নিয়ে ঢাকনাটা খুলতে গেলেন্ | কিন্তু ঢাকনাটা এমনভাবে এঁ্টে বসেছে যে কিছুতেই খোলে না | প্লাস্টিকের জলের বোতলের ছিপি এমনভাবে এঁ্টে বসতে কখনও দেখেননি সুন্িলবাবু | প্রথমে হাত দিয়ে, তারপর জামার ঝুল দিয়ে প্রাণপণ চেপে ধরেও ছিপি খোলা গেল না | ততক্সণে কপালে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠেছে তাঁ্র্ | তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে | এইসময় হঠাৎ পাশের ফুলদানিটার দিকে চোখ পড়তেই ক্িরকম যেন গা শিরশির করে উঠল সুন্িলবাবুর্ | মনে হল ফুলগুলো যেন তাঁ্র দুর্গতিটা বেশ ভালভাবে উপভোগ করছে | সেই সন্গে আর একটা অদ্ভুত ভাবনাও তাঁ্কে যেন চেপে ধরল | সুন্িলবাবু ক্িরকম যেন একটা ঘোরের মধ্য়েই ফুলদানিটা তুলে নিয়ে বাথরুমে গিয়ে, সেটাতে জল ভরলেন্ | তারপর টেবিলের ওপর রেখে জলের বোতলটা তুলে নিলেন্ | হাত লাগাতেই আলগা ঢাকনাটা খুলে এল | ঢকঢক করে জল খেয়ে বোতলটা খাটের পাশের টেবিলে রেখে শুয়ে পড়লেন সুন্িলবাবু |

পরের দিন সকালবেলায় উঠে কিন্তু রাতের সব ঘটনাই কেমন যেন আজগুবি মনে হতে লাগল তাঁ্র্ | সত্য়িই কি আর জলের বোতলের ছিপি অমনভাবে এঁ্টে যেতে পারে নাকি?

আমি নিশ্চয়ই ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখেছি, ভাবলেন সুন্িলবাবু | তাঁ্র মনে হতে লাগল ফুলগুলো নিয়ে বড্ড বেশি ভাবছেন বলেই এইসব অদ্ভুত চিন্তা-ভাবনা তাঁ্র মাথায় আসছে | কিন্তু সেগুলো তাড়াতে হলে আগে তো ফুলগুলোকে বাড়ি থেকে তাড়াতে হয় | অথচ সেটা কিছুতেই করা যাচ্ছে না | সুন্িলবাবু বুঝতে পারছেন, ফুলের চিন্তাটা সারাক্সণ তাঁ্র মাথার মধ্য়ে ঢুকে থাকায় তিনি অফিসের কাজকর্মে ঠিকমত মন দিতে পারছেন না | এমন সব ভুলভ্রান্তি করে ফেলছেন যে অন্য়দের কাছে অপ্রস্তুতে পড়তে হচ্ছে | অথচ ব্য়াপারটার কোনও নিষ্পত্তিও করা যাচ্ছে না |

ইতিমধ্য়ে স্কুলের দু, একদিন ওখান থেকেই অফিস করবেন্ | কিন্তু হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যেতে সুন্িলবাবু জানিয়ে দিলেন যে তাঁ্র অফিসের বেশ কিছু জরুরি কাজ বাড়ি বসে করতে হবে, তাই তিনি যাবেন না | আসলে মনে মনে তিনি ঠিক করে ফেলেছেন শনিবার শম্পা আর তার মা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেই তিনি ফুলগুলো ফেলে দেবেন্ | চারদিন পর শম্পা যখন ফিরবে তখন বললেই হবে ফুলগুলো শুকিয়ে গেছিল, তাই ফেলে দিয়েছেন্ |

শনিবার সকাল থেকেই সুন্িলবাবু একটু উত্তেজিত | কতক্সণে সবাই বাড়ি থেকে বেরোবে | ততক্সণে তিনি ভেবে ফেলেছেন, ফুলগুলো একেবারে প্লাস্টিকের প্য়াকেটে ভরে রাস্তার মোড়ে ময়লার ডাব্বায় ফেলে আসবেন্ | শম্পা আর তার মায়ের বেরোতে বিকেল গড়িয়ে গেল | সন্ধের মুখে বড় রাস্তায় গিয়ে তাদের বাসে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরলেন সুন্িলবাবু | এইবার আসল কাজ্ | প্লাস্টিকের একটা প্য়াকেটে আগে থেকেই বার করে রেখেছিলেন্ | ফুলদানি থেকে ফুলগুলো তুলে নিতেই মনের মধ্য়ে কেমন যেন একটা প্রতিহিং্সার ভাব জেগে উঠল তাঁ্র্ | অনেকদিন ধরে বড্ড জ্বালিয়েছে ফুলগুলো | সুন্িলবাবুর তাই ইচ্ছে হল প্য়াকেটে ঢোকানোর আগে ফুলের ডাঁ্টিগুলো মুচড়ে ভেঙে দিতে | কিন্তু কথাটা ভাবামাত্রই ডাঁ্টিগুলো হঠাৎ কেমন যেন কিলবিল করে সুন্িলবাবুর আঙুলগুলোকে পাকে পাকে জড়িয়ে ধরল | চমকে উঠে হাত ঝেড়ে ফুলগুলোকে হাত থেকে ফেলে দিতে চাইলেন সুন্িলবাবু | কিন্তু কিছুতেই পারলেন না | বরং মনে হল, ডাঁ্টিগুলো যেন ক্রমশ তাঁ্র হাত বেয়ে উঠে গলা পেঁ্চিয়ে ধরছে | নি

জ্ঞান ফিরলে সুন্িলবাবু দেখলেন তিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন্ | হাতের কব্জিতে স্য়ালাইনের ছুঁ্চ্ | মাথার কাছে শম্পা আর তার মায়ের উদ্বিগ্ন মুখ্ | জানা গেল গত তিন দিন তিনি হাসপাতালেই ভর্তি আছেন্ | সেদিন শম্পারা বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্সণ পরে পাশের বাড়ির রন্টু শম্পার সন্গে খেলতে এসেছিল | বেশ কয়েকবার বেল বাজানোর পরেও কেউ সাড়া না দেওয়ায় সে জানলা দিয়ে উঁ্কি মেরে দেখে সুন্িলবাবু মেঝেতে পড়ে গোঁ গোঁ করছেন্ | রন্টু তক্সুনি বাড়ি গিয়ে নিজের মা-বাবাকে ডেকে আনে | দরজা ভেঙে সুন্িলবাবুকে বার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় | শম্পা আর তার মাকেও খবর দেওয়া হয় | এই কদিনে সুন্িলবাবুর শর্িরের অজস্র পর্িক্সা-নির্িক্সা হয়েছে, কিন্তু তিনি যে কেন হঠাৎ এরকম অসুস্থ হয়ে পড়লেন সেটা ডাক্তাররা নিশ্চিতভাবে কিছুই বলতে পারছেন না | তবে এটা তাঁ্রা বলেছেন, সেদিন কোনও কারণে সুন্িলবাবু হঠাৎ অতিরিক্ত ভয় পেয়েছিলেন কিং্বা উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন্ | তার থেকেই এরকম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে | শম্পা আর তার মা অবশ্য় ভয় কিং্বা উদ্বেগের কোনও কারণ খুঁ্জে পাননি | সবাই তাই অপেক্সা করছিলেন সুন্িলবাবুর জ্ঞান ফিরে আসার জন্য় | কিন্তু জ্ঞান ফিরে পেয়েও সুন্িলবাবু মনে করতে পারলেন না সেদিন সেরকম বিপজ্জনক কিছু ঘটেছিল বলে | তাঁ্র সন্গে কিছুক্সণ কথা বলে ডাক্তার অবশ্য় বললেন, এখন কিছু মনে নাও পড়তে পারে | জোর করে মনে করার চেষ্টারও দরকার নেই | শর্ির দুর্বল্ | তাই এখন বিশ্রাম নেওয়াই জরুরি | পরে যদি কিছু মনে হয়, তখন আলোচনা করলেই চলবে |

ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হয়ে গেছে | শম্পা আর তার মা বেরিয়ে গেছে | ফাঁ্কা ঘর্ | সুন্িলবাবু খুব মন দিয়ে চারপাশটা দেখছেন্ | কেন জানি না তাঁ্র মনে হচ্ছে একটা জরুরি কিছু তিনি মিস করে যাচ্ছেন্ | ঘরের কোণায় একটা সাদা টেবিলের ওপর একটা ছোট ফুলদানি | একগোছা লাল গোলাপ রাখা আছে তাতে | ফুলদানিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন সুন্িলবাবু | আস্তে আস্তে তাঁ্র মাথাটা পরিষ্কার হয়ে আসছে | সাদা পোশাক পরা একজন নার্স ঘরে ঢুকল | সুন্িলবাবু একভাবে ফুলদানিটার দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে তাড়াতাড়ি সেটা তুলে নিল | একটু আশ্চর্য হয়ে সুন্িলবাবু বলে উঠলেন, ক্ি হল ওটা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন্?

নার্স একটু অপ্রস্তুতভাবে বললেন, আসলে আপনার মেয়ে বলে গেছে ওটা সরিয়ে দিতে | আপনি নাকি ঘরের ভিতর ফুল রাখা একেবারেই পছন্দ করেন না |

ওটা যেখানে আছে থাক্ | আপনি বরং এ-পাশের জানলাটা একটু খুলে দিন্ | ঘরটা আমার কেমন যেন একটু দমচাপা লাগছে |

ওদিকটা কিন্তু আমাদের বাগান্ | আপনার আবার …

জানলাটা খুলে দিল নার্স্ | শেষ শ্রাবণের বিকেলের আলো তখনও মরে যায়নি | ভেজা বাতাসে ভর দিয়ে ভেসে এল একঝলক স্বর্ণচাপার সুগন্ধ | বুক ভরে শ্বাস নিয়ে সুন্িলবাবু বললেন, চিন্তা করবেন না, আমার অসুখ সেরে গেছে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.