বিদায় ব্যোমকেশ : এই সিনেমায় তো কাণ্ডজ্ঞানের লেশ মাত্র নেই!

‘বিদায় ব্যোমকেশ’ দেখে আমি হাঁ হয়ে গেছি প্রায়। এমনিতে তো ছবিতে গণ্ডা গণ্ডা ভুল আর অসঙ্গতির পাহাড়। কিন্তু সবচেয়ে যেটা চোখে পড়ল বেশি, সেটা হচ্ছে মিনিমাম কাণ্ডজ্ঞানের অভাব।

দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ছবিটা যাঁরা তৈরি করলেন, তাঁদের কারুর মিনিমাম রুচি বা সৌজন্যবোধটুকুও কি নেই?

ভুল-টুল নিয়ে পরে বলছি, আগে এই ব্যাপারটা বলে নিই আসুন।

গোয়েন্দাগল্পের রিভিউ লিখতে গিয়ে আসল অপরাধীর পরিচয় ফাঁস করে দিতে নেই, তাই সে লোকের নাম-পরিচয় লিখছি না কিছু আমি। শুধু এটুকু লিখছি, ছবির ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে দেখতে পাবেন, গল্পের আসল অপরাধী এক উভকামী পুরুষ। ‘উভকামী’ শব্দটার মানে জানেন তো? নারী আর পুরুষ, দুই লিঙ্গের সঙ্গে দেহ-মিলনে যার সমান আসক্তি।

এবং আচার-ব্যবহারে এই অপরাধীটি হচ্ছে একেবারে ‘এফেমিনেট’ অর্থাৎ নারীসুলভ এক পুরুষ।

এমন একজন মানুষকে সিনেমার মতো শক্তিশালী গণমাধ্যমে কোন আক্কেলে অপরাধী হিসেবে প্রোজেক্ট করা হল, জানি না আমি।

ট্রান্সজেন্ডার মানুষজনকে ‘খোরাক’বানিয়ে ফুর্তি লোটার ব্যাপারটা সিনেমায় একসময় খুব চালু ছিল ঠিকই। ‘শোলে’র (১৯৭৫) রাজ কিশোর থেকে ‘সড়ক’ (১৯৯১) ছবির সদাশিব অম্রপুরকর – কে নেই সেই লিস্টে। কিন্তু সে সব তো বহু বহু বছর আগের ব্যাপার। এখন তো হিন্দি ইন্ডাস্ট্রির মেনস্ট্রিম ছবিগুলোও পালটে গেছে আশিরনখ প্রায়।

যে মহেশ ভাট একসময় ট্রান্সজেন্ডারকে ভিলেন সাজিয়ে ‘সড়ক’ বানিয়েছিলেন, সেই তিনিই তার সাত বছরের মধ্যে ‘তমন্না’র (১৯৯৮) মতো ছবি বানিয়ে ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের মর্যাদা দিয়েছিলেন পুরো।

আর তার এতগুলো বছর পরেও বাংলা সিনেমা যে গাড্ডা, সেই গাড্ডাতেই পড়ে?

কুচক্রী অপরাধীর ভূমিকায় ছবিতে ‘এফেমিনেট’ রং-ঢং দেখাচ্ছিলেন যিনি, তাঁকে দেখে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, ২৭ বছর পরে ‘সড়ক’-এর মহারানিকে কাঁচা কাঁচা কপি করার বুদ্ধি আপনাকে কে জোগাল, ভায়া? একবারও মনে হল না আপনার যে, এইভাবে এমন মানুষদের ভিলেন সাজিয়ে দেখানটা আসলে কুৎসিত এক স্টিরিওটাইপের মত?

তখন সবে মাত্র ঋতুপর্ণ মারা গেছেন। ওঁকে কী রকম কুৎসিত ভাবে ব্যঙ্গ করে তৈরি হয়েছিল ‘অভিশপ্ত নাইটি’ (২০১৪), মনে পড়ছে তো? সে ছবির কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ সব কে লিখেছিলেন, জানেন কি? আর সেই ছবিতে ঋতুপর্ণর আদলে যে চরিত্রটি রাখা হয়েছিল, সেই ভূমিকায় অভিনয়ই বা কে করেছিলেন, মনে আছে কি আপনার?

অভিশপ্ত নাইটি ছবিতে ঋতুপর্ণ ঘোষের আদলে তৈরি চরিত্রে দেবালয় ভট্টাচার্য

খেয়াল করে দেখুন, সব প্রশ্নের উত্তরে একটা নামই বেরবে, দেবালয় ভট্টাচার্য। আর ঠিক ধরেছেন, এই ‘বিদায় ব্যোমকেশ’ ছবির গল্প, স্ক্রিপ্ট, সংলাপ সব সেই দেবালয় ভদ্রলোকেরই লেখা সঙ্গে এই ছবির পরিচালনাও ওঁর।

ঋতুপর্ণের চলে যাওয়ার ঠিক পরপর যিনি ওঁকে নিয়ে ওই গোত্রের চটুল রগড় করতে পারেন, নতুন একটা ব্যোমকেশের গল্প লিখতে বসে তিনি যে ঘুরে-ফিরে সেই নারীসুলভ পুরুষকেই কাঠগড়ায় ঠেসে ধরবেন, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে? শুধু কাঠগড়ায় তোলা নয়, ‘বিদায় ব্যোমকেশ’ ছবির শেষে দেখান হচ্ছে নারীসুলভ সেই পুরুষটিকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করে খুন করছে এই ছবির হিরো।

সাবাশ দেবালয়, সাবাশ। কী দুর্দান্ত ক্রেডিট নেওয়ার মতো সিন আপনি শুট করেছেন, ভাই।

একটা কথা আমায় বলুন শুধু, এফেমিনেট পুরুষদের ওপর আপনার রাগ এতটা কেন? হয় ছবি বানাতে গেলে তাঁদের নিয়ে উৎকট সব খিল্লি করার চেষ্টা করছেন চরম, আর না হলে ওঁদের ভিলেন বানিয়ে গুলি চালিয়ে মেরেই দিচ্ছেন সোজা!

অমুক টাইপের লোকজনকে ভিলেন সাজাবো, প্রি-সেট করা এরকম সব অ্যাজেন্ডা নিয়ে আপনি ছবি বানান নাকি?

নাকি এই ব্যাপারগুলো অটোম্যাটিকালি আসে? কিন্তু মুশকিল কোথায় হয় জানেন? এরকম হিডেন সব অ্যাজেন্ডা নিয়ে ছবি বানাতে গেলে, ছবি তৈরির সময় পুরো অ্যাটেনশন ওদিকেই শুধু থাকে। গল্পের বাকি আর কোথায় যে কী সব গলতি রইলো, সে সব ব্যাপারে নজর দেওয়ার জন্যে হাতে সময় থাকে না কোন।

এবার গল্পের সেই খামতিগুলোয় আসি, ছবি দেখার পর যেগুলো আমার কাছে ধাঁধার মতো লাগলো।

সিনেমার ট্রেলারটুকু দেখতে বসলে আপনি একটা সিন দেখতে পাবেন, যেখানে রক্তমাখা ছুরি হাতে একজন এসে পৌঁছচ্ছে থানায়। সঙ্গে ভয়েস ট্র্যাকে শুনতে পাবেন, ‘রিপোর্ট লিখুন, ডিসি অভিমন্যু বক্সী, সান অফ ব্যোমকেশ বক্সী’। সিনেমার একদম শুরুতে রয়েছে এই দৃশ্যটা। এই সিনটা দেখতে গিয়ে আপনি এটাও জানতে পারবেন যে, ঘটনাস্থল হচ্ছে নোনাপুকুর থানা, আর রাত তখন ১১টা। ব্যোমকেশ বক্সীর ছেলে অভিমন্যু বক্সী একটা খুন করে আত্মসমর্পণ করছে থানায়, এটাই হল সিন

টানটান একটা রহস্যের শুরু হল বলে ছবিটা দেখতে শুরু করেছি গুছিয়ে, কিন্তু ছবি যখন শেষ হচ্ছে, তখন আমার মাথা যে ঘুলিয়ে প্রায় লাট! কারণ তখনও অবধি তো এইটে কোথাও ক্লিয়ার হচ্ছে না যে, ফার্স্ট সিনে অভিমন্যু বক্সী (অভিনয়ে জয় সেনগুপ্ত) খুনটা করলেন কাকে। একবার বোধহয় এটা বলতে চাওয়া হল যে, উনি খুন-টুন কিছু করেন নি, রক্তমাখা ছুরিটা নেহাত সাজানো। যদি সেটাই হয়ে থাকে, তাহলেও তো এটা কোথাও স্পষ্ট হল না যে, দুই বছর ধরে বাড়ি থেকে বিশেষ একটা কারণে নিরুদ্দেশ থাকার পরে হঠাৎ করে ফেরার সময় এরকম রক্তমাখা ছুরি নিয়ে নাটক করার দরকারটাই বা পড়লো কেন তাঁর!

ঠাসবুনোট রহস্যকাহিনী লিখতে গেলে মাথা ঠাণ্ডা রেখে চুলচেরা যুক্তি সাজাতে হয়, সাহেব। হুড়মুড় করে কিছু একটা নামিয়ে দিলেই রহস্যকাহিনী হয়ে যায় না সেটা।

রাত ১১টার সময় এই কাণ্ড ঘটার পর ফোন করে ব্যোমকেশের (আবীর চট্টোপাধ্যায়) বাড়িতে পুরো ঘটনা জানাল ডিসি কৃষ্ণেন্দু মাল্য (অভিনয়ে রূপঙ্কর বাগচী)। অথচ কাণ্ড দেখুন, দু’বছর নিখোঁজ থাকার পর ঘরের ছেলের এমন একটা অতিনাটকীয় ফেরার খবর শুনেও কিনা ব্যোমকেশের বাড়ি থেকে রাতের বেলা কেউ এলো না থানায়! ছেলের বউকে সঙ্গে নিয়ে থানায় ব্যোমকেশ এসে পৌঁছল পরের দিন সকালে। যখন থানা ঘিরে হুটোপাটি শুরু করে দিয়েছে নিউজ মিডিয়ার লোক!

শরদিন্দুর লেখা ব্যোমকেশ কি এত লেট লতিফ ছিল?

থানায় এসে ছেলের হাতে ধরা সেই ছুরিটা দেখতে চাইল ব্যোমকেশ। এখন রাতের বেলা যে ছুরি থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়তে দেখেছি, এই সকালবেলায় সেই ছুরিতে রক্তের দাগ তো শুকিয়ে কালচে হওয়ার কথা! আর আইডিয়ালি তো ছুরিটা রাখা উচিৎ পলিথিনের বড় পাউচে ভরেযাতে ছুরিতে লেগে থাকা সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট না হয় কিছু।

ব্যোমকেশ পরীক্ষা করার সময় ছুরিতে রক্তের দাগ কতটা, দেখুন!

এখানে আপনি কী দেখবেন শুনুন। আপনি দেখতে পাবেন, ব্যোমকেশের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ঝকঝকে সেই ছুরি। ঝট করে দেখলে মনে হবে, কোথাও রক্তের দাগ-ফাগ কোন কিচ্ছু নেই! পরে ট্রেলার থেকে খুঁটিয়ে দেখলে দেখবেন যেটুকু আছে, সেটুকু খুব আবছা হওয়া দাগ। আর পলিথিনের পাউচ-ফাউচ থাকাটা তো বহু দূরের কথা! জাস্ট একটা তোয়ালে বা কাপড় দিয়ে ছুরির হাতলটা ধরে ছিল বোধহয় কেউ

আমি তো ঘাবড়ে গেলাম এটা দেখে যে, ব্যোমকেশের এটা দেখেও রিয়্যাকশন হল না আদৌ কিছু! একবারও জানতে চাইল না, খুনের অকাট্য প্রমাণ ছুরিটা থেকে যত্ন করে রক্তের দাগ ধুয়ে-মুছে কেউ সাফ করে দিল নাকি!

আমার মতো পাতি পাবলিকের মাথায় যে খটকা এল, সে প্রশ্নটা ধুরন্ধর সত্যান্বেষীর মনেই আসে না কেন?

কোন স্ট্যান্ডার্ডের সিনেমা এটা, সেটা আপনি এটার থেকেই বুঝুন

ভুল-চুক তো সবারই হয়, দাদা! যদি শুটিংয়ের সময় ছুরিতে রক্তের শুকনো দাগ ঠিকমতো লাগাতে ভুলেই গিয়ে থাকেন, পরে পোস্ট প্রোডাকশন করার সময় গ্রাফিক্সে তো সেটা অ্যাড করে দেওয়াই যেত, স্যর! নাকি তখনও সেটা মনে পড়ে নি কারুর?

আবীরকে যে টুকু চিনি, যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত ছেলে। শুটিং করার সময় ওরও কি ব্যাপারটা খেয়ালে আসে নি নাকি?

এরপর সিনেমায় আরও কী আছে, শুনুন। পাক্কা দুই বছর কোন পাত্তা ছিল না যে ছেলেটির, সেই ছেলে দুম করে ফিরে আসার পরে একজনও কেউ জানতে চায় না, যে তুমি এতদিন কোথায় ছিলে, বল?

বাবা বলুন, ছেলে বলুন, বৌ বলুন, সবার মুখে সব ধরণের প্রশ্ন আছে, কোথাও শুধু এই প্রশ্নটা নেই।

নিরুদ্দিষ্ট হওয়ার আগে ছেলেও নাকি থানার এক দাপুটে অফিসার ছিল। তা’ এতদিন নিখোঁজ হয়ে থাকার সময় থানা বা আর কোন জায়গা থেকে তাঁকে খোঁজার জন্য চেষ্টা করে নি কেন কেউ, এ ছবিতে সেটারও কিন্তু কোন হদিশ নেই!

এর মাঝখানে কাণ্ড দেখুন, দুম করে শুরু হয়ে গেল মন্থর আর প্রেম-প্রেম মুডের অদ্ভুত প্রায় ঘুমপাড়ানি গান! তার লাইনগুলো হচ্ছে এরকম, ‘দিবস রজনী / তোমাতে সজনী / বাড়িঘর মাখামাখি / ব্যাকুল বাসরে / যে আলো দুঃখ / সে আলোতে আমি থাকি’। এখন গোয়েন্দা কিংবা থ্রিলার মার্কা স্টোরিতে এরকম গান মানায় কিনা, সেটা আপনি বলুন ভাই!

গানটাকে ছবিতে মাঝে মাঝেই ফেরত আসতে দেখবেন আপনি। থ্রিলার সিনেমা এডিট করার এই প্যাটার্নটা কার মগজ থেকে বেরিয়েছে, একেক সময় সেটা জানার ইচ্ছে হচ্ছিল খুব।

এটার সঙ্গে আরেকটা ব্যাপার দেখবেন, ছবির শুরু থেকে শেষ অবধি দাদু ব্যোমকেশ থেকে শুরু করে নাতি সাত্যকি (এই ভূমিকাতেও আবীর) অবধি, সবাই অনর্গল ধোঁয়া ফুঁকে যাচ্ছে গলগল করে। একটা ব্যাপার দেখে ভাল লাগলো যে এই সুন্দর ব্যাপারটিতে কোন জেন্ডার ডিসক্রিমেশন নেই, ফুকফুক করে ধোঁয়া ছেড়েছে সাত্যকির গার্লফ্রেন্ড অবন্তিকাও (অভিনয়ে সোহিনী সরকার)।

একদিকে যখন খবরে শুনছি যে, আজ বাদে কাল ক্যানসার-আক্রান্ত রোগীর লিস্টে জগৎসভায় ভারতবর্ষ শ্রেষ্ঠ আসন লভে, তখন সিনেমার শুরু থেকে শেষ অবধি এরকম অনর্গল ধোঁয়াবাজি দিয়ে মুড়ে দেওয়ার মহা-অবদান রাখার জন্যে আরও একবার নির্মাতাদের সেলাম।

আর একটা চরম মজার রগড় বলছি, শুনুন। দাদু আর নাতি, দুটো রোলেই আবীর রয়েছে, সেটা নিয়ে আমার বলার নেই কিছু। কারণ দাদু আর নাতিকে একরকম তো দেখতে হতেই পারে। কিন্তু এটা কিছুতেই বুঝে উঠলাম না যে, কোন আক্কেলে সাত্যকির হবু-বৌ অবন্তিকা আর ওর ঠাকুমা সত্যবতী – এই দুটো রোলই এক মানুষে করলো!

ঠাকুমার সঙ্গে নাতবৌকে এক দেখতে করার লজিকটা কী, দেবালয়? আর গল্পে যদি এটা রাখবেনই তো, কারুর মুখে অদ্ভুত এই মুখের সাদৃশ্য নিয়ে কোথাও কোন ডায়ালগ রাখলেন না কেন? সাত্যকির গার্লফ্রেন্ডকে দেখে ব্যোমকেশ এটা কখনও বলে না কেন যে, জানো, তোমাকে একেবারে সত্যবতীর মতো দেখতে?

সেটা কি সাত্যকির নিজের মনেও স্ট্রাইক করে না কখনও? বাড়িতে তো সত্যবতীর যুবতী বয়সের ফটো ঝোলানো রয়েছে দেখি!

আসলে ক্যারেকটারগুলোর মনের এত ভেতরে ঢুকে কে আর আজকালকার দিনে স্ক্রিপ্ট লিখবে, বলুন?

ছবির যখন মাঝবরাবর পৌঁছবেন, তখন বুঝতে পারবেন ঘটনাগুলো সব কেমন যেন ছানা কেটে যাচ্ছে দ্রুত। তাই একদিকে যখন খুনের রহস্য জমাট হয়ে জমছে, তখন বান্ধবীকে নিয়ে ছাদে উঠে পাশের বাড়ির বন্ধ কপাটে ঢিল মারছে ব্যোমকেশের নাতি! সঙ্গে আবার কাট করে করে দ্যাখান হচ্ছে চ্যাপলিনের ‘দ্য কিড’ ছবির সিন।

শুধু তালজ্ঞান নয়, একেক বার মনে হচ্ছিল, ডিরেক্টরের সময়জ্ঞানও নেই!

না হলে সাতসকালে নোনাপুকুর ডাম্প ইয়ার্ডে খুন হবে ভাড়াটে খুনি কার্তিক, আর সেদিনই একটু বেলার দিকে সেই কার্তিকের লাশ উদ্ধার করার সময় সেই লাশের পচা গন্ধে বমি করতে হবে সাত্যকিকে? একটা লাশ কতক্ষণ ফেলে রাখলে তবে এরকম গন্ধ ছাড়তে পারে, গোয়েন্দা সিনেমা বানানোর আগে সেটুকু খোঁজ করে দ্যাখার সময় হল না নাকি?

ছবির যখন ইন্টারভ্যাল হচ্ছে, পাশ থেকে শুনি একজন বলছে, উঃ মাইরি শুধু কথার পরে কথা বলে চলেছে রে। সিনেমায় কোন ঘটনা-টটনা নেই?

ভদ্রলোকের দোষ কী বলুন? ট্রেলার দেখে ভেবেছিলেন হয়তো বেশ টানটান গা ছমছমে থ্রিলিং একটা কিছু হবে। আর তারপর হল-এ ঢুকে তাঁকে কিনা শুনতে হচ্ছে, শুধু কথার পরে কথা!

কেমন সেটা? ব্যোমকেশের এই ডায়ালগ শুনুন তাহলে, ‘একজন সত্যান্বেষী শেষ গল্প অসমাপ্ত রেখে চলে যেতে পারে। কিন্তু আমি তো একজন পিতা। আমি কী করে চলে যাই বল?’ এই ডায়ালগের চোটে যখন মাথার মধ্যে ঝিম ধরে যাওয়ার অবস্থা, তখন আবার আপনি শুনতে পাবেন নাতি সাত্যকির এই ডায়ালগ যে, ওর দাদু ব্যোমকেশ যে মোবাইল ফোন ইউজ করে না, সেটা নাকি আসলে দাদুর স্পার্ম কাউন্ট কমে যাবে বলে!

সংলাপ লেখার কী অসাধারণ রচনা শক্তি, মানতে হবে ভাই!

প্রেমিকার দিকে বিনা কারণে পিস্তল তাক করে ব্যোমকেশের নাতি…

কথার পরে কথার এই ধাক্কা সামলে উঠতে পারলে, তারপর না হয় মন দেবেন স্ক্রিনে। একটা দৃশ্যে ছবিতে দেখবেন, পার্সোনাল লাইফের শকিং একটা খবর শুনে বলা-কওয়া নেই, ঝট করে বান্ধবী অবন্তিকার দিকে পিস্তল তাগ করছে সাত্যকি। আমি তো সিনটা দেখে হাঁ। আবেগের এ কী রকম বহিঃপ্রকাশ দাদা? রহস্যভেদ করতে নেমে গার্লফ্রেন্ডকে বন্দুক দেখায়, এ কী রকম হিরো?

ছবির এক জায়গায় আপনি জানতে পারবেন, ছবির অন্যতম কালপ্রিট নাকি ওই অবন্তিকার বাবা অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী (অভিনয়ে অরিন্দম শীল)। রাতের বেলা তার পিস্তল থেকেই নাকি গুলি ছোঁড়াছুড়ি হয়এই নিয়ে বাপ-মেয়েতে একদফা ঝগড়া চলার সিন, পেমিক-পেমিকা মান-অভিমান সিন, সব আছে এইখানেতারপর ঝুপ করে দেখবেন, এই ট্র্যাকটা আবার যেন হাওয়া হয়ে গেল কোথায়! একদম লাস্ট সিনে সব রহস্য ভেদ হয়ে যাওয়ার পর অবন্তিকা তো এটা আর জিজ্ঞেস না করে পারেও না যে, তাহলে আমার বাবার কেসটা কী দাঁড়াল?

তার উত্তরে সাত্যকি অস্ফুটে যে কী বলল, সেটা আর বুঝতে পারি নি আমি।

মজাটা হল, এই সিনেমার এক ডায়ালগে এটাও আবার শোনানো হবে, যে বছর বছর ব্যোমকেশের সিনেমা তৈরি হয়ে চলেছে নাকি এখানেতো এরকম সব ডায়ালগ আছে যেখানে, সেখানে ইচ্ছে হলে অরিন্দম শীলের মতো লোককে দিয়ে আধাখ্যাঁচড়া রোল না করিয়ে আরও কত ইন্টারেস্টিং ভাবে ইউজ করা যেত, ভাবুন

সিনেমায় বার কয়েক আপনি দেখবেন মহাভারতের মহাপ্রস্থানিক পর্বের একটা রেফারেন্স টানা হয়েছে। বলা হচ্ছে, পাণ্ডবদের পথ দেখিয়ে নাকি একটি সারমেয় স্বর্গে নিয়ে গিয়েছিল, কী সেই সারমেয়টির নাম, ইত্যাদি ইত্যাদি সব কথা! ইচ্ছে হচ্ছিল, চেঁচিয়ে বলি, আরে দাদা, এসব কথা লেখার আগে মিনিমাম একটু লেখাপড়া করে নেন না আপনারা? পাণ্ডবদের পথ দেখিয়ে স্বর্গে নিয়ে গেছিল একটা কুকুর? নাকি উলটে কুকুরটা পিছু পিছু গেছিল ওদের? রাজশেখর বসুর মহাভারত উলটে দেখছি স্পষ্ট লেখা, ‘পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী উপবাস ক’রে পূর্ব দিকে চললেন, একটি কুকুর তাঁদের পিছনে যেতে লাগল’ (পৃষ্ঠা ৬৭৮)আর এই কুকুরের যে আলাদা একটা নাম ছিল, এই ইনফর্মেশনটাই বা আপনি কোত্থেকে পেলেন ভাই দেবালয়?

গুলিয়ে গেছে উত্তরসূরি আর উওরসূরি বানান!

মহাভারত তো দূরের কথা। বাংলা বানান নিয়ে ছবির নির্মাতাদের জ্ঞানের বহর পেতে হলে ফেসবুকটা খুলুন একটু প্লিজ। দেখতে পাবেন ‘উত্তরসূরি’ শব্দটা লিখতে গিয়ে সগৌরবে তাঁরা লিখে রেখেছেন ‘উওরসূরি’ বলে! এবং এই লেখাটা যে ভুল হয়েছে, সেটা নিয়ে সেখানে কোন বোধের নজিরও নেই!

একই সিনে বৃদ্ধ আবীরের মুখোমুখি অভিনয় করছেন তরুণ আবীর, ছবির এই সিনগুলো দেখতে সত্যি মজা লাগছিল খুব। প্রস্থেটিক মেক-আপ নেওয়ার জন্যে যে পরিশ্রম আবীরকে করতে শুনেছি, তার জন্যে আলাদা করে ওঁর জন্যে প্রণাম। কিন্তু এটা আমি বুঝতে পারি নি যে, শুধু এটুকু ছাড়া বাকি ছবিটায় আর কি কিছু দ্যাখার মতো আছে?

তবে হ্যাঁ। ছবিটাকে আপনি বলতে পারেন, এই চলতি সময়ের প্রতীক। যে, আমাদের বুদ্ধি-শুদ্ধি, কর্মক্ষমতা সব কোথায় চলেছে দ্রুত। যে, কাল্ট একটা ক্যারেকটার নিয়ে গল্প লেখার সুযোগ পেলে সগৌরবে আমরা এখন কীভাবে ছড়াতে পারি!

সন্দীপ রায় আর পরমব্রতের হাতে পড়ে ফেলুদার যে কী অবস্থা, সেটা তো সবার জানা। এবার ব্যোমকেশকে নিয়ে এই ছবিটা যেন বক্সীবাবুর পুরো ফ্যামিলির তেরোটা বাজিয়ে সেই কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার মতো হল!

আর হ্যাঁ, পুরো ফ্যামিলির কথাটা কেন বলছি, সেটা গোপনই বরং থাক। লেখার শুরুতেই বলেছি না যে, রহস্যের আসল পর্দা এই লেখাতে ফাঁস করবো না আমি।

ওটা জানতে হলে আপনি বরং সিনেমা হল-এই যান!

 

3 COMMENTS

  1. I have stopped watching Current bengali movies completely . these are now heap of rubbishes being made in Tollygunge .

    In Mumbai hardly any of them get a release .. still even if from You tube – I prefer to not watch them , no script , zero acting – screen presence capacity , last i watched – Zulfikar .. it was suppose to be a classy Shakespeare adoption , which turned out to be a nonsence cheap comedy with so bad acting ..

    Its better they dont get release here , so that our Gujrati or Marathi friends dont make fun of our so called downfall of rich bengali culture

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.