মহানায়কের নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলেন ছবি বিশ্বাসের ‘ভাল্লুক মাস্টার’!?

 সেসময়ে আজকের মতো কোরিওগ্রাফারদের একটুও রমরমা নেই। হিন্দি ছবির কোরিওগ্রাফাররা তবু টুকুন কদর পেতেন। বাংলা ছবির জগত তো পুঁছতই না সেভাবে। তারই মধ্যে বিশেষ জায়গা ছিল তখনকার রুপোলি পর্দার ‘ডান্স মাস্টার’ বব দাসের। ছবি বিশ্বাস, উত্তমকুমার, পাহাড়ি সান্যাল, সুপ্রিয়া দেবী হয়ে শতাব্দী রায় তো তাঁর শিষ্য ছিলেনই, শ্যামল মিত্র, অজয় কর, অসিত সেনের মতো পরিচালকরাও তাঁর কাছে নাচের স্টেপ শিখেছেন।

একবার, সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বলেই কি এই পেশায় সাবলীল ছিলেন? কারণ, তখনকার দিনে অ-ভারতীয়রাই সাধারণত এই কাজে বেশি দক্ষ হতেন। বয়সের ভাড়ে ন্যুব্জ না হলেও ‘বব’ তখন প্রৌঢ়। নিজের নামের মাহাত্ম্য নিয়ে বলতে গিয়ে হেসে ফেলেছিলেন সেদিন, ‘ কেউ জানে না, আমার আসল নাম ভবানীপ্রসাদ। ছোটবেলায় আমি ফুটবল, জিমন্যাস্টিক, ট্রাপিজে ছিলাম এক নম্বর। পড়তাম সাউথ সুবার্বন স্কুলে। ফুটবলে ইন্টার স্কুল টুর্নামেন্ট জিতে লিম্বার্স শিল্ডও জিতেছি। ফুটবল খেলতে খেলতেই শুরু করি বক্সিং শেখা। বক্সিং-এ বেঙ্গল ইন্ডিয়ার হয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। ওই সময় থেকেই আমি মানুষ হয়েছি চার্চের এক ফাদারের কাছে। উনি আমায় আদর করে ‘বব’ বলে ডাকতেন। ওঁর প্রভাবে ধর্ম পরিবর্তন না করলেও নামটা আমার বদলে গেছিল।’

চার্চের এই ফাদার ববের এতটাই কাছের মানুষ ছিলেন যে শুধু তাঁর কথায় বারেবারে এক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় গেছেন। সেখানেও অনেক মজার গল্প আছে, ‘ফাদার চেয়েছিলেন আমি বক্সিং ছেড়ে কোনও ফাইন আর্টস শিখি। যেমন কোনও ইনস্ট্রুমেন্ট বা ডান্স। ফাদারোর আগ্রহেই প্রথমে ভর্তি হলাম ভায়োলিন ক্লাসে। আমার বেসুরো প্যাঁ-পোঁ শুনে পাড়ার অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছেলেরা খুব হাসত। মুখ ভেঙাত। ব্যাপারটা দিনের পর দিন হতে থাকায় খুব প্রেস্টিজে লাগল। বেহালা ছেড়ে ভর্তি হলাম পিয়ানো ক্লাসে। পিয়ানো টিচার ক্যাসানোভা ছিলেন ভীষণ কড়া। বাজনায় একচুল এদিক-ওদিক হলে বেত দিয়ে পেটাতেন। মারের ভয়ে ওটাও ছেড়ে দিলাম। শেষমেশ নাচ। ওয়েস্টার্ন। তখন আমি ২১ বছর বোধহয়।’

ওই বয়সেই একটা মারাত্মক কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন বব। ঘুঁষি মেরে মহানায়কের নাক-মুখ ফাটিয়ে দিয়েছিলেন! ‘জানেন, একবার উত্তমকুমারের নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলাম এক ঘুঁষিতে। তখনও তিনি মহানায়ক নন। গিরীশ মুখার্জি রোডের লুনার ক্লাবের এক রোগাপটকা প্যাংলা ছেলে। আমার কাছে আসতেন বক্সিং শিখতে। ছ’মাস লেখার পর হঠাৎ একদিন মনে হল, দেখি তো, শিষ্য বক্সিংয়ে কতটা পোক্ত হয়েছে? পরীক্ষা নেব বলেই ওকে ডাকলাম। হাতে গ্লাভস পড়ে বললাম, লড়ো দেখি আমার সঙ্গে। তখনই ওঁকে এক ঘুঁষিতে কাত করেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে নাক-মুখ ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড। ভয়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা। দৌড়ে গিয়ে বরফ এনে নাকে-মুখে ঘষতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ বরফ মাসাজের পর উত্তম স্বাভাবিক হলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বেশ কিছু বছর পর আমার এক বন্ধু এসে বলল, তোকে উত্তমকুমার ডেকেছেন। দেখা করতে গেলাম মহানায়কের নিউ আলিপুরের বাড়িতে। নীচে বসে অপেক্ষা করছি। এমন সময় সিঁড়ি দিয়ে উত্তম নামতে নামতে বললেন, কি আমায় চিনতে পারছেন? আমি গদগদ হয়ে বললাম, আপনাকে কে না চেনে! উত্তর এল, ধুর মশাই। মনে নেই, সেই ছেলেবেলায় এক ঘুঁষিতে আমার নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলেন! লজ্জায় আমার তখন ধরণী দ্বিধা হও অবস্থা।’

কোরিওগ্রাফির পাশাপাশি দু’একটি ছবিতে অভিনয়ও করেছিলেন বব। যেমন, প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের ‘পাড়ি’। ‘সেখানে আমি দিলীপকুমারের অ্যাসিস্টেন্ট জেনারেল। মেকআপ রুমে বসে মেকআপ নিচ্ছি, ছবি বিশ্বাস এলেন। এসেই হাঁক দিলেন, দেখি দেখি, আমাদের ভাল্লুক মাস্টারকে কেমন লাগছে? শুনে বাকিরা হতবাক। আমার বিড়ম্বনার একশেষ। সবাই জানতে চাইলেন ব্যাপারটা কী? বাধ্য হয়ে ফাঁস করলাম আসল ঘটনা। মাদ্রাজের বিখ্যাত এভিএম তখন ডাবল ভার্সনে প্রযোজনা করেছিল ‘আকাশপাতাল।’ টলি-বলি দু’জায়গাতেই শুটিং হচ্ছিল। মাদ্রাজে রিহার্সালের সময় এক রাতে ড্রিঙ্ক করে এলেন ছবি বিশ্বাস। পাহাড়ি সান্যাল মনযোগ দিয়ে নাচ প্র্যাকটিশ করছেন। ওঁকে দেখে বললেন, কই গো তোমাদের নাচের মাস্টার কই? পাহাড়িদা আমায় দেখিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য উড়ে এল, ডান্স মাস্টারের হাইট মাত্র পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি! এ তো দেখি গ্লোবিউল মাস্টার হে! ওঁকে দেখে মনে হচ্ছে শীতের রাতে মহুয়া খেয়ে ভাল্লুকরা যেমন গুটিগুটি পায়ে নাচে, তেমনি তোর সঙ্গে ওয়ালজ নাচছে। তুই কি ওর কাছে ভাল্লুক নাচ শিখছিস?’ ব্যস, -তারপর থেকেই আমি ছবিদা’র ‘ভাল্লুক মাস্টার’। দেখতে পেলেই গলা ছেড়ে সবার সামনে হেঁকে বলতেন, ভাল্লুক মাস্টার আ গ্যয়া!’

ঋণ স্বীকার: আশিসতরু মুখোপাধ্যায়, ‘তারাদের কথা’

  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here