মায়া, মোহ, সেক্স আর সম্মোহন : এককথায় সিনেমা

মোটামুটি বছর ছয়েক আগেকার কথা | দশটা চমৎকার ছোটগল্পে সাজানো বলিউডি ছবি ‘দশ কাহানিয়া'(২০০৭) রিলিজ করেছিল ভারতজুড়ে | চায় জন পরিচালকের (সঞ্জয় গুপ্তা, অপূর্ব লাখিয়া, মেঘনা গুলজার, রণিত রায়, হনসল মেহতা, জসমিত ডোডি) সম্মিলিত অবদান সেই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন কারা, জানেন তো? সঞ্জয় দত্ত, সুনীল শেঠি, নানা পাটেকর, অনুপম খের, নাসিরুদ্দিন শাহ, মনোজ বাজপেয়ীর মতো তারকারা এবং আরো অনেকে | ঘটনাচক্রে সেই সময় আমি ছিলাম হায়দ্রাবাদে আর দিব্বি মনে আছে, যে শুক্রবার ছবিটা রিলিজ করল, সেই দিনই নাইট শোয়ে ছবিটা দেখতে গিয়ে দেখতে পেলাম গোটা হলে আমি ছাড়া হাজির আর মোটে জনা পাঁচেক দর্শক | এরপর এটা লেখা বাহুল্য বোধ হয়, যে মোটে একদিন চালানোর পরই সে ছবি পাল্টে একটা বাজার চলতি সুপারহিট লাগিয়ে দেন সেই হল-মালিক, আর আমিও খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, সারাভারতের বক্স অফিসেই চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দশ-দশটা ছোটগল্পের সেই অনবদ্য নির্মাণ | জনপ্রিয় হিন্দি ছবির আম-দর্শক, যাঁরা এতগুলো বছর ধরে আড়াই ঘন্টায় একটা মাত্র গল্প দেখেই অভ্যস্ত, তাঁদের হঠাৎ এতগুলো ছোটগল্পের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়াটা একটা চ্যালেঞ্জ তো বটেই | আর বক্স অফিসও যে ছোটগল্পের এই চ্যালেঞ্জটা এক্ষুনি হজম করতে রাজি নয়, সেটা তো বোঝাই গেছিল রামগোপাল ভার্মার কারখানা থেকে উৎপন্ন ‘ডরনা মানা হ্যায়'(২০০৩) আর ‘ডরনা জরুরি হ্যায়'(২০০৬)-এর বক্স অফিস রিপোর্ট থেকেই | হাফ ডজন প্রেমের গল্পের সংকলন ‘সালাম-এ-ইশক'(২০০৭), চার-চারটে ঝাঁঝানো-ঝাল যোনতার ছোটগল্প ‘মির্চ'(২০১০), তিন যুগের তিন ডেভিডের গল্প ‘ডেভিড'(২০১৩), সবকটা ছিল দুর্বিষহ ফ্লপ | তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল ‘মুম্বাই কাটিং’ ছবিটার ক্ষেত্রে | মুম্বাই শহরটাকে নিয়ে এগারোটা দুর্দান্ত ছোটগল্পের সংকলনটি পরিচালনাও করেন এগারজন নামী-দামি পরিচালক, তাঁদের মধ্যে ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ থেকে শুরু করে অনুরাগ কাশ্যপ অব্দি, কে না! ২০০৮-এ তৈরি এই ছবি খানকয়েক আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দেখান হল বটে, কিন্তু বাণিজ্যিক ভাবে আর রিলিজই করল না কোনওদিন |

সুতরাং কোন বিপজ্জনক পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে প্রযোজক আশি দুয়া এই ছোতগল্প-সিনেমা ” বানানোর ঝুঁকিটা নিয়েছেন, বুঝতেই পারছেন | এবং সত্যি কথা বলতে কি, বক্স অফিসের লাভ-ক্ষতিকে বোধহয় একটুও তোয়াক্কা না করেই এই ছবিটার নির্মাণ | পাল্টে যাওয়া গ্লোবাল-ভারতে শেষ অব্দি এই ৬ কোটি টাকার ছবিটা মাল্টিপ্লেক্স চেনে হিট করে যাবে কিনা, জানি না | শুধু বলতে পারি, ভাগ্যিস প্রযোজকমশাই দমদার ওই সাহসটা দেখিয়েছিলেন, আর তাই বোম্বে সিনেমার শতবর্ষে পৌঁছে ভারত পেল এমন এক জবরদস্ত সিনেমা-সেলিব্রেশন |

সেলিব্রেশন বলে সেলিব্রেশন! আম-ভারবাসীকে শয়নে-স্বপনে-জাগরণে কীভাবে আষ্টে-পৃষ্টে বেঁধে রেখেছে হিন্দি সিনেমার মায়াজাল, সেই গল্পই বলতে বসেছেন চার রকমের চার পরিচালক | করণ জোহর, দিবাকর ব্যানার্জ্জী, জোয়া আখতার আর অনুরাগ কাশ্যপ | কম্বিনেশনটা দেখে একটু ঢোঁক গিললেন নাকি? বাকি তিনটে নাম তবু বোঝা গেল, কিন্তু তাই বলে করণ জোহরের মতো পরিচালকও এই সারিতে রয়েছেন? অবিশ্যি নয়ই বা কেন? ‘কভি খুশি কভি গম’ (২০০১) বা ‘কভি আলবিদা না কহে না’ (২০০৬) মার্কা বাজারি মশলা-মাখানো ছবির পাশাপাশি এই করণ জোহর-ই তো বানিয়েছিলেন ‘মাই নেম ইজ খান’ (২০১০)-এর মতো সেনসিটিভ সিনেমা, সেটা কি ভোলা যায়? বক্স অফিসের চোখ রাঙানি না থাকায় এখানে অনেকটাই যেন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন সেই করণ | আর তাই এখানে ওঁর আর পাঁচটা চাবির মতো, সমকামীদের নিয়ে লঘু পরিহাস না করে সটান বরং ঢুকে গেছেন এক দম্পতির শোয়ার ঘরে, যেখানে নারীটির (রানি মুখার্জী) শরীরে সেক্স করতে চড়ে বসেছে পুরুষটি (রনদীপ হুদা), কিন্তু তবু মেয়েটি বরফের মতো শীতল, কারণ আজই যে সে তার এক পুরুষ সহকর্মীর কাছ থেকে জানতে পেরেছে, তার স্বামী আসলে চরিত্রে উভকামী | নারী মাংস আর পুরুষ মাংস, দুটোই তার কাছে সমান উপাদেয় | এরপরেও কি আর একই ভাবে মেয়েটির শরীর জেগে উঠতে পারে স্বামীর আদরে-ঘর্ষণে? গলায় মঙ্গলসূত্র আর শরীরে কামসূত্র বিফলা হয়ে যায় তাই | আর এই ভেঙে যাওয়া দাম্পত্যের মধ্যেই করণ এবার বুনে দেন রেলওয়ে ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে থাকা ভিখারিণী-বালিকার সিনেমা-গান : ‘আজিব দাস্তান হ্যায় ইয়ে’ (সিনেমা ‘দিল আপনা আউর প্রীত পরায়ে’) আর ‘লাগ যা গলে'(সিনেমা ‘উয়ো কৌন থি?’) | যে করণ জোহর তাঁর প্রথম ছবিতেই (‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’,১৯৯৮) সারা ভারতবাসীকে শিখিয়েছিলেন যে নাতনিও তার ঠাকুমাকে মিষ্টি হেসে ‘সেক্সি’ বলে ডাকতে পারে, সেই করণ এই ছবিতে বললেন সমকামিতার চোরাস্রোতে টাল-মাটাল পুরুষ-নারী সম্পর্কের ভাঙন-কাহিনি আর পুরুষ-পুরুষ সম্পর্কের নিভৃত অপশনের কথা | ১৫ বছরে এই এক্সট্রা সাহসটুকু তো আসবেই, বলুন?

এ ছবির চরটে গল্পের কোনোটারই কোনও আলাদা নাম দেখতে পাই নি, প্রতিটা আলাদা গল্প শুরু হচ্ছে ফ্রেমের এককোণে শুধু পরিচালকের নাম দেখিয়ে | করণ জোহরের গল্প দিয়ে ছবির শুরু, আর পরের গল্পের মূল উৎস সত্যজিৎ রায়ের লেখা ছোটগল্প – ‘পটলবাবু ফিল্মস্টার’ | গোটাকেয়েক পাতার ছোটগল্পটা থেকে ইতিমধ্যেই যে একটা মঞ্চসফল নাটক নির্মাণ করেছিলেন প্রয়াত রমাপ্রসাদ বণিক, সেটা এ ছবির পরিচালক দিবাকর ব্যানার্জ্জী আদৌ জানেন কিনা, জানি না | কিন্তু এটা বোঝা গেল, গল্পটা থেকে ছবি করতে গিয়ে গোটা কাহিনির এক অবাক করা পুনর্বিন্যাস করেছেন তিনি | মূল গল্পের পটলবাবু এখানে পুরন্দর ( নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকি) আর তার বাড়িতে তার বৌ-মেয়ের সঙ্গে রয়েছে এক এমু পাখিও! সেই এমু পাখির ডিম বেচে বড়লোক হবে, এই আশায় তাকে পুষেছিল পুরন্দর, কিন্তু শেষ অব্দি সেই এমু ডিম পাড়ে নি একখানাও | কাজের খোঁজে ক্লান্ত পুরন্দর একদিন হঠাৎ রাস্তায় শুটিং দেখতে গিয়ে পেয়ে গেল একটা ছবির একটা দৃশ্যে এক অকিঞ্চিতকর এক্সট্রা অভিনেতার পার্ট | এত ছোট কাজ করতে গিয়ে কি তার সম্মানে লাগা উচিৎ? তার কি ফিরিয়ে দেওয়া উচিৎ এই অতি তুচ্ছ-অভিনয়ের অফারটা? সেরকমটাই যখন প্রায় ঠিক করে ফেলেছে সে, সেই সময় এক জাদু-বাস্তব ঘটনা ঘটল হঠাৎ | শুটিং স্পটেই সে দেখতে পেল তার প্রয়াত নাট্যকর্মী বাবা (সদাশিব অম্রপুরকর) আর সেই এমু পাখিটাকে | তারপর কী হল, সেটা বরং পর্দাতেই দেখে নিন |

এর পরের ছবি জোয়া আখতারের | ছোট্ট একটা ছেলের গল্প, যে ছেলেটা আর পাঁচটা ছেলের চেয়ে আলাদা | তার বাবার ভারি শখ, তাকে ফুটবলার বানানোর, আর তাই তাকে মেরে-ধরে জোর করে মাঠ-প্র্যাকটিসে নামাতে চায় তার বাবা | কিন্তু ছেলেটা যে তার ধ্যান-জ্ঞান করে ফেলেছে ক্যাটরিনা কাইফকে! ‘তিস মার খান’ ছবিতে সেই যে ক্যাটরিনার ‘শীলা কি জওয়ানি’ নাচ, সেই নাচ দেখে তো রীতিমতো মোহাবিষ্ট সে! বাড়িতে মা-বাবা না থাকলে সে লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েদের মতো সেজে ক্যাটরিনার মতো নাচতে থাকে তার দিদির সামনে আর হঠাৎ বাড়ি ফিরে তার বাবা ( রনবীর শোরে) সেই দৃশ্য দেখে ঠাঁটিয়ে চড় কষায় একটা | কিন্তু শরীরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আরেকটা শরীর-প্রবণতাকে কি এইভাবে চড় মেরেই পাল্টে দেওয়া যায়?

চিত্রনাট্যকার-দম্পতি জাভেদ আখতার আর হানি ইরানির কন্যা জোয়া আখতার তাঁর এই গল্পটা লেখার আগে দুই বাংলার আলকাপ গানের দলের বিষয়ে গবেষণা করে নিয়েছিলেন কিনা, জানি না | ঘটনা হল, আলকাপ গানের দলে সত্যি সত্যি থাকে অল্পবয়সী মিষ্টি মুখ আর মেয়েলি হাব-ভাবের ছোকরারা, মেয়ে সেজে গানের দলে নাচ দেখানোই যাদের পেশা | ভাববেন না, ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয় | নাচ-গান শেষ হলে জমিদারবাবু কিম্বা বড়লোক গ্রাহকের বিছানাতেও গিয়ে উঠতে হয় এদেরই | শুনেছি, কমবয়সী মেয়েদের চেয়েও নাকি অনেক বেশি সুস্বাদু হয় কমবয়সী ছেলেদের শরীর | নকল ময়েলি চুল, কিম্বা নারকোলের মালা দিয়ে তৈরি নকল বুক খুলে ফেলে এবার তাই তাদের সেই ব্যাপারটা প্রমাণ করে দেখাতে হয় গ্রাহকের শয্যায় | মেয়ে-সাজা নয়-দশ বছরের বালক সন্তানকে জমিদারের খাটে তুলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে তার বাবা, আর তারপরে বাজনদারদের নির্দেশ দিচ্ছে জোরে বাজাতে, ছেলেটার আর্ত চিৎকার যাতে চাপা পড়ে যায়, এই মর্মান্তিক বিবরণ হুমায়ুন আহমেদের রচনা ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’-তে দেখতে পাওয়া গেছিল আগেই | সেই ছবি আরেকবার মনে পড়ে গেল জোয়া-র এই ছবির বালক-নায়ক ভিকি-কে দেখতে দেখতে |

তফাৎ এইটুকু যে এই ছোট ছেলেটির বাবা জোর করে ওকে যৌনপেশায় নামায় না, বরং ঠিক উল্টো, জোর করে ওকে নিয়ে যেতে চায় অন্য একটা ভুল পেশার দিকে | কিন্তু সেটাও কি কিছু কম নিষ্ঠুরতা? বড়দের চোখ এড়িয়ে নিজের স্বপ্নকে কী ভাবে লালন করতে হবে, আর নিজের ভাললাগাটাকে বিক্রি করে বাণিজ্য-সফল হতে হবে, ঘটনা পরম্পরায় তা অবিশ্যি দিব্যি শিখে ফেলে ছোট্ট ছেলেটা | আর আমরা টের পাই, মেয়েলি হলেই একটা ছেলে জাস্ট বাতিল হয়ে যাবে, সামাজিক ব্যাকরণটা আর বোধ হয় এতটা সরল নেই |

শেষ ছবিটা অনুরাগ কাশ্যপ-এর, আর সেই ছবিতে ভারতজোড়া স্টারডমের মুচকি হাসি | বাবার অনুরোধে উত্তর প্রদেশ থেকে এক তরুণ এসে পৌছয় মুম্বইতে, লক্ষ্য একটাই, অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে একবার দেখা করা | সে অবশ্য খালি হাতে আসে নি, তার সঙ্গে রয়েছে একটা মোরব্বা, তার আশা সেই মোরব্বায় একটা কামড় লাগাবেন বিগ বি, আরা তারপরে সেই প্রসাদী মোরব্বা নীরোগ করে দেবে তার বাবাকে | মজা জমে ওঠে এরপরেই | এক মামুলি যুবক কি সত্যি পারে ভারতের বৃহত্তম সুপারস্টারের সঙ্গে দেখা করে, তাকে দিয়ে তার মায়ের তৈরি মোরব্বা প্রসাদ করাতে? মুচমুচে মজায় মোড়া এই ছবির পরতে লেগে থাকে যেন সেই পঞ্চম রিপু : মোহ |

১০০ বছর ধরে বলিউডের সম্মানে মোহাবিষ্ট ভারতবর্ষটাই আসলে এই ছবির বিষয় | ছোটগল্পের মজা বুঝতে না পারলে, এবং মেনস্ট্রিম সিনেমার বাইরে আর কিছু পেটে হজম না হলে, এই ছবি দেখতে যাবেন না দোহাই | আমার ঠিক পেছনের সিটে বসা এক যুবা ঠিক যেমন সারাক্ষণ তার বান্ধবীকে বকা দিয়ে গেল এই ‘বোরিং’ ছবিটা দেখতে আনার জন্য, তার দশা হোক আপনার, সেটা নিশ্চয় চান না?

আর হ্যাঁ, ছবির শেষে বাড়ি ফিরে মুগ্ধ আমি সিনেমা-পঞ্জিকা খুলে দেখলাম, ১৯১৭ সালে এই বাংলায় প্রথম সিনেমা দেখানোর শুরু, প্রথম ছবি ছিল রুস্তমজী ধোতিওয়ালার নির্বাক ছবি ‘সত্যবাদী রাজা হরিশচন্দ্র’ | সেই হিসেবে আর চার বছর পরে বাংলাতেও ছবির শতবর্ষ | সেই শতবর্ষটা কি নিঃশব্দেই কেটে যাবে, নাকি এরকম কোনও সেলিব্রেশনের সুযোগ পাবে বাংলা ছবির দর্শকেরাও? ব্যবসা কী হবে, তার হিসেব শিকেয় তুলে রেখে এরকম ব্যতিক্রমী ছবি বানানোর দম কি দেখাবেন কোনও চিত্র-নির্মাতা?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.