নারীমুক্তি ও স্তন বিযুক্তি

breast flattening

নারী ধর্ষণ হল পুরুষদের জন্মসিদ্ধ অধিকার, যে কোনও মেয়ের শরীর তার বাপের থুড়ি নিজের জায়গির। সুতরাং ছেলেছোকরারা দুষ্টুমি করবেই। তাদের দুষ্টুমির বলি হওয়াটা তোমার অপরাধ কন্যে। সুতরাং ঘোমটা দাও, বোরখা পরো, আর যদি সেটাও যথেষ্ট না হয় কিংবা কচি বয়সে বাচ্চা বিইয়ে পড়াশুনো কেরিয়ারের বারোটা না বাজাতে চাও, তাহলে নিজের সদ্যোদ্ভিন্ন যৌবন পিষে মেরে ফেলো।

ভারতবর্ষের সতীদাহ প্রথা হল সরাসরি বিধবা একক নারীর বাঁচার অধিকার নৃশংসভাবে ছিনিয়ে নেওয়া,তার সম্পর্কে নতুন করে বলার নেই। বৈধব্যে কৃচ্ছসাধন তারই আপাত অকঠোর রূপভেদ। তাছাড়াযেহেতু সব নারী জীবনসঙ্গীর চেয়ে দীর্ঘজীবী হয় না,তাই এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলো এড়িয়েও তার জীবদ্দশা পার হতে পারে। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শুধু মেয়ে হয়ে জন্মানোর অপরাধে যেভাবে জীবন্মৃত করে রাখার যে ব্যবস্থাগুলি ঐতিহ্যবাহিত ও প্রথাসিদ্ধ, সেগুলো অধিকাংশ সতীত্ব, পবিত্রতা এমনকি সৌন্দর্য বা রূপচর্চার অঙ্গ হিসাবে মেয়েদের মনেপ্রাণে এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়, যে তারা নিজেরাই আত্মনিপীড়নের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠে। তবে এখানে যে প্রথাটির পরিচয় দিচ্ছি সেটি অবশ্য ইচ্ছাকৃত সৌন্দর্যহানির উদ্দেশ্যে যাতে নাকি মেয়েরা ‘সুরক্ষিত’ থাকে।

স্তন ইস্ত্রি (Brest Ironing/ Breast Flattening):

মূলত ক্যামারুনে এক বিচিত্র প্রথা প্রচলিত, যা নাকি মেয়েদের মঙ্গলের জন্য করা হয়। সদ্য কিশোরী মেয়েদের সদ্যোদ্ভিন্ন কচি স্তন গরম পাথর, হাতুড়ি বা কোনও শক্ত বস্তু দ্বারা চেপে বসিয়ে দেওয়া। এর নাম স্তন ইস্ত্রি বা breast ironing/flattening। এর ফলে স্তনের কোষকলা নষ্ট হয়ে আর বাড়তে পারে না। এই নিষ্ঠুর কাজটা সাধারণত মেয়ের মাকেই করতে হয়। কারণ বড় বিপদ অর্থাৎ ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচাতে মেয়েকে ছোটখাটো কষ্ট দিয়ে রমনীয়তা কমিয়ে দেওয়া!! তাছাড়া অল্প বয়সে বিয়ের হাত থেকে রক্ষা করে মেয়ের পড়াশুনো চালানোর পথ সুগম করাও কারণ হিসাবে দর্শনো হয়।

কী বিচিত্র যুক্তি! কিশোরীর সদ্য ফোটা স্তন দেখে ওদেশের পুরুষেরা তাকে যৌনতার উপযুক্ত ভেবে নেবে এবং তাদের ভেবে নেওয়াটাই শেষ কথা, মেয়েটির সম্মতি বা অসম্মতি অবান্তর। চূড়ান্ত অত্যাচার থেকে বাঁচানোর প্রতিষেধকটিও তো কম যন্ত্রণার নয়। মেয়েদের স্তনের অন্তর্বতী কোষ কলা খানিকটা ডেলা পাকিয়ে শক্ত হয়ে থাকে, যা বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করানোর আগে পর্যন্ত স্তনের গড়ন দৃঢ় রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু এর ফলে সুন্দর দুটি অঙ্গে যথেষ্ট ব্যথা থাকে যাতে চাপ পড়লে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়। কচি বয়সে সদ্য বুক ওঠার সময় এই ব্যথা বা যন্ত্রণা বেশ তীব্র থাকে। নারী মাত্রেই জানে, তাদের প্রাকৃতিক আকর্ষনীয়তার অন্তরে কত ব্যথা জমে থাকে। এই অবস্থায় আদা পেষা শক্ত কাঠের হামান, নারকেলের খোলা বা পাথর অথবা গরম হাতুড়ি দিয়ে স্তন পিষে চেপটে দেওয়ার সময় বাচ্চা মেয়েগুলোর কতটা কষ্ট হয়, তা পুরুষ মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়, যেমন সম্ভব নয় গর্ভযন্ত্রণা বা প্রসব যন্ত্রণার তীব্রতা অনুমান করা।

জানি না এর ফলে মেয়েগুলো সত্যিই যৌন আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পায় কিনা। শুধু সমগ্র ক্যামারুন নয় এই প্রথার চল দেখা যায় নাইজিরিয়া সহ দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু অংশে, পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার কিছু কিছু দেশেও, বেনিন চাদ, আইভরি কোস্ট, গিনি-বিসুয়া, গিনি-কোনারকি, কেনিয়া এবং জিম্বাবুয়েতেও। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও এর নজির মিলেছে। এমনকি ব্রিটেনেও বিস্তার লাভ করেছে এই উপসর্গ যাকে নৃতাত্ত্বকরা Cameroonian diaspora নামে সনাক্ত করেন। ক্যামারুনের ২০০টি উপজাতির মধ্যেই ধর্ম ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে এর চল। ২০০৬-এর জুন মাসে জার্মান ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি Deusche Gesellschaft fur Internationale Zusammenar (GIZ) দ্বারা ১০ থেকে ৮২ বছর বয়সী ৫০০০ বালিকা ও নারীকে নিয়ে করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রতি ৪ জনের মধ্যে ১ জনের ব্রেস্ট আয়রনিং করা হয়েছে। এই সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে শহরাঞ্চলেই এর প্রচলন বেশি, যেখানে মায়েদের আশঙ্কা মেয়েদের যৌন হ্যানস্থা হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা।

পৈশাচিক সেই প্রথা

লিটোরাল প্রদেশে এর হার ৫৩%, মানে অর্ধেকের বেশি মেয়েকে এই অত্যাচার বরদাস্ত করতে হয়। যদিও দেখা যাচ্ছে, ইসলাম শাসিত যেসব দেশে পৈশাচিক নারী জননাঙ্গচ্ছেদের প্রথা ঐতিহ্য হিসাবে জাঁকিয়ে বসে আছে, সেইসব দেশের বেশ কটাতেই স্তনপীড়নের প্রাদুর্ভাবও বেশি। কিন্তু বিস্ময়করভাবে দক্ষিণ ক্যামারুনের খ্রীস্টান ও অ্যানিমিস্ট ধর্মাবলম্বীদের চেয়ে উত্তর ক্যামারুনের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রথার চল কম, যেখানে মাত্র ১০% মেয়ের স্তন চেপে দিতে দেখা গেছে। তবে সেই ঔদার্যের কারণটাও খুব সুবিধের নয়। উত্তরের ক্যামারুনি মুসলমানদের মধ্যে যেহেতু মেয়েদের শিক্ষার হার কম ও অল্প বয়সে বিয়ের প্রচলন বেশি, তাই তাদের যৌনতার উপযোগী লক্ষণ ফুটে উঠতে ততটা বাধা দেওয়া হয় না।

গত ৫০ বছরে ক্যামারুন ও সংলগ্ন কিছু দেশে খাদ্যাভ্যাসে উন্নতির কারণে মেয়েদের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হয়েছে; যার ফলে শরীরেও স্বাস্থোজ্জ্বলতা প্রতিফলিত হচ্ছে। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের সৌন্দর্যহানি দ্বারা ‘সুরক্ষিত’ করার আয়োজন। নয় বছরের আগে যাদের স্তন বিকশিত হয় তাদের প্রায় ৫০%-এরই স্তন ইস্ত্রি হয়ে যায়, যাদের এগারো বছরের মধ্যে কৈশোর চিহ্ন ফুটে ওঠে তাদের ৩৮%-কে এই অত্যাচার সহ্য করতে হয়। ১৯৭৬ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়ের সংখ্যা ৫০% থেকে ২০% নেমে গেছে, যার ফলে শৈশব ও বিবাহের মধ্যে তফাৎ বেড়ে গেছে। অল্প বয়সে গর্ভবতী হলে যেখানে পড়াশুনো ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়, সেখানে দেরিতে বিবাহ উচ্চ শিক্ষার সহায়ক। পরিবর্তিত সামাজিক পরিস্থিতিতে যেমন একদিকে মেয়েদের শিক্ষালাভ ও পেশার ক্ষেত্র প্রসারিত হচ্ছে, তেমনি তাদের যৌন নির্যাতিত হওয়ার সম্ভাবনা, বিশেষ করে মা-বাবার মনে তাই নিয়ে আশঙ্কাও বেড়ে যাচ্ছে। আর তারই বিকৃত ফলশ্রুতি মেয়েদের শরীরে স্বাভাবিক বিকাশ নষ্ট করে তাদের পুরুষের লোভ থেকে রক্ষার উদ্ভট প্রয়াস। আরও উদ্বেগ এই যে, এই প্রথা ব্রিটেনের মতো প্রথম বিশ্বের উন্নত দেশে পর্যন্ত শাখা বিস্তার করেছে, যেমন করেছে স্ত্রী জননাঙ্গ বিকৃতি। মেয়েদের মুখ্য ও গৌন যৌনাঙ্গ বিকৃতি যে ধর্ষণ তথা যৌন হিংসা দমনে সহায়ক নয়, তার প্রমাণ ঐ আফ্রিকান সমাজগুলো স্বয়ং, যেখানে ধর্ষণ ও নৃশংসতা খুব মামুলি ব্যাপার।

স্তন ইস্ত্রি যে শুধু তীব্র যন্ত্রণা দায়ক তাই নয়, এর ফলে কোষ কলার যে ক্ষতি হয় তাতে ভবিষ্যতে স্তন ক্যান্সার, সিস্ট এবং ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে। তাছাড়া সন্তানকে স্তন্যপান করানোতে যে সমস্যা হবে তা তো সহজেই অনুমেয়। স্তনে সংক্রমণ ও গুটলি (abscesses) তৈরিও হয়ে থাকে। সদ্যোদ্ভিন্ন স্তন গ্রন্থি নষ্ট করে দেওয়ার পদ্ধতি ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে মেয়েটির অসুখের তীব্রতাও।

GIZ (অধুনা “GTZ”) নামের একটি সংস্থা বোঝানোর চেষ্টা করছে এর দ্বারা অল্প বয়সে যৌনাচার বা গর্ভধারণ কোনওটাই রোখা যায় না। GIZ ও Network of Aunties (RENATA) নামের আর একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ব্রেস্ট আয়রনিং বিরোধী প্রচার উদ্যোগকে ক্যামারুনের নারী ও পরিবার উন্নয়ন মন্ত্রক সমর্থনও জানিয়েছে এবং কয়েক মাসের মধ্যে অভিযোগ পেলে এই অপরাধের জন্য সর্বাধিক ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের ব্যবস্থাও ঘোষণা করেছে। ওদিকে CAME Women’s and Girl’s Development Organisation নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা London’s Metropolitan Police -এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করছে। কিন্তু সারা বিশ্বে নিরন্তর ঘটে চলা নারকীয় নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো যতদিন না শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে, ততদিন মেয়েদের অত্যাচারের আশঙ্কায় আগাম অত্যাচারের প্রবণতা রোধ করা খুব দুরূহ।

Advertisements
Previous articleঅতিথি বিতাড়ন
Next articleকুকথা ৪
শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর|রসায়ণ অনার্স নিয়ে বিএসসি পাস করেন, বিএড ও এমবিএ-র পর কর্মজীবন শুরু একটি ফার্মাসিউটিকল সংস্থায়|বর্তমানে একাধিক বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্র-পত্রিকায় গল্প, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, ছোটদের সাহিত্য, ফিচার ইত্যাদি রচনায় নিয়মিত| ঙ্গ সংস্কৃতি পুরস্কার ২০১২, ঋতবাক ‘এসো গল্প লিখি’ পুরস্কার ২০১৬-১৭, শর্মিলা ঘোষ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬ (ছোটগল্প) ও ঊষা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার (নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন প্রদত্ত)।

1 COMMENT

  1. ki bhoyonkor !! eta na porle to jantei partam na eto pashobik hote pare manush !! prithibir kothay je ki ghotchhe eisob kodorjo jinis, bhableo ar etake 2019 bole mone hoy na… ekhono gaa shiure uthchhe ki poRlam…etake legally bondho kora uchit…chhihh…Sotidaho prothar cheye kono ongshe kom joghonyo noy eta…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.