তখন নগর কলকাতা গড়ে ওঠেনি । তবে বাণিজ্যে লক্ষ্মী লাভের আশায় বহু বিদেশির আগমন ঘটেছে । খাড়া হয়েছে রাইটার্স বিল্ডিংস । প্রচুর মানুষ কাজ করেন সেখানে ।বেশিরভাগই অবিবাহিত । তাঁদের অবসর বলতে, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে গল্পগুজব, কিংবা মদ্যপান । কেউ কেউ অবশ্য শরীরচর্চা কিংবা শিল্পকলা অভ্যাস করেন। কিন্তু বাড়ি ফিরে যে কারও কোলে মাথা রেখে দু’টো মনের কথা বলবেন, এমন কেউ নেই।

সাহেব আছে, কিন্তু মেমসাহেবের বড়ই অভাব । মনের তাগিদই হোক, কিংবা শরীরের—অনেকেই এর মধ্যে বিয়ে করে নিয়েছেন পর্তুগিজ কন্যা, কিংবা বাঙালি মেয়েকে। কিংবা যে সমস্ত সংসারি সাহেবের ‘গঙ্গাপ্রাপ্তি’ হয়েছে, তাঁদের স্ত্রীদের আর বৈধব্য জীবন কাটাতে দিতে রাজি হননি কেউ কেউ । কিন্তু কলকাতার ‘রাইটার্স’-দের বিদেশের মাটিতে চাহিদা ছিল তুঙ্গে । অনেক অভিভাবকই তাঁদের মেয়েদের কলকাতায় পাঠাতে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। কেউ কেউ তো আবার এদেশে পাঠাবেন বলেই সামঞ্জস্য রেখে নিজের মেয়েদের নাম রাখতেন, ‘ইভলিনা’ ‘ইন্ডিয়ানা’ ‘অ্যাঞ্জেলিকা’। এর পিছনে অবশ্য দুটি কারণ—প্রথমটি অবশ্যই এদেশে সংসার করতে আসা নববিবাহিতাদের চিঠি। নববিবাহিতারা বেশিরভাগই এ দেশকে বর্ণণা দিতেন—‘…that the blackmen were very amiable, and Calcutta a perfect paradise…’ দ্বিতীয় কারণটির মধ্যে মিশে ছিল একটি ‘দেশাত্মবোধ’—‘…the more readily will a stop be put to that intercourse with the native female of India…’

মজার ব্যাপার হল, যেই না কলকাতায় পা রাখতেন সেই মেয়েরা, ওমনি তাঁদের দেখতে পুরুষের ঢল পড়ে যেত । নকুল চট্টোপাধ্যায় সে বর্ণণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন—‘যখনই ইংরেজ রমণীরা গার্ডেনরিচের জাহাজঘাটায় নামত তখন পরিচিত-অপরিচিত সকলেই তাঁদের হাসিমুখে তাঁদের স্বাগত জানাত । সকলের সঙ্গে পরিচয়ের পালা সঙ্গ হলে তবে তারা পালকিতে উঠতে পেত। যেই রাস্তায় পালকি যেত, সেই রাস্তার দুইধারে রাইটাররা দাঁড়িয়ে কেউ বা হাত নাড়ত, কেউ বা রুমাল ওড়াত । পুর্বনির্দিষ্ট আস্তানায় পৌঁছবা পর শুরু হত আর একদফা সকলের সঙ্গে পরিচিত হবার পালা। সন্ধে সাতটা থেকে রাত্রি এগারোটা পর্যন্ট আগন্তুকরা আসত। এইভাবে কিছুদিন গেলে হয়তো কোনো ডায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসত। অনেক প্রস্তাব নাকচ করে মেমসাহেব একটি প্রস্তাবে রাজি হত। বিয়ে হয়ে যেত।’

আরও পড়ুন:  চোরাই জিনিসে ভরপুর চোরহাট ছিল ব্রিটিশ কলকাতার বিকিকিনির স্বর্গ

এইভাবে বিয়ে যে বেশিদিন স্থায়ী হওয়ার নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না । সাহেবরা কাজে চলে যেতেন, এরপর নিঃসঙ্গ দিনযাপন মেমসাহেবের । তার সঙ্গে বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা। এক অদ্ভুত রোগে ভুগতে শুরু করতেন মেমসাহেবরা। এই রোগের কেউ কেউ নাম দিয়েছিলেন ‘অ্যাংলো ম্যানিয়া’—‘it is an utter antipathy and disgust to every matter or thing uncommon with England, and consequently a through contempt for the manners and customs, opinions and sentiments of all European inhabitants of India. It generally breaks out after a voyage from England and resists every medical attempt, it is somewhat appeased in the cold weather, but the hot winds and rains increase it considerably. It gives an elevation to the muscles of the nose—contracts those of the mouth downwards, and creates a shuddering sensation at a white jacket or Hooka.’

Banglalive-8

রোগ যখন ছিল, তখন তার প্রতিকারও যে থাকবে, এ তো স্বাভাবিক । রোগ সারাতে হাজির হতেন আরেক দল সাহেব । কথায় আছে ‘A faint heart never owns a fair lady’। সম্ভবত এই কথা মাথায় রেখেই সাহেব-সাহেবে যুদ্ধ বেঁধে যেত। এই যুদ্ধের পোশাকি নাম ‘ডুয়েল’। আর সেই যুদ্ধে যে জিতবেন সেই নর পাবেন পছন্দের নারীকে । এরকমই একটি ডুয়েলের কথা শোনা যাক—‘১৮০৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ই অক্টোবর। লে.হেনরি ফিলিপস ও তাঁর প্রতিপক্ষ লে.শেফার্ড এসে উপস্থিত হয়েছেন সেই trees of destruction-এর তলায় । ঝগড়ার মূলে এক নারী। লে.শেফার্ড, লে.ফিলিপসকে এই বলে অভিযুক্ত করেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রীকে তাঁর কাছ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। লে.হেনরি ফিলিপসের পক্ষে এই অভিযোগ অগ্রাহ্য করা সম্ভব ছিল না—তাই ডুয়েলিং-এর মাধ্যমে এই বিবাদের মীমাংসা করাই স্থির হল।…লে শেফার্ডের গুলিতে লে. ফিলিপস নিহত হলেন।’ যদিও পরে জানা যায়, আসল কারণ কিন্তু শেফার্ডের স্ত্রী নন। ‘মেজর রিচার্ড হেনরির সুন্দরী কন্যাকে কেন্দ্র করেই সূত্রপাত হয় এই দুই পুরুষের দ্বন্দ্ব।’

Banglalive-9

আরও একটি ঘটনার উল্লেখ করা যাক—

আরও পড়ুন:  প্রায় তিন দশক ধরে জনশূন্য গোলাপি দ্বীপে একাই আছেন এই বৃদ্ধ

উনবিংশ শতাব্দীর একটি হোটেলে বলরুমে এক সন্দরী নর্তকীর সঙ্গে কে নাচবে তা নিয়ে দুই মদ্যপ সাহেবের ঝগড়া । শেষ পর্যন্ত সেই ঝগড়া গিয়ে ঠেকল ডুয়েলিংয়ে । সেই ডুয়েলিংয়ে একজন পা হারালেন চিরদিনের জন্য । কী কাণ্ড ! একবার ভাবুন । হ্যাঁ, জিতে গিয়ে হিপ হিপ হুররে শোনার তখন একটাই রাস্তা ছিল সাহেবদের কাছে—ডুয়েলিং। তবে ডুয়েলিং যে শুধুমাত্র নারীকে কেন্দ্র করেই সাহেবদের মধ্যে হয়েছে, এমনটা কিন্তু নয় । অনেক কারণেই হয়েছে । যেমন হেস্টিংস এবং ফিলিপ ফ্রান্সিসের মধ্যে ডুয়েলিংয়ের কারণটা ছিল প্রশাসনিক মতপার্থক্য । মতপার্থ্যক্যের ডুয়েলে ফিলিপকে গুলিতে আহত করেছিলেন হেস্টিংস। আর সেই ডুয়েলের পর ফিলিপের কাছে ডুয়েলের চ্যালেঞ্জ এলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। আর সেই চ্যালেঞ্জের পিছনে লুকিয়ে আছে এক কেচ্ছা বৃত্তান্ত।

সামান্য কোম্পানির কেরানি থেকে বড়লাটের পরিষদের একজন সদস্য। বিলেতে স্ত্রী-সন্তানকে রেখে ফিলিপ ফ্রান্সিস এ দেশে আসেন লক্ষ্মীলাভের আশায়। বুদ্ধিমান এই ব্যক্তির উঁচু পদে উন্নীত হতে সময় বেশি লাগেনি। রাইটার থেকে সরাসরি গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিল সদস্য। ফিলিপের মত এ শহরে আরও একজন রাইটার ছিলেন। মজার বিষয় হল, তিনিও ফ্রান্সিস। তবে পদবী গ্র্যান্ড। গ্র্যান্ড ছিলেন কোম্পানির সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট।

কিন্তু এ দেশের পরিবেশে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতির জন্য তাঁকে ওই পদে ফিরে যেতে হয়। পরবর্তীকালে অবশ্য ফিরে আসেন রাইটার হিসেবে। তবে বেশিদিন তাঁকে রাইটার থাকতে হয়নি। সেকালে ডাকসাইটে সুন্দরী ফরাসি কন্যা নোয়েল ক্যাথরিন ওয়েরলির সঙ্গে আলাপের পর তিনি তাঁর সঙ্গে বিয়ে করবেন বলে ঠিক করেন। এই বিবাহ পরিকল্পনা জানতে পেরে কোম্পানি বাহাদুরের দয়াতে গ্র্যান্ডের চাকরি হয় নিমকমহলের সচিব পদে।

সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু গোল বাঁধল ৮ ডিসেম্বর, ১৭৭৮ সালে। বারওয়েলের বাড়িতে পার্টি করতে গিয়েছেন গ্র্যান্ড। ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ তখন, এ সময় গ্র্যান্ডের বাড়ির এক চাকর এসে খবর দিলেন, তাঁর বাড়িতে ফ্রান্সিস ফিলিপ ধরা পড়েছেন। গ্র্যান্ড তো রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু কোথায় ফ্রান্সিস? সেখানে হাজির ফ্রান্সিসের বন্ধু জর্জ শী, আর্চডিকেন। গ্র্যান্ড তো হতবাক। তিনি তাঁদের জেরা করেও কিছু উদ্ধার করতে পারলেন না। অগত্যা তিনি তাঁদের ছেড়ে দিলেন এবং বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটালেন। পরদিন তিনি ডুয়েলের চ্যালেঞ্জে আহ্বান করলেন ফিলিপ ফ্রান্সিসকে। তবে ফিলিপ ফ্রান্সিস ডুয়েলের প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে গিয়ে সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলেন।

আরও পড়ুন:  বীর জওয়ান 'অভিনন্দন'কে বরণ করে নিল আমূল গার্ল

তবে ফিলিপ ফ্রান্সিসকে কিছুতেই ছাড়তে রাজি নন ফ্রান্সিস গ্র্যান্ড। তিনি মামলা ঠুকলেন। আর সেই মামলার শুনানিতে বেড়িয়ে গেল ‘বড়া সাহেব’-এর কেচ্ছা— ঘটনার দিন রাতে মিসেস গ্র্যান্ড তাঁর আয়াকে একটি মোমবাতি আনতে পাঠান। মোমবাতি নিয়ে এসে আয়া দেখতে পান, ম্যাডামের ঘর বন্ধ। আয়ার ডাকাডাকিতে হাজির হয়ে যান অন্য ভৃত্যরাও। এর মধ্যে জমাদার একটি মই উদ্ধার করলেন। মইটি ম্যাডামের শোওয়ার ঘরের জানালার সঙ্গে লাগানো। এর মধ্যেই বেরিয়ে এলেন ফিলিপ ফ্রান্সিস। তাঁকে আটকে রেখে মিস্টার গ্র্যান্ডকে খবর দিতে গেলেন একজন চাকর।

আর এর মধ্যেই ফিলিপ শীষ দিতেই পাঁচিল টপকে হাজির হল তাঁর বন্ধুরা। ব্যাস, ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। আর এই ধস্তাধস্তির মধ্যেই ‘বড়া সাহেব’ পালিয়ে বাঁচলেন। জর্জ শী’র সাক্ষ্য গ্রহণে জানা গেল, মিসেস গ্র্যান্ডের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনিই মইটি তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। এবং তাঁর বাড়িতে জামা পাল্টে ফ্রান্সিস ফিলিপ মই কাঁধে পৌঁছেছিলেন গ্র্যান্ডের বাড়ি।

ভাবুন একবার প্রেমের জন্য কিনা প্রশাসনের এক কর্তা মই কাঁধে অন্যের বাড়িতে হানা দিচ্ছে। কী কেচ্ছা ! কী কেচ্ছা ! এখন অবশ্য এই ডুয়েল থেকে বাঁচা গিয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক চাহিদার তাড়নায় যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাটা আজও জারি। তাই হয়ত ত্রিকোণ প্রেমের জেরে নানা অপরাধের সাক্ষী থাকে এই দেশ, এই শহর।

NO COMMENTS