এমন দিনে ইহা বলা যায়

এমন দিনে ইহা বলা যায়

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Lost Essence Of Durgapuja

কিছুই মেলে না।

স্কুলজীবনে একটা রচনা মানেবই আর বাংলা সহায়িকা দেখে ঝাড়া মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। রচনাটা হল বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য। পরীক্ষায় রচনার জন্য বরাদ্দ থাকত পনেরো নম্বর। সাধারনত চারটে অপশন থাকত। তার মধ্যে বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য কমন থাকার সম্ভাবনা ছিল ষোলয় বারো আনা। গ্রীষ্ম বর্ষা নমো নমো করে সেরে কোনওরকমে শরৎকালে এসে পৌঁছতে পারলেই হাত উঁচিয়ে ‘স্যার পাতা লাগবে’ বলে উঠতাম। শরৎকাল মানেই আকাশে পেঁজা তুলোর মেলা। শরৎকাল মানেই কাশফুলে দে দোল দোল। শরৎকাল মানেই আকাশে বাতাসে আগমনীর মোহময়ী সুর—এসব লেখার সময় ফেনানোর সুযোগ ছিল প্রচুর। বাংলা স্যার দাড়িপাল্লায় খাতা মেপে নম্বর দিতেন। ফলে চার পাতা বড় বড় করে লিখে ফেলতে পারলে নম্বর আমদানি হত ভালই। আমরা, নিতান্তই শহরে বড় হওয়া কিছু হতভাগ্য ছেলেরা খাতায় কাশফুল ফোটালেও ডেস্কটপ ওয়ালপেপার আর সাদা কালো ক্লাসিক সিনেমা ছাড়া জীবনে এখনও সেভাবে কাশফুল দেখে উঠতে পারলাম না।

পুজো পুজো গন্ধ আর কই। কোথায় সেই পুজোর আমেজ! আগমনী সুরের সঙ্গে সমার্থক ছিল যে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলা, যে বীরেন ভদ্র মানে ছিল ভোর চারটের অ্যালার্ম আর আধো ঝিমুনি-জ্বালা করা চোখের মধ্যে আশেপাশের অনেক বাড়ি থেকে আসা ছোটবেলার প্রথম সারাউন্ড সাউন্ড, বিশ্বায়নের যুগে মে মাসের উষ্ণায়নেও তা এক ক্লিকে শুনতে পাওয়া যায়। কিছু শারদীয় সংখ্যার বিজ্ঞাপন শুরু হয়ে যায় জুন মাস থেকে। জুলাইয়ে ‘নাউ অন স্ট্যান্ডস’। অগস্টের মধ্যে তা পড়া হয়ে যায়। আর প্রাক-পুজো ঘর পরিস্কার করার ছুতোয় মহালয়ার আগেই আট টাকা কেজি দরে তার হাতবদল হয়ে যায়। এবারে মহাসপ্তমীর দিন সকালে মহাকচুরি কিনতে গেলে যে ঠোঙাটা পাবেন, তা হয়তো এ বছরেরই কোনও শারদীয়ার পাতা থেকে তৈরি। আশ্চর্য হবেন না।

চারদিকে যখন ঝাঁঝাঁ রোদ্দুর, ঘামাচিদের জয়োৎসব, তখন থেকেই পুজো আসে। মোটামুটি জুনের শেষ থেকেই অধিকাংশ বাংলা টিভি চ্যানেলগুলোর লোগো লাট্টুর মত ঘুরতে থাকে। একবার চ্যানেলের নাম, এক পাক ঘুরলেই আর একশ এক দিন, আবার এক পাক। ত্রিনয়নী মুখ। হিমসাগর ফজলির আঁটি চোষার সময় থেকেই ডিওডরেন্টের স্প্রের মতো পুজোর আমেজ ভুস করে গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হয়। বীরেন ভদ্রকে এক ঠ্যালা মেরে জাগিয়ে দিই আমরা। অগস্ট-এর শুরু থেকেই রাশি হাসি পটলসোনার বিজ্ঞাপনের ব্রেকে ইয়া দেবী সর্বভূতেষু।

কিছু কিছু রেস্তোরাঁর বুফে সিস্টেমে দেখবেন, মেনকোর্সে পাঁচপদ। স্টার্টারে দশ। লোকে শুরুতেই বুভুক্ষুর মতো এত খেয়ে নেয়, মেনকোর্স অবধি আর পৌঁছতে পারে না। ঠিক তেমনই হয়েছে খুঁটিপুজো। এই খুঁটিপুজো ছিল আগেও, তবে তা ছিল পার্থিব প্যাটেলের মতো, শচীন হয়ে ওঠেনি। এখন খুঁটিপুজোটাও একটা উৎসব। কোনও কোনও মন্ত্রীখচিত পাড়ার খুঁটিপুজোতেই এমন ঢক্কানিনাদ হয় যে সে পাড়ার অনেকে পুজোর সময়টা বাইরে কাটানোর কথা ভাবতে শুরু করেন। বেড়াতে যতটা চান, তার থেকে বেশি চান পালাতে। নায়িকাদের হয়েছে পোয়াবারো। জরির ফিতেয় তাঁদের জন্য হাজার হাজার গান্ধীজি খেলা করেন। একটা সামান্য কাঁচির কয়েকটা মায়াবী কুচ-এ তাঁদের কত মুচমুচে শখ পূর্ণতা পায়। চকচক করলেই আসলে সোনা হয়। তাই তো প্রোদুনোভার দীপার থেকে শুধু তুমির খুশি কিংবা তামান্নার ফিতে কাটার দক্ষিণা অনেক বেশি।

এখন তো বাই ওয়ান গেট ওয়ানের যুগ। অফারময় বেঁচে থাকা। এটিএমে টাকা না থাকলেও পেটিএমে থাকে। তাই তো সার্বজনীন দুর্গাপুজোর আগেই বীরবিক্রমে চলে আসে সার্বজনীন শপিংপুজো। শপিংটাও তো পুজো! কেমন অফার দেখুন। দুর্গাপুজোয় পাঁচ হাজার টাকার বাজার যদি করে ফেলতে পারেন, তাহলে কালীপুজোর সময় তিন হাজার টাকার বাজার করলে চারশ টাকা ডিসকাউন্ট। অফারাসুরের হাতছানিতে প্রথমে দুটো জামা কেনার প্ল্যান করে থাকলেও কিনে ফেলতে হচ্ছে পাঁচটা। বারশ টাকার শাড়ি কিনলেও আরও তিনশ টাকার কিছু কিনে ফেলতে হচ্ছে এমনি এমনি, কারণ দেড় হাজার টাকা বিল হলে চারটে স্টিলের গ্লাস ফ্রি। আর তালেগোলে অফার মিস হয়ে গেলে যে দুঃখটা হচ্ছে, তা নবমী নিশির মন খারাপকেও হার মানায়।

শারদীয়া সংখ্যাগুলোতে লেখক সাহিত্যিকদের আজকাল পাল্লা দিতে হচ্ছে পুজোর পাস-এর সাথে। দিনকয়েক আগে শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়ে একটা ম্যাগাজিনের দোকানে গিয়েছিলাম। ফুটপাথের দোকান, যেমন হয়। সামনে সার সার শারদীয়া। বছর কুড়ি বাইশের এক পনিটেল, প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে চুইংগাম চিবোতে চিবোতে ম্যাগাজিনবিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বস্, কোন বইটায় পাস বেশি হবে?’ পাস মানে হল দুর্গাপুজোর মন্ডপে ঢোকার ভিআইপি পাস। দোকানদার একটি পত্রিকা দেখালেন। ঠোঁটদুটো একটু উঁচু করে বললেন, ‘হেব্বি হিট।’ সেই শারদ সংখ্যার উপরে বড় বড় করে লেখা—পঁয়ত্রিশটি হট পুজোর কুল পাস। তার নিচে ছোট করে—সেই সঙ্গে তিনটি লা-জবাব উপন্যাস। পাসপ্রিয় প্রেমিকের প্রেমিকার নজর ছিল কিন্তু অন্য দিকে। মেয়েটি অন্য একটা শারদীয়া তুলল। তার সঙ্গে ফ্রি একটা শ্যাম্পুর বোতল। শারদীয়ার সূচিপত্র গেল দিকশূন্যপুরে, পাস না শ্যাম্পু এই নিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হল। দোকানি গুটখার পিক ফেলতে ফেলতে খানিক রগড় দেখলেন। তারপর পাসগুলো তিরিশ টাকায় আর শ্যাম্পুর বোতলটা পঁচিশ টাকায় ওদেরকে বেচে দিলেন। এতে তাঁর কি লাভ হল জানি না। অবশ্য আমিও তক্কে তক্কে ছিলাম। প্রেমিক প্রেমিকা হাস্যমুখে বিদায় নিতেই আমি সর্বস্ব খোয়ানো দুই অনাথ শারদীয়া সংখ্যাকে হাফ দামে কিনে নিলাম। কুল পাস ছিঁড়ে নেওয়ার পরে একটা বইয়ে কাগজ আর বিশেষ ছিল না। যাক গে। শারদ সংখ্যা তো!

এখন তো দুর্গাদেবী থিমরুপেন সংস্থিতা। দেশলাই কাঠির দুর্গা, আইসক্রিম স্টিকের দুর্গা, উলের কাঁটা, পানের বাটা, নকশি কাঁথা—দুর্গা তৈরি হচ্ছে সবকিছু দিয়েই। ঠোঙা দিয়ে তৈরি এক দুর্গামূর্তির তলায় গত বছর লেখা দেখেছিলাম—রিসাইকেলেবেল। মমতাময়ী দুর্গা হয়েছে, লাদেনমুখী অসুরও। সব পুজো কমিটিই তো নতুনত্ব চায়। চারদিকে যা অবস্থা, এ বারে কোনও পুজোর থিম ডেঙ্গু হলে অবাক হব না। এমনটা ভাবা যেতে পারে, ঢাকের আওয়াজের বদলে হিডেন স্পিকারের মাধ্যমে পুজো প্যান্ডেলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে কানের কাছে মশার ডানা ঝাপটানোর সেই একঘেয়ে বিরক্তিকর উননন্ উননন্ শব্দ। যত বেশি বিরক্তি হবে, থিম তত বেশি রিয়্যালিস্টিক! ভলান্টিয়াররা হাতে মশা ভাগানোর ক্রিম নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ধুপ ধুনো নয়, মন্ডপচত্বরে ম-ম করছে মসকুইটো কয়েলের গন্ধ। মশারির মধ্যে সপরিবারে মা দুর্গা। আর মহিষাসুর নয়, এক মশাসুর দুই বর্গফুট জমা জলের উপরে দাঁড়িয়ে প্রবল বিক্রমে হুল বাগিয়ে মশারি ছেঁড়ার চেষ্টা করে চলেছে।

এই লেখাটা যেদিন লিখছি, তত দিনে আমাদের উত্তর কলকাতার পাড়ার পুজো প্যান্ডেলের বাঁশের কাঠামো তৈরি করার কাজ শেষ। আজ থেকে কাপড় লাগানো শুরু করার কথা ছিল। পুজো কমিটির সেক্রেটারির আদেশে তা একদিন পিছিয়েছে। একটু আগে পাড়া চরতে বেরিয়ে দেখে এলাম, কমিটির পল্টুদা আর বিল্টুদা মোবাইলের টর্চের আলো বন্দুকের মতো তাক করে রয়েছেন বাঁশের খোলাগুলোর মধ্যে। ওই জায়গার জমা জলও নাকি এডিস ঈজিপ্টি নামে অসুরসম্রাটের ইদানীং খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে!

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

pandit ravishankar

বিশ্বজন মোহিছে

রবিশঙ্কর আজীবন ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের প্রতি থেকেছেন শ্রদ্ধাশীল। আর বারে বারে পাশ্চাত্যের উপযোগী করে তাকে পরিবেশন করেছেন। আবার জাপানি সঙ্গীতের সঙ্গে তাকে মিলিয়েও, দুই দেশের বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত ব্যবহার করে নিরীক্ষা করেছেন। সারাক্ষণ, সব শুচিবায়ু ভেঙে, তিনি মেলানোর, মেশানোর, চেষ্টার, কৌতূহলের রাজ্যের বাসিন্দা হতে চেয়েছেন। এই প্রাণশক্তি আর প্রতিভার মিশ্রণেই, তিনি বিদেশের কাছে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের মুখ। আর ভারতের কাছে, পাশ্চাত্যের জৌলুসযুক্ত তারকা।