ব্যোমকেশ গোত্র : সেক্সের আগুনে এই গল্পটা তো টগবগিয়ে ফুটছে!

সেক্সের আগুন মানে যে ঠিক কী বলতে চাইছি, সেটা ছবির ট্রেলার যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা তো বোধহয় আঁচ করতে পেরেছেন আগেই। কিন্তু এখানে একটা কথা বলে রাখি যে, এই সিনেমায় এই আগুনটা কিন্তু একা সত্যকাম ডস-এর (অভিনয়ে অর্জুন চক্রবর্তী) মধ্যে জ্বলে না।

বাইরে থেকে দেখতে যতই সুভদ্র আর পরিশীলিত লাগুক না কেন, এই আগুন আসলে ধিকিধিকি জ্বলে খোদ ব্যোমকেশের নিজের মধ্যেও। সিনেমায় এটার হাল্কা একটা হিন্টও রয়েছে দেওয়া। ছবিতে দ্যাখান হচ্ছে যে, একবার এক ঝলক মিলনোন্মুখ কোন মেয়ের ছবি দেখলে, হোক না যতই অচেনা মেয়ে – বেশ ক’দিন কেটে গেলেও সেই মুখ ব্যোমকেশ ভুলতে পারছে না আর।

দাঁড়ান একটু খুলেই বলছি এটা।    

মুসৌরির ক্যাসানোভা সত্যকাম ডস। একের পর এক মেয়ের সঙ্গে শুয়ে বেড়ানোই তার কাজ। কিন্তু সিনেমায় দ্যাখান হচ্ছে যে, এর সঙ্গে তার আরও একটা প্যাশন আছে। সেটা হল, কোন মেয়েকে তার পোশাক খুলে আদর করার সময় তার ভলাপচুয়াস হট ফটো তুলে নিজের কালেকশনে জমিয়ে রাখা। এই সত্যকামের গত কয়েকদিন ধরে মনে হচ্ছে যে, এই দুনিয়ায় তার আয়ু আর বেশি দিনের নয়। নিজের সেই সম্ভাব্য খুনের তদন্তভার ব্যোমকেশকে (আবীর চট্টোপাধ্যায়) দেওয়ার জন্য সুদূর মুসৌরি থেকে কলকাতা এল ও।

আমরা এটা দেখতে পেলাম যে, ব্যোমকেশের সঙ্গে কথা বলার সময় ভারি অবহেলায় নিজের কালেকশনের সেই মেয়েগুলোর ছবি সে ছড়িয়ে দেয় ব্যোমকেশের সামনে। নিলাজ ভঙ্গীতে বুঝিয়ে দ্যায় যে, কার কার সঙ্গে এখন শুয়ে বেড়াচ্ছে ও। সাদা-কালোয় তোলা এনলার্জ করা ছবি, অজিত তো শক খেয়ে প্রায় ছিটকে যায় দেখে আর ব্যোমকেশ ওগুলোর দিকে ঠিক একটা পলক তাকায়।

কিন্তু উদ্দাম ওই সেক্সি ছবি ব্যোমকেশের মধ্যে কী অভিঘাত যে তৈরি করে সেটা আপনি বুঝতে পারবেন এর কয়েকটা সিন পর।

সত্যকাম খুন হলেও হয়ে যেতে পারে, এটা আঁচ করে, সত্যবতী আর অজিতকে সঙ্গে নিয়ে মুসৌরি পৌঁছে যাচ্ছে ব্যোমকেশ। এবার সেখানে কাণ্ডটা কী হচ্ছে, শুনুন। সেই যে কবে সাদায়-কালোয় তোলা খানকয়েক মেয়ের ফটোগ্রাফ সে দেখেছিল সত্যকামের কাছে, সেগুলো দেখলাম তাঁর মনে এত গেঁথে আছে যে, মুসৌরির বাজারে ভিড়ের মধ্যে কোন মেয়েকে বাজার করতে দেখেও ঝট করে সে বুঝতে পারছে, আরে, এই তো সেই মেয়ে – ব’লে!

যদিও সে মেয়ে তখন নেহাত ঘর-গেরস্থালির একটা লুকে আছে, যেটা ওই ফটোর ‘লুক’ থেকে একশো মাইল আলাদা।

এখানে জাস্ট শুরু। তারপর এটা দ্যাখান হচ্ছে যে, সেই মেয়ের পিছু নিয়ে সোজা তার বাড়ি অবধি পৌঁছে যাচ্ছে ব্যোমকেশ আর এভাবে নতুন একটা পরতও খুলছে স্টোরির! এক-পলক-দ্যাখা ফটোর স্মৃতি থেকে মেয়ে চিনে বের করার ঘটনা এ ছবিতে একাধিকবার আছে।

মিলনপিয়াসী মেয়েদের ব্যাপারে ওর নজর আর মেমরিটা কত স্ট্রং, সেটা এর থেকেই বুঝতে পারবেন আপনি! জাস্ট একটা ঝলক একজনের মুখ দেখে এভাবে সেটা মনে রেখে দেওয়া তো চাট্টিখানি নয়। আর হ্যাঁ, এটা কিন্তু শরদিন্দুর মূল টেক্সটেও নেই।

সেক্স-স্টার্ভড এই মেয়েগুলোর ছবি মনে গেঁথে থাকলেও বাবা-মেয়ের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তোলা ‘নিরামিষ’ ছবি যে ওর মনে থাকছে না, সেটাও আবার এই সিনেমাতেই আছে! ম্যানচেস্টারে গিয়ে রমানাথ চৌধুরী (অরিন্দম শীল) আর তাঁর মেয়ে সুচিত্রার (অনিন্দিতা বোস) তোলা সেই যুগল ছবিটার কথাই ধরুন। প্রথমবার লাইব্রেরির পুরনো কাগজে ছবিটা দ্যাখার পর পরের বার ঊষাপতির (অঞ্জন দত্ত) বাড়ির দেওয়ালে ছবিটা দেখেও ঠিক চিনতে পারে নি ও, ওর রিয়্যাকশন ছিল, ‘খুব চেনা চেনা লাগছে ছবিটা। আগে কোথায় দেখেছি মনে করতে পারছি না।’

ব্যোমকেশের সাবকনশাসে সেক্সের এই চাপা আগুন ছবিতে ইচ্ছে করে রাখা হল কিনা, জানি না সেটা আমি। কিন্তু এর ফলে যে ছবিটা আরও ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠেছে, তাতে সন্দেহ নেই কোন।

এখানে সোজাসুজি একটা কথা জানিয়ে রাখছি আমি। ব্যোমকেশের যে গল্পটা থেকে এই ‘ব্যোমকেশ গোত্র’ তৈরি হল, আমার মতে সেই ‘রক্তের দাগ’ বেশ খাজা একটা স্টোরি। খোদ শরদিন্দুর লেখা নিয়ে কমেন্ট করছি বলে কিছু মনে করবেন না প্লিজ। বহু বছর আগে গল্পটা যখন প্রথম পড়ি, তখনই আমার মনে হয়েছিল এটা যেন সম্পাদকের ফরমায়েশ না-এড়াতে পেরে নিছক একটা পাতা-ভরানো লেখা। গল্পের বেসিকেই তো মহা-গণ্ডগোল! নইলে সত্যকামের মত একটা ফুর্তিবাজ মানুষ, যে এর-ওর সঙ্গে শুয়ে বেড়িয়ে মহা-মজায় কাটিয়ে যাচ্ছে দিন, সে হঠাৎ নিজের খুন হওয়ার সম্ভাবনা টের পেয়েও গল্পে কোথাও সেটা আটকাতে চাইবে না কেন?

উলটে গোয়েন্দার কাছে এসে তাঁকে বলবে যে, খুন হয়ে যাওয়ার পরে – তবে তদন্তে নামতে। সঙ্গে আবার এর জন্য মোটা টাকা পারিশ্রমিকও দেবে! এই যে এত কিছু করলো সত্যকাম, কেন করবে বলুন সে এই কাজগুলো, এতে তার মোটিভটা ঠিক কী? এমন কি সে তো এটাও বলছে না যে তদন্ত করে সেই খুনিকে আপনি পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেবেন, স্যর!

একলা শুধু ব্যোমকেশকে নিজের কেচ্ছা জানিয়ে লাভটা কী হবে তার?

সত্যকামের মোটিভ নিয়ে শরদিন্দুর কাহিনী বলুন কিংবা অরিন্দমের ছবি, কোথাও কিন্তু কোন শব্দ নেই। সিনেমা বানাতে এসে অরিন্দম তো আবার দেখছি, শরদিন্দুর চেয়েও এক কাঠি বেশি সরেস! শরদিন্দুর ‘সত্যকাম’ এই কলকাতারই মানুষ, আমহার্স্ট স্ট্রিটের লোক। সেখান থেকে ব্যোমকেশের বাসায় আসা খুব একটা বড় কিছু কাজ না। কিন্তু অরিন্দম তো তাঁর ছবিতে দ্যাখাচ্ছেন, সত্যকাম সুদূর সেই মুসৌরিতে থাকে! আর সেখান থেকে কার্যত কোন মোটিভ ছাড়াই গোয়েন্দাকে অ্যাপয়েন্ট করতে কলকাতা অবধি আসে!

গল্পের লোকেশনটা পালটে দেওয়ায় সিনেমার লুক-ফিল আর সিনিক বিউটি আরও ভাল হয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু ক্রেডিবিলিটিতে কী চাপ হল, বুঝতে পারছেন তো?

একে এরকম বেখাপ্পা সব ব্যাপার, তারপরে ভাল করে যদি স্ক্যান করেন তো বুঝতে পারবেন, এই ‘রক্তের দাগ’ কিন্তু আসলে ব্যোমকেশের অন্য গল্প ‘আদিম রিপু’র মশলাগুলোকে একটু এদিক-ওদিক সাঁতলে নিয়ে তৈরি একটা স্টোরি। ‘আদিম রিপু’র শেষের কটা ডায়ালগ যদি লিখে দিই এখানে, তো সে ব্যাপারটা আপনার কাছে স্পষ্ট হবে আরও।

‘প্রভাত মড়ার মত মুখ তুলিয়া উঠিয়া বসিল, ভগ্নস্বরে বলিল, ‘ব্যোমকেশবাবু এর চেয়ে আমায় ফাঁসি দিলেন না কেন? রক্তের এ কলঙ্কের চেয়ে সে যে ঢের ভাল ছিল।’ ব্যোমকেশ তাহার কাঁধে হাত রাখিয়া দৃঢ় স্বরে বলিল, ‘সাহস আনুন প্রভাতবাবু। রক্তের কলঙ্ক কার নেই? ভুলে যাবেন না মানুষ জাতটার দেহে পশুর রক্ত রয়েছে। মানুষ দীর্ঘ তপস্যার ফলে তার রক্তের বাঁদরামি কতকটা কাটিয়ে উঠেছে… চেষ্টা করলে রক্তের প্রভাব জয় করা অসাধ্য কাজ নয়।’

কী মনে হচ্ছে, প্রভাত নামটা না লিখে দিলে আর আগে থেকে কিছু না বলে দিলে বুঝতে পারতেন এগুলো ‘আদিম রিপু’র লাইন? মনে হচ্ছে না হাতে গরম ‘রক্তের দাগ’ থেকে তুলে দেওয়া হল বলে? 

সাহিত্যের পাতা থেকে এবার সিনেমা স্ক্রিনে আসুন। অরিন্দমের তৈরি ‘ব্যোমকেশ গোত্র’ বেশ টানটান ছবি ঠিকই, কিন্তু ভাল করে খতিয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন এতে এমন বেশ কয়েকটা ব্যাপার রয়েছে, যেগুলোর পেছনে আদৌ লজিক নেই কোন।

যেমন ধরুন, মুসৌরির রাস্তায় ব্যোমকেশের চূড়ান্ত সেই ঝাড়পিট করার সিন। ব্যোমকেশ যে অরিন্দমের পাল্লায় পরে হিন্দি সিনেমার হিরোর মত অ্যাকশন করে, সেটা নিয়ে আমার কিন্তু অসুবিধে নেই কোন। একসঙ্গে ছ’টা লোককে প্রায় একলা পিটিয়ে ঘায়েল করার পরেও যে তাঁর চোখের চশমা এদিক থেকে ওদিকে সরে না, সিনেমার স্ক্রিনে এটাও দেখতে দিব্যি লেগেছে আমার। ব্যোমকেশের একটা ঘুষিতে গুণ্ডারা যখন উলটোদিকে ডিগবাজি খেয়ে ছিটকে পড়ছে দূরে, সেই শটগুলোর তো জবাব হবে না কোন!

প্রবলেম হল, বুঝতে পারি নি যে, ব্যোমকেশকে এভাবে পেটাতে গুণ্ডা লাগাল কে? তার মোটিভটা ঠিক কী? অরিন্দম দেখিয়ে দিচ্ছেন এটা আসলে সত্যকামের কাজিন ব্রাদার শীতাংশুর (নামের বানান মূল টেক্সট-অনুসারী) কাজ। কিন্তু শীতাংশু কেন এই কাজটা করতে যাবে, তারও তো যুক্তিগ্রাহ্য হিসেব যে নেই কোন!

শীতাংশুর ক্ষার ছিল যে ছেলের উপর, সেই সত্যকাম তো ততক্ষণে মৃত! আর গল্পটা যারা জানে, তারা এটুকুও তো বেশ ভালই জানে, সত্যকামের খুনের পেছনে শীতাংশুর হাত নেই। অর্থাৎ ব্যোমকেশের তদন্ত থেকে ওর ডিরেক্ট ক্ষতি হওয়ার চান্স নেই কোন কিছু। তাহলে ব্যোমকেশের ওপর ওর এত জাতক্রোধ হবে কী কারণে, যে মুসৌরির রাস্তায় ছ-ছটা গুণ্ডা লেলিয়ে গোয়েন্দাকে মার খাওয়াবে ও!

ব্যোমকেশের এই অ্যাকশন সিন থেকে আসুন এবার সত্যকামের অ্যাকশন সিনটায়। কারুর মেয়ে, কারুর বোন, কারুর লাভারের সঙ্গে শুয়ে বেড়াচ্ছে বলে সারা মুসৌরি সত্যকামকে মারার জন্যে ক্ষেপে উঠেছে, এই লজিকে ভুল নেই কোন কিছু। কিন্তু এখানে আবার খটকা কোথায় জানেন? সত্যকাম তো বড়লোকের লালটু ছেলে, সারা দিন মদ আর মেয়েমানুষ নিয়ে যার যৌবনবেলা কাটে। তাকে যখন পাঁচ-ছটা তাগড়া লোক একসঙ্গে অ্যাটাক করে, তখন একলা হাতে সেই সবকটাকে ঘায়েল ও করছে কী করে দাদা? এবং এখানেও ঝাড়পিটের স্টাইল যদি খেয়াল করেন, দেখতে পাবেন পুরো সেই হিন্দি সিনেমার হিরোর মত যেন! জাস্ট একটা করে ঘুষি আর তাতেই ইয়া সব পালোয়ানগুলো ছিটকে পড়ছে দূরে।

ভেবে বলুন, এর পেছনে আদৌ কোন হিসেব পেলেন খুঁজে?

এটা ছাড়া আরও সব চাপের ব্যাপার আছে। যেমন ধরুন, অরিন্দম বেশ দেখিয়ে দিলেন, সেই ’৫২ সালের মুসৌরিতে গিজগিজ করছে ওপার বাংলা থেকে ছিটকে আসা শরণার্থীর দল! এখন ঘটনা হিসেবে এটাও খুব কনভিন্সিং কি? নামী বেওসায়ি থেকে শুরু করে লাস্যময়ী বার-গায়িকা – মুসৌরিতে সবাই নাকি বাঙালি! সন্ধেবেলা সেই এলাকার ভাঁটিখানায় বার সিঙ্গার বাংলা গান গায়! আপনি বলুন, ধরতে গেলে এটাও একটু গুরুপাক নয় কি?

আর একটা কথা বলুন আমায়, ব্যোমকেশ অ্যান্ড কোম্পানির কি দায় রয়েছে সর্বসময় নিজেদেরকে সোশ্যালি খুব কনশাস বলে প্রমাণ করে চলার? এদিকে সিগার টানতে গিয়ে কিউবার রাজনীতিতে কয়েক বছর পরে কী ঘটবে, সেটা নিয়ে কমেন্টস ছাড়ছে ব্যোমকেশ, ওদিকে ড্রেস কিনতে দোকানে ঢুকে পশুপ্রেম জাহির করছে তস্য ওয়াইফ সত্যবতী বক্সী। ছোট্ট একটা প্রশ্ন আসছিল মনে যে, ব্যোমকেশের এতই যদি হাই-ভোল্টেজ জ্ঞান, বৌয়ের কথা শুনে তাহলে সিগারেটটা আজও ছাড়তে পারে না কেন?

পুরো ছবির বেশিটা জুড়ে ছড়িয়ে আছে কামুক সত্যকাম। কখনও সে আদর করছে মীরাকে (বিবৃতি চট্টোপাধ্যায়), কখনও লেহন করছে এমিলি সাবিত্রী বিশ্বাসের (প্রিয়াঙ্কা সরকার) নিলাজ শরীরখানা। কাজিন সিস্টার চুমকির (সৌরসেনী মৈত্র) সঙ্গেও তার দেহ-রিলেশন আছে। শুধু এটুকু নয়, প্রথম আলাপেই সত্যবতীর শরীরী রূপের স্তুতি শুরু করে দ্যায় ও, আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে শরীর।

ব্যোমকেশ অবধি থম্‌ মেরে যায় দেখে!

এখানে আমার একটা কথা বলার আছে স্যর! সত্যকামকে দেখে আমার কামুক প্রেমিক মনে হচ্ছিল ঠিকই। কিন্তু এটা বুঝতে পারছিলাম না, ছেলেটাকে কেন ‘পারভার্ট’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হল। ‘পারভার্ট’ তো অন্য জিনিষ ভায়া! ছবিতে একটা কোন সিন পাই নি, যেখানে কোন মেয়েকে জোর করতে দেখেছি আমি ওকে। কোন বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে কিছু করতে দেখি নি আদৌ। নিজের মুখেই এটাও বলেছে যে, পঁয়ত্রিশের চেয়ে বেশি বয়সী কারুর দিকে হাত বাড়ায় না ও। আর হ্যাঁ, নিজেকে নিয়ে চাঁচাছোলা সত্যি বলার হ্যাবিটও আছে ওর। কখনও বলছে ‘সংসার করার জন্য আমি জন্মাই নি, সংসারে আগুন ধরানোর জন্য আমার জন্ম’। আবার কখনও বলছে, ‘আমি সাপের বিষের নেশার মত। একটুখানি ছোবল ভাল। বেশি হলে বিষিয়ে যাবে।’

একটা কথা বুঝতে পারছিলাম না যে, যে মানুষ নিজের সম্পর্কে এতটা অনেস্ট কথা বলতে পারে, পাবলিক তাকে মারার জন্য ক্ষেপে না উঠে নিজেদের ঘরের ঢলানি মেয়েগুলোকে সামলাচ্ছিল না কেন গিয়ে? আর এই ছেলেকে যদি ‘পারভার্ট’ বলে স্ট্যাম্প মেরে দ্যান তো আমাদের কৃষ্ণ ঠাকুর কী?

এবার খুনের দৃশ্যে আসুন। শরদিন্দুর লেখার ছিল লিখে গ্যাছেন, কিন্তু সিনেমাতে দ্যাখার সময় টের পাবেন যে, সত্যকামের খুন হওয়ার সিনটা আসলে গল্পের দুর্বলতম পার্ট। খুনের জন্যে যে ভাবে একটা রাংতার টুকরো ইউজ হল, সেটা নিছক ছেলেমানুষির মত। আর সবচেয়ে বড় কথা, পিঠে একটা মাত্র গুলি খেয়ে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুটাও তো খুব বেশি আনইউজুয়াল থিং! অন্ধকারের মধ্যে অপটু হাতে ছোঁড়া গুলি প্রথম চান্সেই হৃদপিণ্ড ভেদ করে গ্যাল, লেখার সময় শরদিন্দু এর সম্ভাব্যতা ভেবে দেখেছিলেন কি?

সত্যকামকে এর চেয়ে তো ঢের সহজে মারা যেত বিষ প্রয়োগ করে!

গল্পের আর সিনেমার এই খামতিগুলো এই লেখাতে দেখিয়ে দিচ্ছি ঠিকই। কিন্তু এর সঙ্গে সোজাসুজি এটাও বলতে চাই যে, প্রায় জোড়াতালি-মারা গল্পটা নিয়েও অরিন্দম সিনেমায় যেটা তৈরি করেছেন, সেটা রীতিমত তারিফযোগ্য কাজ।

শুধু সংলাপের কথাই ধরুন। ব্যোমকেশের ছবির ডায়ালগ এত কুশলী হাতে শেষ যে কবে লিখতে দেখেছি, চট করে মনে পড়ছে না তা। একদম শেষে সত্যবতীর ব্যোমকেশকে আলগোছে বলা একটা কথা মনের মধ্যে এসে পুরো কিক মারল যেন। ‘অপরাধী খুঁজতে খুঁজতে, মনস্তত্ত্ব বুঝতে বুঝতে নিজে নিষ্ঠুর হয়ে যেও না। আমাদের জীবনে দয়া, ক্ষমা, এগুলোর তো একটা মূল্য আছে।’ পড়তে এখানে কেমন লাগল জানি না, কিন্তু সিনেমার লাস্ট ফ্রেমে গিয়ে এই কথাটার অভিঘাত প্রায় অমোঘ হয়ে লাগে!

আবীরের অভিনয় নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই, শুধু এটুকু বলতে পারি যে ওর চোখের তারার মুভমেন্টগুলো নজর করবেন আলাদা করে, ছবি দ্যাখার মজা বেড়ে যাবে অনেকগুণ। আর সব্যসাচী চক্রবর্তীর ছেলে অর্জুনের ইমেজ এতদিন ছিল লক্ষ্মী ছেলের মত, এই ছবিতে দুষ্টু ছেলের ভূমিকায় তিনি যে কী ভাবে ফাটিয়ে দিলেন শুধু সেটুকু দ্যাখার জন্যেই তো ছবিটা দেখতে পারেন।

এর আগে এই কলামেই ‘হর হর ব্যোমকেশ’ (২০১৫) আর ‘ব্যোমকেশপর্ব’কে (২০১৬) এফোঁড়-ওফোঁড় করেছি আমি সমালোচনার বাণে। কিন্তু ‘ব্যোমকেশ গোত্র’ দেখতে গিয়ে মনে হল, একদম প্রথম ছবি ‘আবর্ত’তে (২০১৩) যে ম্যাচিওরিটিটা দেখিয়েছিলেন, সেই ম্যাচিওর অরিন্দম শীল আবার ফেরত এসেছেন যেন।

এখনও পর্যন্ত এবার পুজোয় সৃজিত, কৌশিক আর অরিন্দমের যে ছবিগুলো দ্যাখার সুযোগ হল – তার মধ্যে আমার মতে এই ছবিটাই বেস্ট!

2 COMMENTS

  1. Cinemata vsn valo legeche amar !!apnar sange Ami o ekmot.porichallaker kaj satti prosongsoniyo.dialogue writing vsn smart ebong Mon diye na sunle anek kichu miss krte Hobe!!avinoy e protyekei khub valo.r parisese boli cineme k just 1ta entertaing cinema hisebei Ami enjoy krte chaibo,golper truti khujte jabona!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here