রাবণের আদেশ এক গ্রহ অমান্য করায় নিশ্ছিদ্র হতে পারল না মেঘনাদের জন্মকুণ্ডলী

3366

হিন্দু শাস্ত্রে অভিশাপ পর্বে এতজনের কথা বললাম | কিন্তু একজনের কথা বাদ পড়ে গেছে | নতুন বছরে অভিশাপ নিয়ে লিখব না ভেবেছিলাম | কিন্তু মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিতের প্রসঙ্গে না বললে হিন্দু পুরাণে অভিশাপ বিষয়ে কথন অসম্পূর্ণ থেকে যায় | রাবণপুত্রের জীবনে আশীর্বাদও যথেচ্ছ পরিমাণে বর্ষিত হয়েছিল | আশীর্বাদ না অভিশাপ‚ কার পাল্লা ভারী‚ সে বিচারের ভার মহাকবিরা ন্যস্ত করেছেন পাঠকের স্কন্ধেই | 

লঙ্কাধিপতি রাবণ এবং তাঁর মহিষী মন্দোদরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র মেঘনাদ | জন্মের পর তাঁর কান্না এত তীব্র ছিল‚ যেন বোধকরি মেঘের গর্জন | তাই তাঁর নামকরণ হয় মেঘনাদ বা মেঘের বজ্রনির্ঘোষ | তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাজিত করে স্বর্গলোক জয় করেছিলেন | ফলত আর এক নাম ইন্দ্রজিৎ | 

শুক্রাচার্যর কাছ থেকে সকল যুদ্ধবিদ্যা আয়ত্ত করেছিলেন | উপর্যুপরি ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর এই ত্রিদেবের নিকট থেকে লাভ করেছিলেন ব্রহ্মাস্ত্র | দেবলোকের পাশাপাশি পরাস্ত করেছিলেন রাম লক্ষ্মণকেও | নিশ্চিহ্ন করেছিলেন অর্ধ মানব অর্ধ বাঁদর জাতিকে | তাঁর অপর নাম হল রাবণি‚ শক্রজিৎ‚ বাসবজিৎ এবং ঘননাদ | বিশ্বে যতজন মহা মহা মহারথী আবির্ভূত হয়েছেন‚ তাঁদের মধ্যে একজন মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎ |

রাবণ চেয়েছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের জীবন যেন সম্পূর্ণরূপে বাধাবিঘ্নহীন হয় | মন্দোদরী যখন আসন্নপ্রসবা রাবণ আদেশ দিলেন চন্দ্র সূর্য-সহ সকল গ্রহ উপগ্রহ এবং নক্ষত্রমণ্ডলীকে | যাতে সদ্যোজাতর জন্মছক এমন হয়‚ কোনওদিনও কোনও বিঘ্ন তাঁর অন্তরায় না হতে পারে | রাবাণ যেমন ছিলেন দক্ষ বীণাবাদক তেমনই নিপুণ জ্যোতিষী | তাঁর মতো শক্তিধরের আদেশ অমান্য করবে এমন আর কে আছে জগৎ সংসারে ? সকল গ্রহ নক্ষত্র নক্ষত্রমণ্ডলী দশাননের আদেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করল | আদেশ অমান্য করলেন শুধু শনিগ্রহ | বাকি সবাই যখন অবস্থান করছিলেন নবজাতকের কুণ্ডলীর একাদশতম কক্ষে‚ শনিগ্রহ তখন বিরাজ করতে লাগলেন দ্বাদশ কক্ষে | এর ফলেই মেঘনাদের পতন হয় লক্ষ্মণের কাছে |

ক্রমে দশানন-তনয় এমন অস্ত্রের অধিকারী হলেন‚ যা ছিল না ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের কাছেও | একসঙ্গে তাঁর কাছে ছিল ব্রহ্মনাদ অস্ত্র‚ বৈষ্ণবাস্ত্র এবং পাশুপৎ অস্ত্র | অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত মেঘনাদ ছিলেন বিপক্ষের ত্রাসের কারণ | অস্ত্র আর শস্ত্রের মধ্যে একটা সুক্ষ্ম পার্থক্য আছে | অস্ত্র হল যা মূলত নিক্ষেপ করা হয় | শস্ত্র হচ্ছে যা হাতে ধারণ করে শত্রুকে আঘাত করতে হয় | শস্ত্রকে হস্তে ধারণ করেও রাখতে হয় | প্রয়োজনে তা নিক্ষেপ করা হয় | শস্ত্র হল তরবারি‚ গদা বা বর্শা ইত্যাদি |

মেঘনাদের কাছে ছিল অন্তত তেইশ প্রকার মহা শস্ত্র | অস্ত্র ছিল কম পক্ষে একশত | সবই তিনি লাভ করেছিলেন দেবতাদের নিকট থেকে আশীর্বাদ স্বরূপ | কিছু অস্ত্র ছিল আত্মরক্ষার নিমিত্ত | কিছু অস্ত্র নির্ধারিত ছিল আক্রমণহেতু | এতটাই দক্ষ ছিলেন ইন্দ্রজিৎ‚ একবার মাত্র শরনিক্ষেপ করে বিনাশ করতেন একাধিক শত্রুকে | 

লঙ্কায় রাম রাবণের যুদ্ধে শেষ লগ্নে অবতীর্ণ হন মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎ | তখন তাঁর সকল ভ্রাতা নিহত হয়েছেন | বধ করা হয়েছে কাকা কুম্ভকর্ণকে | এমতাবস্থায় ইন্দ্রজিৎ এলেন সমরক্ষেত্রে | তিনদিন তিনি যুদ্ধ করেছিলেন রামচন্দ্র ও রামানুজের বিপক্ষে |

প্রথম দিনেই ইন্দ্রজিতের নাগপাশে আবদ্ধ হন রাম-লক্ষ্মণ | সংজ্ঞাহীন দুই ভ্রাতা ভূপতিত হন | কয়েক লক্ষ সর্পের বন্ধন থেকে তাঁদের উদ্ধার করেন গরুড় | তিনি সর্পকূলের শত্রু | সেইসঙ্গে ভগবান বিষ্ণুর সারথি | রামচন্দ্র ছিলেন বিষ্ণুর সপ্তম অবতার | 

ক্ষিপ্ত হয়ে দ্বিতীয় দিন প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন ইন্দ্রজিৎ | মেঘের আড়ালে লুকিয়ে‚ অদৃশ্য হয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন | তাঁর প্রখর সমর বুদ্ধিতে বিপন্ন বোধ করলেন সুগ্রীব ও বানরসেনা | এইদিনই ইন্দ্রজিতের শরাঘাতে অচেতন হয়ে পড়েন লক্ষ্মণ | সুষেণের নির্দেশে তাঁকে সুস্থ করে তোলা হয় গন্ধমাদন পর্বতের বিশল্যকরণী লতার মৃতসঞ্জীবনী সুধায় |  

বারংবার দৈবশক্তি রামলক্ষ্মণকে রক্ষা করছে দেখে ইন্দ্রজিৎ এবার শেষ পন্থা ধারণ করলেন | নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে বসলেন যজ্ঞে | এই যজ্ঞে সমাপনে সফল হলে তিনি হবেন অপরাজেয় | সেই বার্তা রাম লক্ষ্মণকে পৌঁছে দিলেন বিভীষণ | তিনি জানতেন যজ্ঞরত মেঘনাদ কোনও অস্ত্র বা শস্ত্র স্পর্শ করবেন না | বিভীষণের চিনিয়ে দেওয়া পথে রাম লক্ষ্মণ প্রবেশ করেন যজ্ঞাগারে | তাঁদের সঙ্গে কাকা বিভীষণকে দেখে বিমূঢ় হয়ে পড়েন মেঘনাদ | তিনি অস্ত্র স্পর্শ না করে যজ্ঞের বাসনাদি দিয়ে প্রতিরোধ করেন বিপক্ষকে | 

নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার থেকে এই প্রতিরোধে বেরিয়ে এসে স্বমূর্তি ধারণ করেন ইন্দ্রজিৎ | একে একে তিন ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করলেন লক্ষ্মণের উদ্দেশে | ব্রহ্মনাদ‚ বৈষ্ণবাস্ত্র এবং পাশুপৎ অস্ত্র | কিন্তু বিস্মিত রাবণি দেখলেন একটিও স্পর্শ করল না লক্ষ্মণকে | 

এদের কাছে জয় অসম্ভব উপলব্ধি করে যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে অদৃশ্য হয়ে পিতা সমীপে গেলেন মেঘনাদ | অনুরোধ করলেন রামচন্দ্রের নিকট ক্ষমাভিক্ষা করে সন্ধির পথ অবলম্বন করতে | ক্রোধান্ধ রাবণ পুত্রের অনুরোধেও কর্ণপাত করলেন না | উপরন্তু তাঁকে ভর্ৎসনা করলেন | কেন তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেছেন |

জন্মদাতার নিষ্ঠুর ব্যবহারে অপমানিত ও আহত ইন্দ্রজিৎ বললেন তিনি পালিয়ে আসেননি | তিনি পিতাকে সতর্ক করতে এসেছিলেন | কারণ তিনি সম্যক অবগত‚ এই যুদ্ধে তাঁদের পতন অনিবার্য |  এরপর পিতা মাতা ও স্ত্রী শেষনাগ কন্যা সুলোচনা বা প্রমীলার কাছ থেকে বিদায় নিলেন ইন্দ্রজিৎ | প্রাণপণ শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করেও তিনি পরাজিত হলেন | তাঁর মস্তকছেদ করেন লক্ষ্মণ | 

বিভিন্ন রামায়ণ ভেদে বিবরণের রকম ফের আছে | পিতা রাবণের কাছে গিয়ে ইন্দ্রজিতের সতর্ক করার প্রসঙ্গটি সবস্থানে নেই | তথাপি পরিশেষে সারমর্ম হল যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে সূর্যোদয়ের আগে নিরস্ত্র মেঘনাদকে বধ করেন রামানুজ লক্ষ্মণ | 

আমার কাছে রামায়ণের মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎ এবং মহাভারতের কর্ণ সমগোত্রীয় | দুজনেই মহাবীর হয়েও করুণ পরিণতির স্বীকার | মাইকেল মধুসূদন দত্তের অবিনশ্বর সৃষ্টির উপজীব্য হয়েছেন মেঘনাদ | মধুকবির মেঘনাদবধ কাব্য যে বছর প্রকাশিত হয়েছিল‚ সেই ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে জন্ম হয়েছিল এমন এক বিরল প্রতিভার‚ যাঁর কলমে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল কর্ণকুন্তী সংবাদ |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.