ভবিষ্যতে নির্মলা কি পারবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে ?

বছর ১০/১১ আগেও বিজেপি যখন কেন্দ্রে বিরোধী আসনে; দলের কেন্দ্রীয় সংগঠনে একজন ঝাঁঝালো ও বলিষ্ঠ মহিলা মুখপাত্র নেই বলে রাজনাথ সিংহ, অরুণ জেটলি প্রমুখ প্রায়ই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতেন। তাঁরা খুঁজছিলেন এমন কাউকে যিনি হবেন বেশ বলিয়ে কইয়ে। অবশ্য বিজেপিতে তখন সুষমা স্বরাজ, উমা ভারতী প্রবল সক্রিয়। কিন্তু তাঁদের তো আর মুখপাত্র স্তরে টেনে আনা যায় না। তবে সে অভাব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

২০০৮ সালের নভেম্বরে কর্নাটকে বিজেপি-র জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজর কাড়েন নির্মলা সীতারমন। ঠিক যেমনটা ভাবছিলেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। নির্মলা উচ্চশিক্ষিত, তাঁর প্রতিটি কথা কেবল ঝাঁঝালো নয়, পিছনে রয়েছে ধারালো যুক্তি । দিল্লি ফিরে এসে জেটলিই দলের সভাপতি রাজনাথকে প্রস্তাব দিলেন, নির্মলাকে জাতীয় স্তরে মুখপাত্র করা হোক। এর পর নির্মলাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি
। রাইসিনা হিলের সাউথ ব্লক থেকে নর্থ ব্লকে আনা হল তাঁকে । বিগ ফোরে তাঁর আসন রইল অটল। শারীরিক
অসুস্থতার কারণে অরুণ জেটলি মন্ত্রী হতে অনীহা প্রকাশ করায় নির্মলার উপরেই অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হল।

স্পষ্ট হয়ে গেল মোদি-অমিত শাহর কতটা আস্থাভাজন তিনি। নির্মলা অর্থমন্ত্রক পাওয়ায় কেবল বিজেপি বা এনডিএ জোটশরিকরাই নয়, বিরোধী শিবির থেকে এসেছে অভিনন্দনের বন্যা। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তনী নির্মলা রাজনীতিতে আসার আগে লন্ডনে একটি কনসালটিং ফার্মে কাজ করতেন। দেশে ফিরে হায়দ্রাবাদের সেন্টার ফর পাবলিক পলিসি স্টাডিজ-এর ডেপুটি ডিরেক্টর পদ। বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বে জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য নির্মলা ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। বছর দেড়েক পর পেয়েছিলেন দলের সর্বভারতীয় মুখপাত্রের দায়িত্ব । ২০১৪ সালে প্রথমবার অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে রাজ্যসভার সদস্য তারপর মন্ত্রিত্ব; মোদির প্রথম মেয়াদে কোম্পানি বিষয়ক মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রকের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রমন্ত্রী । পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

নির্মলা প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন মধ্যেই গগণশক্তি ২০১৮ নামে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রকল্প চিন সীমান্তে শক্তি প্রদর্শন করে ভারতীয় বায়ুসেনা। সুখোই, সি সেভেনটিন গ্লোবমাস্টার, এমআই ১৭ হেলিকপ্টারের মহড়া হয়। দেখা হয় সি ১৩০ হারকিউলিস হেলিক্টপারের কার্যকারিতা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা অরুণাচলের ভারত-চিন সীমান্তবর্তী বিতর্কিত জেলা আনজোতে গিয়ে সেনাবাহিনীরও গ্রামবাসীদের সঙ্গেও কথা বলেন। তাতে বেজায় চটে চিন। বরাবরই অরুণাচল প্রদেশকে দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে দাবি করে এসেছে চিন। সেখানে ভারতের কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সফর ভাল চোখে দেখবে না চিন। উল্লেখ্য, দু’দেশের মধ্যে ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল রয়েছে।

প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পেয়ে ইন্দো-চিন সীমান্তে নাথু লা সফরে গিয়ে সম্প্রীতির নজির গড়েন নির্মলা। একেবারে জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে চিনা সেনাদের উদ্দেশে সীতারমন ‘নমস্তে’ জানান। পিপলস লিবারেশন আর্মির সেনারা ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে মানদারিন ভাষায় ‘নি হো’ বলে সম্বোধন করে, মানে ‘হ্যালো’। নির্মলা তাঁদের নমস্তের মানে বোঝান এবং বলানোর চেষ্টা করেন। শেষমেশ চিনা সেনারা হাতজোড় করে নমস্তে জানান । রাজনীতির কারবারিরা বলছেন অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা এবং কর্পোরেট জগতে কাজের অভিজ্ঞতার কারণেই তাঁকে অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া । অনেকে নির্মলার মধ্যে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী দেখছেন। ইন্দিরা গান্ধী ভারতের রাজনীতিতে রেকর্ড গড়েছিলেন দেশের প্রথম মহিলা প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে। তাঁর পর প্রথমে প্রতিরক্ষা ও পরে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন নির্মলা । কিন্তু ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী কি সম্ভব ?

বিজেপিতে আডবানী থেকে মুরলীমনোহর যোশীর ব্যাকফুটে চলে যাওয়া ও নীতীন গড়করির ক্ষমতা খর্ব হওয়ায় দলে অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী মোদি। নির্মলা মোদি-শাহর বিশ্বস্ত হলেও এই দুজনের ক্ষমতার কাল এখন পাঁচ বছর। এরপরও যদি দেশের শাসন ক্ষমতায় গেরুয়া শিবিরই থেকে যায় তাতেও নির্মলার পক্ষে অমিত শাহকে টপকে দু’নম্বরে পৌঁছান অসম্ভব। কারণ তিনি যোগ্যতায় শাহর থেকে যতখানি এগিয়ে ক্ষমতায় ততটাই পিছিয়ে।

ইতিমধ্যেই রাজনীতির কারবারিরা প্রশ্ন তুলেছেন অর্থের দায়িত্ব নির্মলার হাতে পুরোপুরি থাকবে ? প্রথম মেয়াদে নির্মলা যখন বাণিজ্যমন্ত্রকে ছিলেন তখন বকলমে তাঁর মন্ত্রক চালাতেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। পরে নির্মলা প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্ব নেওয়ার পর মোটামুটি ভাবে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় থেকেই মন্ত্রক চালানো হত বলেই বিজেপি করিডরের আলোচনা । তাই এবারও মনে হচ্ছে অর্থমন্ত্রকের সচিবরাই প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে মন্ত্রক চালাবেন। নির্মলা সামনে থাকবেন মাত্র। মোদী-শাহ নিশ্চিন্তে থাকবেন যে তাঁদেরকে অন্ধকারে রেখে অর্থমন্ত্রী আগ বাড়িয়ে কোনও উদ্যোগও নেবেন না, দুর্নীতির আশঙ্কাও থাকবে না। তাই দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভবনা অলীক।

Advertisements

3 COMMENTS

  1. যা অসম্ভব তা নিয়ে এত চিন্তা ভাবনা করে লাভ কী?

  2. দিল্লির জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনিতি-র প্রাক্তনী নির্মলা সীতারমনের বিজেপি রাজনীতিতে যোগদান থেকে ২য় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী হওয়াটা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক কিন্তু মোদি-শাহর একচেটিয়া ক্ষমতাতন্ত্রে তার বেশী এগনো যে সম্ভব নয় সেটা নির্মলাও ভাল জানেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.