সদা হাস্যময়ী সুচিত্রার একটা চাপা দুঃখ ছিল

‘ জেনেছি সুখের নাহি শেষ‚ শরীর ধারণ বিড়ম্বন;
যত উচ্চ তোমার হৃদয়‚ তত দুঃখ জানিবে নিশ্চয় |’

এই কবিতাংশটি স্বামী বিবেকানন্দের লেখা ‘সখার প্রতি’ কবিতা থেকে নেওয়া হল | এটি ব্যবহার করার কারণ হল যুক্তিযুক্ততা | যাকে মনে করে এটি এখানে রাখলাম সেই সুচিত্রার সঙ্গে আমার সখ্যতা সেই ১৯৮৩-৮৪ সাল থেকে | সেই বন্ধু বিনি খবরে প্রায় চকিতে চলে গেল এই সদ্য—-১২ মে | ঠিক তার আগের মাসে—-১১ এপ্রিল আমার মা চলে গেল | প্রায় একই সঙ্গে দুজন রমণী আমার কাছ থেকে সরে গেল | আমি জানি‚ আমার মা কতখানি বন্ধু | আমার সামান্য লেখালেখির সঙ্গে মার অখণ্ড যোগ সেই কিশোরকাল থেকে | আর সুচিত্রার সঙ্গে কবে থেকে‚ সে কথা তো বলেইছি | এই দুজনই একই সঙ্গে আমার বন্ধু | আর কী আশ্চর্য‚ দুজনেই পিঠোপিঠি সময়ে চলে গেল |

সুচিত্রা আসত আমাদের ‘গল্পচক্র’ নামে টাটকা গল্প পাঠের আসরে সেই তিরাশি সাল থেকে | এর প্রধান আয়োজক ছিল বন্ধু রাধানাথ মণ্ডল—যে একজন উচ্চকোটির লেখক ছিল | সেও চলে গেছে বহুকাল‚ এক গাড়ি দুর্ঘটনায় | বৈষ্ণবঘাটায় তার বাড়িতে নিয়ম করে গল্পপাঠের আসর বসত |

সেখানে সুতপন‚ শ্যামল‚ অমর‚ ঝড়েশ্বর—-প্রায় সব নবীন গল্পকার গিয়ে জমতাম | সে এক দেখার মতো অবস্থা | নতুন গল্প লিখে ফেলতেই হবে | না হলে রাধাকান্তের ধমকের হাত থেকে নিস্তার নেই | মাঝে মাঝে সেই আসরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়‚ সমরেশ বসু‚ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ এসেছেন | আমরা উৎসাহ পেয়েছি |

সুচিত্রাও তখন গল্প লিখছে | তবে কেমন যেন লুকোনো অব্স্থায় | সে বেশি কথা বলে না | একধারে বসে গল্প শোনে | সঙ্গে থাকত তার স্বামী—-আমাদের প্রদীপ দা বা ভাই কুণাল | আমাদের মধ্যে মাঝে মাঝে পানাহার হয় | সুচিত্রা তার ব্যাগ থেকে ভাজা মশলা বার করে খায় | তরলে তার মতি নেই | তার ঝোলায় টাটকা গল্প থাকলেও সে সহজে পড়তে চাইত না | তবে যেদিন পড়ত সেদিন অনেকের নাসিকাকুঞ্চন থমকে যেত—-খানিক শোনার পর |

আমরা যারা গ্রামের গল্প লেখক‚ তারাও একদিন আপাদমস্তক শহুরে সুচিত্রার গ্রাম নিয়ে লেখা একটি গল্পপাঠ শুনে চমকে উঠলাম | আবারও প্রমাণিত হল‚ গল্প লেখার জন্যে গ্রামে বা শহরে গিয়ে বাস না করলেও চলে | সেখানে লেখকের তৃতীয় চক্ষু কতটা প্রবল এটাই ভাববার কথা | সুচিত্রা আমার কাছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ |

আসলে বলত কম‚ শুনত বেশি বলেই বুঝি তার তৃতীয় নয়ন দিন দিন প্রবল হয়ে উঠছিল | এখন অনেকেই তাকে আশাপূর্ণা দেবীর উত্তরসূরি বলছেন | এই কথাটি আমি মেনে নিতে পারি না | কোনও লেখকই তার পূর্বসূরির পথ বরাবর চলতে পারেন না | হয়তো প্রথম প্রথম অনুপ্রেরণার সূত্র বলে কিছু একটা ক্রিয়া করে | একসময় সে নিজের বাড়তি চোখ খুঁজে পায় | নিজের মতো করে পড়ে‚ দেখে‚ ভাবে | সুচিত্রাও তাই | তার উপন্যাসগুলি পড়লে বোঝা যায় সংসারের জটিলতার বাঁকা এবং সোজা চোখ কাকে বলে | এখন এই দুঃখের সময়ে তার সাহিত্য নিয়ে বিচার করার সময় আসেনি | কালক্রমে তা হবে | এখন শুধু মনে করতে চাই তার সদাই হাসিপূর্ণ মুখের কথা | গালে পান-জর্দা সহ | পানরাঙা ঠোঁট চিরে সে সদাই প্রাণভরে হাসছে |

তার একটা চাপা দুঃখ ছিল | বেসরকারি ও রাজ্য সরকারি পুরস্কার পেলেও সে ভারত সরকারের নজরে পড়েনি | কিন্তু তার বই যে পরিমাণে বিক্রি হয়ে পাঠকের কাছে যায়‚ পড়ার জন্যে পাঠকের আগ্রহ যে কী পরিমাণ সে কথা সবাই জানে | এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী আছে ? পদস্থ চাকরি ছেড়ে দিয়ে সে বেশ কিছুদিন ‘হোল টাইমার লেখক ‘|

ইদানীং লেখকরা নাকি লেখকের বন্ধু হয় না | সবাই নাকি নিজের পরিসরে ব্যস্ত | একের বিরুদ্ধে অন্যের কাঁটা বেধানোর চল এখন | সুচিত্রার মতো হাটখোলা প্রাণ তাহলে আর কোথায় পাবো ! তার কথা মনে পড়লেই ভিতরটা তাজা ফুল হয়ে যায় | তার সুগন্ধে যে কী আনন্দ !

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.