সিদ্ধার্থ-পত্নী যশোধরা কি সেকালের ‘সিঙ্গল মাদার’?

ছেলেকে কোনওমতেই সন্ন্যাসী হতে দেওয়া যাবে না | রাজা শুদ্ধোধন উঠেপড়ে যোগ্য পাত্রীর খোঁজ করতে লাগলেন | যে সে মেয়ে হলে তো হবে না| স্বয়ং কপিলাবস্তু-যুবরাজের বিয়ে বলে কথা |

মেয়ের সন্ধান দিলেন মহাপ্রজাপতি বা মহাপজাপতি গৌতমী | সিদ্ধার্থর পালিকা জননীই খুলে দিলেন রাজার চোখ | মেয়ে তো আছে ঘরের কাছেই | রাজা শুদ্ধোধনের বোনের মেয়ে অর্থাৎ সিদ্ধার্থের পিসতুতো বোন, যশোধরা |

যশোধরার বাবা ছিলেন কৌল্যিয় বংশের রাজা শুপ্পবুদ্ধা | মা ছিলেন শাক্য বংশের কন্যা, পমিতা | বলা হয়, শাক্য এবং কৌল্যিয় এই দুটি বংশ আসলে সূর্য বংশীয় ইক্ষ্বাকু বংশের প্রলম্বিত অংশ | প্রাক বৌদ্ধ যুগে এই দুটি বংশের সমকক্ষ অন্য কোনও বংশ কপিলাবস্তুতে ছিল না| এবং বিয়ের সম্পর্ক এই দুটি বংশের মধ্যেই তৈরি হত |

বিভিন্ন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ এবং যশোধরা, দুজনেরই জন্ম একই বছরের বৈশাখী পূর্ণিমার দিন | অর্থাৎ, যেদিন বুদ্ধ জয়ন্তী, সেদিন আবার বুদ্ধ-পত্নী যশোধরারও জন্মদিন বটে|

যাই হোক, দুই বংশের সম্মতিতে ১৬ বছরের সিদ্ধার্থের সঙ্গে বিয়ে হল ঠিক এক্কেবারে সমবয়সী যশোধরার সঙ্গে | দাম্পত্যের ১৩ বছরে জন্ম নিল একমাত্র পুত্রসন্তান, রাহুল |

এবং পিতৃত্বের স্বাদ তো ঘরে বাঁধলই না, বরং মায়ার নতুন বন্ধনকে পিছনে ফেলে সিদ্ধার্থ পা রাখলেন জ্ঞানের পথে, আলোকবর্তিকার সন্ধানে |

সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগী হওয়ার পরে ভেঙে পড়েন তাঁর সহধর্মিণী | কিন্তু মনে মনে সঙ্কল্প করেন, স্বামীর পথকেই গ্রহণ করবেন তিনি| ধীরে ধীরে ত্যাগ করেন দামী অলঙ্কার এবং পোশাক | বিনা আভরণে কাষায় বস্ত্রই হল যশোধরার নতুন বসন |

একমাত্র ছেলেকে বড় করার পাশাপাশি তিনি হেলায় ফিরিয়ে দিয়েছেন পাণিপ্রার্থী বহু রাজা-মহারাজাকে | রাজপ্রাসাদে থাকলেও তিনি কান পেতে ছিলেন সংসারত্যাগী সিদ্ধার্থের গতিবিধির প্রতি|

গৃহত্যাগের ৬ বছর পরে সিদ্ধার্থ আসেন কপিলাবস্তুতে | তিনি তখন মহাজ্ঞানী গৌতম বুদ্ধ | শোন যায়, ছেলে রাহুলকে পিতৃ-সাক্ষাতে পাঠালেও তাঁর কাছে যাননি যশোধরা | বরং তিনি ইচ্ছেপ্রকাশ করেন, স্বয়ং সিদ্ধার্থ গৌতম আসুন তাঁর কাছে |

তাঁর সাধ পূর্ণ করেন গৌতম বুদ্ধ | দেখা করতে আসেন পূর্বাশ্রমের পত্নীর সঙ্গে | এরপর ক্রমে ভিক্ষু সঙ্ঘে যোগ দেন রাহুল | সংসারত্যাগ করেন তাঁর মা যশোধরাও | মহাপজাপতি গৌতমীর অধীনে যোগ দেন ভিক্ষুণী সঙ্ঘে | আরও ৫০০ জন মহিলার সঙ্গে | মূলত গৌতমী এবং তাঁর অনুরোধেই ভিক্ষু সঙ্ঘে মেয়েদের প্রবেশ মেনে নেন গৌতম বুদ্ধ |

এরপর জীবনের শেষ দিন অবধি সঙ্ঘ সেবিকা হয়েই থেকে গেছেন যশোধরা | গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের দু বছর আগে ৭৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন তিনি |

জাতকের গল্পে বলা হয়, বুদ্ধ-জন্মের আগেও সিদ্ধার্থের সঙ্গে দেখা হয়েছে যশোধরার | বিগত জন্মে | তখন তাঁর নাম ছিল সুমেধা |

কালের স্রোতে বিস্মৃত হয়েছে যশোধরার নাম | সীমাবদ্ধ হয়ে আছে শুধু স্কুলের ইতিহাস বইয়ের পাতায় | কিন্তু প্রত্যেক পুরুষের সাফল্যের পিছনে একজন নারীর অবদানের তত্ত্ব অনুযায়ী, এটা বলা যায় কি গৌতম বুদ্ধের সাফল্যের নেপথ্যে ছিলেন যশোধরা? কিংবা কখনও কি ভাবা যায় এই অনাম্নী অঙ্গনা আসলে অধুনা ‘সিঙ্গল মাদার’-দের পথিকৃৎ?

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কফি হাউসের আড্ডায় গানের চর্চা discussing music over coffee at coffee house

যদি বলো গান

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স-এ সারা রাত ক্লাসিক্যাল বাজনা বা গান শোনা ছিল শিক্ষিত ও রুচিমানের অভিজ্ঞান। বাড়িতে আনকোরা কেউ এলে দু-চার জন ওস্তাদজির নাম করে ফেলতে পারলে, অন্য পক্ষের চোখে অপার সম্ভ্রম। শিক্ষিত হওয়ার একটা লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল সংগীতের সঙ্গে একটা বন্ধুতা পাতানো।