ঐষিকী বসুমল্লিক
জন্ম ১ নম্ভেম্বর‚ ১৯৯৫ | লোরেটো বউবাজার স্কুলের এই প্রাক্তনী এখন গোখেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী | পড়াশোনা অ্যাডভার্টাইজিং ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সেলস প্রোডাকশন নিয়ে | ভবিষ্যতে থাকতে চান ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত পেশায় | পড়াশোনা-লেখালেখির বাইরে যত্ন করে লালন-পালন করেন বই পড়া আর গান শোনার শখ |

প্রধানত উড়িষ্যার পুরী অঞ্চলের উৎসব হলেও সারা ভারতবর্ষেই রথযাত্রার প্রচলন আছে। যারা বৈষ্ণব অর্থাৎ বিষ্ণুর উপাসক তাদের বিশ্বাস অনুসারে জগন্নাথ দেবই স্বয়ং বিষ্ণু এবং বলরাম হলেন বিষ্ণুর অবতার । আর সুভদ্রা হলেন ভাগবত বর্ণিত কৃষ্ণের ছোট বোন । সুভদ্রা আবার মহাভারতের তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন-এর স্ত্রী । বলা হয় পুরীর সমুদ্র গর্জনে ভীত হয়ে দুই দাদা জগন্নাথ ও বলরামের মাঝখানে আশ্রয় নেন সুভদ্রা । তাই এই তিন মূর্তি জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রাকে নিয়েই হয় জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা । 

Banglalive

ভারতের অন্যান্য অংশের মত পশ্চিমবঙ্গেও, বিশেষ করে কলকাতা শহরেও একসময়ে রথযাত্রা মহাসমারোহে পালন করা হত । কলকাতার প্রাচীনতম এবং কুলীন রথ ঠিক কোনটি তা নিয়ে বেশ কিছু মতপার্থক্য থাকলেও বেশিরভাগ লোকের মতে বৈঠকখানা অঞ্চলের রথটিই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন এবং কুলীন । এই রথটি হল কলকাতার অন্যতম একটি প্রাচীন পরিবার, শেঠ পরিবারের রথ । বছরের অন্যান্য সময় বৈঠকখানা অঞ্চলেরই একটি প্রাচীন বটগাছের তলায় পড়ে থাকত এই বিশাল রথটি, যার উচ্চতা প্রায় সত্তর ফুট । রথযাত্রার দিনে এই বিশালাকৃতি রথের যাত্রাপথ ছিল লালদীঘি থেকে বৈঠকখানা পর্যন্ত । 

আবার অনেকের মতে বড়িশার জমিদার সাবর্ণগোত্রীয় রায়চৌধুরী পরিবারের রথ কলকাতার প্রাচীনতম । পরিবারের সন্তান কৃষ্ণদেব রায়েচৗধুরী ১৭১১ সালে শুরু করেন রথযাত্রা । প্রায় জন্মলগ্ন থেকে চলায় এটিই সম্ভবত কলকাতার প্রাচীনতম রথযাত্রা । কেন এই রথযাত্রার প্রবর্তন সেই প্রশ্নের উত্তরে পরিবারের পক্ষ থেকে যা জানা যায় তা হল- দূরদর্শী কৃষ্ণ দেব বুঝেছিলেন যে ব্রিটিশ শাসক নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য জাতিবিরোধকে প্রশ্রয় দিচ্ছে । এই ভেদাভেদ যাতে মাথা তুলতে না পারে তার জন্য তিনি রথযাত্রার প্রচলন করেন । একই সঙ্গে আয়োজন করেন নানাবিধ বিনোদন-সহ রথের মেলাও। চারপাশের মানুষজনের সমাগমে সত্যিকারের আনন্দমেলা হয়ে উঠত এই রথের মেলা । সেই সময় পরিবারের কুলদেবতা নারায়ণশিলা বসিয়েই রথ টানা হত । রথ বেহালার বড়িশা অঞ্চলে ঘুরত, পরিবারের সকলের বাড়ি বাড়ি যেত ।

অনেক পরে ২০ ফুট উচ্চতার নতুন রথ তৈরি হয় । ১৯১১ সালে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার নতুন মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় পারিবারিক মন্দিরে, তারপর থেকে শুরু হয় নবরূপে রথযাত্রা । এখনও একই ভাবে সাবর্ণদের বড় বাড়ি থেকে রথযাত্রা পালিত হয় । বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বা ‘পহণ্ডিবিজয়ম’ করে দেবতারা রথে আসেন । নারকেল ফাটিয়ে রথ চলতে শুরু করে এবং বেহালা পর্যন্ত ঘোরে । শিলপাড়ায় প্রয়াত হিরালাল বসুর বাড়িতে; ‘মাসির বাড়ি’ হিসেবে জগন্নাথ দেব থাকেন । এখন রথ টানা, রথের মেলা সবই পরিসরে ছোট হয়ে এসেছে, তবুও ভক্তদের মনে জগন্নাথদেব ‘নয়ন পথগামী’; জগতের নাম ।

বেহালা অঞ্চলেই রয়েছে আরও একটি পুরনো রথ । এখানকার বিখ্যাত মুখোপাধ্যায় পরিবারের ‘সোনার দুর্গাবাড়ি’-র রথ । মুখোপাধ্যায় পরিবারের প্রাণপুরুষ জগতরাম মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেন পারিবারিক শালগ্রামশিলা মধুসূদন । এখনও মুখোপাধ্যায়দের ঠাকুরদালানে এই শালগ্রাম শিলার নিত্য পূজা হয় । ১৭৯০ সালে কাঠের রথে মধুসূদনকে বসিয়ে এই পরিবারের রথযাত্রা উৎসবের শুরু । জগতরামের প্রপৌত্র যদুনাথ আরেকটি শালগ্রামশিলা প্রতিষ্ঠা করেন ‘রাজরাজেশ্বর’ । তারপর থেকে রথে এই দুই শালগ্রামশিলাই বসানো হত, রথযাত্রার সঙ্গে থাকত হরি সংকীর্তন, পালাগান, ব্রাহ্মণভোজন । এরপর থেকে ১০০ বছরের ও বেশি সময় কেটে গেছে, মেলা, কীর্তন এসব আর এখন না হলেও রথের সঙ্গে জড়িত পারিবারিক ঐতিহ্য , পুজোর নিয়ম নিষ্ঠা যথাসম্ভব বজায় রয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের কথায়-রথযাত্রা উৎসবকে কেন্দ্র করে সারা পরিবার এক হয়ে যায় সেটাই বা কম কী ! এখন ট্রাফিক-এর সমস্যা ইত্যাদি কারণে সমস্ত বেহালা জুড়ে রথটানা আর সম্ভব হয় না, বাড়ির দেউড়ি থেকে ডায়মন্ড হারবার রোড পর্যন্ত রথ নিয়ে যাওয়া হয় । সারাদিন ডায়মন্ড হারবার রোডের মুখে রথ রাখা থাকে আর সন্ধ্যেবেলা রথ ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় । উল্টোরথের পর থেকে রথ রেখে দেওয়া হয় ঘরবন্দি করে । আবার প্রতীক্ষা শুরু হয় একটি বছরের ।

এবার বলা যাক উত্তরের রথযাত্রা উৎসবের কথা । সারা বাড়ি মার্বেলে মোড়া, ঘরে ঘরে পেইন্টিং , কিউরিও, ভাস্কর্যের ছড়াছড়ি । লর্ড মিন্টো সশ্রদ্ধ নামকরণ করেন ‘মার্বেল প্যালেস’, মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট-এ সুবিশাল অট্টালিকা । রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী রাজেন্দ্র মল্লিক এর মার্বেল প্যালেস শুধু যে ঐশ্বর্যয়ের সমারোহে ঝলমল করত তা নয়, ধর্ম , পূজার্চনা , ভক্তিভাবের জোয়ারও ছিল একই রকম । কাকতালীয়ভাবে ১৮১৯ সালের ২৪ জুন রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে রাজেন্দ্র মল্লিক এর জন্ম । তাঁরই ইচ্ছায় উনবিংশ শতকের মধ্যভাগে মার্বেল প্যালেসে রথযাত্রার সূচনা । পরিবারের কুলদেবতা জগন্নাথদেবকে মার্বেল প্যালেসে অধিষ্ঠিত করেন রাজেন্দ্রর পিতা নীলমণি মল্লিক ও মাতা হীরামনি দাসী । পরিবারের উত্তরপুরুষদের কাছ থেকে জানা যায় যে মায়ের কাছে অনুপ্রাণিত হয়েই রাজেন্দ্র মল্লিক রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে দরিদ্রনারায়ণ সেবা, বস্ত্র বিতরণ ও অতিথি ভোজন-এর আয়োজন করতেন ।

এখনও রথের দিন কয়েক হাজার মানুষ প্রসাদ পান এই মার্বেল প্যালেসে । রাজেন্দ্র মল্লিক বহু অর্থ ব্যয় করতেন রথ উপলক্ষে । তিনি জগন্নাথ দেবকে উৎসর্গ করে গীত রচনা করেন, তাতে সুরও দেন। রথ চলার সময় পরিবারের সদস্যরা সেই গান গেয়ে জগন্নাথ দেবের আরাধনা করতেন, আজও সে প্রথা বজায় আছে । বাগানের পূর্ব কোণে তৈরি হয়েছিল কাল্পনিক ‘মাসির বাড়ি’। চৈতন্যদেব পুরীতে রথ সচল করতেন নিজের মাথা দিয়ে ঠেলে, তারই অনুকরণে এখনও এই পরিবারের সদস্যরা মাথা দিয়ে রথ ঠেলে দেন । শ্রীখোল, মৃদঙ্গ, করতাল বাজিয়ে মল্লিক বাড়ির রথ পরিক্রমা করে । এই রথ অবশ্য পরিক্রমা করে বাড়ির চৌহদ্দির ভেতরেই ।

শোভাবাজার দেব বাড়ির রথও টানা হয় বাড়ির মধ্যেই । এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা নবকৃষ্ণ দেব ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পর কলকাতার শোভাবাজার অঞ্চলে বাসস্থান নির্মাণ করে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন । সে যুগের অন্যান্য ধনী পরিবারের মত তাঁর বাড়িতেও দোল দুর্গোৎসবের মত নানা উৎসব লেগেই থাকত । রথযাত্রাও তার মধ্যে অন্যতম । পরবর্তীকালে পরিবার বড় ও ছোট এই দুই তরফে ভাগ হয়ে যায় । ছোট তরফ অর্থাৎ রাজ কৃষ্ণের বাড়ির রথযাত্রা আরম্ভ হয় ১৭৯০ সালে । এদের কুলদেবতা গোপিনাথ জিউকে অবশ্য রথে বসানো হয় না, পরিবর্তে শালগ্রাম শিলাকে জগন্নাথ রূপে রথে বসিয়ে টানা হয় । এই পরিবারের রথ চলে সকালবেলা । সন্ধ্যায় পূজা শেষে দেবতাকে ভোগ হিসেবে পাঁপড়ভাজা-সহ নানারকম ভাজার নৈবেদ্য দেওয়া হয় ।

কলকাতার বউবাজার অঞ্চলের গোবিন্দ সেন লেনের এক গৃহবধূ চুনিমণি দাসী তাঁর বাড়ি সংলগ্ন বিরাট ঠাকুরদালান ও মন্দির নির্মাণ করেন এবং জগন্নাথ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন ১৩০৭ বঙ্গাব্দের ১১ মাঘ, মাঘী পূর্ণিমার দিন । কথিত আছে এই বাড়ির কুলদেবতার অবয়ব তৈরি করা হয়েছিল পুরীর জগন্নাথ বিগ্রহের উদ্বৃত্ত কাঠ দিয়ে এবং সেই মূর্তি আজও অক্ষত । তখন থেকেই এই বাড়ির রথযাত্রার শুরু ।

আগেকার রীতি মেনে পুরীর পাণ্ডারা এখনও এই বাড়ির রথযাত্রা উৎসবে যোগ দিতে আসেন । নিমকাঠের তৈরি ১৬ ফুট উঁচু রথটির চারদিকে পুতুল, ঘোড়া, সারথি দিয়ে সজ্জিত । জগন্নাথ দেবের পরিধানে থাকে সাদা ধুতি, হাতে রুপোর দণ্ড, মাথায় রুপোর ছাতা । এইভাবে ব্রাহ্মণবেশে তিনি রথে ওঠেন । প্রচুর মানুষ দূর দূর থেকে আসেন এই রথযাত্রায় যোগ দিতে । আর থাকে ভোগগ্রহণ পর্ব ।

বউবাজার অঞ্চলের আরেকটি অংশ শশিভূষণ দে স্ট্রিট-এর শ্রী গৌরাঙ্গ মন্দিরের রথও বহু পুরনো । এখানে কুলদেবতা শ্রী জগন্নাথ দেবকেই রথে বসিয়ে টানা হয় । তবে রথটি জীর্ণ হয়ে যাওয়ায় বেশিদুর টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না, কাছাকাছি পরিক্রমা করেই ফিরে যায় ।

ক্রাউচ লেনের দাস বাড়ির রথও প্রায় ১০০ বছরের বেশি পুরনো । পরিবারের সদস্যদের থেকে জানা গেছে আগে এই রথও আকৃতিতে সুবৃহৎ ছিল কিন্তু বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণের অসুবিধা ও নানাবিধ কারণে এর উচ্চতা কিছুটা কমিয়ে ১২ ফুট করে নেওয়া হয়েছে । সন্ধ্যাবেলা পরিবারের কুলদেবতা লক্ষ্মী জনার্দনকে বসিয়ে কাছাকাছি ঘুরিয়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ।

(পুনর্মুদ্রিত)

আরও পড়ুন:  ছেলের বাগদান সেরেই মুকেশ-নীতা গিয়েছিলেন রাশিয়া‚ বিশ্বকাপের স্বাদ নিতে

NO COMMENTS