নিজের মুখেই ঝাল খান

Bengali feature

নালে ঝোলে থাকা বাঙালির ঝালেও সুনাম ইয়ে বেশ সুমুখ আছে। অন্যের মুখে ঝাল খেতে সে যেমন ভালোবাসে তেমনি নিজের মুখেও ঝাল খেতে ভালবাসে।লঙ্কাধিপতি রাজা রাবণের সঙ্গে বাঙালির কাশিদাসী রামায়ণেই সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে। সে রাবণও নেই আর সে লঙ্কাও নেই। এখন যা আছে তাকে ইংরেজিতে চিলি বললেও আসলে সে ‘ধানি’ বা ‘সুর্যমুখী’ বা নেহাতই ‘শুকনো’ বা ‘কাঁচা’ অথবা ‘কুল’ বা ‘জাপানি’ বা ‘ক্যাপসিকাম’ বা নেহাতই ‘দেশি’ লঙ্কা নামে সবুজ-মেরুনীয় মোহনবাগান হতে হতে গা ঘেঁষে চলে গিয়ে কোথাও লাল-হলুদের ছোঁয়া রেখে একেবারে বঙ্গদেশের যুযুধান দুই রাজনৈতিক দলের রঙ মেখে, লাল-সবুজের হাতছানি দিতে দিতে বাঙালিকে ডাকছে, “ওরে সবু্‌জ ওরে আমার কাঁচা/ আধ মরাদের জিভে ঘষে তুই বাঁচা।”

বাঙালির লঙ্কা প্রীতি অবিদিত। তবে ‘ঘটি’দের থেকে ‘বাঙাল’দের ঝাল খাওয়ার সুনাম বেশি।ঘটিরা সব রান্নার শেষেই একদানা চিনি দিয়ে ওঁ মিষ্ট ওঁ মিষ্ট বলে জিভের ঝাল নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু আদি বাঙালরা ঝোলে ও ঝালে লঙ্কা দেয় গুলে।

এই যে ধানি লঙ্কা বা কুল লঙ্কা –এর ঝাল সুবিদিত।ছোট্ট ছোট্ট কুলের মত গোল বা চিমশানো এই লঙ্কা জিভে পড়েই ডিনামাইটের মত ফাটে। দামেও কম গুণমানে বেশি এই লঙ্কার কদরটাই আলাদা। নামেই ধানিপটকার সাদৃশ্য টেনে এনে রসিক ঝাল প্রেমী বুঝিয়ে দিয়েছেন এই লঙ্কার জাত কেমন হবে।আজ থেকে কিছু বছর আগেও গ্রীষ্মের দুপুরে যখন সবাই দরজায় খিল এঁটে ঘুম দিচ্ছে সেই স্বর্গীয় সময়ে মাটির হাঁড়িতে রাখা কালো আর পুরনো তেঁতুলের তাল তুলে নিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে পুকুর পাড়ে এসে গোল হয়ে বসে নুন আর কাঁচা লঙ্কা সহযোগে হুশহাশ চকাস টকাস শব্দ তুলে খায়নি এমন মেয়ে এমনকি ছেলেও গ্রামের দিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কালবৈশাখী ঝড়ে কুড়িয়ে পাওয়া আমের কুসিকে নুন আর কাঁচা বা শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো সহযোগে জারিয়ে খাওয়া দুর্গারা এখনও জীবন্ত জীবাশ্মর মত টিকে আছে বাংলার গ্রামে গ্রামে। তবে ফ্ল্যাটের অপু-দুর্গাদের এইসব হিসেবের বাইরে রেখে দেওয়াই ভাল। কারণ তারা ঝাল বলতে কেউ কেউ এই সব কাঁচা ও শুকনো লঙ্কা মাখা দুপুর বুঝলেও বেশিরভাগের দৌড় ঐ চিলি চিকেন থেকে চিলি শস পর্যন্তই। তাই আবাসনের আবাসিকদের বাদ রেখে আমাদের নঙ্কা বাসনার কাহিনি আরও দীর্ঘায়িত হোক লঙ্কার আচারে। তবে তার আগে আর এক লঙ্কাকাণ্ডের কথা জেনে রাখা ভালো। সে এক ‘অসাম’ যুদ্ধ। অসম তো বটেই। কাঁচা আমকে কাঁচা লঙ্কা সহযোগে শিলে থেঁতো করে অল্প করে চিনি বা গুড় দিয়ে ঐ আগে যে কথা বলেছি ওঁ মিষ্ট ওঁ মিষ্ট বলে একটা বাটিতে রেখে দিয়ে শুরু হত যুদ্ধ। চারজনে গোল করে জিভ বের করে বসে থাকতে হবে বাটির দিকে তাকিয়ে। এহে হে আপনার জিভেই যে জল চলে এল। তাহলে আর যুদ্ধ জিতবেন কি করে? এই যুদ্ধে জেতার শর্তই হল ঐ বাটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেও একফোঁটা জল ফেলা চলবে না। সংযম, বুঝলেন সংযম। গৌতম বুদ্ধ যে অষ্টাঙ্গিক মার্গের কথা লিখে গিয়েছিলেন এ তার থেকে কোনও অংশেই কম নয়। যার জিভ থেকে টুকুস জলটুকু পড়বে সেই বাতিল বলে গণ্য হবে। আর যার জিভ শুকনো মরুভূমির মত ঠা ঠা করে হাঁফাবে সেই পাবে বাটিতে রাখা আম ছেঁচার ভাগ। জিভ লপলপায় পর জল না ছিটকায় তবেই তো সে অমৃতস্য পুত্র।

এতো গেল লঙ্কা ও আমের বা তেঁতুলের যৌথ বাহিনীর কথা। কিন্তু লঙ্কার একাই যা সব আচার হয় আর তা দেখে লোভে জিভ চকচক করে তার কোনও তুলনা নেই।শুধু কাঁচা লঙ্কাকে সর্ষের তেল ভর্তি পুরনো হরলিক্সের শিশিতে ভরে রোদে রেখে নতুন বৌ-এর মত যত্নআত্তি করলে তার যে রূপ ফুটে উঠবে তা আর কহতব্য নয়(পুরনো বললাম কারণ এখন তো প্লাস্টিক। এই প্লাস্টিক আমাদের অতি প্রাচীন আচার শিল্পে সার্জিকাল স্ট্রাইক করেছে। কাচের শিশি বা বয়ামের তুল্য আর কোনও সিংহাসন নেই যে আচার রোদে দেওয়া যেতে পারে!) রবীন্দ্রনাথ থাকলে হয়তো আর একবার লিখেই ফেলতেন

কাচের বয়ামে পুরি

যত লঙ্কা রকমারি

যত্নে ঢালি সরিষার তেলে,

চারিদিকে রৌদ্র প্রখর আচার হইবে মুখর

আহা আহা কি দারুণ ঝালে।

দুপুরের রোদে লঙ্কার আচার বা লাল লাল কাঁচা লঙ্কা ছাদে বা উঠোনে যেখানেই শুকোতে দেওয়া হোক বানর সেনার দল লঙ্কাকাণ্ড করতে দলে দলে ছুটে এসে আপনার আচার বা হাফ শুকিয়ে আসা বা চিমসে যাওয়া ঝাল ঝাল লঙ্কা মুঠো মুঠো মুখে তুলে হরিরলুট করতে করতে এ ডাল ও ডাল করে চোখের নিমেষে হাওয়া হয়ে যাবেই। আর আটকাতে গেলেই দাঁত খিঁচিয়ে গাল দেবে দলবেঁধে। পরের মুখে ঝাল ও গাল দুই-ই খাবেন তখন লঙ্কাধিপতি হতে গিয়ে। তাই চটের বস্তা বা প্লাস্টিকে নয় লঙ্কা শুকোতে দিলে লাঠিও রাখা দরকার। কাচের বয়াম শুদ্ধ তুলে নিয়ে হাওয়া হয়ে যাওয়ার ঘটনাও শোনা যায়। তাই আচারের যত্ন নিন। লঙ্কার ঝাল বজার রাখুন আপনার লাঠিতেও।

ঝাল বড় বিষম বস্তু। খেতে খেতে লঙ্কার ঝাল লেগে গেল বিষম খায় প্রায় সকলেই। ঝাল বিষাদেরও বটে। কারণ আনন্দের খবর হলেই আমরা মিষ্টি মুখ করাতে চাই কিন্তু কেউ কাউকে ঝালমুখ করাতে বলি না। তবে অবশ্য ট্রেনের কামরায় বসলেই ঝালমুড়ির কথা মনে আসবেই। মানে ট্রেনে চেপেছেন আর ঝালমুড়ি খাননি এটা একেবারেই শোভনীয় নয়।তবে লঙ্কার ঝালের বাইরেও আমরা অন্যের মুখ ঝাল খাই। বাঙালি অন্যের মুখে ঝাল খেয়ে আসছে সেই প্রাক-ঐতিহাসিক যুগ থেকেই যখন বাঙালি সবে ডিম ফুটে বাঙালি হচ্ছে। বাঙালি নিজে নিজে বুঝতে পারে না কিছুই। ব্রিটিশরা বলে না দিলে রবীন্দ্রনাথকেও চিনতে পারত না তো অন্য কথা। পরের জন্য গাল খাওয়া ও পরের মুখে ঝাল খাওয়া বাঙালিদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। যাক গে সেই সব ইতিহাস গোপন থাকাই ভাল। শুধু একটি কথা বলে এই লেখা শেষ করব।

লঙ্কার মোরব্বা হয় নিশ্চয়ই জানেন। না জানলে খেয়ে দেখতে পারেন। খুবই সুস্বাদু।আমতেলেও লঙ্কা দেওয়া থাকে। রান্না করা খাবারে লঙ্কা দেওয়া হয় না এমন খাবার কমই আছে। সব থেকে বেশি ব্যবহৃত মশলাই হল লঙ্কা। আবার একদম কাঁচা লঙ্কা সহযোগে তেল পেঁয়াজ মাখা মুড়িও খেতে বেড়ে লাগে। ঝগড়ার সময় শত্রুর চোখে লঙ্কা ঘষে দিতে ইচ্ছে করে অনেকের, এমনকি আত্মরক্ষার কাজেও লঙ্কা গুঁড়ো বেশ ভালো অস্ত্র।তামিল সিনেমাতে প্রায়ই দেখায় সারি দিয়ে শুকোতে দেওয়া লঙ্কা ভিলেনের চোখে ছুঁড়ে দিয়ে নায়িকাকে নিয়ে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। আবার যাওয়ার আগে লঙ্কায় আগুন দিতেও ভুলছে না। এসবই লঙ্কার গুণগান বটে।লঙ্কার হাজারো উপকারিতা। তাই বাজারে আরও লঙ্কা আসুক। রান্নাঘরে ও সংসারে সংসারে লঙ্কাতত্ব ও লঙ্কাকাণ্ড জমে উঠুক। শুধু বিধিসম্মত দুটি সতর্কীকরণ মনে রেখে লঙ্কা খান।

এক- কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে লঙ্কা কম খান।

দুই- জল কামানের ভয় থাকলে কোনও বাচ্চাকে ‘তোর লঙ্কাটা দেখা’ বলবেন না।

1 COMMENT

  1. ঝাল খেতে খেতেই হারিয়ে যাওয়া আরও অনেক কিছুরই স্বাদ পেলাম। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা যে কতো কিছুই হারিয়ে ফেলেছি তা খুব সহজেই বুঝিয়ে দিলেন। ভীষণ ভালো লেখাটা। আর হ্যাঁ, ছোট বেলায় মা’কেও পুরনো হরলিক্সের কৌটো করেই আচার রোদে দিতে দেখতাম। সবটা মনে পড়ে গেলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here