পাকিস্তানের কোলে মাসুদ আজহার লালিত পালিত চিনের স্নেহে

জঙ্গিবাদী সন্ত্রাস সক্রিয় করতেই মাসুদ আজহার জইশ-ই-মহম্মদ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পাকিস্তানের কোল আর চিনের স্নেহে ১৯৯৪ সালে একটি মাস কাশ্মীরে কাটায় মাসুদ। ২০০১ সালের সংসদ হামলা, ২০১৬-তে পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে হামলা এবং ২০১৬-র সেপ্টেম্বর উরি হামলার মাস্টারমাইন্ড এই মাসুদ । কাশ্মীর উপত্যকায় জৈশের আত্মঘাতী হামলা, গাড়িবোমা হামলার মতো ঘটনাও তার নেতৃত্বে ঘটে। তাছাড়া কাশ্মীরের সাম্প্রতিক সব কটি হামলার পিছনেই মাসুদের মাথা আছে বলে সন্দেহ।

আন্তর্জাতিক সংস্থার গোয়েন্দারা বলেন, তালিবান ও লস্কর-ই-তইবা জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে আজহারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং নিয়মিত যোগাযোগ আছে। মার্কিন সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্লকে অপহরণ ও খুনের অভিযোগ ওঠে আজহার ঘনিষ্ঠ শেখ আহমেদ সইদ ওমর নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। কিন্তু পাকিস্তান আজহারকে গৃহবন্দি দশা থেকে মুক্তি দেয়। আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের সৃষ্টি হয়, চাপে পড়েও পাকিস্তান অভিযোগ অস্বীকার করে ।

আইসি ৮১৪ বিমান অপহরণ ঘটনায় ভারতের গোয়েন্দাদের মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্ট-এ ওঠে আজহারের নাম। পাকিস্তান বলে আজহার হাইজ্যাকার নয়। হেফাজতে পেতে আমেরিকা মাসুদের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করতে চাইলে চিন আপত্তি তোলে। মাসুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে আন্তর্জাতিক মহল থেকে বারবারই চাপ এসেছে। তবে মাসুদ আজহারের সংগঠন জইশ ই মহম্মদকে রাষ্ট্রপুঞ্জ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বলে ঘোষণা করেছে।

শুরু থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর, বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে জইশ ই মহম্মদ তথা আজহার মাসুদ । মাসুদের বসবাস পাকিস্তানে এই অভিযোগ সত্ত্বেও তাঁকে কখনোই পাকিস্তান সরকার বিচারের মুখোমুখি করেনি ।

১৯৯০-এর দশক থেকেই পাকিস্তান এই জঙ্গিগোষ্ঠীকে স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট হিসেবে ব্যবহার করে ভারতে কাজ করতে দিয়েছে এবং তার থেকে সুবিধা লাভ করেছে। দেশের অভ্যন্তরে জঙ্গি উপদ্রব, সন্ত্রাসবাদী হামলা বিশেষত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক কালে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিদের উপস্থিতি ভারতকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এতে পাকিস্তানের শাসক তথা সামরিক বাহিনীর মদত রয়েছে। পুলিশ রেকর্ড অনুযায়ী উপত্যকার ৫৬ জন জৈশ জঙ্গির মধ্যে ৩৫জন পাকিস্তানি এবং দক্ষিণ কাশ্মীরে ৩৩ জন জৈশ জঙ্গির মধ্যে ২০ জন পাকিস্তানি ।

প্রশ্ন হল জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ ও তার নেতা মাসুদ আজহারের মতো সন্ত্রাসবাদী হামলার মাস্টার প্ল্যানারকে মদত দিয়ে; দেশে আশ্রয় দিয়ে পাকিস্তানের লাভ কী ?

২০০৩ সালে পাক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশারফকে দু দুবার হত্যার চক্রান্ত করার পর থেকে পাক নিরাপত্তাবাহিনীর সমর্থন হারায় জইশ-ই-মহম্মদ। কিন্তু লশকর এবং হিজবুল মুজাহিদিনের উপর আন্তর্জাতিক নজরদারি থাকায় জৈশের পুনরুত্থান পাকিস্তানের রণকৌশল বলেই মনে করা হয় ।
সে দেশের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার দরকার তাদের গুরুত্ব রক্ষার জন্য এবং পাকিস্তানে যে ধরনের কার্যকলাপ বিশেষত পাশতুন তাহফুজ মুভমেন্টের মতো উত্থান তাদের যেভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল, তা মোকাবিলার জন্য দেশের বাইরে একটা আক্রমণে উদ্যত শত্রু তৈরি করা ।

প্রতিবেশী দেশ ভারতকে পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে দেখানোটা সহজ। এতে  দেশের রাজনীতির ওপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব। বিশ্বাস করা সম্ভব নয় যে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার অজ্ঞাতেই জইশ-ই-মহম্মদ পুলওয়ামায় হামলা চালিয়েছে। জঙ্গিদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়ে তাদের দিয়ে কৌশলগত স্বার্থ সম্পন্ন করতে চায় পাকিস্তান আর উপত্যকায়
অস্থিরতা জিইয়ে রাখার জন্য পাকিস্তানকে পাশে রাখতে চায় চিন।

বহু কাল মাসুদ আজহারকে বিশ্বের রক্তচক্ষু থেকে বাঁচিয়েছে বেজিং। কিন্তু এখন বেজিং নিশ্চয়ই জানে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের স্থায়ী সদস্যপদ যদি ভারত পেয়ে যায়, তাহলে যেভাবে ভেটো দিয়ে মাসুদ আজহারকে চিন আড়াল করেছে, সেটা আর হবে না । চিনের লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ায় সুপার পাওয়ার হয়ে ভারতকে কোণঠাসা করা। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের উপর দিয়ে গদর বন্দর পর্যন্ত চিনের পরিকাঠামো ইতিমধ্যে
দিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে । তার ওপর চাবাহার বন্দর দখল । চিন সব মিলিয়ে কোটি কোটি মার্কিন ডলার শুধু পাকিস্তানেই বিনিয়োগ করে রেখেছে । চিনের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতিও ভারতের পক্ষে বেশ চাপের।

শোনা যাচ্ছে মাসুদ আজহার এবং তার বাহিনীই নাকি চিনের বিপুল বিনিয়োগের রক্ষাকর্তা ।পাকিস্তানের ভিতর বা বাইরের সবরকম আঘাত থেকে চিনের বিনিয়োগ এবং পরিকাঠামোর রক্ষাকর্তাও নাকি তিনি । কিন্তু চিন কি মাসুদকে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বানাবে ? নাকি সেনাবাহিনীর হাত ধরে আসা পাকিস্তানের নবাগত প্রধানমন্ত্রী সেই ছায়াযুদ্ধে তরবারি চালাবেন?

তপন মল্লিক চৌধুরী
টেলিভিশন মিডিয়ায় বেশ কিছুকাল সাংবাদিকতা করেছেন । নানা ধরনের কাজও করেছেন টেলিভিশনের জন্য । সম্পাদনা করেছেন পর্যটন, উত্তরবঙ্গ বিষয়ক পাক্ষিক পত্রিকা। নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় । চর্চার প্রিয় বিষয় আন্তর্জাতিক সিনেমা, বাংলা ও বাঙালি।

7 COMMENTS

  1. বেশ ভাল বিশ্লেষণ করেছেন, সব মিলিয়ে ভাল লেখা

  2. খুব যে নতুন কিছু বললেন তা নয় কিন্তু লেখাটা খুব ভাল এবং যুক্তিযুক্ত।

  3. মাসুদ আজহার এই সময়ে ভীষণ আলোচিত নাম, তাকে নিয়ে নানা লেখার ভীড়ে এই লেখাটি যথেষ্ট আলাদা।

  4. জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসকে পাকিস্তান এবং চীন কীভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছে লেখাটি তে বেশ খোলাখুলি আলোচনা রেখেছেন লেখক তার যুক্তিগুলো অস্বীকার করা যাচ্ছে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here