ঝন্টিপাহাড়ির বনবাংলোয় খাটের নিচে হারমোনিয়ামটায় আরও গাঢ় হল ধুলোর প্রলেপ

কলঘরের খিড়কি দরজায় ঘাপটি মেরে বসে কতক্ষণ ! ইশারায় প্রেয়সীকে বুঝিয়েই চলেছে‚ ওটা আসলে  লালু  | বাতাসে আঙুল কেটে‚ নির্বাক মুখে বলেই চলেছে ওটা ‚ ওটা  মানে লালু‚ মানে ললিত ! কিন্তু বেচারি সিদ্ধেশ্বরের কপাল বড়ই মন্দ | না‚ তো প্রেমিকা আলো তার দিকে তাকাচ্ছে‚ না তো আলোর কথা রুমমেট জাঁহাবাজ অনুরাধা নিজের কানে তুলছে !বিশ্বাসই করছে না প্রেমপত্র লেখে ললিত‚ সিধু নয় | শেষে বাধ্য হয়ে আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে বেচারি সিদ্ধেশ্বর‚ সিধু | ঢাল হিসেবে বিশাল বারকোশও রক্ষা করতে পারল না | মাথায় ধপাস করে পড়ল ওই বারকোশের মোক্ষম ঘা | 

পর্দায় তাও ঢাল পেয়েছিলেন | বাস্তবে সেটুকুও ছিল না চিন্ময় রায়ের | কর্মরতাদের মেস বসন্ত বিলাপে ঢুকতে যত না কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে‚ তার থেকে বহুগুণ বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে বাংলা ছবির জগতে পায়ের নিচে জমি পেতে | তুলসি চক্রবর্তী‚ জহর রায়ের রেখে যাওয়া ব্যাটন তো রয়েইছে | পাশাপাশি তখন দাপিয়ে অভিনয় করছেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় | নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন রবি ঘোষ‚ অনুপকুমারও | এই অবস্থায় নিজের জন্য এক চিলতে জায়গা করা সহজসাধ্য নয় |

সেটাই করে দেখিয়েছিলেন তিনি | শুধু জায়গা বললেই তো আর হবে না | গড়তে হবে নিজস্ব ঘরানা | নইলে পূর্বসূরি ও সমসাময়িকদের সঙ্গে তুলনা অবশ্যম্ভাবী | সেখানে তিনি সম্পূর্ণ সফল বলেই তাঁর করা প্রতিটা চরিত্রই স্মরণীয়‚ সে যত ছোটই হোক না কেন | অধিকাংশ চিত্রনাট্যে তিনি নায়ক নন | কিন্তু পর্দায় ডাকসাইটে নায়কের পাশেও অম্লান |  

থিয়েটারে কাজ করার পরে ছবির দুনিয়ায় আত্ম প্রকাশ পরিচালক তপন সিনহার হাত ধরে | ১৯৬৬-তে প্রথম ছবি গল্প হলেও সত্যি | চোরসর্দারের স্যাঙাত | রবি ঘোষের মতো দাপুটে অভিনেতার পিঠে হাত রেখে  চলো বলে দলের পাণ্ডার কাছে নিয়ে যাওয়া—-নতুন অভিনেতার কাজ চিনতে ভুল হয়নি সত্যজিৎ রায়ের | রোগা হাড় জিরজিরে চেহারায় সরু গোঁফের মধ্যেই পেয়ে গিয়েছিলেন হাল্লারাজার দূতকে | শুন্ডি ঘুরে এসে যে বুঝতে পেরেছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অসারতা | কিন্তু বোঝাতে পারেনি যুদ্ধপিপাসু রাজাকে | 

বুঝতে কিন্তু বাংলা ইন্ডাস্ট্রিও বুঝতে পারেনি | নইলে অভিনেতা চিন্ময়কে সেভাবে পাওয়া গেল কোথায় ? ভাঁড়ের বাইরে আর কোনও ভূমিকায় বিশেষ ভাবাই হল না ! তা নিয়ে মনের খেদ কমাতে পারেনি তাঁর সহজাত রসবোধ | রসিকতা করে বলতেন সাগিনা মাহাতো ছবির সেটে প্রথম আলাপে তাঁকে দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন নায়িকা সায়রা বানু | পরে যখন সায়রা বানু এসে তাঁর কাঁধে হাত রেখে কথা বলেছিলেন‚ তখন নাকি চিন্ময়ের জ্ঞান হারানোর পালা ! 

একে অ-নায়কোচিত চেহারা‚ তার উপর ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলছে সবসময় | এই দুটোই হয়ে গিয়েছিল তাঁর তুরূপের তাস | ননীগোপালের বিয়ে থেকে চারমূর্তি | এখনই থেকে ধন্যি মেয়ে | বাইরে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে গোপন করা ভিতরের দুর্বলতা | এককথায় গড়পড়তা বাঙালির স্বভাব | ভাঙব তবু মচকাবো না | সেটাই অভিনয়ের ট্রেডমার্ক করে ফেলেছিলেন তিনি | তাই ঝন্টিপাহাড়িতে হারমোনিয়াম বাজিয়ে বীরদর্পে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে পরমুহূর্তে মুচ্ছো যেতে পারেন ভূতের ভয়ে | আপনজন-এ স্ত্রীকে ধমকে রেখে লাজুক হাসিতে বিপ্লবীর কাছে পিস্তল দেখার অনুমতি চাইতে পারেন | 

শোনা যায়‚ অনুমতি নিয়েছিলেন অভিনেতা চিন্ময় রায় নিজেও | পরিচালক দীনেন গুপ্তর কাছে | অনুযোগ ছিল বসন্ত বিলাপ-এ সিধুর চরিত্র সেরকম গুরুত্ব পায়নি | পরিচালকের সবুজ সঙ্কেত পেয়ে তৈরি হয়েছিল সেই অমোঘ পুকুরপাড়ের দৃশ্য | বাংলা ছবির কমেডিতে ‘ মাসিমা মালপো খামু ‘ যদি প্রথম স্থানে থাকে‚ দ্বিতীয় অবশ্যই ‘ তুমি আমাকে বলো উত্তমকুমার ‘ | নিজেকে নিয়ে কতটা মস্করা করতে না পারলে সফল কমেডিয়ান হওয়া যায় না | সেদিক দিয়ে চিন্ময় রায় ছিলেন জুড়িহীন | 

নির্দ্বিধায় অভিনয় থেকে ঝেড়ে ফেলতেন মেদ | যেমন ঝেড়ে ফেলেছিলেন পদবী থেকে দত্ত | রেখে দিয়েছিলেন শুধু  রায়  | আর রেখেছিলেন মনের কোণে দুরাশা | সুন্দরী জুঁই-কে পাওয়ার | ধরেই নিয়েছিলেন পাবেন না | কিন্তু মাঝে মাঝে টেনিদার জন্যও অপেক্ষা করে থাকে বিস্ময় | যখন ননীগোপালের প্রেমের প্রস্তাবে সায় দেন গায়িকা মানসী | শুধু পর্দায় নয়‚ পর্দার বাইরেও | দুজনের দাম্পত্য সত্যি ছিল জুঁইয়ের সুবাসে আমোদিত | স্ত্রী বিয়োগের পরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন অভিনেতা চিন্ময় রায় | 

ইদানীং লেগেই ছিল শারীরিক অসুস্থতা | তবু হাজারো কষ্টেও অটুট মুখের হাসি আর মনের রসবোধ | যা অটুট ‘আটাত্তর দিন পরে’‚ ‘ধন্যি মেয়ে’‚ ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’‚ ‘মৌচাক’‚ ‘ঠগিনী’‚ ‘ফুলেশ্বরী’‚ ‘ছুটির ফাঁদে’‚ ‘স্বয়ংসিদ্ধা’‚ ‘ঘটকালি’‚ ‘ব্রজবুলি’-সহ আরও অজস্র ছবিতে তাঁর অভিনয়ে |

পর্দায় অভিনয় থেমে গিয়েছিল বহুদিন | এবার বিদায় নিলেন জীবনের মঞ্চ থেকেও | অবিভক্ত বাংলার কুমিল্লা জেলা থেকে যে পর্ব শুরু হয়েছিল ১৯৪০-এর ১৬ জানুয়ারি‚ তা থেমে গেল ২০১৯-এর ১৭ মার্চ | ঝন্টিপাহাড়ির বনবাংলোয় খাটের নিচে হারমোনিয়ামের উপর আরও গাঢ় হল ধুলোর প্রলেপ |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.