চিৎপুরের যাত্রাপাড়ায় রথযাত্রা শুধু এক উৎসবের দিন নয় — এক পবিত্র দিন | যার উপর নির্ভর করে প্রতিটি যাত্রা দলের আগামী পালার ব্যবসায়িক প্রতিশ্রুতি |

Banglalive

আমার ছোটবেলায় খেলার রথ সাজিয়ে পাড়ার রাস্তায় দিদিদের সঙ্গে সন্ধেবেলা বেড়িয়ে পড়া | সঙ্গে রাস্তায় ছোট-বড়-মাঝারি মাপের রথযাত্রা দেখা | তেলেভাজা-পাঁপড় ভাজা খাওয়া | উত্তর কলকাতায় রথের ঐতিহ্য আজও অনেকটাই অম্লান আছে — বাঙালি মানসিকতার ছোঁয়া লেগে আছে | তার সঙ্গে চিৎপুরের যাত্রাপাড়ার রথযাত্রার মেজাজ কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা এবং এক ভিন্ন মাত্রার ছোঁয়া সেখানে |

আমি গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের শেষ দিকে যাত্রায় যাই সুরকার রূপে | যে সব দলে সুর করার জন্য চুক্তিবদ্ধ ছিলাম, সে সব দল ছাড়াও অন্য দলও আমন্ত্রণ জানাত রথযাত্রার দিন | প্রত্যেক দলে সেদিন পুজো হত দুপুরবেলা | অনেকে আবার সিন্নিও পুজোয় দিতেন | দুপুরে সেই সিন্নি ও ফলমূল প্লেটে সাজিয়ে সকলকে দেওয়া হতো সহৃদয়ে‚ সমাদরের সঙ্গে | আমাদের সময়ে বেশিরভাগ দল বাংলা ক্যালেন্ডার ছাপাত পালার নাম, নায়ক-নায়িকার নাম ও সুরকারের নাম দিয়ে | এই ক্যালেন্ডারের বেশ চাহিদা ছিল নায়েক পার্টির কাছে |

চিৎপুরের যাত্রাপাড়া বলতে পুরো চিৎপুর রোডটা নয় | চিৎপুরের যাত্রাপাড়ার ব্যাপ্তি হচ্ছে নতুনবাজার থেকে অ্যালেন মার্কেটের আগে অবধি | কেবলমাত্র তরুণ অপেরা ও নট্ট কোম্পানির অফিস ছিল — শোভাবাজার স্ট্রিট ও হরচাঁদ মল্লিক স্ট্রিটে | অবশ্য তরুণ অপেরার গদিঘর ছিল চিৎপুরেই | এখন তো তরুণ অপেরা বন্ধ হয়ে গেছে | নট্ট কোম্পানি অবশ্যই এখনও চিৎপুরের বাইরেই অফিস রেখে আজও ব্যবসা চলাচ্ছে |

পুরনো কথায় ফিরে আসি | নায়েক পার্টি হচ্ছেন যাঁরা যাত্রাপালা বুকিং করেন, তাঁদের বলা হয় | রথযাত্রার দিন দূর-দূরান্তের গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন জেলা থেলে বিভিন্ন ক্লাব,লাইব্রেরি বা অন্য ধরনের সংগঠন দল বেঁধে যাত্রাপালা বুকিং করতে আসেন | বুকিং করার সময় একটা টাকা দিয়ে বুকিং করেন | সুতরাং রথযাত্রার তিথি আসলে চিৎপুরের যাত্রা দলগুলির অগ্রিম রোজগারের একটা দিন | নায়েক পার্টিদের অগ্রিম বুকিংয়ের সঙ্গে মিষ্টির প্যাকেট, ক্যালেন্ডার ও পোস্টার দেওয়া হয় — যাতে তাঁরা তাঁদের জায়গায় ফিরে গিয়ে প্রচার শুরু করতে পারেন | নায়েক পার্টি বুকিংয়ের বিনিময়ে একটা নির্দিষ্ট হারে কমিশন পেয়ে থাকেন | প্রায় আড়াই দশক চিৎপুরের সঙ্গে যুক্ত থাকার সূত্রে একজনকে জানতাম — যাঁর নাম ‘নিরাপদ দাস’ এবং যিনি গর্ব করে বলতেন যে বরাহনগর মিউনিসিপ্যালিটিতে তিনিই সবচেয়ে বেশি কর দেন তাঁর সম্পত্তির জন্য | নিরাপদবাবু ভারতী অপেরার গদিতে বসতেন এবং নায়েক পার্টিদের সঙ্গে যাত্রাপালার মালিকের যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে কমিশন নিতেন |

আরও পড়ুন:  স্কুল চত্বরেই বাগান করে ফলানো হবে মিড ডে মিলের জন্য প্রয়োজনীয় সবজি

রথযাত্রার দিন মালিকরা পালাকার, সুরকার — এঁদের প্রত্যেককে কিছু অগ্রিম দিতেন | এই অগ্রিম দেওয়াকে বলা হয় ‘সাইদ’ করা | অনেক দলে সুরকারের রথের দিন একটু সুরও করে দিতে হতো | একে বলা হত ‘সুরভাঙা’. অনেক দলে নাটকও পড়া হত |

চিৎপুরের যাত্রাদলে ষাট, সত্তর এমনকি আশির দশকে গদিঘর ছিল | অর্থাৎ একটা বড় তক্তপোশ থাকত | তার ওপর মোটা তোশক থাকত ধবধবে সাদা চাদর ঢাকা | আর থাকত কয়েকটা তাকিয়া | ঘরে চেয়ার ও লম্বা বেঞ্চি থাকত | মালিক গদিতে বসতেন | অতিথি যদি বিশিষ্ট হন তবে গদিতে বসবেন, অন্যথায় চেয়ার বা বেঞ্চিতে | কালের প্রকোপে এখন আর সেই পুরনো গদিঘর নেই | এখন সব অফিস হয়েছে আধুনিক চেয়ার-টেবিল দিয়ে |

আগে রথযাত্রার দিন চিৎপুরের যাত্রাপাড়ায় লোকে লোকারণ্য হত | শিল্পী ও সুরকার ও পালাকারদের পকেট গরম হতো | নায়েক পার্টিরা বড় থলে ভরে মিষ্টির প্যাকেট, ক্যালেন্ডার ও পোস্টার নিয়ে ঘরে ফিরে যেতেন বুকভরা আশ্বাস নিয়ে | যাত্রাপালার গান হলে পাড়ার ভেঙে পড়া ক্লাবঘরটার ছাউনি হবে, লাইব্রেরির বই কেনা যাবে | আগে যাত্রা হতো ষষ্ঠী থেকে জ্যৈষ্ঠি | অর্থাৎ দুর্গাপুজোর ষষ্ঠি থেকে জৈষ্ঠ্য মাস অবধি | কমবেশি একশো আশি দিন থেকে দুশো দিন | এখন হোম এন্টারটেনমেন্টের যুগে পুরনো যাত্রার সে সুদিন আর নেই | তবু বাংলার যাত্রা আছে, ছিল এবং থাকবে | লোকশিক্ষা ও মনোরঞ্জনের মাধ্যম হয়ে |

NO COMMENTS