কলকাতা তখন লোকে লোকারণ্য। নিউ মার্কেট গড়ে তুলেছেন স্টুয়ার্ট হগ। শহরে আরও বাজার দোকান আছে। কিন্তু কালিদাস শীল নামে এক ব্যক্তি নিজের নামে একটি বাজার খুলে বসলেন বিশ শতকের গোড়ায়। বাজারে খোদাই করা হল তাঁর নাম—কালিদাস শীলের বাজার। সবজি, ফলমূল, ভালই বিক্রি হতে লাগল। কিন্তু ক’দিনের মধ্যেই দোকানিরা পালাল।

বৌবাজার ও ওয়েলিংটন স্ট্রিটের সংযোগস্থলের কাছে এই বাজার থেকে কেন দোকানিরা পালিয়ে গেলেন, তা জানা নেই । তবে পালাল । কিন্তু আস্ত একটা বাজার আছে যখন, তখন সেখানে কি আর দোকানির অভাব হয় ! নতুন দোকানিও পেয়ে গেল কালিদাস শীলের বাজার । সঙ্গে নতুন ক্রেতাও ।

সারাদিন খাঁ খাঁ । গ্যাসবাতি জ্বলে উঠতেই জমে ওঠে বাজার । কালিদাস শীলের বাজার হয়ে গেল পুরনো জিনিসপত্রের বিকিকিনির জায়গা। পসরা সাজিয়ে বসতে শুরু করলেন দোকানিরা। ক্রেতারাও আসতে শুরু করলেন। শুধু পুরনো জিনিস নয়, এই বাজারের মূল আকর্ষণ হল চোরাই মাল। বাজারে যে জিনিসটা দশ টাকা, এখানে তা অনায়াসেই দু-তিন টাকা কিংবা হাফ দামে মেলে।এরপরেও দরদস্তুরের সুযোগ ।

সে কারণে অল্প দিনেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল বাজার । কালিদাস শীল অতীত হয়ে  নতুন বাজারের নাম হল চোরহাট বা চোরবাজার । শুধু বাজারের নয়া নামকরণ পুরনো বা চোরাই মালের বিকিকিনির জন্যই নয়, এই বাজারে উপস্থিত থাকত সে সময়ের দাগী চোর, পকেটমাররা। সুযোগ পেলে এখানেও তারা তাদের পেশাকে ঝালিয়ে নিত।

Banglalive-8

এই বাজারেই এক সন্ধ্যায় হাজির হয়েছিলেন এক সাহেব । অগাস্টাস সামারভিল । এ দেশের অপরাধ এবং ধর্ম নিয়ে গবেষণা করছিলেন । সে জন্যই তাঁর চোরহাটে আসা । এসেই এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলেন তিনি—

Banglalive-9

একটি দোকানে এক জোড়া জুতো দেখে সাহেব লোভ সামলাতে পারলেন না । পাঁচ টাকা দাম দিয়ে কিনে ফেললেন সেই জুতো । দোকানিও পিচবোর্ডের বাক্সে জুতো ঢুকিয়ে তা সুতো দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলেন । সাহেব বগলদাবা করে সেই জুতো নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। এবার বাক্স খুলেই হতবাক সাহেব—ভোঁ ভাঁ, জুতো জোড়া হাপিস। অথচ সুতো বেশ টাইট করেই বাঁধা। তাহলে কোথায় গেল জুতো !

আরও পড়ুন:  অগ্নিগর্ভ ভূস্বর্গে এক ঝলক মানবিকতার টাটকা বাতাস

সাহেব অনেক নেড়ে চেড়ে দেখে আবিষ্কার করলেন, পিচবোর্ডের বাক্সের একদিক কেটে জুতো জোড়া বের করে নেওয়া হয়েছে । শুধু তাই নয়, জুতো জোড়া বের করার পর সেই অংশটা আবার আঠা দিয়ে জোড়া হয়েছে । সাহেবের বেশ রাগ হল । পরদিন সন্ধ্যায় আবার তিনি হাজির হলেন সেই দোকানে । দোকানি তো সাহেবকে দেখে এক গাল হাসলেন। সাহেব বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই দোকানি বলে উঠলেন—‘আমি বেশ খুশি, আপনি আমার পাকা খরিদ্দার হয়েছেন। মাল আপনার পছন্দ হয়েছে। তাই তো আবার ফিরে এসেছেন। আসুন আসুন বসুন বসুন।’

বলতে বলতেই সাহেবের হাতে এক জোড়া জুতো ধরিয়ে দিলেন দোকানি, ‘এই নিন, একেবারে জলের দাম । মাত্র তিন টাকা।’ সাহেব জুতো জোড়া হাতে নিয়ে বিস্মিত–গতকাল তিনি যে জুতোটা কিনেছিলেন, এ তো সেই জুতো ! সাহেবের বেশ হাসি পেল । তিনি তিন টাকা দিয়ে আবার সেই জুতোটা কিনলেন । তবে এবার আর রিস্ক নিলেন না । নতুন জুতো পায়ে গলিয়ে পুরনোটি হাতে ধরে বাড়ি ফিরলেন ।

এ ঘটনায় হয়ত চোর হাট নিয়ে স্টাডি করার ইচ্ছেটা বেড়ে গিয়েছিল সাহেবের । প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই হাজির হতে লাগলেন। এমনই একদিন চোর হাটে একটি দোকানের সামনে আরও এক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছিলেন সামারভিল—একটি দোকানে লেখা ‘এক দর’। বেশ অবাক হলেন সাহেব। যেচে আলাপ করলেন সেই দোকানের বৃদ্ধ মালিকের সঙ্গে । বৃদ্ধের দোকানে এসে প্রায়শই আড্ডা দিতেন সাহেব ।

একদিন তিনি জানতে পারলেন, ওই বৃদ্ধ এক সময়ের দাগী চোর । যে সে চোর নয়, ম্যাজিকের মত তিনি হাপিস করে দিতে পারেন সব কিছুই। কিন্তু একদিন এক সাহেবের কুকুরের হামলায় তাঁর হাত নষ্ট হয়ে যায়। কথা শেষ হতেই সিগারেট ধরাতে গিয়ে সামারভিল দেখলেন, তাঁর পকেট থেকে উধাও সিগারেট কেস। বিস্মিত চোখে সামারভিল তাকালেন বৃদ্ধের দিকে। বৃদ্ধ মিটি মিটি হাসতে হাসতে বললেন, এখনও তাঁর হাত  এখনও তা মরে যায়নি।

আরও পড়ুন:  খোলা আকাশের নীচে খবর পড়লেন এই টিভি সঞ্চালকরা

এখনও কি সেই বাজার আছে ? কে জানে ! তবে একদিন খোঁজ করতে করতে পৌঁছে গিয়েছিলাম এক সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটে। প্রতি সন্ধ্যায় বৈঠকখানা বাজারের ভিতরে একটা বাজার বসে। সেই বাজারে পুরনো জুতো বিক্রি হয়। এই বাজার সেদিনের ‘চোর হাট’ কিনা, তা অবশ্য জানা নেই। হয়ত হবে, কিংবা হবে না ।

NO COMMENTS