আব্বু

211

আব্বু

হাঁ্টতে হাঁ্টতে মোড়টা ঘোরার আগেই বাঁ দিকে একটা ফাঁ্কা জায়গার আভাস পেলাম | আকাশটা মনে হচ্ছে ওদিকটা করে মাটির অনেক কাছে নেমে এসেছে | ঘুরতেই চোখে পড়ে একটা নদ্ি, বেশ চওড়া, আমার দু’পাশে কলার ক্সেত, একটু খাড়াই ঢাল বেয়ে একটা ঘাট মত | ঘাটে যেতে ইচ্ছা করে না খুব একটা, সামনে গেলেই তো নদ্ির ধার তার মিষ্টি মধুর ব্য়াপারটা ছেড়ে গণ শৌচালয় হয়ে ধরা দেবে | তার থেকে দ্ুরে দাঁ্ড়িয়ে মনে মনে জুম করে নেওয়াই ভাল | নদ্ির মাঝে একটা চর , আগাছা আর কাশ গাছে ভর্তি | দ্ুর থেকেও যেন শোঁ শোঁ একটা আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে | এক সাইকেল কিশোর্ি, উৎ্সাহে টগবগে, গামছা আর চানের সরঞ্জাম নিয়ে আমাকে সযত্নে এড়িয়ে, পেরিয়ে যায় আর পিছন ফিরে হাত নেড়ে নেড়ে কাউকে তাড়া দিয়ে ডাকে, অস্ফুটে হাসি মাখিয়ে বলে, এসো না, বড্ড ঢিমে তুমি…যেন বা দ্ুরের যাকে বলা সে শুনতে পাচ্ছে | ব্য়ক্তিগত ব্য়াপার,তাকাবো না ভেবেও তাকিয়ে ফেলি; বোধহয় মেয়েটার মা, আরও মিনিট পনের লাগবে মহিলাটির আমাকে পেরিয়ে যেতে | ততক্সণ আমি একদম একা | আমার আশে পাশে কেউ নেই,কোনও শব্দও না | আবার চোখ যায় চরটার দিকে | এবার নজরে পড়ে ওখানে একদল লোকজনও আছে, পিকনিকই হবে | সঙ্গে ঢাউস মাপের দুটো সাউন্ড বক্স, এত দ্ুর থেকে শোনা যায় না | একঘেয়েমি কাটাতে নিশ্চয়ই | আমার চুপচাপ ভাল লাগছে | হাত দিয়ে আমার মোবাইলের ইয়ার ফোনটা একবার পরখ করে নিই | আস্তে আস্তে চারপাশটা সহন্িয়, অনুলেখ্য় হয়ে আসতে থাকে |

এবার ফিরতে হয় | ভালোই লাগল বোধহয় এই সময়টুকু | হঠাৎ আমাকে চমকে দিয়ে খুব কাছ থেকে ক্রক ক্রক করে একটা কাক ডেকে ওঠে…নিশ্চয়ই দাঁ্ড়কাক | আর সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে হাত চলে যায়, অনেক দিন দাঁ্ড়কাক দেখিনি, একটা ছবি তুলে রাখি | ঘুরতেই দেখি একটা নয়, দুটো দাঁ্ড়কাক |, একটা কলাগাছের পাতার ওপর হুটোপুটি করছে | আমাকে ক্য়ামেরা তাক করতে দেখে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ঝটিতি ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখে থেমে যায় দুটো কাকই | এবং চট করে উড়ে ফিরে আসে পাশের গাছটায় | আমি আবার ক্য়ামেরা তাক করি | এবং আবার আমাকে দেখে উড়ে যায় | আমি তাক করি,স্টিল থেকে মুভিতে চলে যাই, আস্তে আস্তে জুম করতে থাকি,ওরা মাথা ঝাঁ্কিয়ে ঝাঁ্কিয়ে দ্য়াখে আর পাশের কলাগাছটার পাতায় গিয়ে বসে | পাতাটা জিমন্য়াস্টিকের স্প্রিং বোর্ডের মত লাফিয়ে ওঠে আর ওদের দুজনকে শ্ুন্য়ে ছুঁ্ড়ে দেয় | পড়তে পড়তে ওরা ডানা মেলে সামলে নেয়, প্রতিবর্তে উড়ে যায় পাশের গাছটার আন্দাজমত আরো শক্তপোক্ত কোনো পাতায় | পাতা গুলো, আমার ক্য়ামেরা এগোতে থাকে, আরো কাছে এগোতে থাকে, ওরা পালাতে থাকে, আড়াল খোঁ্জে | এবার কলাগাছ ছেড়ে নিচু, একটু শক্ত ডালালা একটা গাছ খোঁ্জে | একবার ডানদিকে যায়, আবার গোত্তা খেয়ে বাঁ দিকে ছুট দেয়; আমিও এলোপাথারি তাড়াতাড়ি করে হাঁ্টতে গিয়ে একটা শক্ত বড় মাটির ঢ্য়ালায় ধাক্কা খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ি |
— একটু দেখে ছবি তুলুন…, হালকা ধমকের স্বরে বলে এক মহিলা পাশ দিয়ে চলে যান | একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসি, মহিলা চলতে চলতেই পেছন ফিরে দ্য়াখেন, হাসি ফেরত দ্য়ান | আবার ক্র, আশে পাশেই, কিন্তু কাক জোড়াটাকে আর দেখতে পাই না | ফিরে দেখি মহিলাটি চলে যাচ্ছেন নদ্ির দিকে |

একটু সময়ের মধ্য়েই আবার চারপাশটা অনুলেখ্য়, সহন্িয় হয়ে আসে |

আমার যতদ্ুর চোখ যায় আমি কাক জোড়াটাকে খুঁ্জতে থাকি | দেখতে পাই না | কলার ক্সেতের রকমারি হালকা সবুজ খানিকটা গাঢ় হয়ে গেছে, তারপর আছে ঝোপঝাড় | হয়ত ওখানেই আছে | আমি সরি বলে অস্ফুটে, একটু হেসে; যেন বা শুনতে পেল |

মাঝ-চরে সাউন্ডবক্স বাজছে, আমি দেখতে পাই | কতগুলো ছেলে মেয়ে নাচানাচি করছে | আমি ফিরে যাই |

আমার ফোনে থেকে যায় দুটো কাকের ছটফটানি আগাম্ি কয়েক দিনের জন্য় |

আব্বু

মোবাইলের এই খেলাটা বেশ মজার | তিনটে তিনটে করে রঙের চৌখুপি ন্িচে নেমে এসে ডান দিক বাঁ দিক করে করে জমা হতে থাকে | ওপর-ন্িচ-ডান-বাঁ করে তিনটে চৌখুপির রঙ মিলে গেলেই সেই তিনটে খোপ মিলিয়ে যায়, রঙ না মিললেই জমতে থাকে | আবার নতুন তিনটে রঙের খোপ নামে | সব রঙ মিলে মিলিয়ে গেলে ফোনের পর্দাটা একদম সাদা হয়ে যায়, আর একটা ভ্িষণ ফাঁ্কা লাগে | রঙের খোপগুলো জমলে বেশ লাগে, তাতে বেশ একটা রং্দার্িও খেলা করছে | মাঝে মাঝে গাঢ় হয়েও মিলিয়ে যাচ্ছে; আবার নতুন রঙের আনাগোনা, নতুন সম্িকরণের সম্ভাবনা | কিন্তু সেও তো হবার নয় | ক্রমে বাক্সগুলোর গতি বাড়তে থাকে, জমতে জমতে অল্প কিছুক্সণের মধ্য়েই পর্দায় ভিড় হয়ে যায় | আর পর্দাটা ভরে গেলে নিজে থেকেই রঙের বাক্সগুলো ফ্য়াকাসে হয়ে যায়, ভরার সময়ও পাওয়া যায় না; পর্দায় খেলা শেষ ভেসে ওঠে | মনে হয় বড্ড দেয়াল হয়ে ওঠে পরিচিতিগুলো | খেলা শেষের সমর্থনে যুক্তি সাজাই “ভ্িষণ বোরিং লাগছিল” | বড় পর্দার ফোনে নিশ্চয়ই এই সমস্য়া থাকবে না | আবার থাকতেও পারে | দুটো তিনটে ফোন পাশাপাশি রেখে দেখতে পারলে হয়, এই যা; বা রঙগুলো আরও ভালো বা স্পষ্ট লাগবে | দ্ুরব্িন লাগিয়ে কার আর কবে চোখ ভালো হয়েছে; আর রঙের দেয়াল ইচ্ছে মত থামিয়ে স্ক্রিন সেভার করে রাখা যেত’দিন বুঁ্দ হয়ে কাটে আর খেলাও চলতে থাকে…বাসে বিছানায় বাথরুমে, সুযোগ এলেই | মাঝে মাঝেই থামতে হয়, বাধা আসে | মেট্রো রেলে একদিন প্রচন্ড ভিড়ের মধ্য়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার মাশুল গুণতে হল | …এক ধাক্কায় এর গায়ে ওর পায়ে গোত্তা খেতে খেতে ফাস্ট-ফরোয়ার্ড ভো-কাট্টা ঘুড়ির মত ফোন ট্রেনের মেঝেতে; দাদা একটু সরুন…,দিদি প্লিজ একটু দেখি করে ন্িচু হয়ে দেখি ফোনে তখনো রঙ মিলান্তি চলছে, কিন্তু আমার দেখায় ফোনের স্ক্রিনটা তখন উল্টো হয়ে আছে, আর চমকে গিয়ে দেখি রঙের বেয়াড়া দেয়ালটা বহু-রং তুবড়ি হয়ে গেছে |
মজে থাকি তুবড়ি খেলায় | ফোনটাকে উল্টো করে খেলতে খুব অসুবিধে হয় প্রথম প্রথম, তারপর সেও ক্রমে অভ্য়েস হয়ে যায় |
এক সময় তুবড়ির রঙে তুবড়ি বিবর্ণ লাগে | ফোনটাকে ডানপাশ করে ঘুরিয়ে নিই | পছন্দ হয় না | …উল্টো পাশে…না, বিশেষ রকমফের কিছু না | ভেবেছিলাম এই ভাবেই ফোনটার জ্িবদ্দশাটা চলে যাবে, কিন্তু তা বোধহয় হবার নয় | অগত্য়া, মনে করে নিই দেয়াল দেয়াল খেলাটাই বেশ ছিল | কিছুদিন পর আবার নাহয় তুবড়িটা ভালো লাগাব | এ হল এক নতুন রঙ মিলান্তি; মাত্র দুটো রঙ, খ্য়ালো যত পারো, শুধু একটু নিয়ম বানিয়ে নিতে হবে হার-জিত আর আব্বু

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.