মেঠো ধুলো মেখে পড়ে রইল উনুন-শিলনোড়া-হাতাখুন্তি-সাঁড়াশি, চলে গেলেন শতবর্ষীয়া রন্ধনশিল্পী

গ্রামের মেঠো আলের ধারে কাঁচা উনুন | শীর্ণ হাত খচখচ করে তরকারি কাটছে | মশলা পিষছে | থেঁতো করে নিচ্ছে গোটা মশলা | তারপর গ্রামের পথের ধারেই তৈরি হচ্ছে একের পর এক বিস্ময় | কখনও এমু পাখির মাংসের স্বর্গীয় কষে কষা ঝাল ঝোল | কখনও তরমুজের ভিতরে নবজন্ম চিকেনের | অথবা একের পর একে শিকে গেঁথে যাচ্ছে কাবাব | সবই খোলা আকাশের নিচে | তোলা উনুনে | গত দু বছর ধরে এভাবেই গ্রাম্য স্বাদের আস্বাদন হচ্ছিল অন্দ্রাক্ষরী মস্তানাম্মার হাতে | ইউটিউবের মাধ্যমে তিনি নাকে ঝামা ঘষে দিতেন শহুরে আভিজাত্যের | চলে গেলেন শতবর্ষীয়া রন্ধনশিল্পী | ১০৭ বছর বয়সে মৃত্যু হল অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুর জেলায় গুঢিওয়াড়া গ্রামে | 

হাতের রান্নায় এত স্বাদের বাহার | কিন্তু তাঁর জীবন ছিল রূপ-রস-বর্ণ হীন | বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১১ বছর বয়সে | এগারো বছরের দাম্পত্যে পেলেন চার সন্তান এবং অকাল বৈধব্য | বাইশ বছর বয়সী মস্তানাম্মা তখন খেতমজুর | মাঠে পরিশ্রমের মাঝেই রান্নাবান্না সেরে ফেলা | নইলে চারজন সন্তানের মুখে কী তুলে দেবেন ! বেশিদিন তুলে দিতেও হল না | কলেরা নিয়ে নিল তিনজনকে |

এরকম চরম শোকও যা নিতে পারল না তা হল মস্তানাম্মার হাতের জাদু | অতি সামান্য উপকরণেও বাজিমাত করা ছিল তাঁর ডান হাতের খেলা | কোনওদিন ব্যবহার করেননি স্টোভ বা এলপিজি গ্যাস | কাঠ বা কয়লার আঁচই ছিল তাঁর সৃষ্টির ইন্ধন | মিক্সার গ্রাইন্ডারের ঘরঘরানি নয় | আম্মার কানে মধুর মনে হতো শিলনোড়ার ঘষঘষানি |

এইভাবেই জন্ম দিয়ে চললেন সন্তানদের | জীবন তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে তিনজন সন্তানকে | পরিবর্তে তিনি জীবনকে দিয়েছেন নিজের সন্তানসম অসংখ্য পদ | কখনও চিকেন ড্রামস্টিক‚ আবার কখনও বা কেএফসি-র মাংস ভাজা | আবার কোনওদিন বাঁশের ফাঁপা অংশে মন গুমরে পড়ে থাকত বিরিয়ানি | গলত না যতক্ষণ অবধি কেউ তাকে রসনায় ধারণ করছে |

হাতের জাদুর মতোই অমলিন বৃদ্ধার ফোকলা মুখের হাসি | অন্ধ্রপ্রদেশ ছাড়িয়ে তামিলনাড়ু‚ কেরল‚ কর্নাটক ছাপিয়ে বিন্ধ্য অতিক্রম করে সারা বিশ্বে বৃদ্ধার নাতি নাতনিরা আমোদিত হয়েছে রান্নার সুবাসে | বছর দুয়েক আগে তাঁর দূর সম্পর্কের নাতি কে. লক্ষ্মণ এবং তাঁর এক বন্ধু শ্রীনাথ রেড্ডি মিলে শুরু করেন ইউ টিউব চ্যানেল কান্ট্রি ফুডস | সাড়ে বারো লক্ষের বেশি সাবস্ক্রাইবার নিয়ে মস্তানাম্মা ছিলেন বিশ্বের প্রবীণতমা ইউটিউবার | এই চ্যানেলে প্রথম বার পোস্ট করা হয়েছিল বেগুনের তরকারি | সেটাই আজ অবধি এই রন্ধনশিল্পীর জনপ্রিয়তম পদ | কান্ট্রি ফুডস চ্যানেলে পোস্ট করা হয়েছে বৃদ্ধার শেষকৃত্যও | স্বর্গীয় রান্নার পদ যেখানে‚ সেখানেই নশ্বর থেকে অবিনশ্বর হলেন তিনি |

গ্রামের পথের পাশে পড়ে রইল তাঁর উনুন-শিলনোড়া-মশলাপাতি-হাতাখুন্তি-সাঁড়াশি | সব ফেলে চলে গেলেন বৃদ্ধা | যাঁর বিয়ে হয়েছিল ১১ বছর বয়সে‚ বৈধব্য ২২-এ‚ আর বিশ্বজোড়া খ্যাতি ১০৭-এ | চিতা থেকে কুণ্ডলি হয়ে পাক খেয়ে ওঠা ধোঁয়ায় স্বর্গপ্রাপ্তি হয়েছিল অভাগীর | সেরকমই হয়েছে কি এই বৃদ্ধারও যখন গ্রামের মাঠের ধারে তাঁর মাটির উনুনের আঁচ থেকে ধোঁয়া হাত বাড়িয়েছিল আকাশের দিকে ? সঙ্গে এমন অনেক খাবারের ঘ্রাণ নিয়ে‚ যা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কোনওদিন হয়তো সন্তানদের মুখে তুলেও দিতে পারেননি এই রন্ধনশিল্পী |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.