‘ক্রিসক্রস’: খুব ঝকঝকে ছবি, কিন্তু গণ্ডগোলটা কোথায় হয়েছে, জানেন?

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তসলিমা নাসরিনের কাহিনী-চিত্রনাট্যে এক মেগাসিরিয়াল দ্যাখান হবে ঠিক হয়েছিল এপারের এক চ্যানেলে। তসলিমাই নাম রেখেছিলেন, ‘দুঃসহবাস’। শেষ অবধি নানা কারণে সেটা টেলিকাস্ট হয় নি বটে আর। তবে, কী ভাবে যেন সেটার পাইলট এপিসোড দ্যাখার সুযোগ হয় আমার।

এমনিতে তো মোটের ওপর দেখতে বেশ ঝকঝকে আর স্মার্ট হয়েছিল সেটা, কিন্তু গণ্ডগোল ছিল কোথায় জানেন? স্ক্রিপ্টে।

শুধু প্রথম পর্বেই একটি ক্যারেকটারকে এক সন্ধে থেকে রাতের মধ্যে এতগুলো জায়গায় দ্যাখান হয়েছিল, যে দেখতে গিয়ে হাঁ হয়ে যাই আমি। হাতে গোনা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটা মানুষ ক’টা লোকেশনে চক্কর খেতে পারে বলুন দেখি? ফিজিবিলিটি বলে তো জীবনে একটা ব্যাপার থাকে, নাকি?

একটা এপিসোড দেখতে গিয়েই তখন হাঁফ ধরে যায় আমার। ফার্স্ট এপিসোড পেরিয়ে পরের এপিসোডগুলো দ্যাখার জন্যে আর কোন ইচ্ছে আসে নি মনে।

‘ক্রিসক্রস’ নিয়ে লিখতে বসে হঠাৎ কেন অতদিন আগের দ্যাখা টিভি সিরিয়ালের কথা লিখে শুরু করছি, জানেন? সিনেমাটা কিছুক্ষণ দ্যাখার পরেই যে সেই ‘দুঃসহবাস’ দেখতে বসার স্মৃতিগুলো মনে পড়তে লাগল আমার একের পর এক!

না, দু’টোর গল্পে কোন মিল নেই তাই বলে। কিন্তু অন্য একটা ব্যাপারে যে দুটো হুবহু এক!

‘ক্রিসক্রস’ এমনিতে বেশ ঝকঝকে আর স্মার্ট একটা ছবি। কিন্তু গণ্ডগোলটা হল যে সেই টিভি সিরিয়ালের মতো! নির্দিষ্ট একটা সময়ের মধ্যে একটা ক্যারেকটার যে ঠিক কতটা ট্র্যাভেল করতে পারে, ক’টা জায়গায় যেতে পারে, সেটার মিনিমাম হিসেব যে নেই কোন!

‘মেহের’ (অভিনয়ে নুসরাত জাহান) নামে মেয়েটির কথাই ধরুন। সকাল থেকে শুরু করে রাত্রি অবধি, মোটামুটি পনের কি ষোল ঘণ্টার স্টোরি। এর মধ্যে একে দিয়ে কী কী করতে দ্যাখান হচ্ছে শুনুন।

সকালবেলায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে এ গিয়ে পৌঁছল এক দুষ্টু ডিরেক্টরের (অভিনয়ে দেবালয় ভট্টাচার্য) কাছে, অডিশন দেওয়ার জন্য। সেই ডিরেক্টর আবার তার অডিশন নিতে চায় জামার বোতাম খুলিয়ে, তবে। ‘একটা বোতাম খুলতে এত কষ্ট হচ্ছে?’ এখন ঠিকঠাক যদি সময় মেপে দেখতে হয়, তাহলে এরকম একটা অডিশন দিতেই হাফ দিন কাবার হওয়ার কথা!

এখানে কিন্তু দেখতে পাবেন, অডিশনে বিফল হয়ে ফ্লোরের বাইরে বেরিয়ে আসছে মেহের। সোজা বাড়ি ফেরত না গিয়ে ফ্লোরের সামনে সামনে পেতে রাখা চেয়ারগুলোতে বসছে কিছুক্ষণ। সেখানে পাশে-বসা একটা মেয়ে ওকে বলছে ‘ম্যাজেন্টা ফিল্মস’ নামে এক প্রোডাকশন হাউসের কথা। ওয়েব সিরিজ করার জন্য যারা এখন মেয়ে খুঁজছে নাকি। শর্ত শুধু এটাই যে, ওসব সিরিজ-টিরিজগুলো সব অ্যাডাল্ট মার্কা হবে। ‘তোমার তো ফিগার ভাল। সেটা দ্যাখাতে এত প্রবলেম কীসের?’ সেখানে আবার শুট শেষ হওয়া মাত্র হাতে হাতে ক্যাশ।

সেই অপশনে না গিয়ে মেহের তখন ফিরে আসছে বাড়ি। আসা মাত্র বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়ার টাকার জন্যে গুঁতো দিচ্ছে ওকে। কিন্তু টাকা তখন কোথায় পাবে ও?

মরিয়া হয়ে মেহের তখন হেল্প চাইছে বন্ধু ইরার (মিমি চক্রবর্তী) কাছে। ইরা ওকে জুগিয়ে দিচ্ছে মিস সেনের (জয়া আহসান) অ্যাড এজেন্সির নাম্বার। সেখানে যদি মডেলিংয়ের কাজ কিছু পায় ও।

এবার আপনি দেখতে পাবেন, মেহের গিয়ে পৌঁছচ্ছে সেই মিস সেনের কাছে। কিন্তু কাজ কিছু জুটছে না ওর আদৌ। চেম্বারে ওকে নিজের সামনে বসিয়ে রেখে গরম গরম কথা শুনিয়ে মিস সেন ওকে ভাগিয়ে দিচ্ছে জাস্ট।

এরপর আবার টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ার সিন। দু’দিন আগে যে শুটটা করেছে, সেটার জন্যে চেক নিতে মেহের গেছে প্রিয় শর্মা নামে এক প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাছে। যথারীতি এখানেও কিস্যু পায় না ও।

কাট টু এবার চার্চ সিনে আসুন। হতাশ হয়ে মেহের এবার গিয়ে পৌঁছেছে চার্চে। সেখানে বসে বন্ধু সুজ়ি-র (প্রিয়াঙ্কা সরকার) সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথা বলছে সে। শুনছে কালকের মধ্যে নাকি সুজ়িকে ওর ছেলের স্কুলের ফি জমা দিতে হবে। আর সুজ়ির হাতে নাকি দেওয়ার মতো আদৌ কোন টাকা-পয়সা নেই।

ব্যাস, অমনি মেহেরের মনে পড়ে যাচ্ছে সকালবেলা স্টুডিওপাড়ায় শোনা একটা মেয়ের কাছে সেই ম্যাজেন্টা ফিল্মসের কথা। ওটা মনে পড়া মাত্র দ্রুত সুজ়িকে কথা দিয়ে ফেলছে ও, যে কালকে ছেলের স্কুলে ফিজ দিতে কোন প্রবলেম হবে না ওর। অ্যাজ ইফ ওখানে কাজটা করে পেমেন্ট যেন পেয়েই গ্যাছে ও!

এরপর ও চলে যাচ্ছে ম্যাজেন্টা ফিল্মসের অফিসে। সেখানে তখন রগরগে বেড সিন শুট করছে হাউসের দুষ্টু কর্তাখানি (অভিনয়ে জয়জিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়)। তার কথা শুনে বোঝা যাচ্ছিল, ওয়েব সিরিজ না ছাই, একের পর মেয়ের সঙ্গে এর তো শুধু শুয়ে বেড়ানোর তাল।

সকালবেলায় অডিশন দেওয়ার সময় জামার প্রথম বোতামটুকু খুলতে চাইছিল না মেহের। আর এখন একটু বেলা গড়াতে না গড়াতে খুল্লাম খুল্লা ওয়েব সিরিজ করতে হল রাজি! বাহ রে স্ক্রিপ্ট, বাহ! এর আগে শোনা গেছিল, ম্যাজেন্টা ফিল্মসে শুট শেষ করা মাত্র নাকি হাতে হাতে ক্যাশ। এখন দেখতে পাওয়া গেল, শুট শুরু হওয়ার আগেই, মেহের রাজি হওয়া মাত্র ওর হাতে নোটের তাড়া – হাতে গরম পঞ্চাশ হাজার ক্যাশ!

ঠিক এই জায়গায় খুব ভাল কিছু ডায়ালগও রয়েছে ছবিতে। যেমন জয়জিৎ অভিনীত ক্যারেকটারটিকে বলতে শোনা গেল যে, ‘আমরা কিন্তু শিল্প মাড়াই না’। আর মেহেরকে তার উত্তরে বলতে শুনবেন যে, ‘শিল্প মাড়ানোর হলে আমিও এখানে আসতাম না’। এরপর ওর হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে ওকে কাছে টেনে নিচ্ছে ম্যাজেন্টা ফিল্মসের দুষ্টু সেই লোক।

এরপরেই আপনি দেখতে পাবেন যে শুরুও হয়ে গেল ম্যাজেন্টা ফিল্মসের নতুন ওয়েব সিরিজের শুটিং, ‘রোমে রোমাঞ্চ’ নাম। রোমান রাজপুরুষদের কায়দায় একটা ড্রেস পরে খাটের ওপর সেই দুষ্টু লোকটা আর তার সঙ্গে মেহের। এরপরেই আবার চমক। দেখতে পাবেন মেহেরের সেই সতীপনা রিটার্ন এসেছে ফের। কাপড় খোলা পরের কথা, বিছানায় উঠে কো-অ্যাক্টরকে চুমু খাওয়ার নামে একেবারে ছিটকে উঠছে সে!

এই সমস্ত দেখতে গিয়ে মাথা আমার ঘুলিয়ে গেল পুরো। মনে হচ্ছিল আগের সিনে যা দেখেছি, পরের সিনে গিয়ে তার আর হিসেব মেলে না কেন? একটু আগেই যে মেয়েটাকে পেমেন্ট বুঝে নেওয়ার সময় বলতে দেখলাম, ‘আমিও এখানে শিল্প মাড়াতে আসি নি’, এখন সে কোন আক্কেলে বলতে পারে যে, ‘আই অ্যাম অ্যান আর্টিস্ট, নট অ্যান এসকর্ট’।

ম্যাজেন্টা ফিল্মসের শুটিং পর্ব এইখানেতেই ইতি। এবার আবার দেখতে পাবেন ওর বন্ধু ইরা ফোন করছে ওকে। ফোন করে রিকোয়েস্ট করছে ইরার বয়ফ্রেন্ড আর্চিকে (অর্জুন চক্রবর্তী) যেন একটু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সামলে রাখে মেহের। আসলে আজ রাত ন’টার সময় আর্চির বাড়িতে যাওয়ার কথা ইরার। সেখানে ওদের এনগেজমেন্ট ঘোষণা হবে আজ। বাই চান্স কাজের চাপে ইরা যদি এই অনুষ্ঠানে না গিয়ে উঠতে পারে, তাহলে সেটা মেহের একটু ম্যানেজ দ্যায় যেন। কারণ, ওই আর্চি তো মেহের-এরও কাছের ফ্রেন্ড হয়!

এইখানে আবার একটা ধাক্কা। যার সঙ্গে দীর্ঘ সময় লিভ-ইন করছি আমি, যার সঙ্গে আজ রাতে আমার অফিসিয়াল এনগেজমেন্ট হবে, তাকে একটা কথা বুঝিয়ে বলার জন্য থার্ড পার্টিকে ফোন করতে হবে! এ কেমন রিলেশনশিপ, ভাই!

তো সে যাক, আবার আপনি মেহেরের কাছে আসুন। ইরা শুধু বোঝাতে বলেছিল অর্চিকে, কিন্তু এখানে আপনি দেখতে পাবেন যে, বোঝানোর জন্যে অর্চিকে নিয়ে একেবারে শপিং মলে ঘুরতে চলে যাচ্ছে মেহের। সেখানে ঘুরতে ঘুরতে মেহের হঠাৎ জানতে পারে, অর্চির পিসতুতো দাদা অহন (গৌরব চক্রবর্তী) একটা অ্যাড এজেন্সি চালায়, আর সেখানে মডেল হিসেবে মেহেরের একটা কাজও জুটতে পারে।

এবার মেহের পৌঁছে যাচ্ছে অর্চির সেই পিসতুতো দাদার কাছে। কিন্তু পৌঁছে যাওয়া এবং অহনের সঙ্গে মিটিং করাই সার, কারণ অহনও কোন কাজের অফার দিতে পারছে না ওকে।

এবার মেহের বাড়ি ফেরার সময় যখন সুজ়ির বাড়ির সামনে দিয়ে পাস করছে, তখন হঠাৎ দেখতে পেল কতগুলো ইভ টিযার এসে অ্যাটাক করেছে সুজ়িকে। দ্যাখামাত্র সুজ়িকে হেল্প করতে ঝাঁপিয়ে পড়ল মেহের, আর আত্মরক্ষার স্প্রে ইউজ করে ছেলেগুলোকে কাবু করল দ্রুত। তারপর সুজ়ির সঙ্গে সুজ়ির ঘরে ঢুকল গিয়ে সে।

সেখানে সুজ়ির আঁকা পেন্টিং দেখে চমকে গেল মেহের, আর মনে হল, এত ভাল পেন্টিং যে করতে পারে, অহনের এজেন্সিতে কাজ তো পেতেই পারে সে।

মনে হওয়া মাত্র সুজ়িকে নিয়ে অহনের এজেন্সিতে ফের গিয়ে পৌঁছল মেহের। বন্ধ চেম্বারে অহন তখন ক্লায়েন্টের সামনে বসে হাতজোড় করে কাকুতি করছে খালি! আর্ট ওয়ার্ক ডেলিভার করতে নাকি আরও একটু সময় লাগবে ওর।

ঠিক ওই সময়েই ওর চেম্বারের বাইরে বসে কম্পিউটারে পুরো আর্ট ওয়ার্ক বানিয়ে ফেলল সুজ়ি! আর ক্লায়েন্ট যখন রেগে-মেগে এজেন্সি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে তৈরি, তখন সেই আর্ট ওয়ার্কের ছাপা নিয়ে ক্লায়েন্টের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে ও।

ব্যাস, অমনি সুজ়ির চাকরি হয়ে গেল। আর সেই বিজ্ঞাপনে মডেলিংয়ের কাজও পেল মেহের। এরপর  অহনকে নিয়ে ওরা দুজন অর্চিদের বাড়িতে সেই রাতের পার্টিতে যাচ্ছে, যেটা নাকি রাত নটার সময় শুরু!  অর্চি-ইরার এনগেজমেন্ট ঘোষণা করার পার্টি প্লাস অর্চির মা-বাবার চল্লিশ বছরের অ্যানিভার্সারি পালনটাও হবে।

এবার আপনি বলুন, যদি ধরে নিই মেহের দিন শুরু করেছিল সকাল সাতটা নাগাদ, আর পার্টিতে পৌঁছল রাত দশটা নাগাদ এসে, তবু, একই দিনে একটানা সবকটা জায়গা অ্যাটেন্ড করা ওর পক্ষে পসিবল কিনা আদৌ। এটা হিসেব করতে যাতে সুবিধে হয়, সেই জন্যে মেহেরের পুরো দিনটা এত ডিটেলে লিখে দিলাম ভাই!

বাড়ি থেকে স্টুডিওতে অডিশন দিতে যাওয়া। তারপর বাড়ি ফিরে এসে ঠিকানা খুঁজে মিস সেনের এজেন্সি। তারপর ফের টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় পেমেন্ট নিতে যাওয়া। তারপর চার্চে সুজ়ির সঙ্গে গল্প। তারপর ম্যাজেন্টা ফিল্মসের অফিসে প্রথমবার কাজের খোঁজে যাওয়া। কথাবার্তা বলে পঞ্চাশ হাজার অ্যাডভান্স। সেদিনই সঙ্গে সঙ্গে শুট। আর তারপরেই কিসিং সিন করবে না বলে, শুট থামিয়ে বেরিয়ে আসা। তারপর ইরার কথা শুনে অর্চির সঙ্গে সিনেপলিস যাওয়া। এরপর সেখান থেকে অহনের ঠিকানা নিয়ে তার এজেন্সিতে কাজের খোঁজে ঢুঁ। সেখান থেকে ব্যর্থ হয়ে ফেরার সময় দুষ্টু লোকদের সঙ্গে লড়াই করে সুজ়ির মান-ইজ্জত বাঁচিয়ে দেওয়ার কেস। তারপর সুজ়ির ঘরে ঢুকে ওর ছবি দেখে অবাক হয়ে সুজ়িকে নিয়ে ফের অহনের অ্যাড এজেন্সিতে যাওয়া। এরপর সেখানে বসে সুজ়ির আর্ট ওয়ার্ক বানানো আর সেটা দেখে মুগ্ধ হয়ে দুজনের কাজের জোগাড় হওয়া। তারপর সবাই মিলে অর্চিদের সেই রাত নটার পার্টি যাওয়া। 

সম্ভব কিনা এটা পনের ঘণ্টায়, বলুন? আর এই যে একটার পর একটা করে তুমুল ঘটনা ঘটেই চলেছে, এখানে কোথাও কিন্তু দেখবেন না, মেহেরের আদৌ কোথাও এনার্জি লেভেল ড্রপ হচ্ছে কিংবা দেহে-মনে ও ধ্বস্ত হচ্ছে বলে। সিনেমায় একটা গান আছে ‘মোমের শহর’ বলে। শহরটা মোমের কিনা বোঝা যাচ্ছিল না ঠিকই, কিন্তু পুরো দিনটা এইভাবে কাটাতে দেখে মেহেরকে যদি আপনার মোমের তৈরি পুতুল-রোবট বলে ভুল হয় তো, তাতে খুব একটা দোষ দেওয়া যাবে না ভাই!

স্মরণজিতের যে উপন্যাস থেকে নির্যাস নিয়ে এই ছবিটা তৈরি, সেটা তো আবার একটা গোটা দিনও নয়, বলতে গেলে কার্যত হাফ বেলার গল্প। কিন্তু এমন একটা স্টোরি লিখতে গিয়ে ঘড়ির টাইম নিয়ে স্মরণজিৎ সতর্ক ছিলেন খুব। সব অধ্যায়ের শিরোনামে ঠিক ক’টার সময় ঘটনা ঘটছে, স্পষ্ট সেটা লিখতে লিখতে গেছেন। বুঝতেই পারছেন সিনেমায় ওই যত্নের কোন বালাই পাট নেই!

সব থেকে বড় ধাঁধা হল, ছবির নাম ‘ক্রিসক্রস’ কেন, সেটার কোথাও ব্যাখ্যা নেই কোন! স্মরণজিতের উপন্যাসে ক্যারেকটারগুলো যেমন অদ্ভুতভাবে ‘ক্রিসক্রস’ করে দ্যাখা হয়ে যেতে থাকে, এখানে সেটা কোথায়? কোথাও সেটা থাকলেও তো খুব খাপছাড়া ভাবে আছে! আর ছবির শেষে কী হচ্ছে, না সবক’টা ক্যারেকটারকে ঘাড় ধরে ডিরেক্টর নিয়ে আসছে অর্চিদের সেই বিয়ে-ঘোষণার পার্টি-স্থলে সোজা। সবাই এসে এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে যে সিনেমার শেষে, সেই সিনেমার নাম ‘ক্রিসক্রস’ রাখার যুক্তি একটু বুঝিয়ে দেবেন প্লিজ?

তবে হ্যাঁ, ছবিতে অভিনয় চমকে দেওয়ার মত। মিস সেনের ভূমিকায় ফাটিয়ে দিয়েছেন জয়া আহসান জাস্ট। আর কিছু না দেখে আলাদা আলাদা শটে মহিলার চোখের তারার চলনটুকু লক্ষ্য করে যাবেন। যখন ডাঁট দ্যাখাচ্ছেন, তখন কেমন বিহেভ করছে চোখের তারা আর যখন প্যাঁচে পড়ছেন, তখন আবার সেই চলনটা পালটে যাচ্ছে কেমন।

কিন্তু ওই যে লিখেছি না যে, পুরো ছবিটাকেই ডুবিয়ে দিয়েছে অযত্নে লেখা স্ক্রিপ্ট। নইলে আপনি বলুন, দিনের শুরুতে দেখতে পেলেন উনি অ্যাড এজেন্সির সর্বময়ী কর্ত্রী, সবাই সমঝে চলছে ওঁকে, আর কলকাতার টপ ফেস হিসেবে ওঁর ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য নিউজপেপার হাজির। আর সেই দিনেই বেলা গড়াতে না গড়াতে আপনি দেখতে পাবেন, ওঁর অফিসে কর্মীরা সব আন্দোলনে ব্যস্ত – দু’মাস ধরে তারা কোন মাইনে পায় নি বলে! আর সেই দিনের মধ্যেই হাত থেকে একটা বড় ক্লায়েন্ট বেরিয়ে যাওয়ায় পথে বসে গেলেন উনি! আরে ভাই, স্ক্রিপ্ট লেখার সময় আপনাদের মাথা ঠিক ছিল তো, নাকি?

মূল উপন্যাসে অর্চি বলে ক্যারেকটারটি ফটোগ্রাফার ছিল। আর তার বান্ধবী ইরা তাকে চাপাচাপি করতো বিয়ে করে নেওয়ার জন্যে। সিনেমায় এই ব্যাপারটা পুরো উলটে দেওয়া আছে। এখানে ফটো-জার্নালিস্ট হল ইরা, আর তাকে ধরে বিয়ের জন্য ঝুলোঝুলি করে অর্চি। এ ভাবে লারী-বিপ্লব দ্যাখান হচ্ছে, সে ব্যাপারে আমার আপত্তি নেই কিছু। আমার প্রশ্ন শুধু একটা যে, ইরাকে এ কোন রুটিনে আপনি কাজ করতে দ্যাখালেন ভাই? শুরুতে আপনি দেখতে পাবেন, গত রাত থেকে নাকি টানা অফিসে রয়েছে ইরা। তার এমনই কাজের চাপ। তা’ তারপরেও ওর শিফট ওভার হয় না নাকি? নতুন একটা কাজ এসে যায়, আর ইরা সারাদিন ধরে সেই কাজের পেছনে ছোটে। মিডিয়ায় কাজের খুব প্রেশার থাকে জানি, কিন্তু এটা ঠিক হজম হল না যে কাজের চাপে চব্বিশ ঘণ্টায় একবারও বাড়ি যাওয়া বা ঘুমের কোন সিন থাকে না ভাই!

জয়া আহসানের পরেই ঠিক আলাদা করে যাঁর নাম করতে চাই, তিনি হলেন সোহিনী। রূপার ভূমিকায় ওঁর অভিনয় নিয়ে আলাদা করে বলতে চাই না কিছু, কিন্তু রান্নাঘরের তেল-ঝোল মাখা আটপৌরে কাপড় পরে ডি-গ্ল্যাম লুকে অদ্ভুত এক অ্যাপিল এসেছে ওঁর।

বাকি ছবির সঙ্গে তালমিল রেখে ওঁর ট্র্যাকটাও খুব অযত্ন নিয়ে লেখা। অক্ষম পতি, দজ্জাল শাশুড়ি আর লোলুপ দেওর – এই ক্লিশে হয়ে যাওয়া চেনা খোপে আটকানো ওঁর স্টোরি। এর সঙ্গে আবার এক্সট্রা টপিং করে সাজিয়ে রাখা লাং ক্যানসার আর কাশতে কাশতে মুখ দিয়ে রক্ত তোলার সিন অবধি আছে! সত্যি দাদা, পারেন বটে আপনারা। একলা রোগীকে চেম্বারে ডেকে ডাক্তার সোজা শুনিয়ে দিচ্ছে যে, আপনার লাং ক্যানসার হয়েছে, তাই তিন মাস আর আয়ু! এরকমটা হয় বলে শুনেছেন নাকি কেউ? আরে রোগীর থেকে এই বিশেষ রোগের নামটা লুকিয়ে রাখার জন্যে বায়পসির রেজাল্ট অবধি সাংকেতিক জার্গনে লেখা থাকে। আর আপনি এভাবে সোজাসুজি ক্যানসারের বার্তা দিয়ে ডেথ পরোয়ানা শুনিয়ে দিলেন, ভাই?

আর একটা কথা বলুন আমায়, লারী মুক্তি মানে কি শুধু সিগারেট ফোঁকা আর ডিস্কে কিংবা বারে গিয়ে গেলাস গেলাস মাল উড়িয়ে দু’হাত তুলে ধেই ধেই করে নাচ আর টলমল করে হাঁটা? আর দোকান থেকে ফ্যাশনেবল কাপড় জামা কেনা? না, মানে – সিনেমায় এগুলোই সব দেখিয়ে দিলেন কিনা! রূপাকে এটা বলারও তো কেউ নেই যে, শাড়ি ছেড়ে ম্যানিকুইনের গা থেকে ওই লাল কাপড়টা খুলে নিয়ে পড়ার পর তোমায় যে বেখাপ্পা এক জোকার লাগছে গো!

তবে ছবির মেজর ঘাপলা কেস এগুলো নয় কিন্তু। কী সেটা আসলে, জানেন?

বলতে চাইছেন লারীশক্তির স্টোরি। আর সেটা করতে গিয়ে কিনা পুরো সিনেমা জুড়ে ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট চালিয়ে গেলেন বিশেষ এক সাবান কোম্পানির জন্যে! তাতে নাকি পদ্মফুলের তেল মেশান আছে! মাইরি আপনারা পারেনও বটে! ১১৫ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের একটা পুরো সিনেমাকে সাবানওয়ালাদের বিজ্ঞাপনে পালটে ফেলতে কারুর একবারও হাত কাঁপল না, স্যর? এই আপনাদের লারীশক্তি উদযাপনের হাল? সাবান কোম্পানির ট্যাগ লাইন ধার করে বলতে হচ্ছে ‘অব সমঝোতা নাহি’?

মাঝে মাঝে সিরিয়াসলি জানতে ইচ্ছে করে যে সিনেমার মধ্যে বিজ্ঞাপন ঠুসে দেওয়ার জন্যে ঠিক কত টাকা আসে ঘরে? বাংলা ছবির দুবলা বাজেটে সেটা হেল্প করে কতখানি?

কেরিয়ারের শুরুতেই ‘জিরো থ্রি থ্রি’ বা ‘জানি দেখা হবে’ বানাতে পারে যে, তার ওপর বেশ খানিকটা আশা রেখেছিলাম আমি। তবে এতদিন পর সেই আশাগুলো আর বেঁচে-বর্তে নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here