দার্জিলিং-এ বারবার

জমজমাট দার্জিলিং-এর ম্যাল

দার্জিলিং শহরটা যে বাঙালী জীবনের সঙ্গে কতখানি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে সেটা নিয়ে নতুন করে আর বলার কিছু নেই | একটা সময় ছিল যখন গরমের ছুটি পড়লেই কলকাতার বাবুরা লোটাকম্বল গুটিয়ে ওই পাহাড়ি শহরে গিয়ে সপরিবারে ক’দিন আরামে কাটিয়ে আসতেন | শীতকালে পারতপক্ষে কেউ ও পথ মাড়াত না ঠান্ডায় জমে যাবার ভয়ে | তবে সে সব পাঠ কবেই চুকে-বুকে গিয়েছে –

 পশমের টুপি নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসেছে এক মহিলা

পশমের টুপি নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসেছে এক মহিলা

কারণ পাহাড়ে আর সেই ঠান্ডা পড়ে না অথবা গড়পরতা বাঙালী শীতের সঙ্গে তাল ঠুকে মোকাবিলা করতে শিখেছে | সে যাই হোক না কেন দার্জিলিং-এর আকর্ষণ কিন্তু মাছিমারা কেরানী থেকে শুরু করে রহিস কেউকেটা সবার কাছেই দিন দিন বেড়েছে বই কমেনি |

আমি জীবনে প্রথমবার দার্জিলিং যাই বাবা-মা’র সঙ্গে ১৯৬৪ সালে যখন স্কুলে ক্লাস ফোর-এ পড়ি | বাবা ছিলেন এরোপ্লেন কোম্পানির চাকুরে – ফি বছর নিখরচায় আমাদের নিয়ে আকাশ পথে বেড়াতে যেতেন | সেবার কলকাতা থেকে বোঁ করে উড়ে গিয়ে নেমেছিলাম শিলিগুড়ি এয়ারপোর্টে, তারপর একটা সাদা অ্যাম্বাসাডার গাড়িতে চেপে ঘন্টা তিনেকের মধ্যেই দার্জিলিং | থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল বাবাদেরই অফিসের হলিডে হোম-এ | মনে আছে ঘরটা ছিল বিশাল বড় – উত্তর দিকে টানা জানলা – সামনেই ঝকঝক করছে কাঞ্চনজঙ্ঘা | ঘরের প্রায় লাগোয়া একটা সাজানো গোছানো রান্নাঘর – দার্জিলিং-এ তখনো মোড়ে মোড়ে এত খাবারের দোকান গজিয়ে ওঠেনি | ফলে কেভেন্টার্স থেকে টাটকা খাসির মাংস কিনে আনা হতো আর মা বেশ রান্না করত | আপাদমস্তক কাঠের বাড়ির এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে তার যে খোশবাই পেতাম – আজও তা নাকে লেগে আছে | কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়াও আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে দেখা যেত একটা সবুজ রঙের ছাউনিওলা বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি | সবুজের ওপর সাদা দিয়ে একটা লেখা স্পষ্ট পড়া যেত – L. J SANATORIUM | বাবা বুঝিয়ে দিয়েছিল কোনও শক্ত অসুখ থেকে ওঠার পর শরীর সারাতে লোকে এসে এখানে থাকে – চিকিত্সারও ব্যবস্থা আছে অনেকটা হাসপাতালেরই মতো | তখন কী ছাই জানতাম যে বছর দেড়েক বাদে ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে তিন কিস্তিতে ছাপা হবে সত্যজিৎ রায়ের লেখা প্রথম ফেলুদার গোয়েন্দা গল্প যেখানে ফেলুদা মাসতুতো ভাই তপেশ (পরে খুড়তুতো ভাই হয়ে যায়) ও তার বাবাকে নিয়ে এই স্যানেটোরিয়ামেই এসে উঠবে |

পাহাড়ের ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া দার্জিলিং-এর ঘর বাড়ি
পাহাড়ের ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া দার্জিলিং-এর ঘর বাড়ি

এরপর বাবা-মা’র লেজুড় হয়ে ঘুরেছি দারুণ দারুণ সব জায়গায় কিন্তু দার্জিলিং আর যাওয়া হয়নি – দ্বিতীয়বার গেলাম প্রায় তিরিশ বছর বাদে ১৯৯৫তে | বাবা তখন নেই, অথর্ব মা’কে বাড়িতে রেখে | এদিকে আমি ঘোর সংসারী হয়ে উঠেছি, নিজের এবং এক শালীর পরিবার সমেত সাতজন মিলে | গিয়েই প্রথমে খুঁজেছিলাম সেই হলিডে হোমটা – আবছা মনে ছিল গেট দিয়ে বেরোতেই সামনে দেখা যেত বিশাল মাউন্ট এভারেস্ট হোটেলটাকে | যদিও দু’চারটে কাঠের সুন্দর দেখতে বাড়ি আশেপাশে ছিল কিন্তু আমার ছোটবেলাকার স্মৃতির সঙ্গে কিছুই মেলাতে পারলাম না | সেটা ছিল ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু ফলে ঠান্ডাটাও ছিল একেবারে হাড় কাঁপানো | প্রথমদিন সকালের দিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা একবার ছোট্ট করে উঁকি দিয়ে সেই যে ডুব মারল সে যাত্রায় আর দেখা গেল না | তবে শ্যামলদার গোল্ডেন অর্কিড হোটেলটা কিন্তু চমত্কার ছিল | ম্যালের একধারে যে ঘোড়ার আস্তাবলটা আছে তার পাশ দিয়ে যেতে হয় – রাস্তাটার নাম জাকির হোসেন রোড – ছিমছাম ব্যবস্থা আর দিব্যি ঘরোয়া খাওয়া দাওয়া | বলতে গেলে আমাদের কাছে বহুদিন অবধি দার্জিলিং-এর অন্যতম আকর্ষণ ছিল এই হোটেল |

মনে আছে ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে এক বন্ধুকে নিয়ে জীবনে প্রথমবার ট্রেকিং করতে গেলাম – গন্তব্যস্থল ১২০০ ফিট উঁচু সান্দাকফু | সেবারই নতুন করে আবার মাথায় ভূত চাপল যাওয়া আসার পথে আশেপাশের দৃশ্যগুলো দেখে দেখে স্কেচ করার | আর্ট কলেজে পাঁচ বছর ধরে টানা এই কাজ করেছি – আমাদের কোর্সের মধ্যেই ছিল – ছুটিছাটায় ঘুরে ঘুরে কাছেপিঠের কোনও গ্রাম-গঙ্গার ধার-কালীঘাটের মন্দির চত্বর –দোকানপাট, লোকজন এই সব আঁকতে আমার খুব ভালো লাগত | কলেজ পাশ করে ঠান্ডা ঘরে বসে একটানা বছর কুড়ি চাকরি করার পর সে সব প্রায় গোল্লায় গেছিল – আবার শুরু হলো এই সান্দাকফু থেকে |

ম্যাল রোডের ধারে চাউনি ঘেরা এই বেঞ্চগুলো পুরনো দার্জিলিংকে মনে পড়িয়ে দিত
ম্যাল রোডের ধারে ছাউনি ঘেরা এই বেঞ্চগুলো পুরনো দার্জিলিংকে মনে পড়িয়ে দিত

সেবার ফিরতি পথে একটু বিশ্রাম নেবার উদ্দেশ্যে দার্জিলিং এলাম – এখানকারও কিছু দৃশ্য আঁকা হলো সেই প্রথম | এরপর থেকে প্রতিবারই নিয়ম করে বাঁধানো মোটা স্কেচ খাতা আর আঁকার সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছি – শেষকালে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াল আঁকার টানেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া |

ইতিমধ্যে শুধুমাত্র দার্জিলিং-এই গেছি নিদেনপক্ষে বার দশেক | কাশ্মীর, সিমলা, ডালহৌসি, শিলং, মাউন্ট আবু, এমনকি সিকিমের আনাচে কানাচেও তো কত ঘুরলাম – তবু দার্জিলিং-এ যে কেন বারবার যেতে ইচ্ছে করে কে জানে!

যতবারই গেছি মনের আনন্দে স্কেচ করে বেরিয়েছি | ম্যাল রোডের ধারে ছাউনি ঘেরা বসার জায়গা, মহাকালের মন্দিরে ওঠার মুখে রাস্তার ওপর গরম পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসা লেপচা মেয়েরা, কেভেন্টার্সের ছাদে কফি আর স্যান্ডউইচ সহযোগে ব্রেকফাস্টরত লালমুখো সাহেব | আর এঁকেছি ম্যাল-এর চারধারে বেঞ্চিতে বসে থাকা বিভিন্ন বয়সের পুরুষ-মহিলাদের |

বহু স্মৃতি জড়ানো এই কেভেন্টার্স
বহু স্মৃতি জড়ানো এই কেভেন্টার্স

কেউ কেউ ঝলমলে জামা পরা ট্যুরিস্ট-ক্যামেরা দিয়ে পটাপট ছবি তুলেই চলেছে – বাকিরা স্থানীয় – নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছে তো কেউ একলা বসে মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছে – পিছনে উঁচু স্ট্যান্ডের গায়ে টাঙানো বোর্ডে লেখা –

কিছু কিছু স্মৃতি বড়ই দামী

এদের চিরকালের মতো আগলে রাখো |

সত্যি দার্জিলিং শহর ও তার আশপাশটাকে ঘিরে আমার নিজের কত যে স্মৃতি – সব মনে রাখতে পেরেছি কিনা জানিনা – তবে মাঝে মাঝে আমার স্কেচ খাতার পাতাগুলো উল্টোলে অনেক কিছু চোখের সামনে ভেসে ওঠে – পুরনো কথাগুলো আবার নতুন করে মনে পড়ে যায় |

দেবাশীষ দেব
স্বনামধন্য এই অঙ্কনশিল্পী নিজেই এক সম্পূর্ন প্রতিষ্ঠান | তাঁর হাত ধরে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে বাংলার কার্টুন শিল্প | সিগনেচার বেড়াল আর স্ব-নেচারটি কোমল, আত্মবিশ্বাসী, রসিক | বেড়ানো তাঁর নেশা | তাই ঝুলিতে রয়েছে বহু গল্প, সঙ্গে অসাধারণ সব স্কেচ | সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নিরলস সাধনার অমর ফসল ‘রঙ তুলির সত্যজিৎ’ |

8 COMMENTS

  1. Purani Darjeeling ke pete hole ase paser nepali grame home stay te thaka chhara upaay nei. Nanakaronei ekhon seet onek banagali i joy kore niyechhen. Melli theke ghoom monestry er ektu age porjonto jaigay Landslider opor kaaj korechhi. Sei thakar somoy ochena darjeeling ke chinechhi. Apmar lekha te purano diner swad khje pelam er saathe sketch gulo pranbonto.
    Valo thakben o Rakhben

  2. আমরা যারা নব্বই বা নতুন সহস্রাব্দের শুরুর বছর গুলোর মধ্যে দিয়ে নিজেদের শৈসব বা কৈশোর অতিক্রম করেছি তাদের কাছে আনন্দমেলার এক অন্য জায়গা ছিল আর যারা আনন্দমেলা কে আঁকড়ে ধরে বর হয়েছে, যেমন আমি, তাদের কাছে দেবাশীষ বাবুর আঁকা প্রচ্ছদ বা অন্য ছবি নতুন কিছু নয়। গল্পের অন্য চরিত্র গুলোর মতো উনার ছবিগুলোও যেন এক-একটা বর্ধিত ছরিত্র হয়েই আসতো আমাদের কাছে। বিশেষ করে পূজাবার্ষিকীতে দুলেন্দ্র ভৌমিকের বড় গল্পের সাথে উনার আঁকা ছবিগুলোও কিছু কম আকর্ষণ রাখতো না।
    এবার আসি এই লেখার কথায়। আমার পঁচিশ বছরের জীবনে এই প্রথম আমি দার্জিলিং ঘুরে এলাম ২০১৫-র মে-জুন মাসে পরিবারের সদস্যদের সাথে। এবং আর পাঁচটা বাঙালীর মতো আমিও গিয়ে মেলাতে চেষ্টা করেছি, খুঁজেছি সেই দার্জিলিংকে যার কথা পড়েছি সত্যজিৎ রায়ের লেখা ফেলুদার পাতায় বা টেনিদার গল্পে এবং আরো অনেক গল্প, উপন্যাস বা পত্র-পত্রিকার পাতায়। কিছু কিছু জিনিষ মেলাতে পেরেছি বা কিছু পারিনি। কিন্তু একটা জিনিষ সত্যি, একবার গিয়েই দার্জিলিং শহরটাকে বড়ো ভালবেসে ফেলেছি। আমি জানি আমি আবার ছুটে যাব সেখানে। বার বার। সদ্য ঘুরে আসার ফলে স্মৃতি এখনো টাটকা। দেবাশীষ বাবুর লেখা আর ছবি গুলো সেই স্মৃতিকে আরেকবার রঙিন করে তুললো মনের মণিকোঠায়।
    স্মৃতি সততঃই সুখের।
    ধন্যবাদ দেবাশীষবাবু।

  3. ছবিগুলির অনবদ্য আর প্রাণবন্ত রেখায় আর লেখাটির সংযোগ খুবই ভালো লাগলো | অনেক পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল..

  4. I also felt nostalgic reading the article and the beautiful sketches. Expecting many more such from the author. I can remember my boyhood days when we used to Darjeeling in the vacation.

  5. ETO DIN LEKHATA PORINI KENO? NIJEKEI BOLLAM. AABAR NEJEI BOLLAM BARO BHUL HOYE GECHHE. AAJ (19 JUNE, 2016) DEBASHISH-ER PURONO EKTA CHHABI DEKHE KICHHU-EKTA LIKHLAM, DEBASHISH JANALO, ‘DARJEELING-ER LEKHATA PORECHHIS?’ AAMI BOLLAM, NA, PORA HOYNI TAKHON O SANDHAN DILO. CHHABI TO O BHALO AANKE, KINTU LEKHA JE AANKE BUJHLAM, AAGEO DEBASHISHER LEKHA PORECHHI ETA KIN O 6 MERECHHE, SHUDHU TAI NOY, MATHER BAIRE PATHIYECHHE. KHUB BHALO LEGECHHE, MONE HOCHCHHE AAJ-I RAATE TRAIN DHORI GANTABYO—– DARJEELING.

  6. ♥♥ পড়ুন অথবা মরুন ♥♥

    আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে প্রিয় ফেরশতা আজাজিল, এই আজাজিল ফেরেশতা আল্লাহ তায়ালার এতই ভক্ত ছিল যে, তার ইবাদত বন্দেগী যেমন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করেছে, তেমনি সে আচার-আচরণে, আল্লাহর আদেশ নির্দেশ পালনে সিদ্ধহস্ত ছিলো। আল্লাহর সখের সৃষ্টি মানব জাতি সৃষ্টি করার পর, সকল ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলেন, হে ফেরেশতাগণ, তোমরা আমার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব মানব জাতিকে সেজদা করো। সকল ফেরেশতা আল্লাহর আদেশ মতে সকল মানবজাতিকে সেজদা করলো। শুধু মাত্র আজাজিল আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অমান্য করলো। আল্লাহর আদেশ অমান্য করায় আজাজিল পৃথিবীতে শয়তান হিসাবে আবির্ভূত হলো। এই সন্তান আল্লাহর সখের সৃষ্টি মানব জাতিকে বিপদগামি করানোর দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে পৃথিবীর সকল মানবের অন্ত:করনে শয়তানি বিষ ছিটানো শুরু করলো। খুন-খারাবি, মারামারি, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি থেকে শুরু করে পৃথিবীর সকল অপকর্মে মানবজাতিকে ধাবিত করার আন্দোলন অব্যাহত রাখলো। শয়তানের এধরনের অপকর্মের জন্য একদিন আল্লাহ তায়ালা শয়তানকে বললেন।
    হে শয়তান! পৃথিবীর সকল কুকর্মের জন্য তুমিই দায়ী। শয়তান এবার বললো না, আমি না, তোমার প্রিয় বান্দারাই এ ধরনের অপকর্ম করছে। আল্লাহ এবার চ্যালেঞ্জ করে বললেন, হে শয়তান! তুমি প্রমাণ করো যে, এমন কোন অপকর্ম আছে যাতে তোমার হাত নাই। শয়তান আল্লাহ তায়ালার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলো। এবার শয়তান ফন্দি-ফিকির শুরু করলো, কিভাবে তা প্রমাণ করা যায়; শয়তানি বুদ্ধি মিলে গেলো, গ্রামের এক নিম্নমধ্য পরিবারের আয় রোজগারের এক মাত্র পথ, তার পালের গাভীর দুধ বিক্রি করা। এই গাভীর দুধ বিক্রি করে তিনি তার ছেলে মেয়ে বউঝি নিয়ে সংসার চালান। শয়তান এবার ওই কৃষকের ঘরের দরজার পাশে এক ফোঁটা মিষ্টি লাগিয়ে আসলো। এই মিষ্টি খাওয়ার জন্য দল বেঁধে পিপঁড়া আসা শুরু করলো, পিপঁড়া ধরার জন্য টিক টিকির ভীড় বাড়তে শুরু করলো, টিকটিকি ধরতে ইদুঁর এসে গেল। এবার ইঁদুর ধরতে গিয়ে যেই না বিড়াল লাফ দিয়েছে, কৃষকের মাটির পাত্র ভর্তি গাভীর দুধ মাটিতে পড়ে গেল। স্ত্রীর দায়িত্বে থাকা দুধ মাটিতে পড়ে যাওয়ায়, কৃষক তার ঘরে রাখা লাঠি দিয়ে, স্ত্রীর মাথায় এমন ভাবে আঘাত করেছে যে, আঘাত করা মাত্র স্ত্রী মারা গেছে। এবার শয়তান খোদার কাছে গিয়ে বাহাদুরের ন্যায় বলছে, হে খোদা! আজকের খুনটা কে করেছে? শয়তানের এ ধরনের বক্তব্যে আল্লাহ তায়ালা জবাব দিলেন ঘরের দরজার কাছে যে মিষ্টি লাগিয়েছে সেই এই খুন করেছে’। গল্প শেষ এবার আসল ঘটনায় যাচ্ছি, ঘটনার সাথে গল্পটা পাঠকরা মিলিয়ে নিতে পারলেই আমি লেখক হিসাবে ধন্য হবো।
    ভারতের পর্যটন এরিয়া দার্জিলিং পাহাড়ে বসবাসকারীদের সাথে পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তুমূল ঝগড়া চলছে। পাহাড়িরা ঐক্য বদ্ধ হয়েছে, তারা আলাদা প্রদেশ চাচ্ছে। ঝগড়ার সূত্রপাত কয়েকমাস আগে পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কোন এক সভায় বলে ছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের মাতৃভাষা হবে বাংলা। আর এই বক্তব্যের সূত্র ধরে পাহাড়িদের সাথে মমতা ব্যানার্জি তৃণমূল সংগঠনের স্নায়ুযুদ্ধ, ভাংচুর, সর্বোপরি প্রদেশের দাবি। দিন দিন আন্দোলনের বিভিন্ন মোড় পাল্টাচ্ছে। পাহাড়িরা ইয়ং যুবুকদের নিয়ে যুদ্ধাং দেহী মনোভাবে গড়ে তুলছে একটি বাহিনী, যে বাহিনী সরকারের পুলিশ, আর্মিদের সাথে লড়াই করবে। অপর দিকে সমতল ভূমির সাধারণ জনমানুষরা পাহাড়িদের অপ্রত্যাশিত দাবির বিরুদ্ধে স্নায়ু যুদ্ধ অব্যাহত চালিয়ে যাচ্ছে। একমাত্র পর্যটন ব্যবসায় যে পাহাড়িরা জীবন জীবিকা অর্জন করছে, সেই পাহাড়ে যাতে পর্যটকরা না যান সে কর্মকান্ড রীতিমত চলছে। অনেকেই সমতল ভূমি থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যাতে পাহাড়ে না যেতে পারে সে ব্যাপারেও কাছ করছে।
    মমতা ব্যানার্জির পশ্চিমবঙ্গের ভাষা হবে বাংলা, এ ধরনের বক্তব্য প্রদান করে কোন অপরাধ করেনি। মমতা বিরোধী থেকে শুরু করে সকল স্তরের জনমানুষ মনে করে মমতা ব্যানার্জির বক্তব্য যথাযথ। কারণ তিনি তার বক্তব্যে বলেনি পাহাড়িরা তাদের মাতৃভাষা ব্যবহার করতে পারবে না। অফিশিয়াল ভাষা বাংলা হোক এটাই তিনি চেয়েছেন। আজ যারা পাহাড়ী তারা কখনই ভারত বর্ষের আদিবসতি নন। সময়ের ব্যবধানে তারা পাহাড়ের বসতি হয়েছেন। নেপালী, গোর্কা অধ্যুষিত কালিংম্পক পাহাড়ীরা তাদের মাতৃ ভাষায় কথা বলতে পারবে না। একথা মমতা ব্যানার্জি কখনো বলেনি। কেন তাহলে অযৌক্তিক একটি বিষয় নিয়ে পাহাড়ীরা আন্দোলন করছে, কেন পাহাড়ীরা সরকারের সৈনিকদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য যুবকদের সংঘটিত করছে। এই যোদ্ধারা কোথায় অস্ত্র পাবে, কারা তাদের ডিফেন্স বা কাভারিং হিসাবে সহযোগিতা করবে? এধরনের প্রশ্ন মাথায় রেখে ঘটনার বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বলা যায়, দার্জিলিং পাহাড়ীদের সাথে সমতলের মানুষের যুদ্ধ ক্ষেত্র তৈরি করতে দুইটি দিক কাজ করছে। তার একটি চিনাপন্থী শয়তানি বিষ, অন্যটি গ্যাংটক ভিত্তিক চীনা বাজার চাঙ্গা করার স্নায়ুযুদ্ধে শয়তানি কৌশল। আমার জানামতে পাহাড়ি জনমানুষরা অত্যন্ত সহজ-সরল প্রকৃতির। তারা ব্যবসা বাণিজ্যকে লক্ষ্মী হিসাবেই জানে। বর্তমান যে পরিস্থিতি চলছে তাতে তারা খুশি নন। তবে শয়তানি বিষ ছড়িয়ে পড়ায় এরা এখন বেকায়দায় রয়েছেন। এভাবে আর কয়েকমাস যুদ্ধ চললে পাহাড়িরা মাটির সাথে মিশে যাবে। একই সাথে শান্ত, প্রকৃতি নির্ভর পর্যটন এরিয়াটি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণিত হবে। ভারতের কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের উচিৎ কোন ক্রমেই যেন শয়তানের বাদশা জয়ী হতে না পারে, সেদিকে নজর দেওয়া এবং অতি দ্রুত পাহাড়িদের সাথে সমতলের দ্বিধা-দ্বন্দ মিটিয়ে ফেলা। এক্ষেত্রে পাহাড়ীদের বোঝা উচিৎ প্রদেশের দাবিতে যে আন্দোলন করা হচ্ছে, তা আদৌও সম্ভব না; অযৌক্তিক এই দাবি আদায়ের নামে পাহাড়ীরা যা কিছু করছে, তা এক সময় ‘গোদের উপর বিষ ফোঁড়া’ হয়েই দাঁড়াবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here