অভিনয় বিষয়টা মানবিক : দেবশংকর হালদার

নিঃসন্দেহে বাংলা মঞ্চের আজ অবিসংবাদী এক নম্বর অভিনেতা দেবশংকর হালদার | শুধু থিয়েটারের স্টেজই নয় তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষরে উজ্জ্বল বাংলা চলচ্চিত্র জগৎও | এমনকী টেলিভিশনের পর্দায় এক অন্য ধরণের অনুষ্ঠানে অ্যাঙ্কর হিসেবেও ছড়িয়েছে তাঁর দীপ্তি | বাংলা বছরের প্রথম দিনে তাঁর সঙ্গে এক মনখোলা কথোপকথন |

আপনার বাবা যাত্রা-অভিনেতা ছিলেন।তখন যাত্রার উপার্জনেই আপনাদের সংসার চলত। তখন কি সংসারে নিরাপত্তাহীনতা ছিল?

দেবশংকর হালদার : আপনি যে বয়সের কথা বলছেন;সেই বয়সে ওসব কিছু বোঝা যায় না।তখন আমার বয়স ছিল অল্প।তাই অল্প খাওয়া দাওয়া, অল্প জামাকাপড়কেই অনেক মনে হতো।এখন বড় হয়ে বুঝতে পারি, সেই সময় কখনও স্বাচ্ছন্দের বাইরে থাকতে হয়েছে।যদিও বাবা মা সে সব বুঝতে দিতেন না।তবে আমি ছোটবেলায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিনি।কারণ মাথার ওপর বাবা মা ছিলেন।

আপনি যখন বড় হচ্ছেন তখন এই অনুভূতির কি পরিবর্তন হয়েছিল?

দেবশংকর হালদার : বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন আমার বোধ বিবেচনা হলো তখন বুঝতে পারলাম আমার উচিত কিছু রোজগার করা।আমার বাবা যাত্রায় ছিলেন বলে কখনও খুব ভালো রোজগার করেছেন।কখনও রোজগারের অবস্থা ছিল মন্দ।বাবার শেষ দিকে শরীরটা ভেঙ্গে গিয়েছিল।তখন আর অভিনয় করতে পারছিলেন না।সাংগঠনিক কাজ করতেন।

পরে আপনি যখন সিদ্ধান্ত নিলেন থিয়েটার  করবেন তখন অতীতের নিরাপত্তাহীনতা ভাবায় নি?

দেবশংকর হালদার : আসলে স্বাচ্ছন্দ্য কতটা হলে হয়—এটা নিয়ে কোনদিন তেমন ভাবিনি।আমি যখন থিয়েটার করতে শুরু করলাম;তখন চাকরি করার কথাও ভেবেছি।ছোটবেলায় বাসনা ছিল খেলোয়াড় হওয়ার।ছোটবেলায় মাঠে গিয়ে মোহোনবাগান,ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখেছি।আমি মোহনবাগানের সাপোর্টার ছিলাম।তখন ইচ্ছা ছিল ফুটবলার হওয়ার।বড় হয়ে একটা চাকরিও পেয়েছিলাম।কিন্তু সেটা করিনি।আমার বন্ধুরা সব চাকরি করেছে।ওদের রোজগার অনেক ভালো।এই সব ভাবাত।কিন্তু থিয়েটারে মনের স্বাচ্ছন্দ্য অনেক বেশি পেতাম।আর আমি যেটুকু টাকা পেতাম তা দিয়ে চালিয়ে নিতে পারতাম।কখনও কখনও নিজের স্বাদ পূরণ করতে পারতাম না।কখনও কখনও আবার সমাজে অপমানিত হতে হয়েছে। আর তত্ত্বগত ভাবে থিয়েটারকে আমাদের রিস্কি কাজ বলে মনে হয়।বাস্তবেও থিয়েটারকে আমার ঝুঁকিপূর্ণ  মনে হয়েছে।কিন্তু এটা আমার কাছে কোনোদিনই খুব একটা বড় বিষয় বলে মনে হয়নি।

বাস্তব জীবন না কল্পনা কোথা থেকে অভিনয়ের রসদ জোগাড় করে থাকেন?

দেবশংকর হালদার : অভিনয় বিষয়টা বিশেষ কোরে মানবিক।এবং সমাজের সঙ্গে যুক্ত।যে মানুষ সমাজে সংসারে বাঁচে সেই মানুষ সব চেয়ে বেশি অভিনয়ের রসদ সংগ্রহ করতে পারে।মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, চারপাশটা দেখা —এ সব অবজার্ভ করা একজন অভিনেতার কাজ।

আপনি দেবব্রত বিশ্বাস, বিবেকানন্দ থেকে শুরু করে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।এই চরিত্রগুলোকে ঠিক কীভাবে রূপদান করেন?

দেবশংকর হালদার : প্রত্যেক চরিত্রের একটা নাম আছে।একটা চারিত্রিক গঠন আছে।দেবব্রত বিশ্বাসকে আমরা জানি।কিন্তু এমন অনেক চরিত্র আছে যাদের আমি জানিনা। সেক্ষেত্রেও সেই চরিত্রের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে।ঐতিহাসিক কিছু পটভূমিকা আছে।সমাজে তেমন চরিত্র আছে।সেই সব চরিত্রকে দেখে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে সেটা উপস্থাপনা করতে হয়।দর্শক দেখেন চরিত্রটা কতোটা সত্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে।অভিনেতা সেই চরিত্রে কতোটা প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে পারছে—সেটাই সবাই দেখেন। অভিনেতা চরিত্রকে কতোটা কপি করছে —সেটা কেউ দেখেন না।

আপনি একই সঙ্গে বহু থিয়েটারে অভিনয় করেন।একই সঙ্গে এতোগুলো চরিত্র নিজের মধ্যে কি করে ধারণ করছেন?

দেবশংকর হালদার : সকলের মধ্যেই নানান চরিত্রের  মিশ্রণ থাকে।আপনার মধ্যেও রয়েছে।আপনি আমার সঙ্গে কথা বলার আগে কারোর সঙ্গে কোনো একটা ভূমিকা তো পালন করেছেন।তারই মধ্যে পরিশীলিত কণ্ঠে আপনি একটা চরিত্রায়ণ করে আমার সঙ্গে কথা বললেন।এইভাবে আপনি আপনার ছেলে বা ভাইয়ের সঙ্গে কথা নিশ্চয়ই বলবেন না।তার মানে আপনি প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে পালটে নেন।আমিও ঠিক সেই কাজটা করি।একজন অভিনেতা যখন অভিনয় করেন তখন তিনি চেষ্টা করেন চরিত্র অনুযায়ী আলাদা আলাদা মানুষ হয়ে ওঠার।অভিনেতার মধ্যেই সেই আলাদা আলাদা সঞ্চিত ধনরত্নগুলো আছে।সেগুলোকে সে সময় অনুযায়ী বার করে আনে।আর অভিনেতার একটা শারীরিক উপস্থিতি থাকে।সেই শারীরিক উপস্থিতির সাহায্যে সে চরিত্রের আভিজাত্য ধরে রাখে।

থিয়েটার কি আজকের দিনে দিন বদলের গান হয়ে উঠতে পারে?

দেবশংকর হালদার : শিল্প জ্যান্ত আর্ট ফর্ম বলে অন্যান্য শিল্পকর্মের থেকে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।এবং থিয়েটার সেটা বহুবার করেছে।আমাদের থিয়েটারও ছোটো করে হলেও অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে।

থিয়েটার থেকে বড় পর্দায় আসার অভিজ্ঞতা কেমন?

দেবশংকর হালদার : একটা মাধ্যম থেকে আর একটা মাধ্যমে গেলে যেটুকু ফারাক নজরে আসে সেটুকু এসেছিল।মাধ্যমটাই-তো আলাদা।বড় পর্দার যেমন চাহিদা সেই চাহিদা অনুযায়ী কাজ করি।

নান্দীকার থেকে আপনার থিয়েটারের যাত্রাপথ শুরু।এখন আপনি অন্যান্য নাট্যদলেও অভিনয় করছেন।নান্দীকারের দেবশংকর হালদার না কি অন্য নাট্যদলের দেবশংকর হালদার বললে বেশি খুশি হন?

দেবশংকর হালদার : যে কোনো ভালো কাজের স্বীকৃতি পেলেই ভালো লাগে।সেই অনুভূতি দল নির্বিশেষেই হয়।

নান্দীকারে প্রথম যুক্ত হওয়ার এক্সপিরিয়েন্স কেমন ছিল?

দেবশংকর হালদার : আমাদের কলেজে আমি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে।হঠাৎ খবর পেলাম নান্দীকার আর ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা মিলে একটা ওয়ার্কশপের আয়োজন করেছে।আমি ওখানে গেলাম।ওনারা পরীক্ষা নিলেন।আমি পাশ করলাম।সেই থেকেই নান্দীকারে।সংক্ষেপে বলতে গেলে গোড়ার দিকে নান্দীকারের দিনগুলির অভিজ্ঞতা ছিল রোমাঞ্চকর।নান্দীকারে আমি অনেক কাজ শিখেছি।অভিনয় বাদেও ব্যাকস্টেজের কাজও শিখেছি।

আপনি তো নান্দীকার বাদেও অন্যান্য দলেও নাটক করেন।সমস্ত দলের জন্য সমান সময় সমান শ্রম কীভাবে ডিস্ট্রিবিউট করেন?

দেবশংকর হালদার : একটা নির্দিষ্ট সংগঠন বাদেও আরো অনেকগুলো দলে যুক্ত হয়ে আমার কিন্তু উপকার হয়েছে।আমি নানান শৃঙ্খলার মধ্যে গেছি।সব দলকেই আমি প্রায় একই প্রাধান্য দিই।এগুলো দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে চলে এসেছে।

নাটক পরিচালনা নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

দেবশংকর হালদার : এখনই তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই।যদি কোনো ভালো টেক্সট পাই এবং সেটা যদি কেউ না করেন,তাহলে আমি পরিচালনা করতে পারি।

আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলিকে যদি ভাগ করতে বলা হয় তাহলে কোন কোন অধ্যায়ের কথা বলবেন?

দেবশংকর হালদার :  প্রথমত এই পৃথিবীতে আমি জন্মেছি।দ্বিতীয়ত আমার বাবা মাকে আমি পেয়েছি।তৃতীয়ত আমি আমার পরিবারকে পেয়েছি ।চতুর্থত আমি আমার ছেলেবেলার একটা অসাধারণ পাড়া পেয়েছি।পঞ্চমত আমি আমার স্কুলের মাস্টারমশাইকে পেয়েছি।পরবর্তীকালে কফিহাউসে গেলাম, সেটা একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা।ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘটনা আমার জীবনের আর একটা স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

আপনি ছোটবেলায় খেলোয়াড় হতে চেয়েছিলেন, তারপর ছাত্র রাজনীতি করেছেন – এত রকমের জীবন কি আপনার অভিনয় জীবন কে প্রভাবিত করেছে?

দেবশংকর হালদার : সব সময় প্রভাবিত করেছে।এই সব জীবনের মধ্যে গিয়েছিলাম বলেই জানতে পারলাম জীবনের নানা জটিলতা।সেই সব থেকে অভিনয়ের নানা জটিল বিষয় অনেক সহজ হয়েছে।ওই অভিজ্ঞতাগুলো আমার কাছে মূল্যবান সম্পদ।

থিয়েটারের মতো সিনেমায় যখন অভিনয় করেন তখন কি তেমন কোনো সামাজিক দায়বদ্ধতা অনুভব করেন?

দেবশংকর হালদার : শিল্পী যে মাধ্যমেই কাজ করুন না কেন,তার সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকেই।সেটা সবসময় তার মনের মধ্যে চলে।সেটাকে অস্বীকার করা যায়না।

এখনকার প্রজন্মকে থিয়েটারে দেখে কী মনে হয়?

দেবশংকর হালদার : আমাদের থেকে কম বয়সী ছেলে মেয়েরা খুব ভালো কাজ করছে।থিয়েটার নিয়ে এখনকার প্রজন্ম মাতামাতি করতে চাইছে —এটা দেখে আমার নিজের গর্বিত মনে হয়।

সামনে আর কী কী কাজ করতে চাইছেন?

দেবশংকর হালদার : আজকে খেয়ে দেয়ে বেরোব।তারপর একটা রেকর্ডিং আছে।তারপর একটা নাটক আছে ।কাল নবদ্বীপে একটা শো আছে।পরশুদিন একটা নতুন নাটকের রিহার্সাল আছে।নাটকের বিষয় হলো – কলেজ স্ট্রীটের বইপাড়া।গণকৃষ্টি নাট্যদলের অমিতাভ দত্ত নাটকটির পরিচালক।এই অবধি আমি ভাবতে পেরেছি।এই কাজগুলো আমি ভালো করে করব।

1 COMMENT

  1. তন্ময় দত্তগুপ্তের নেওয়া আরও একটা ভালো সাক্ষাতকার পড়লাম। অভিনয় জগত সম্পর্কে যারা কিছুটা খোঁজখবর রাখেন তারা মোটামুটি সকলেই দেবশংকর হালদার সম্পর্কে জানেন। এখানে দেবশংকর হালদারের মনের কথা-প্রাণের কথা, এতদিনে না জানা অনেক কথা বের করে এনে আমাদের আরও সমৃদ্ধ করলেন তন্ময়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here