টেনুদির টুমলিং অভিযান

1202
ধোতরে থেকে টুমলিং-এর পথে ট্রেকিং (ছবি: লেখক)

টেনুদির ভালো নামটা আমার কিছুতেই মনে থাকে না| ওই পারমিতা বা সঙ্ঘমিত্রা জাতীয় কিছু একটা হবে| আগেই বলে রাখা ভালো যে টেনুদির নামকরনের সাথে পটলডাঙ্গার টেনিদার কোনও সম্পর্ক নেই| টেনুদির এহেন নামকরনের পিছনে রয়েছে একটি ছোট ট্রেকিং অভিযান| সেই সময় ওনার নানারকমের কান্ডকারখানা দেখে আমিই নামটা দিয়েছিলাম| বলা বাহুল্য তিনি তাঁর এই নাম সম্পর্কে কিছুই জানেন না| তবে এই লেখা পড়ে টেনুদি যদি আমার উপর কুপিত হন, আশা করব বাংলালাইভের সম্পাদক ওনার প্রকোপ থেকে আমাকে উদ্ধার করবেন|

ঘটনার সূত্রপাত এই বছরের এপ্রিল মাসে| আমার ভ্রমণপিপাসু বন্ধু তথাগতর পাল্লায় পড়ে একটা ছোট ট্রেকে যেতে রাজি হয়েছিলাম| সুতরাং একদিন সকালবেলায় দলবল সমেত নিউজলপাইগুড়ি ষ্টেশনে সকাল দশটা নাগাদ হাজির হলাম| আমাদের গন্তব্য ভারত নেপাল সীমান্তে সান্দাকফু ট্রেক রুটের একটি ছোট্ট জনবসতি| নাম তার টুমলিং|

টুমলিং যাওয়া খুব সোজা| প্রথমে নিউজলপাইগুড়ি থেকে মানেভঞ্জন পৌঁছতে হ্য়| মানেভঞ্জন বড় জনবসতি| মানেভঞ্জন থেকে ডানদিকে ১৯ কিলোমিটার গেলেই ধোতরে গ্রামে পৌঁছে যাওয়া যায়| এই গ্রাম থেকেই রডোডেনড্রন জঙ্গলের মধ্যে ট্রেক করে টুমলিং যেতে হয়| মাঝে টোংলু নামক ছোট একটা বসতি পড়ে| একটা শর্টকাটও আছে| ওটা দিয়ে টোংলু বাইপাস করে টুমলিং যাওয়া যায়| টুমলিং থেকে ফিরতে হলে মেঘমা আর চিত্রে গ্রাম দিয়ে মানেভঞ্জনে ফিরে আসতে হয়|

কার্সিয়াং, ঘুম, লেপচা জগত, সুখিয়া পোখরি আর মানেভঞ্জন পেরিয়ে যখন ধোতরে পৌঁছালাম তখন পৌনে তিনটে বাজে| কার্সিয়াং-এ খাওয়া মোমো অনেকক্ষন হজম হয়ে গিয়ে তখন সকলের বেজায় খিদে পেয়েছে|

ছবির মতো ধোতরে গ্রাম
ছবির মতো ধোতরে গ্রাম (ছবি: লেখক)

ধোতরে গ্রামটা ছবির মত সুন্দর| আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাও দেখা যায়| ভালো থাকার জায়গা বলতে একটাই – গ্রামের শেষপ্রান্তে অবস্থিত শেরপা লজ| আমাদের জন্য দোতলায় তিনটে ঘর আগে থেকেই বুক করাই ছিল| ঘরগুলো ছোট কিন্ত বেশ পরিষ্কার পরিছন্ন| দোতলায় চারটে ঘর| বাথরুম অবশ্য একটাই|

হাত মুখ ধুয়ে ভেজ মোমো, ওয়াই ওয়াই সূপ, অমলেট আর কফি খেয়ে আমরা চললাম পোর্টারের সন্ধানে| পোর্টারের অগ্রিম বুকিং করে আমরা গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে বেরোলাম|

তথাগত আর তার স্ত্রী নন্দিতা বেশ কিছু ট্রেকিং রুট গিয়েছে| তথাগতর স্কুলের বন্ধু রাজেনও সপরিবারে আমাদের দলে রয়েছেন| ওঁদের এটা ট্রেকিং এর প্রথম অভিজ্ঞতা| রাজেন বেশ রসিক লোক| আলাপ হওয়ার পর তিনি হেসে বললেন “আরে আপনাদের মত দুঁদে ট্রেকারদের সাথে ট্রেক করতে যাচ্ছি, এটা কি কম কথা মশাই? আমি তো একটা DSLR ক্যামেরাও কিনেছি| ছবি টবি কিচ্ছু বুঝি না| আপনাকে কিন্ত সাহায্য করতে হবে মশাই|”

রাজেনের মেয়ে তিন্নি খুব পশুপ্রেমী| সে যখন যেখানে পারছে বেড়াল তুলে আদর করছে বা রাস্তার কুকুরের পিঠে হাত বোলাচ্ছে| তার মায়ের ব্যাপারটা একদমই পচ্ছন্দ হচ্ছিল না| দু-তিন বার “তিন্নি, এটা কি হচ্ছে, ইনফেকশন হয়ে যাবে|” বলা সত্বেও কাজ না হওয়াতে তিনি অবশেষে রনে ভঙ্গ দিলেন| আমরাও হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের শেষপ্রান্তে কিছু সুন্দর চোর্তেনের সামনে এসে দাঁড়ালাম| তিন্নির সঙ্গে যথারীতি একটা কুকুর|

চোর্তেনের উপর শেষবেলায় সূর্যের আলো পড়লে সেটা ছবি তোলার লোভনীয় বস্তু| আমরা সকলে ক্যামেরা বের করে ছবি তুলছি, হঠাৎ রাজেনের স্ত্রী তার পাশে এসে বললেন “এই শুনছ, এই দেখ..কুকুরটার হাবভাব আমার ভালো ঠেকছে না”

“তার মানে?” আমরা সকলেই ক্যামেরা ছেড়ে কুকুরের দিকে তাকালাম |

কিন্ত কোথায় কী? কুকুরটা দিব্যি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নিচের গাছগাছালির দিকে কি যেন দেখছে| এতে অস্বাভাবিকের কী আছে?

“বুঝতে পারছেন না?” অধৈর্য্যের সাথে বললেন ভদ্রমহিলা – “নিশ্চই নিচে হিংস্র কোনও জানোয়ার দেখেছে| হয়ত চিতাবাঘ| ওরা সব বুঝতে পারে| আমাদের এখানে আর বেশিক্ষন থাকা উচিত নয় |”

আমি প্রথমে ভেবেছিলাম রাজেনের স্ত্রী ঠাট্টা করছেন| উনি জঙ্গল নিয়ে একটু উদ্বিগ্ন সেটা আগেই বুঝেছিলাম| সেটা প্রথমবার ট্রেকে এলে অস্বাভাবিক কিছু নয়| কিন্ত এখন যেটা বললেন সেটা যদি সিরিয়াসলি বলে থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে উনি অযথা টেনশন করেন|

তথাগত হাসতে হাসতে বলল “আরে এটা চিলাপাতার জঙ্গল নয়| তাছাড়া বিকেল সাড়ে চারটের সময় ধোতরের কাছে নব্বই এর দশকেও কেউ চিতাবাঘ দেখেছে কিনা সন্দেহ|”

ভদ্রমহিলা কিন্ত খুব আশ্বস্ত হলেন না| তখন ওনাকে দেখানো হল যে ট্রেক রুটটা শেরপা লজের ঠিক পাশ দিয়ে| ওই পথ দিয়ে আমরা সকলে একটুখানি হাঁটলামও, কিন্ত চিতাবাঘের আতঙ্কটা যে ওনার মাথা থেকে পুরোপুরি যায়নি সেটা আমি বেশ বুঝতে পারলাম|

লজে ফেরার সময় আমি নন্দিতাকে নিচু গলায় প্রশ্ন করলাম যে রাজেনরা কোথাও বেড়াতে গিয়ে চিতাবাঘের সম্মুখীন হয়েছেন কিনা ?

“আরে না, না|” মুচকি হেসে বলল নন্দিতা “ও একটু এরকমই|”

“সেকি, উনি সবসময় এরকম টেনশন করেন নাকি?”

নন্দিতা এর জবাবে এমন একটা হাসি দিল যার মানে হ্যাঁ বা না দুটোর যে কোনও একটা হতে পারে|

“তাহলে আমি ওনার নাম টেনুদি রাখব| আইডিয়াল হবে|”

“এই খবরদার|” চোখ পাকিয়ে বলল নন্দিতা “সামনা সামনি টেনুদি বোলো না| কেলেঙ্কারি হবে|”

“সে নাহয় বলব না| কিন্ত টেনুদির কাল কোনও টেনশন হবে না| সকাল বেলায় ঝকঝকে রোদ্দুরের মধ্যে রডোডেনড্রনের শোভা দেখলেই মন ভালো হযে যাবে|”

বিধাতাপুরুষ মনে হয় আমার কথা শুনে মুচকি হেসেছিলেন| কারন সেদিন রাত থেকে যেটা শুরু হল, সেটা এপ্রিল মাসে আশা করা যায় না| তুমুল বৃষ্টি| রাতভোর জল ঝরিয়ে, সকালেও সে বৃষ্টি থামার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না| একে এপ্রিল মাস, আর তার মধ্যে মাত্র দুদিনের ট্রেক বলে আমরা কেউ আর বয়ে বয়ে বর্ষাতি বা পঞ্চো সঙ্গে করে আনিনি |

তথাগত আর আমি বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে প্লাস্টিক শিটের খোঁজে বেরোলাম| গ্রামের দোকানেই সেটা পাওয়া গেল| পোর্টার আসতে কিছু দেরী হলো| আমরা জিনিসপত্র গোছগাছ করছি, এদিকে টেনুদি দেখি বিশাল এক প্লাস্টিকের ঝোলা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন| এত বড় ঝোলা নিয়ে উনি হাঁটবেন কী করে? দেখি তার মধ্যে গুচ্ছের খাবার দাবার আর একটা বড় দু লিটারের জলের বোতল|

“এত বড় ঝোলা নিয়ে হাঁটবেন কী করে? আর এত কী দরকার? খুব বড় জোর চার পাঁচ ঘন্টার হাঁটা তো?” প্রশ্ন করলাম আমি

“ও ঠিক আছে| আমি পারব| দেখবেন কাজে লেগে যাবে|” বললেন টেনুদি| তারপর গলা নামিয়ে যোগ করলেন
“যা বৃষ্টি হয়েছে, নিশ্চই সব জন্ত জানোয়ারের ঘর ভেসে গেছে| রাস্তায় একটি ভালুক বা চিতাবাঘ চোখে পড়তেই পারে | সবাই একসাথে থাকবেন|”

টেনুদির ভাবগতিক দেখে মনে হলো যুদ্ধে যাচ্ছেন| আমি আশ্বস্ত করলাম যে আমি রাস্তা মোটামুটি চিনি, বছর চারেক আগেই এসেছি| তথাগত সান্দাকফু গেছে তবে সেটা মানেভঞ্জন দিয়ে |

পোর্টাররা মাল নিয়ে আগে বেরিয়ে গেল| আমরা প্লাস্টিক জড়িয়ে সকাল দশটা নাগাদ হাঁটা শুরু করলাম| তখন বৃষ্টি একটু ধরে এসেছে| আমার প্রধান আশংকা ছিল যে এই বৃষ্টিতে সব রডোডেনড্রন ফুল ঝরে গেছে কিনা| কিন্ত কিছুদুর যেতেই বুঝলাম সে আশংকা অমূলক| সারা রাস্তায় লাল আর গোলাপি রংয়ের অজস্র ফুল ফুটে রয়েছে| প্রাণ ভরে দেখে যেতে হয় আর ছবি তুলে যেতে হয়|

এর মধ্যে কুয়াশা নামল| তার সাথে জঙ্গল ক্রমে ক্রমেই ঘন হচ্ছিল| সাথে সাথে টেনুদির টেনশন বাড়ছিল| একসময় তিনি বলেই ফেললেন “কেউ কি কিছু খাবে না? একটু দাঁড়িয়ে কিছু খেয়ে নিলে হয়|”

রডোডেনড্রনগুচ্ছ
রডোডেনড্রনগুচ্ছ (ছবি: লেখক)

তখন সবে দু ঘন্টা হাঁটা হয়েছে| ব্রেকফাস্টও ঠিক মতন হজম হয়নি| তাছাড়া রডোডেনড্রন ফুলের ছবি তুলতে সকলেই ব্যস্ত| তাই আমরা আরও একটু হেঁটে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে দাঁড়িয়ে কিছু খেলাম| তারপর ঝোলার কিছু কিছু জিনিস নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলাম, কারন ঝোলার ভারে টেনুদি নেতিয়ে পড়ছিলেন|

“আর কতটা অমিতাভদা?” টেনুদি প্রশ্ন করলেন “ দেখেছেন কিরকম কুয়াশা নেমে আসছে|”

“আর বেশিক্ষণ নেই| টুমলিং এর শর্টকাট একটু বাদেই পড়ার কথা| তাছাড়া পাথর বিছানো রাস্তাটা সোজা টোংলু হয়ে টুমলিং যায়| মোট কথা হারিয়ে যাওয়ার কোনও ভয় নেই|” আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললাম|

ধোতরে থেকে টুমলিং-এর পথে রডোডেনড্রন
ধোতরে থেকে টুমলিং-এর পথে রডোডেনড্রন (ছবি: লেখক)

টেনুদির তাতে বিশেষ বিকার হলো না| উল্টে মেয়েকে এক ধমক লাগলেন একটু এগিয়ে যাওয়ার জন্য| কুয়াশার দরুন চারপাশ আবছা হয়ে যাচ্ছিল, বলে আমি মনে মনে ঠিক করলাম টুমলিং এর শর্টকাট না খুঁজে সোজা টোংলু চলে যাওয়া ভালো| যদিও তার জন্য একটু বেশি হাঁটতে হবে, কিন্ত মাঝপথে টোংলুতে সবাই বিশ্রাম নিতে পারবে| তাই দ্রুত পাথর বিছানো রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চললাম|

কিন্ত টেনুদির জন্য হাঁটা দায়| তিনি ক্ষনে ক্ষনেই রাস্তায় চিতাবাঘ দেখার আশংকা প্রকাশ করছিলেন| একটা চল্লিশ নাগাদ তিনি ঘোষনা করলেন “আমি তিনটে পর্যন্ত দেখব, তারপর একটা সিদ্ধান্তে আসব|”

কুয়াশাটা ঘন হয়ে আসছিল| আমার টেনুদির “সিদ্ধান্ত” নিয়ে চিন্তা হচ্ছিল| তাই অন্যদের থেকে একটু দ্রুত পা চালিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম যে টোংলুর ঢোকার মুখের গেটটা দেখা যায় কিনা| কিন্ত তাতেও বিপত্তি| টেনুদির কাতর গলা শোনা গেল “ও গুপ্তদা, আপনি আমাদের ফেলে চলে গেলে কী হবে? হারিয়ে যাব তো|” রাজেন হেসে বললেন “আরে সব দুঁদে ট্রেকাররা রয়েছে. হারাবে বললেই হলো?”

কপাল ভালো যে একটু এগোতেই গেটটা দেখা গেল| গেটের মাথাটা দুমড়ে গেছে, কিন্ত গেটের পিলার এর উপর লেখাটা দিব্যি পড়া যাচ্ছে := “Area 230 Ha,. -: Location :-  Beat : Tonglu,  Range : Tonglu,  Darjeeling Forest Division, LAT N -270 10’41” LONG E- 880 04’30” Altitude : 2700 Mt to 3050 Mt.

দুরে কুয়াশার মধ্যে একটা ট্রেকার্স হাট দেখা যাচ্ছিল| আমি একটু পিছিয়ে গিয়ে একটা হাঁক পেড়ে বাকিদের জানালাম যে আমরা টোংলু পৌঁছে গেছি| টেনুদির টেনশন তাতে একটু লাঘব হলো বলে মনে হয়|

টুমলিং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা (আকাশ যখন পরিষ্কার)
টুমলিং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা (ছবি: লেখক)

টোংলু আর টুমলিং থেকে দৃশ্যটা অনেকটা সান্দাকফুর মতো| এই রুটকে অনেকে তাই “মিনি সান্দাকফু” বলেন| কিন্ত আমরা যখন টোংলু পৌছালাম তখন কুয়াশার মধ্যে কিছুই দেখা গেল না| টোংলুতে অনেকগুলো ট্রেকার্স হাট আছে| তার একটাতে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে আমরা মোমো, ওয়াই ওয়াই সূপ আর কফির অর্ডার দিলাম| তখন দুটো বাজে|

খেতে খেতে টেনুদিকে একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না| “আচ্ছা, তিনটের মধ্যে টোংলু না পৌঁছলে কী ‘সিদ্ধান্ত’ নিতেন?” টেনুদি অম্লান বদনে জানালেন যে তিনি আবার ধোতরের দিকে হাঁটা লাগাতেন|

খেয়ে দেয়ে টুমলিং পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে তিনটে বাজল| আমাদের বুকিং ছিল শিখর লজে| সেটা মূল রাস্তা থেকে একটু নিচে নেমে যেতে হয়| টুমলিং এ থাকার অন্য জায়গা হলো রাস্তার উপরে অবস্থিত সিদ্ধার্থ লজ| এর মধ্যে তার একটা নতুন বাড়ি তৈরী হয়ে গেছে| সিদ্ধার্থ লজের সামনে সেই পরিচিত সাইনবোর্ড “ওয়েলকাম টু নেপাল”|

শিখর লজের মালকিন হলেন নীলাদিদি নামক এক মহিলা| বহুকাল ধরে এই হোটেল চালাচ্ছেন| এবার দেখলাম তারও একটা নতুন বাড়ি তৈরী হয়েছে| তার প্রত্যেকটি ঘর সুবিশাল, সাথে ফায়ারপ্লেসও আছে| আমরা সকলে সেই বড় ঘরে ঢুকে চা আর মোমোর অর্ডার দিলাম| বিকেলে একটু হাঁটতে বেরোলাম| মেঘাছন্ন আকাশে সূর্যাস্ত দেখে চমৎকৃত হলাম| কাঞ্চনজঙ্ঘা আর তার সঙ্গীসাথী পাহাড়ের দল কিন্ত মেঘের আড়ালেই রয়ে গেল|

সকালে এক বিপত্তি হলো| আমরা মোবাইলের ঘড়ি কিভাবে যেন আড়াই ঘন্টা পিছিয়ে গিয়েছিল| ফলে আমরা আড়াইটের সময় উঠে সবে দাঁত মাজা শুরু করেছি, হঠাৎ রাজেন নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভুলটা ধরে ফেলাতে একটা ফালতু ঝামেলার হাত থেকে বাঁচা গেল| এরপর কারুর আর সেরকম ঘুম এলো না|

পাঁচটা নাগাদ তথাগত, নন্দিতা আর আমি কাঞ্চনজঙ্ঘার উপর সূর্যের প্রথম আলো দেখার আশায় বেড়িয়ে পড়লাম| মূল রাস্তার পাশে একটা টিলা আছে| সেখান থেকে দৃশ্যপট ভালো দেখা যাবে এই আশায় আমরা তার মাথায় উঠে পড়লাম| কাঞ্চনজঙ্ঘার ও তার আশে পাশের পাহাড় সবই দেখা যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্ত সমস্যা হল অন্যখানে| পাহাড়গুলোর মাথার উপর নিকষ কালো একটা মেঘ| তার ফলে কাঞ্চনজঙ্ঘার মূল চূড়া দেখা যাচ্ছিল না, কিছুটা কন্ধকাটার মতো লাগছিল|

আকাশের তখন মুখ ভার
আকাশের তখন মুখ ভার (ছবি: লেখক)

এর মধ্যে ক্যামেরা হাতে রাজেন এসে পড়েছিলেন| “একি, কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখ ভার কেন?” বলে ক্যামেরা বার করে কিছু ছবি তুলে আমাকে বললেন “দেখুন তো বেশি সাদা আসছে কেন?” আমি রাজেনকে ক্যামেরার সেটিং দেখাতে দেখাতে বললাম “বাকি দু’জন কই?”

“ওদের একটু সময় লাগবে|” বলে রাজেন আবার ছবি তোলায় মন দিলেন| টেনুদি আর তিন্নি এলেন আরও আধ ঘন্টা পরে| টেনুদি এসেই রাজেনকে ছবি তলার নানারকম নির্দেশ দিতে থাকলেন| মাঝে মাঝে যখন স্বামীর উপর ভরসা হচ্ছিল না, আমায় রাজেনের ক্যামেরা নিয়ে কয়েকটা ছবি তুলে দিতে বললেন| আমি বাধ্য ছেলের মতো নির্দেশ পালন করলাম| কে জানে বাবা, নির্দেশ পালন না করলে যদি টেনশন বেড়ে যায়|

কাঞ্চনজঙ্ঘার রাগ পড়ল না, কাজেই মেঘও সরল না| আমরা কিছুক্ষন বাদে নেমে এলাম| আগের বার খাসা আবহাওয়া ছিল, কাঞ্চনজঙ্ঘা উপর সোনালী আলো দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম| পাহাড়ে ভালো সিনারি দেখাটা পুরোপুরি কপালের ব্যাপার|

টুমলিং থেকে চিত্রের পথটা একটু একঘেয়ে| একে তো গাড়ি চলার পথ দিয়ে হাঁটা| তার উপর আশেপাশে সেরকম ঘন বনানী নেই| একদম সোজা রাস্তা, সেরকম চড়াই উতরাই নেই| মাঝে বলার মতো একটা জিনিসই আছে| সেটা হলো মেঘমা গ্রামের একটা মনাস্ট্রি| কিন্ত তাতেও টেনুদির টেনশনের বিরাম নেই| রাজেন বা তিন্নি এগিয়ে বা পিছিয়ে গেলেই তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলেন| এটা পরিষ্কার হচ্ছিল ওনার টেনশনটা নিজের জন্য নয়, অন্যর জন্য|

লামেধুরা নামক এক ছোট বসতিতে চা আর কিছু খাবার সবে খেয়ে হাঁটা দিয়েছি, রাজেন আমাকে ছবি তোলা নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন| আমি ওনার ক্যামেরা নিয়ে সবে কিছু বোঝাতে শুরু করেছি, এমন সময় দেখি টেনুদি অনিচ্ছুক তিন্নিকে টানতে টানতে ফিরে আসছেন| আমরা তো অবাক|

ব্যাপার সামান্যই| তিন্নির সাথে বরাবরের মত একটা রাস্তার কুকুর হেঁটে চলেছিল| আচমকা সে ছুটে ফেরত চলে যায়|
ব্যাস, টেনুদির চিতাবাঘ ভীতি ফেরত আসে| আমাদের পিছনে না দেখতে পেয়ে আরও ভয় বেড়ে যায়| তাঁকে যতই বোঝাই যে এই রাস্তার দিয়ে ১৫ মিনিট অন্তর গাড়ি যাচ্ছে, এখানে চিতাবাঘের ভূত আসারও কোনও সম্ভাবনা নেই – কে শোনে সে কথা| তাঁর নির্দেশে আমরা বাচ্চা ছেলেদের মতো বাকি রাস্তা একসাথে মার্চ করে বেলা একটা নাগাদ চিত্রে পৌঁছালাম|

চিত্রে মনাস্ট্রি
চিত্রে মনাস্ট্রি (ছবি: লেখক)

চিত্রে বেশ ছবির মতো সুন্দর জায়গা| সুন্দর একটা মাঠ রয়েছে, যেখানে রোদ্দুরে শুয়ে সারাদিন কেটে যেতে পারে| এই গ্রামে একটা বড় মনাস্ট্রি আর একটা সুবিশাল চোর্তেন রয়েছে| এখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা ও তার আশে পাশের পাহাড় দেখা যায়, কিন্ত তার জন্য কসরত করে একটা টিলার মাথায় উঠতে হয়| এখানে বলে রাখা ভালো যে পরদিন সকালে আমি সেই টিলার মাথায় উঠেছিলাম| সেদিন রোদ ঝলমলে থাকা সত্বেও আমার কপালে কিন্ত কন্ধকাটা কাঞ্চনজঙ্ঘাই জুটেছিল |

Chitre_Chorten
চিত্রে-তে সুবিশাল চোর্তেন (ছবি: লেখক)

চিত্রেতে থাকার ভালো জায়গা একটাই – হকস নেস্ট| সাথে লাগোয়া রেস্টুরেন্ট| রেস্টুরেন্টটা খুব চালু, কারণ মানেভঞ্জন থেকে আসার পথে লোকে এখানেই প্রথম বিশ্রাম নেয়| থাকার দুটো আলাদা জায়গা আছে| একটা রেস্টুরেন্টের লাগোয়া, অন্যটা তার পাশেই| প্রত্যেকটা বিল্ডিংয়েই দুটো করে ঘর, এটাচড বাথরুম সহ|

চিত্রেতে এসে টেনুদি কিন্ত বেশ খোশ মেজাজে ছিলেন| ওঁরা পাশের বিল্ডিংয়ের ঘরটা নিলেন| সেটা বেশ বড় আর সাথে ব্যালকনিও ছিল| কিন্ত সমস্যা হলো রাতে খাওয়ার সময়| রাজেন টেনুদির ভয় কাটাবার জন্য হোটেলের মালিককে জিজ্ঞেস করে বসলেন যে এখানে টুরিস্টদের ভয় পাওয়ার মতো কিছু আছে কিনা| তাতে তিনি জানালেন যে এখানকার লোকেদের নিয়ে সমস্যা নেই, যত সমস্যা হয় টুরিস্টদের নিয়ে|

“হামারে হোটেল মে এক বাঙালি বাবু দারু পি কর আপনা বিবি ঔর উনকা দোস্ত কো বহুত মারা| ফির ও শিলিগুড়ি ভাগ গয়া|” জানালেন হোটেলের মালিক| তারপর টেনুদির দিকে তাকিয়ে বললেন “আপকে বগলওলা কমরে মে হি ঠহরে থে|”

এই গল্প শুনে হিতে বিপরীত হল| ‘বহুত মারা’র মানে যে প্রাণে মারা নয়, তার আসল মানে যে নিছক বেদম ঠ্যাঙানি, এটা টেনুদি মানতে চাইলেন না| ঘরে ফিরে তিনি অস্থির হয়ে গেলেন এই ভেবে যে তাঁর পাশের ঘরে অতীতে একটা খুন হয়েছে, রাতে কোনও প্রেতাত্মা হানা দিতে পারে| আমরা হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছিলাম না, এমন সময় টেনুদি ঘর বদলের প্রস্তাব দিলেন| “গুপ্তদা আমাদের ঘরে চলে আসুন, আমরা ওনার ঘরে যাচ্ছি”| ঘোষনা করলেন তিনি|

এই প্রস্তাবটা দুপুর বেলায় দিলে তাও ভাবা যেত| কিন্ত রাত দশটার সময় এক পেট খেয়ে ছড়ানো মালপত্র গুছিয়ে ঘর বদলের আইডিয়াটা একদম লোভনীয় নয়| আমি আমার অক্ষমতার কথা জানাতে টেনুদি কিছুটা কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন “আপনারা কেউ আমার সমস্যাটা বুঝলেন না| আমার কিন্ত রাতে ঘুম আসবে না|” কি আর করা, মনে মনে ‘Truth is stranger than fiction’  বলে আমি আমার ঘরে ঘুমোতে গেলাম|

সকালে উঠে দেখি বেশ রোদ ঝলমলে আকাশ| টেনুদির ঘরে গিয়ে দেখি তিনি চোখ লাল করে চায়ের কাপ নিয়ে বসে আছেন|

“সত্যি ঘুমোননি?” এই প্রশ্নের জবাবে তিনি সম্মতি সূচক মাথা নাড়লেন| রাজেন দাঁত মাজা সেরে এসে সহাস্যে বললেন “আমি খাসা ঘুমিয়েছি|”  তিন্নি প্রকান্ড একটা হাই তুলে বলল “আমিও”|

টেনুদি গোমড়া মুখে বললেন “তা ঘুমোবে না কেন? আমি জেগে জেগে রাম নাম জপ করছিলাম বলেই তো কোনও অঘটন ঘটেনি| নাহলে ঘুমের বারোটা বেজে যেত|”

আমি টেনুদির দিকে একটু অবাক চোখে তাকালাম| এনার ভাবনাচিন্তা অনেকটা পুরনো দিনের মা-মাসিমাদের মতো| যাঁরা স্বামী, পুত্র, কন্যার মঙ্গল কামনা ছাড়া আর কিছু ভাবেননি| ইনি মনে করেন যে ওনার পাশে থাকলে ওঁর স্বামী আর কন্যাকে চিতাবাঘ আক্রমণ করবে না, এমনকি তাদের জন্য তিনি অশরীরী আত্মার সাথে লড়ে যেতে পারেন|

টেনুদির আচরনে এই প্রথম আমার হাসি পেলনা, বরং কোথাও একটা শ্রদ্ধার ভাব জন্মাল |

পরিশিষ্ট

চিত্রে থেকে গাড়ি করে মানেভঞ্জন হয়ে যখন নিউজলপাইগুড়ি পৌঁছালাম তখন বাজে সন্ধে সাতটা| এর মধ্যে দু ঘন্টার জন্য দার্জিলিং ও ঘুরে আসা হয়েছে| ট্রেনে উঠে টেনুদি একটু অসলগ্ন কথাবার্তা কথা বলা শুরু করলেন| নন্দিতা বলল “একি, কী সব বকছিস ?”

“প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে|” জড়ানো গলায় বললেন টেনুদি “কাল রাতে রাম নাম জপতে বেশ কষ্ট হয়েছে|”

নন্দিতা বলল “কেন? ওটা তো রিপিটেটিভ ব্যাপার|”

“না না সেজন্য নয়| জানালার পাশে বসে পোর্টারদের কান্ড দেখছিলাম| মদ খেয়ে কেউ ভুল বকছে, কেউ গান গাইছে, কেউ আবার বমিও করছে| হাসি পেয়ে যাচ্ছিল, তাই রাম নাম জপতে অসুবিধা হচ্ছিল|” পুনরায় জড়ানো গলায় বললেন টেনুদি|

নন্দিতা বলল “আর তুই রাত জেগে ওই সব দেখলি? সত্যি দীপান্বিতা … তুই পারিসও বটে|”

দীপান্বিতা? টেনুদির নামটা কি দীপান্বিতা ছিল? না কি মনিদীপা?

কি করব, শুরুতেই তো বলেছি টেনুদির ভালো নামটা আমার কিছুতেই মনে থাকে না|

টুমলিং-টোংলু  ট্রেকিং

যদি প্রাণে ট্রেকিং এর ইচ্ছে থাকে, কিন্ত শরীর বা মন খুব বেশি হাঁটাহাঁটির পক্ষপাতী না হয় – তাহলে এই ট্রেকিং আপনার জন্য আদর্শ| আর গাড়ি করে যেতে চাইলে ব্রিটিশ আমলের ল্যান্ডরোভারে করে আঁকাবাঁকা রাস্তায় ঝাঁকুনি খেতে খেতে চলে আসুন| মনে রাখবেন টুমলিং এবং টোংলু দু জায়গাতেই মোবাইলের নেটওয়ার্ক এর সমস্যা রয়েছে|

জেলা : দার্জিলিং

নিকটবর্তী রেলস্টেশন : নিউজলপাইগুড়ি

কিভাবে যাবেন : নিউজলপাইগুড়ি থেকে গাড়ি করে মানেভঞ্জন হয়ে ধোতরে| সেখান থেকে ছয় কিলোমিটার ট্রেক করে টুমলিং| টোংলু হয়ে গেলে আরও দেড় কিলোমিটার বেশি হাঁটতে হবে|

ফেরার সময় মেঘমা আর চিত্রে হয়ে মানেভঞ্জন| সোজা মানেভঞ্জন হেঁটে আসতে পারেন, অথবা চিত্রে থেকেই গাড়ি বুক করতে পারেন| টোংলু থেকে মানেভঞ্জন ১১ কিলোমিটার| আগাগোড়া গাড়ি করে গেলে মানেভঞ্জন থেকে ল্যান্ডরোভারে যেতে হবে| ঝাঁকুনি এড়াবার জন্য নিতে হবে সামনের সিট|

কোথায় থাকবেন : ধোতরে – শেরপা লজ (9733048579); টুমলিং : শিখর লজ (009779742615068); চিত্রে : হকস নেস্ট (09733081184)

Advertisements

6 COMMENTS

  1. ভাই অমিতাভ লেখাটা জম্পেশ হয়েছে। ট্রেকিং এর ওপর তো অনেকি লেখা পড়েছি কিন্তু এটা তুমি একদম ছক্কা হাকিয়ে দিয়েছ। একদম অন্য স্বাদের ভ্রমণ আলেখ্য, শুধু এই অসাধারণ এবং একমেবদ্বিতিয়ম টেনুদি চরিত্রটির জন্য। জানিনা এটি তোমার উর্বর কল্পনাপ্রসুত কিনা, তবে ভদ্রমহিলা যদি সত্যি রক্তমাংসর চরিত্র হন তবে আলাপ করার ইচ্ছা রইল। এমন মানুষ কোটিতে গুটিক হয়। শুভেচ্ছা তোমার জন্য আবারো। এমন আরো লেখা পড়ার আশায় রইলাম।

  2. টেনুদি খুব ই মিষ্টি তো।
    খুব মিষ্টি মনের মানুষ। দেখ অমিতাভদা তুমি তো কত শত জায়গা গেছ, যাবে কিন্তু এই সফর টা তোমার মনের মণিকোঠায় চিরদিন অম্লান থাকবে একজন সরল, মিষ্টি মনের মানুষের জন্য।

    টেনু দি, এই লেখার মাধ্যমে আপনার কথা জানলাম, আপনাকে জানলাম। আপনি please নিজেকে বদলাবেন না, এমন এ সুন্দর মনের মানুষ থাকবেন।

  3. Great !! Love the narrative style of the story/ travelogue. The pics are awesome . Wishing for a sequel with Tenudi in a new location .

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.