তাঁর পরিচালিত‚ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ময়ূরাক্ষী সাম্প্রতিককালে প্রশংসা পেয়েছে সমালোচক ও দর্শক দুই পক্ষেরই |খোলামেলা আড্ডায় পরিচালক অতনু ঘোষ |

আপনার ছবি ‘ময়ূরাক্ষীর’প্রথম দর্শক ফিডব্যাক কী ছিল?
অতনু ঘোষ : প্রিমিয়ারের দিন প্রথম ফিডব্যাক পেলাম।বুঝলাম ছবিটা মানুষের মন 
ছুঁয়েছে।ছবি রিলিজের পর আমি বুম্বাদা বিভিন্ন হলে গিয়েছি।দর্শকেরা প্রত্যেকেই আবেগে 
আপ্লুত।তারা কেউ কাঁদছেন।কেউ হাত ধরে বলছেন — “অনেক দিন পর এরকম অনুভূতি হলো |”

Banglalive

ময়ূরাক্ষীর বাবাছেলের সম্পর্কের আইডিয়া আপনার মনে এলো কীভাবে?
অতনু ঘোষ : আইডিয়াটা একেবারেই আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া।আমার বাবা বেশ কিছুদিন ডিমেনশিয়ায় ভুগেছেন। ‘ময়ূরাক্ষীর’ সুশোভন মানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের যে বিস্মৃতি,তার থেকে অনেক বেশি ডিমেনশিয়ায় আমার বাবা 
আক্রান্ত ছিলেন।ডাক্তারি পরিভাষায় বাবা ছিলেন ডিমেনশিয়ার চতুর্থ স্টেজে।আমি মাঝে মাঝে বাবার হাত ধরে পাশে বসতাম।সেই সময় আমার মাথায় প্রথম ভাবনা আসে।

Banglalive

এই ভাবনা থেকেই আপনি ময়ূরাক্ষীর চিত্রনাট্য লিখলেন?
অতনু ঘোষ : ময়ূরাক্ষীর পুরো ভাবনা কিন্তু আমার জীবনের নয়।শুধু ওই ডিমেনশিয়া বাদে
বাকি ভাবনাটাই কাল্পনিক।আর্যনীল মানে প্রসেনজিতের চরিত্রের মধ্যে কোনও ভাবে আমার ব্যক্তিজীবনের প্রতিচ্ছবি নেই।আর্যনীলের চরিত্রটা আমি গোড়া থেকেই কাল্পনিক 
করতে চেয়েছিলাম।অবশ্য আমার বাবার সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা —এটাই 
‘ ময়ূরাক্ষীর’ উৎস বা বীজ।তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
আপনার একটা টেলিফিলমের নাম অসমাপ্ত।যার মুখ্য চরিত্রেও ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।সেখানেও সৌমিত্র বাবু এ্যলজাইমার পেশেন্ট।তো ওই চরিত্রের সঙ্গে ময়ূরাক্ষী’র সুশোভনের কোনও মিল আছে?

Banglalive

অতনু ঘোষ : না, একেবারেই নেই।ওটা ছিল এ্যালজাইমার সংক্রান্ত গল্প।‘ময়ূরাক্ষী’ কিন্তু এ্যলজাইমার গল্প নয়।এ্যালজাইমার-এর  চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো,আমরা যখন কোনও কাজ করতে যাই,তখন তার সংকেত ব্রেনে যায়।সেই সংকেত অনুযায়ী আমাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কাজ করে।এ্যলজাইমার-এর ক্ষেত্রে ব্রেনে ওই সংকেত বা নির্দেশ পৌছায় না।
অনেক সময় ডিমেনশিয়া থেকে এ্যলজাইমার হতে পারে।কিন্তু এ্যালজাইমার আলাদা রোগ।‘অসমাপ্ত’র গল্পটা ছিল একেবারেই আলাদা।‘ময়ূরাক্ষী’তে একজন মাঝবয়সী ছেলে বিদেশে থাকে।ছোটবেলা থেকে সে তার বাবাকে যেমন দেখেছে,বিদেশ থেকে এসে সে দেখে তার বাবা বদলে গেছে।

Banglalive

এই বদলটা কি শারীরিক না মানসিক?
অতনু ঘোষ : দুটোই।তার বাবা অনেক অসংলগ্ন কথা বলে।বাবার আগের সেই প্রাণশক্তি 
নেই।জীবনীশক্তিও নেই।বাবার এই অবস্থা দেখে আর্যনীলের কষ্ট হয়।এই কষ্ট তার অস্তিত্বকে গ্রাস করে।মূলত ‘ময়ূরাক্ষী’ আর্যনীলের জীবনের একটা যাত্রা।আর্যনীলও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত।সে এখান থেকে বেরোতে চাইছে।একটু স্বস্তি এবং 
শান্তি চাইছে।
আপনার আগের তৈরি করা ছবিগুলোর মধ্যে একটু হলেও আন্তর্জাতিক ছোঁয়া ছিল।কিন্তু ময়ূরাক্ষী’তে তেমন ভাবে কোনও আন্তর্জাতিক বিষয় আছে কি?

অতনু ঘোষ : আমাদের দেশের চল্লিশ লক্ষ মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত।আর সারা পৃথিবীতে
ডিমেনশিয়ার সংখ্যা চারশো চল্লিশ লক্ষ।আধুনিক পৃথিবীতে হতাশা খুব পরিচিত ছবি।সেই জায়গা থেকে বলব এটা ভীষণ ভাবে ইন্টারন্যাশনাল।এই ছবিতে বাবা ছেলের সম্পর্ককে আধুনিক ভাবে দেখানো হয়েছে।আর একটা বিষয়ের কথা বলব।
কী?
অতনু ঘোষ : বার্ধক্য, জীবনে আসবেই।এটা ডেস্টিনি।কিন্তু একটা মানুষ ক্রমাগত সচল থেকে অচল হয়ে পড়ছেন,এটা ক্রাইসিস।এক সময়ে যে মানুষের ব্যক্তিত্ব বহুজনকে অনুপ্রাণিত করত,সেই মানুষটাই আজ অসহায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন আসতেই পারে — কেন এই জীবন?এই লস অফ হিউম্যান ডিগনিটি বা জীবনবোধের
দর্শন ভীষণ ভাবে আন্তর্জাতিক।

আপনি যখন সিনেমায় ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন,তখন আপনার ছবি সেভাবে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌছায়নি।কিন্তু পিতা পুত্রের সম্পর্ক বা মা ছেলের সম্পর্ক চিরকালই সেলেবেল সেন্টিমেন্ট।এই ছবি করার সময় সেই ভাবনা কি ছিল?

অতনু ঘোষ : তন্ময় এটার দুটো দিক আছে।প্রথমত আমি সব সময় বিশ্বাস করি,বিষয়ের থেকে আঙ্গিক আসে।মানে ফরম ডিক্টেটেড বাই কনটেন্ট।আমার ‘তখন ২৩’ ছিল অন্তর্জগতের ঘাত প্রতিঘাতের কাহিনী।সেখানে বাইরের ঘটনা খুব একটা 
আসেনি।পুরোটাই মন কেন্দ্রিক।এবার এই অন্তর্জগতকে সিনেমায় ধরতে হলে বাইরের ভাষার মাধ্যমে দেখালে হবে না।‘তখন ২৩’-এর সিনেমার আঙ্গিক তাই মনোগতি অনুযায়ী বক্তব্য রেখেছে।এবং ওই ছবিতে অনেক জায়গায় সিম্বলের প্রয়োগ রয়েছে।কিন্তু ময়ূরাক্ষীর ঘটনাটা বাইরের ঘটনা।মানে ছেলে বাইরে থেকে বাবাকে বোঝার চেষ্টা করছে।

আরও পড়ুন:  কপালের জোরেই কি 'জিরো'র হাত থেকে বাঁচলেন এই অভিনেতা?

আপনার সিনেমার ভাষা তাহলে বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল?
অতনু ঘোষ : আমি সব সময় সরাসরি বক্তব্য পেশে বিশ্বাসী।আমি খুব একটা আমার ছবিতেপ্রতীক বা সিম্বলের আশ্রয় নেই নি।কিন্তু ‘ময়ূরাক্ষী’তে সামান্য প্রতীকের ব্যবহার আছে।এবং এই দৃশ্যের উৎস সেই সুশোভনের ডিমেনশিয়ার অসঙ্গতি থেকে।অস্থির চিত্তে সুশোভন তার বাড়ির দেওয়ালে দেখে একটা বিরাট মাকড়সা।এই দেখাটাও কিন্তু বাইরের দেখা।সুশোভনের অস্থিরতা,মনের তোলপাড় বোঝানোর জন্য ওই দৃশ্যে একটা অদ্ভুত সাউণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে।সেটা মনের খুব গভীরের অবস্থা নয়।কারণ তুমি দেখবে আমার ক্যামেরা মুভমেন্ট খুব ফিক্সড।মনের গভীরে প্রবেশ করলে আমার ক্যামেরার মুভমেন্ট হতো বেশি।
আপনি বলছেন বাইরের থেকে বাবা ছেলের সম্পর্ককে ডিসকভার করা হয়েছে।কিন্তু বৃহত্তর বিশ্বের সমস্যা যেমন ডিমনিটাইজেশন,রাজনৈতিক রক্তপাত,সন্ত্রাসবাদ—এসব বাবা ছেলের সম্পর্ক বা সিনেমার অন্যান্য চরিত্রকে কি কোনওভাবে 
এফেক্ট করছে?

অতনু ঘোষ : এফেক্ট তো করেছে।কয়েকদিন আগেই নাট্য ব্যক্তিত্ব এবং চিত্র পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায় খুব সুন্দর একটা কথা বলেছেন।সু্মন মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় বাইরের পৃথিবীর তোলপাড়,একাকিত্বই ছড়িয়ে পড়ছে ব্যক্তি মানসে।এভাবেই তিনি  ‘ময়ূরাক্ষী’ দেখছেন।এছাড়া বাইরের পৃথিবীর কথা যেটা তুমি বললে সেটারও অনেক সূত্র ছবিতে আছে।
ঠিক কোন সূত্রগুলোর কথা আপনি বলছেন?
অতনু ঘোষ : দেখবে ছবিতে সুশোভন খবরের কাগজ পড়ছেন না।কেন পড়ছেন না সে কথাও তিনি বলেছেন। তিনি বলছেন —“মানুষের প্রতি অবিশ্বাস,হিংসার কথা কেন আমিপড়ব”?ময়ূরাক্ষীতে বয়স্ক একজন লাইব্রেরিয়ানের প্রসঙ্গ এসেছে,যার নাতনি 
রাজনৈতিক কোনও ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিল।প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে খুন করা হয়।মানুষ চোখেরবাইরে বেরোলেই আমাদের আশঙ্কা হয়।একটা ইনসিকিওরিটি কাজ করে।ছবিতে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।
কোন কথা?
অতনু ঘোষ : বাইরের পৃথিবীর অস্থিরতার প্রসঙ্গে গ্ল্যাডস্টোনের একটা উক্তি আছে —“We look forward to a time when the power of love would replace the love ofPower”| 
এই ছবিতে সুশোভন ওরফে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সিকুয়েন্স যখন দেখানো হয় তখন দৃশ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত ভেসে আসে।এই সব রবীন্দ্রসঙ্গীত কি সুশোভনের মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সংযুক্ত?
অতনু ঘোষ : সুশোভনের জন্য সকালবেলা একটা এফ এম চালাননো হয়।এই এফ এমটা উনি পছন্দ করেন।উনি কাগজ পড়তে চান না।টেলিভিশন দেখতে চান না।কিন্তু এফ এম কে উনি প্রশ্রয় দেন।এটা আমার কাছে মনে হয় খুব গভীর মনস্তত্ত্ব।
বিষয়টা ঠিক কেমন?
অতনু ঘোষ : আসলে মানুষ শুধু অন্যের কণ্ঠ শুনতে চায়।মানুষের একাকিত্বে ভোগার অন্যতম কারণ কারোর গলা শুনতে না পাওয়া।আমি ওল্ডেজ হোমে গিয়ে দেখেছি সারাক্ষণ রেডিও চলে।রেডিওর কণ্ঠের সঙ্গে এদের একটা আত্মিক যোগাযোগ 
থাকে।‘ময়ূরাক্ষী’র রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলো সুশোভনের সাথে মিশে যায়।ছবিতে রেডিওর এফ এম-এ একটা কথা শোনা যায়।
কোনটা? 
অতনু ঘোষ : এফ এম-এ এক জায়গায় বলা হয় —“আজ আমরা কথা বলছি হারিয়ে যাওয়া সময়,হারিয়ে যাওয়া মুহূর্ত,হারিয়ে যাওয়া মানুষ নিয়ে।তারপরেই ওই গানটা শোনা যায়—“আমি তারেই খুঁজে বেড়াই”।আর “তখন তরুণ ছিল অরুণ আলো” এই গানটা যেন সুশোভনের ফেলে আসা জীবনের সুর।আবার সুশোভন যখন ছবি আঁকেন তখন আর 
একটা গান ভেসে আসে —“রঙের মেলা,রূপের খেলা…”। মানে এই রঙ আর রূপের আকর্ষণই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখবে।
যে রঙ আর রূপের কথা আপনি বলছেন,সেই রঙ আর রূপের কথাতো তখন ২৩’এও ছিল।সংলাপটা হলো“চারদিকে ছড়িয়ে আছে রঙ।কম্পিউটারের ভি জি এ প্যানেল থেকে বেশি।মোর দ্যান সিক্সটিন মিলিয়ান কালারস”।তখন ২৩’-এর রঙের সঙ্গে ময়ূরাক্ষীর রঙের কোনও মিল আছে?

অতনু ঘোষ : অবশ্যই।রিয়ালিটি এবং ফ্যান্টাসির সংঘাত তো এখানেই।রিয়ালিটি বার বার ফ্যান্টাসিকে ভেঙে দিচ্ছে।কল্পনা হারিয়ে যাচ্ছে বলে বাস্তব বার বার রূঢ় হচ্ছে।এটা ‘অ্যাবি সেন’-এর মধ্যেও আছে।আমাদের কোথাও স্বপ্ন দেখার ইচ্ছে আছে।কিন্তু স্বপ্নের হদিশ নেই।বা স্বপ্নের সেই চাবি নেই।যার সাহায্যে স্বপ্ন উন্মোচিত এবং উদ্ভাসিত হতে পারে।

আরও পড়ুন:  কেন ১৩ বছরের দাম্পত্যজীবন থেকে বেরিয়ে এলেন এই জুটি?

প্রত্যেক ফিল্মমেকারের ছবিতে একটা সিগনেচার স্টেটমেন্ট থাকে। আপনার ছবির সিগনেচার স্টেটমেন্ট কী বলে মনে হয়?
অতনু ঘোষ : এটাতো দর্শক বলতে পারবেন।আমার নিজের মনে হয় আমার ছবিতে একাকিত্ব ফিরে ফিরে আসে।কখনও হারিয়ে যাওয়া সময় আসে।আবার শত সমস্যা সত্ত্বেও আশা,আলো,বিশ্বাস যে হারিয়ে যায়নি —সেটাও ছবিতে থাকে।এছাড়া বহির্জগৎ ও অন্তর্জগতের অস্থিরতা আসে।
প্রসেনজিত চ্যাটার্জীকে এই প্রথম আপনার ছবিতে দেখে গেল।ময়ূরাক্ষী’ চিত্রনাট্য কি প্রসেনজিতকে ভেবে লেখা।নাকি চিত্রনাট্য লেখার পর চরিত্র অনুযায়ী প্রসেনজিতকে নির্বাচন করা?

অতনু ঘোষ : এই দুটো ভাবনাই কিছুটা ছিল।একটা চরিত্রকে দেখলেই যেটা প্রথমে নজরে পড়ে সেটা হলো চরিত্রের ব্যক্তিত্ব।সেই চরিত্রের শারীরিক গঠন অনুযায়ী আমরা ভাবি যে চরিত্রটা হয়ত ভালো কিংবা খারাপ।আর একটা হিসেব আমাদের মনে আসে।সেটা হলো বয়সের হিসেব।বয়স ও ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী আমার প্রথম থেকেই মনে হয়েছিল প্রসেনজিত চ্যাটার্জী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে হিসেবে যথাযথ।আমার আর একটা জিনিস মনে হয়েছিল।

কী?

অতনু ঘোষ : আর্যনীলের চরিত্র যতো না কথা বলে তার থেকে অনেক বেশি কথা বলে তার চোখ।অর্থাৎ তার চোখের অভিব্যক্তি মনের অবস্থান বোঝায়।আমার মনে হয়েছে প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়ের চোখ একটা জোরালো অস্ত্র।এবং ঋতুপর্ণ ঘোষের 
মতো পরিচালক এই চোখের ব্যবহার করেননি।অন্যান্য পরিচালকেরাও এই বিষয়ে জোর দেননি।
এটা কেন মনে হলো?

অতনু ঘোষ : কারণ বুম্বাদাকে (প্রসেনজিত চ্যাটার্জী) কেউ খুব একটা অন্তর্মুখী চরিত্র দেননি।প্রসেনজিত অনেক ভাবনা চিন্তা করে একটা চরিত্র নির্বাচন করেন।বুম্বাদা যখন এই চরিত্র করতে রাজী হলেন,তখন আমার খুব ভালো লেগেছিল।উনি অনেকদিন 
ধরে আমার সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছেন।‘ময়ূরাক্ষী’র গল্প শুনে বুম্বাদাকে খুব এক্সাইটেড লাগছিল।এই সবের নিরিখে আমি ওঁকে নির্বাচন করেছি।

এই ছবির পাবলিসিটি এবং মার্কেটিং আপনার অন্যান্য ছবির থেকে অনেক বেশি।ছবির সাফল্যের পেছনে প্রচারের ভূমিকা কতটা?
অতনু ঘোষ : অবশ্যই প্রচার একটা ফ্যাক্টর।ছবিটার কথা জানতে না পারলে ‘ময়ূরাক্ষী’ দর্শকের দরবারে পৌছাত না।বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলা হয় প্ল্যাকার্ড।প্ল্যাকার্ড মানে একটা দেওয়ালের ওপর বারোটা পোস্টার।সেখানে দুটো পোস্টার হয়ত গভর্ণমেন্ট 
দিয়েছে।বা কোনও বেসরকারি সংস্থা দিয়েছে।এখন এর মাঝখানে একটা ছবির পোস্টার কতোটা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।সবাই আমাকে বলে দেওয়ালগুলোকে কেমন নানান রঙের ডিজাইন মনে হয়।তাই বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার জরুরি।
এই ছবিতে সুশোভনের চরিত্র পাওয়ার পর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কিছু বলেছিলেন?
অতনু ঘোষ : সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বার বার বলেন — “অতনু তোমার সিনেমা নিয়ে তুমি যেভাবে কনসিভ করেছ,সেটা কনসিভ আর কারোর পক্ষে করা সম্ভব নয়। কারণ তুমি সিনেমার সমস্ত ডিপার্টমেন্ট নিয়ে ভাবছ।আমি তো শুধু আমার চরিত্র  নিয়ে ভাবছি। তাই আমি ছবিতে বাড়তি কিছু করলে সেটা চাপিয়ে দেওয়া হবে”।
আর কী বলেছেন উনি?
অতনু ঘোষ : অনেক সময় আমার সাথে ওনার মতের মিল হয়নি।আমি তখন বলেছি এখন থাক পরে দেখা যাবে।পরের দিন সৌমিত্র বাবু এসে বলেছেন —“অতনু আমি পরে ভেবে দেখলাম তোমারটাই ঠিক।ওটাই ছবিতে রেখো”।এটাই ওনার মতো  অভিনেতার মস্ত বড় দিক।এই উদারতা এবং সংবেদনশীলতাতা ওনার আছে।উনি অসম্ভব অনেস্ট শিল্পী।
আপনার ছবিতে ময়ূরাক্ষী নারী।আবার ময়ূরাক্ষী বললে নদীর কথাও মনে হয়।ছবিতে কোথাও কি নদী আর নারী একাকার হচ্ছে?
অতনু ঘোষ : জীবনের প্রাণশক্তি অনুপ্রেরণার মধ্যে নারী এবং নদীর প্রভাব তো আছেই।নারী সভ্যতার উৎস।তাই নারীর যে বহমান অবস্থান সেটা নদীর সঙ্গে সমার্থক। নদীর চলাচলের মধ্যেও জোয়ার ভাঁটা আছে।চড়াই উৎরাই আছে।নারীর জীবনও তেমন।সেই দিক থেকে ‘ময়ূরাক্ষী’র মধ্যে নদী এবং নারীর ভাবনা চলে আসে।
আপনার ব্যক্তিগত ক্রাইসিস পিরিয়ডে আপনি কি কখনও আপনার তৈরি সিনেমার চরিত্রের কাছে সমাধানের পথ খোঁজেন ?
অতনু ঘোষ : একটা সময়ের পর আমার তৈরি চরিত্রগুলোর সঙ্গে আমার দূরত্ব তৈরি হয়। এর কারণ হলো সব সময় আমি অতীতের ছবিগুলি দেখি না।আমি অনেকদিন ‘অংশুমানের ছবি’, ‘তখন ২৩’ দেখিনি।কিন্তু এটা হয়ত ঠিক যে এই চরিত্রগুলো নানা ভাবে অবচেতনে প্রভাব ফেলে।কখনও কখনও খুব দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবও থাকে।তার সূত্র ধরে জীবনে পথ চলা অনেক সহজ হয়।আবার অন্যরকম অনুভূতিও হয়।
অন্যরকম অনুভূতি?
অতনু ঘোষ : হ্যাঁ।খুব কষ্টের সময় বা আঘাতের সময় যে অনুভূতি হয় সেই অনুভূতির নির্যাস পরবর্তী সময় কোনও ছবির চরিত্রে ভিন্ন ভাবে রূপান্তরিত হতে পারে।

আরও পড়ুন:  ক্যান্সারে আক্রান্ত স্বপ্ন-সুন্দরী নাফিসা আলি, কান্না ভেজা বুকে শেয়ার করলেন চুল কাটার দৃশ্য

ময়ূরাক্ষী’তে সুশোভনের স্ত্রীর নাম অপর্ণা।আবার অপুর সংসারে অপুর স্ত্রীর নাম অপর্ণা।কোথাও সত্যজিৎ রায়ের ইনফ্লুয়েন্স আপনার ভাবনায় থাকে?

অতনু ঘোষ : সব ক্ষেত্রে নয়।আমার চিত্রনাট্যের যাবতীয় কিছু সত্যজিৎ  রায়ের কাছে শেখা।মানুষের জীবনের টানাপোড়েন বা সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা মানুষের পরিচয় আমার ছবিতে থাকে।এক্ষেত্রে আমি বলব আমার মধ্যে মৃণাল সেনের প্রভাব বেশি।মৃণাল সেন আমার অত্যন্ত প্রিয় পরিচালক।

এখন অবধি আপনার সমস্ত ছবিগুলোকে ভালো লাগার জায়গা থেকে যদি সাজাতে বলা হয় তাহলে কীভাবে সাজাবেন?
অতনু ঘোষ : এটা বলা খুব মুশকিল।একেকটা ছবি একেকটা কারণে স্মরণীয়।‘তখন ২৩’ আমার কাছে যে কারণে প্রিয়,’এক ফালি রোদ’অন্য আর এক কারণে প্রিয়।এই ভালো লাগার কারণগুলো খুব ব্যক্তিগত।এই ভালো লাগার সঠিক ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব না।
আপনি বহু অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছেন।যদি প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় করে সাজাতে বলা হয়,তাহলে কীভাবে করবেন?
অতনু ঘোষ :আমি যে চরিত্রে যাকে নিয়েছি সেই চরিত্রে সে সব থেকে মানানসই।ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত,যীশু সেনগুপ্ত,আবীর চ্যাটার্জী,প্রসেনজিত চ্যাটার্জী এরা আমার পরিচালিত চরিত্রে অভিনয় করেছেন।এবং এই চরিত্রে অভিনয় করার পর চরিত্রগুলো প্রবলভাবে জনপ্রিয় হয়েছে।সৃজিত মুখার্জী একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন,যীশুর অন্যতম সেরা ছবি হচ্ছে ‘তখন ২৩’।‘অংশুমানের ছবি’র পর ইন্দ্রনীল সেনগুপ্তর জনপ্রিয়তা কোন পর্যায়ে গিয়েছিল,সেটাসবাই দেখেছে।ঋত্বিক বার বার বলেন ‘একফালি রোদ’ ওর কাছে ইম্পরটেন্ট ছবি।আবীর বলে ‘অ্যাবি সেন’ওর প্রিয় ছবির মধ্যে অন্যতম।ওদের নির্বাচন করে আমি সাফল্য পেয়েছি।তাই এদের এক দুই তিন চার করে সাজানো অনুচিত।
প্রসেনজিত চ্যাটার্জীকে নিলে নাকি পরিচালকদের অনেক রকম সুবিধা হয়।মানে উনি প্রচার বিপণন এসব বিষয়ে যথেষ্ট সাহায্য করেন।এটা আপনার ক্ষেত্রে কতোটা হয়েছে?
অতনু ঘোষ : অবশ্যই উনি এটা করে থাকেন।শুধুমাত্র অভিনয় করে ওনার কাজ শেষ হয়ে যায় না।এবং এটা উনি কখনই মনে করেন না।বুম্বাদার কাছে ছবিতে অভিনয় করা মানে কাজের সূচনা।এরপর সেই ছবি কীভাবে বিপণন,প্রচার,লে আউট ডিজাইনিং হবে — সমস্ত কিছুতেই প্রসেনজিত জড়িত।
অভিনেতার কি এটা করা প্রয়োজন?
অতনু ঘোষ : এটাই তো হওয়া উচিত।এটা পেশাদারী মনোভাবের পরিচয়।ওনাকে নিলে আমরা এই এ্যাডভান্টেজগুলো পাই।এখান থেকে বোঝা যায় প্রসেনজিত বাদে বাকি সিস্টেম কতখানি নড়বড়ে।তার মানে অন্য অভিনেতাদের ক্ষেত্রে এটা হয় না। অন্যরা নিশ্চয়ই ততটা এগিয়ে আসেন না।বলতে বাধ্য হলাম।
এই সাফল্যের পর আপনার জীবনযাত্রার কোনও পরিবর্তন আসবে?
অতনু ঘোষ : এর সঙ্গে জীবনযাত্রার কোনও সম্পর্ক নেই।আমি নিজেকে টেকনিশিয়ান মনে করি।কেউ যদি তার সাফল্যে আত্মহারা হয়ে যায়,তাহলে তো বিপদ।সিনেমা শিল্পটা এতটাই শক্তিশালী এবং বিশ্ব সিনেমা যেখানে গেছে,সেই দিকে লক্ষ্য রাখলে বোঝা যায় যে এই সমস্ত সাফল্য ছোটখাটো সাফল্য।

1 COMMENT