প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য এই সময়কার সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিমান চিত্র পরিচালকদের একজন | তাঁর পরিচালিত বাকিটা ব্যক্তিগত পেয়েছে জাতীয় পুরস্কার | তাঁর চলচ্চিত্র ভাবনা ও আরও বিবিধ বিষয় নিয়ে কথা বললেন তন্ময় দত্তগুপ্তর সঙ্গে |

তোমার বাড়ি বহরমপুরে।নদীয়ার সঙ্গেও তোমার একটা রিলেশন আছে।বহরমপুরেই তো তোমার ছেলেবেলা কেটেছে? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : বহরমপুরে আমার বড় হওয়া।আমার জন্ম।আমার বাবা নদীয়ার তেহট্টর বাসিন্দা।চাকরি সূত্রে আমার বাবা বহরমপুরে চলে  আসেন।নদীয়ার তেহট্টর সঙ্গে আমার কানেকশন আছে।ওখানে এখনও আমাদের বাড়ি আছে।

তোমার বাবা খুব সিনেমা দেখতেন।সেই থেকেই কি তোমার সিনেমার প্রতি ইন্টারেস্ট? 

Banglalive-8

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : বাবা খুব হিন্দি সিনেমা দেখতেন।পুরনো দিনের বাংলা ছবিও দেখতেন।আমিও সিনেমা দেখতাম।কিন্তু আমার মনে কিছু প্রশ্ন আসত।যেমন ধরো একটা লোক বা অভিনেতা সিনেমায় কী করে গান গাইছে? বাস্তবে একটা মানুষ গান গাইলে এরকম তো হয় না।মানে সিনেমার চরিত্র গান গাইছে আর তার সঙ্গে মিউজিকও হচ্ছে।এই ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগত।প্লেব্যাক সিঙ্গার, মিউজিক — এসব আমি নিজে  নিজেই বার করেছিলাম।আমার বাড়ির কাকা, পিসিরা নাটক করতেন।আর বহরমপুরের বিভিন্ন জায়গায় চ্যারিটি শো হত।সেখানেও সিনেমা দেখানো হত।আমার এইট এবং নাইনে পড়ার সময় দূরদর্শনে সত্যজিৎ রায় এবং  ঋত্বিক ঘটকের রেট্রোস্পেকটিভ হয়েছিল।ঋত্বিক ঘটকের  ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ আমার খুব ভালো লেগেছিল।তাছাড়া শিবরাম চক্রবর্তীর ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ আমার খুব প্রিয় উপন্যাস  ছিল।

Banglalive-9

দূরদর্শন তাহলে তোমার ছেলেবেলায় একটা ইম্পরটেন্ট রো প্লে করেছে? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : হ্যাঁ।উত্তম কুমারের মৃত্যুমাস জুলাইয়ে দূরদর্শনে  ‘নায়ক’ দেখেছিলাম।আমি প্রচুর পুরনো বাংলা ছবি দেখতাম।আবার পুরনো হিন্দি ছবিও দেখতাম।আমাদের বহরমপুরে দু’দিন দোল হয়।সেই সময় ভি সি পি ভাড়া করে আমরা সিনেমা দেখতাম।আমাদের কালার টিভি  ছিল না।তাই ভি সি পির সঙ্গে কালার টিভিও  ভাড়া করতাম।প্রতিদিন তিনটে করে সিনেমা দেখতাম।তখন মুঘলে আজম, পাকিজা,ধর্মেন্দ্র,দিলীপ কুমারের ছবিও দেখেছি।

একদিকে কমার্শিয়াল হিন্দি ছবি আবার অন্যদিকে সত্যজিৎ এবং ঋত্বিকের ক্লাসিক ছবি দেখছ।তা এই দুই ধারার ছবির পার্থক্য কিছু বুঝতে  তখন?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : আমার দুটো সিনেমার পার্থক্য খুব মনে হত।কারণ কোনও ভাবে ঋত্বিক ঘটকের, সত‍্যজিৎ রায়ের ধারার ছবি আমার ভালো লাগতে শুরু করেছিল।আর একটা ইম্পরটেন্ট পার্ট হোল ন্যাশনল টিভিতে প্রতি রবিবার দুপুরে তখন আঞ্চলিক সিনেমা দেখাত।আমি দেখতাম।কিন্তু সাব টাইটেল  পড়ে কিছু বুঝতে পারতাম না।শুধু সিনেমা দেখে একটা স্টোরি লাইনের আন্দাজ পেতাম।একটা সিনেমার সংলাপ বা ভাষা তুমি না বুঝলেও একটা মেসেজকে তুমি কমিউনিকেট করতে পারবে।সেই প্র্যাকটিশটা আমার হয়েছিল।

তোমার কথা থেকেই একটা প্রশ্ন মাথায় এলো।এই যে তুমি বলছ ছবির সংলাপ না পড়ে তুমি ছবির সম্পর্কে ধারণা করতে পারছিলে।এই জায়গা থেকেই কি সিনেমাকে একটা ইউনিভার্সাল গ্লোবাল ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে ধরা হয়? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : তন্ময় তুমিও ওই আঞ্চলিক সিনেমাগুলো দেখেছ।কারণ তুমি আমার সময়ের একজন।দেখো ওই ছবিগুলো দেখে একটা  পয়েন্টের পরে বোঝা যেত ছবিটার ভাবনা।এটা শুধু আমি নই,অনেকেই বুঝতে পারতেন।মারঠি ছবি বা অসমিয়া ছবি দেখে মনে হত ওদের পোশাক,আদব-কায়দা, কথাবার্তার ভঙ্গিগুলো আলাদা।এই সব দেখতাম।আর তুমি যেটা বলছ সেটা ঠিকই সিনেমার ভাষাটা তো  আন্তর্জাতিক।

বহরমপুর থেকে তুমি কলকাতায় চলে এলে।তারপর সিনেমার পোকা নাড়াচাড়া দিল।তখন সিনেয়া চর্চা করতে কীভাবে?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য :  বহরমপুর থেকে কলকাতায় চলে আসার পরে আমি এখানে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল দেখেছি।এখানে আসার পরে আমি বহু কোর্স  করেছি।তখন এত ভালো ভালো সব কোর্স ছিল না।আর আমার বাবা প্রায় ভেবে ফেলেছিল যে আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার।সিনেমা পেশায় না  এলে আমার ফিউচার প্রায় তাই হত। কলকাতায় আমার এক দাদা ছিলেন দেবব্রত রায়।তিনি এখনও আছেন।তিনি সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।উনি আমাকে বিভিন্ন টেকনিক্যাল টার্ম বলতেন।আমি এরপর মাল্টিমিডিয়ার একটা কোর্স করি।তারপর মাল্টিমিডিয়ার দুমাস চাকরি করি ।ওখানে আমাকে কিছু কনটেন্ট  দেওয়া হত।ট্র্যাভেল ডকুমান্টারি টাইপের অ্যানিমেশন, গ্রাফিক্স আমাকে সব কিছু   করতে হত।এটা ২০০০ কি ২০০১ সালের ঘটনা।ওই সময়ে ইন্টারনেটের এত বাড়বাড়ন্ত ছিল না।স্ক্রিপ্টও আমি করতাম।সাউন্ড ডিজাইনও করতাম।ওখানে দু-তিন মাসের চাকরিতে আমার স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ে সেন্স গ্রো করেছিল।সেই সময়েই আমি ঠিক করে ফেলেছিলাম ক্রিয়েটিভ পেশায় থাকব।তথাকথিত চাকরি করব না।

আরও পড়ুন:  আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষের শিকার কাজলের বোন তনিশা!?

তা এই দেবব্রত বাবুর সঙ্গে তোমার যোগাযোগ হল কীভাবে? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : দেবব্রত বাবু আমার পিসতুতো দাদা।ওনার আর একটা পরিচয় দি।উনি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর কো-স্ক্রিপ্ট রাইটার।উনি অভিনয়ও করেন।উনি আমায় সাহায্য করেছিলেন।

এরপরেই কি পেশাগতভাবে ছবি করা শুরু? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : না।তারপরে রূপকলা কেন্দ্রে আমি এডিটিং নিয়ে ভর্তি হই।বলতে পারো রূপকলা কেন্দ্রে শিক্ষা গ‍্রহণ আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। সৌমেন্দু রায়,সুমিত ঘোষ , মহাদেব শী,অর্ঘকমল মিত্র,মিতা চক্রবর্তী,অনুপ মুখোপাধ্যায়-এর মতো টিচার পেয়েছি।আর আমরা যখন পড়তাম তখন রূপকলা কেন্দ্রের সি ই ও ছিলেন অনিতা অগ্নিহোত্রী।

এই পেশা যে অনিশ্চয়তায় ভরপুর সেটা তোমার কখনও মনে হয়নি? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যঃ সেটা তো মনেই হয়েছে।তুমি যে অনিশ্চয়তার কথা বলছ,সেটা এখনও আছে।যদিও এখন কিছুটা কমফোর্ট জোনে।কিন্তু আজ থেকে দু-তিন বছর আগেও একটা অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল।কারণ আমার সিকিওরড কোনও ইনকাম ছিল না।কিন্তু আমি এই  জগতেই পড়েছিলাম ও আছি।

তুমি রিজিওনাল সিনেমা এই সমস্ত লেবেল বিশ্বাসী নও।তোমার কাছে সিনেমা ইটসেল্ফ ইন্টারন্যাশনল।এটা একটু ব্যাখ্যা করবে?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : দেখো আমার কাছে ফিল্ম মাত্রই ইন্টারন্যাশনল। বলার সুবিধার জন্য আঞ্চলিক, জাতীয়,আন্তর্জাতিক এই ভাগ করা হয়।কিন্তু একটা আঞ্চলিক ছবিও আন্তর্জাতিক মানের হতে পারে।

তোমার ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ কতটা আন্তর্জাতিক মানের? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য :  ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ আমার ছবি বলেই  আমি নিজে জাজ করতে পারব না।ছবিটার ফ্রেমিং বা টেকনিক্যাল  কোয়ালিটির মধ্যে কিছুটা ইন্টারন্যাশনল ব্যাপার আছে। আবার ছবিটার মধ্যে কালচার স্পেসিফিক ব্যাপার আছে।তবে আবার এও বলব আঞ্চলিক,জাতীয়, আন্তর্জাতিক এই ধরনের লেবেলে আমার প্রবল আপত্তি আছে।হিন্দিতে ছবি হলেই সেটা জাতীয় সিনেমা হবে — এরকম ভাবনা গণ্ডগোলের।হিন্দিও তো একটা ঞ্চল প্রধান ভাষা।তাহলে সেটাই বা কেন রিজিওনাল হবে না।

আমাদের এখনকার বাংলা সিনেমাকে তুমি প্লাস্টিক সিনেমা বলো।এই প্লাস্টিক সিনেমা বলতে তুমি কী বোঝাতে চাও? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য :তোমার এই প্রশ্নের দুটো দিক আছে।প্লাস্টিক ফিল্ম বলতে প্রথমত কনটেন্টের দিক থেকে গ্রাসরুট লেবেলের সঙ্গে যোগাযোগ নেই।নিদেন পক্ষে মধ্যবিত্ত জীবনের কিছু আর্টিফিসিয়াল জীবন যাপন।সেটাও খুব গোছানো।যদিও বা গ্রামের কিছু রেফারেন্স এলো, সেটাও  শহুরে দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা। গ্রামের মানুষেরা সব সময় ইস্তিরি করা জামা কাপড় পরে না।অথচ ছবিতে সেটা দেখানো হচ্ছে।বা তাদের কোনও কথার রি-অ্যাকশন একেবারেই অন্যরকম।সেটা শহুরে অনেক পরিচালক ভাবে না।ডায়লগ যখন লেখা হয়,তখন পরিচালকের মুখের ভাষায় সবাই কথা বলছে বলে মনে হয়।কিন্তু চরিত্র তো তার অবস্থান অনুযায়ী ডায়লগ বলবে,সেটা তো পরিচালকের নিজস্ব ব্যক্তিগত অবস্থানের মতো নাও হতে পারে।এই বিষয়টা তো পরিচালককে জানতে হবে।

প্রদীপ্ত আমাদের আলোচনার মধ্যে একটা ইম্পরটেন্ট পয়েন্ট উঠে এলো।গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছবিটার প্রেক্ষাপট গ্রাম বাংলা। গৌতম বাবু সরাসরি গ্রামের মানুষ নন।উনি রিসার‍্চ করে ওরকম ছবি করলেন।আর তুমি গ্রামের ছেলে।গ্রাম জীবনের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক আছে।তোমরা দুজনেই যখন ছবি করছ তখন গ্রাম জীবনকে দেখার মধ্যে কোনও ফারাক থাকছে ? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য :  দেখো একটা দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক থাকে।আবার সংলাপের একটা ফারাক থেকে যায়।মানে কথ্য ভাষার ফারাক।আমাদের  পশ্চিমবঙ্গের অনেক রকমের ডায়ালেক্ট আছে।মূর্শিদাবাদে একরকম ডায়ালেক্ট,বহরমপুরে আরেক রকমের ডায়ালেক্ট আবার জঙ্গিপুরে গেলে আবার সম্পূর্ণ আরেক রকমের ডায়ালেক্ট।এখন আমি যদি বহুদিন চর্চা করে মূর্শিদাবাদের ডায়লগ দিই,তাহলে সেটা খুব ভালোভাবে হবে না।আবার অ্যাকিউরেট সব ভাষা তুলে ধরলে,সেটা আবার লোকে বুঝতে পারবে না।মানে সর্বজনীন গ্রাহ্য হবে না।সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র পটভূমিও গ্রাম।ওনার প্রেজেন্টেশনটাই ছবিকে অন্য জায়গায় পৌছে দেয়।ডায়ালেক্টকে একটা স্ট্যাণ্ডার্ড জায়গায় আনতে হবে।তবে সিনেমার কালার টোন আর চরিত্রের পোশাকের কালারের পরিবর্তন আনলে ভালো।আর একটা সমস্যা আছে।

কী? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যঃ এখনকার বাংলা সিনেমায় শহর মানেই কলকাতা।আর গ্রাম মানেই শান্তিনিকেতন।ব্যাকগ্রাউন্ড এবং সাউণ্ডের ক্ষেত্রেও কোনও ফারাক দেখি না।গ্রামের অ্যাম্বিয়েন্স এবং শহরের অ্যাম্বিয়েন্সের মধ্যে তো পার্থক্য থাকেই।

তোমার ছবি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ডিস্ট্রিবিউশনের সময় প্রচুর সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।তেমন হল পায়নি।সেভাবে বাণিজ্যের মুখও দেখেনি। তা তুমি কি এবার তোমার অ্যাটিটিউড  থেকে একটু সরবে? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য :  তন্ময় এটা অ্যাটিটিউডের ব্যাপার নয়।আমার ছবির বাজেট খুব কম থাকে।একটা দুটো স্ক্রিপ্ট আছে।যেগুলো পিরিয়ড পিস।তার বাজেট একটু বেশি।মানে দেড়শো বছর আগের সময়ের ছবি।বা দুশো বছর পরের ছবি।বাদ বাকি আমার খুব ছোট বাজেটের ছবি।যেগুলো রিকভার করা খুব কঠিন নয়।দেখো বিশাল টাকা খরচ করিয়ে আমি লায়াবিলিটি বাড়াতে চাই না।তন্ময় লায়াবিলিটি যত বাড়বে তোমার ওপর চাপ বাড়বে।ধরো ২৫ লাখ টাকার একটা ছবি করলাম।সেখানে লায়াবিলিটি অনেক কম,কিন্তু ফ্রিডম অনেক বেশি।৫০ লাখ টাকার একটু বেশি বাজেট হলে লায়াবিলিটি একটু বেশি।দু’কোটি চার কোটি পাঁচ কোটি যখনই ছবির বাজেট হবে,তখনই কিন্তু তোমাকে সিস্টেম,বাণিজ্য  এসবের মধ্যে আসতে হবে।তখন তোমার ফ্রিডম কমবে।বা থাকবেই না।অতোগুলো টাকার ব্যাপার।এখন আমার ছবির প্রদর্শনীর বাইরে বেশি লোক দেখুক সেটা আমি চাইব।এবং টাকা ফিরে আসুক।আমার একটা অন্য বিষয় মনে হয় |

আরও পড়ুন:  'সচিনের বায়োপিকে অভিনয় করতে চাই'-অনিল কপূর

সেটা একটু বলো। 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : আমার মতো মানুষ পৃথিবীতে কিছু আছে।সারা পৃথিবীতে বহু কোটি বাঙালি আছে।তার এক পারসেন্ট আমার ছবি দেখতে  পারলে আমার টাকা উঠে আসবে।আমাকে ওই জায়গাটায় পৌছাতে হবে।ইন্টারনেটের যুগে সেই জায়গায় রিচ করা খুব কঠিন নয়।আমেরিকার মতো শহরে ১০০ টা লোকের মধ্যে একটা লোকও যদি আমার ছবি দেখে গোটা পৃথিবীতে অনেক লোক হবে।’বাকিটা ব্যক্তিগত’ সেরকম সিনেমা হলে দেখায়নি বলে আমি প্রোজেক্টর নিয়ে আমার টিমের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ছবিটা দেখাতে আরম্ভ করি।ওই ছবি দেখে গ্রামের বহু লোকের খুব ভালো লাগে।

প্রদীপ্ত আমাদের দর্শক বহু যুগ ধরে বন্ধু বান্ধব নিয়ে হৈ হৈ করে হলে ছবি দেখে।তা তোমার কি মনে হয় গ্রামে দেখিয়ে ইন্টারনেটে দেখিয়ে সে স্বাদ পূর্ণ হবে? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : আমার প্রথম ছবির ক্ষেত্রে সেটা হয়নি বলেই আমি দুঃখে অল্টারনেট পথ খুঁজেছি।

তুমি কি মাঝামাঝি কোনও পথ খুঁজবে যেখানে হলেও মানুষ দেখবে আবার বিশ্বের মুষ্টিমেয় বাঙালির কাছেও তোমার ছবি যাবে? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : দেখো আমার ছবি আমার নিজের মনে হয় খুবই কমার্শিয়াল।হয়ত সেটা আজকে সেভাবে রেখাপাত করছে না।কিন্তু কালকেও যে একই রিঅ্যাকশান হবে তার কোনও মানে নেই।কাল সেটা অন্যের কাছে  রিঅ্যাক্টিভ হতেই পারে।কনটেন্ট ওরিয়েন্টেড কাজ লোকে এখন দেখছে।আমার ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’তে চেষ্টা করছি একটু অন্যভাবে করার।মানে ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’র কোনও রকম ছায়া এর মধ্যে না থাকে।আমি বিভিন্ন রকমের ছবি করতে চাই।এখনকার হার্ডকোর কমার্শিয়াল ছবির মতো আমি ছবি করতে পারব না।সেটা আমার কাছে চাপের ব্যাপার।কারণ সেই প্র্যাকটিশ আমার নেই।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্য এবং সিনেমা চিরকালই সেলেবেল।বাংলা এবং হিন্দি ছবির ক্ষেত্রে।সেই ভাবনা থেকেই কি রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তর ভাবনা?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : সেলেবিলিটির ভাবনা এসেছে পরে।আমার একটা ডাইরি আছে।তার একটা পাতাতে প্রচুর কনসেপ্ট লেখা আছে।এটা লেখার সময় সেলুলয়েড,ডিজিটাল,টেলিফিল্ম সব ছিল।সিরিয়ালি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ছিল ১৩ নম্বর কনসেপ্ট। শ্রীকান্তও ছিল।শ্রীকান্ত আমি  মাধ্যমিকের আগে পড়েছিলাম।শ্রীকান্ত আমার খুব প্রিয় ছিল।তাই লিখে রেখেছিলাম।প্রোডিউসারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল,কোনটা  আমি নিয়ে করলে ভালো হয়।তাই শ্রীকান্ত করার ব্যাপারে আমাদের উভয়পক্ষের সম্মতি ছিল।আর তুমি যে সেলেবেলিটির কথা বলছ,সেটা হয়ত কিছুটা শরৎচন্দ্রকে ঘিরে আছে।কিন্তু আমার এও সন্দেহ আছে,এখনকার প্রজন্ম শরৎচন্দ্র পড়েছে?আমি জানি না।

তোমার ছবিতে নির্দিষ্ট কিছু অভিনেতা থাকেই।যেমন ঋত্বিক চক্রবর্তী,অপরাজিতা ঘোষ দাস।এই দুই মুখ বিভিন্ন চরিত্র বারে বারে তোমার  ছবিতে অভিনয় করে।তোমার চিত্রনাট্যের চরিত্রের কখনও আইডেন্টিটই ক্রাইইসিস হয়?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : ২০০৬ সালে আমি তারা মিউজিকে যখন ‘বিশ্বাস নাও করতে পারেন’ করি,তখন ঋত্বিক একটা মেগাসিরিয়াল করছে।লোকে তখন ওকে ওইভাবে চেনে।আবার ‘পিঙ্কি আই লাভ ইউ’ করার সময় ঋত্বিককে আরেক রকম ভাবে চেনে।চেনাগুলো তো বদলে যায়।এখন আমি যে সেটআপে কাজ করি তাতে ঋত্বিককে লাগে।অপরাজিতাকে লাগে।দেখো আমি যে সময়ে কাজ আরম্ভ করেছি, তখন ঋত্বিক অপরাজিতা কেউ স্টার ছিল না।আমি যে পদ্ধতিতে কাজ করি তাতে বন্ধু হওয়াটা দরকার।ঋত্বিক আমার খুব বন্ধু।বন্ধু মনোভাবাপন্ন টিম থাকলে  আমার কাজ করতেও সুবিধা হয়।

তুমি একজন ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকার।সিনেমাটাই তোমার একমাত্র প্রোফেশন নয়।তুমি একজন এডিটর।এডিটিং-ই তোমার মূল রুজি রোজগারের জায়গা।তা একজন ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকার কি শুধু ফিল্ম করেই জীবন ধারণ করতে পারে?নাকি অল্টারনেটিভ একটা  প্রোফেশন রাখতে হবে বেঁচে থাকার জন্য?

আরও পড়ুন:  আমিরকে হকি স্টিক দিয়ে মারতে গেছিলেন মাধুরী!?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : সিনেমা একটা খুব ফিজিক্যাল পরিশ্রম স্বাপেক্ষ কাজ।প্রাথমিক ভাবে তোমার খাওয়া দাওয়া ঠিক করে করতে হবে।এখন  খাওয়ার জন্য টাকা লাগবে।আর তা না হলে কোনও এক গৌরী সেন লাগবে।স্ত্রী,ভাই বা বন্ধু কেউ তোমায় টাকা জুগিয়ে যাবে।আমার নিজস্ব গৌরী সেনের ব্যবস্থা আমি নিজেই করেছি।আমি সব সময় চেষ্টা করেছি আমার লাইফস্টাইল যাতে বেড়ে না যায়।বেসিকটুকু রেখে কখনও একটু ভালো রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া করলাম।বাসই চড়লাম।কিন্তু মাঝেসাজে ভালো লাগার জন্য একটু ট্যাক্সি চড়লাম।আমার চাহিদাকে আমি এখানেই বেধে রাখি।কারণ আমাকে ইনকাম করতে হয়।সংসার করতে হয়।তার সঙ্গে ছবিও করতে হয়।

তুমি বিয়ে করেছ?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : করিনি।তবে কিছুদিনের মধ্যে করব।আমি, বাবা, মা একসঙ্গে থাকি।

ভেঙ্কটেশের মতো বড় প্রডাকশান হাউস থেকে কখনও ডাক পেয়েছ?বা তুমি তেমন বড় প্রডাকশান হাউসের কাছে গেছো?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : দু একজনের সাথে কথা তো হয়েছে।আলাদা করে নাম বলছি না।তবে তাদের সঙ্গে ছবি করার খুব তাগিদ অনুভব করিনি।

কেন?তুমি তোমার মতো করে ছবি করতে পারবে না বলে? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : একদমই তাই।আমি যে গল্পটা ভেবেছি,তাতে বিরাট পরিবর্তন চলে আসুক, সেটা আমি চাই না।এছাড়া অনেক রকমের চাহিদা  মেটানোর ফ্যাক্টর চলে আসে।ফিল্ম মেকিংটা আমার ভালোবাসার জায়গা।যেটা আমি গায়ে গতরে ঝাঁপিয়ে করতে চাই।সেটা আমাকে খুব আনন্দ দেয়।সেই আনন্দ মাটি করে কি লাভ ! দেখো তন্ময় তুমি যেতে চাইছ সিমলা,কিন্তু যাচ্ছ দীঘা।তাতে কি তোমার ভালো লাগবে?লাগবে না।আমার গন্তব্য যখন সিমলা,তখন সিমলাই যাবো।সেটা পাঁচ বছর বাদে যাবো।চোদ্দবার দীঘা গিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবো না।

প্রসেনজিৎ একবার ইন্টারভিউতে তোমার কথা বলেছিলেন।তা ওনার সঙ্গে তোমার ছবির করার কোনও কথা হয়েছে? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : অনেকবার সেরকম কথা হয়েছে।তবে এখন অবধি কোনও কংক্রিট জায়গায় আসেনি।দেখা যাক।

‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল।তেমনই ‘সহজ পাঠের গপ্পো’, ‘দৃষ্টিকোণ’,’ ময়ূরাক্ষী’ জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে।এই ছবিগুলো কেমন লেগেছে? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য :   ‘ময়ূরাক্ষী’, ‘দৃষ্টিকোণ’ দেখিনি। ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ আমি দেখেছি।আমার ভালো লেগেছে।ওটা খুব সহজ ছবি।বহুদিন প্র্যাকটিশ করে ওখানে একটা ডায়লেক্ট ব্যবহার করা হয়েছে।যেটা চমৎকার।ছবিটা আমাকে খুব টাচ করেছে।কোনও রকম আড়ম্বর নেই।বাংলা ছবিতে এমন কাজের অভাব আছে।এই একই বিষয়ে মানে ‘তালনবমী’ নিয়ে ধনঞ্জয় মণ্ডলের একটা ছবি আছে।সেই ছবিটার আরেক রকমের ফ্লেবার।কিন্তু কালেভদ্রে একটা ‘সহজ পাঠের গপ্পো’,’বাকিটা ব্যক্তিগত’ হলে হবে না।এটা রেগুলার হতে হবে।

তুমি আজ পরিচিত ফিল্মমেকার।তোমার বড় হওয়ার পেছনে কারা কারা ছিলেন?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : আমার পিসেমশাই ছিলেন।২০১৬ সালে উনি মারা যান। সাহিত্য সিনেমা সব ব‍্যাপারে ওনার মতামত পেতাম।ওনাকে খুব মিস করি।তারা চ‍্যানেলের সৌগত পুরকায়স্থ কথা খুব বলব।আমার রিসেন্ট ছবি ‘রাজলক্ষী শ্রীকান্ত’র সম্পর্কে সৌগত দার কাছ থেকে অনেক সাজেশন নিয়েছি।তারা চ‍্যানেলের মিল্টন দা আমার সঙ্গে সৌগত দার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। আমার এক ব‍্যাচমেট আছে অমিত বসু।আমি ছবি করার পরেই প্রথমেই ওদের দেখাই। আরেকজনের কথা বলব দেবানন্দ সেনগুপ্ত।উনিও আমার টিচার ছিলেন।ওনাকেও আমি ছবি দেখাই।সবার শেষে আমার মা-র কথা বলব।মা নীরবে আমার জন‍্য করে যাচ্ছেন।

তুমি বা তোমরা শর্ট ফিল্মমেকারদের নিয়ে একটা ফেস্টিভ্যাল করো।শর্টফিল্ম মেকারদের নিয়ে তোমার আর কোনও ভাবনা আছে? 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য : দেখো আমার মানিটরি রিসোর্স নেই যে আমি অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে পারব।আমি ইয়ং মেকারদের ক্রিয়েটিভ জায়গা থেকে হেল্প করার চেষ্টা করি।’কলকাতা শর্টস’ আমরা করেছিলাম কারণ নতুন নতুন ছেলে মেয়েদের ছবি যাতে লোকে দেখতে পায়।আর সিনেমা নিয়ে মন খোলা আড্ডা যেন হয়।

শেষ প্রশ্ন।ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমটার মধ্যে যে অব্যবস্থা,যে স্বজনপোষণ মনোভাব তার বিরুদ্ধে তুমি কোনওদিন সোচ্চার হবে? নাকি নীরবে  নিজের কাজ করে যাবে?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য :  মানুষ এই সিস্টেম চাইছে।তাদের মধ্যে কোনও স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছে দেখছি না।আবার এও সত্যি মুঘল সাম্রাজ্যেরও পতন হয়। এই পতনের সময় আমরা নাও থাকতে পারি।বা থাকতেও পারি।তন্ময় আমি এটুকু বলতে পারি আমি আমার কাজটা প্রাণপণ করব।এটা আমার অলীক বিশ্বাস কিনা জানি না।আমি আমার মতো করে কাজগুলোকে করে যাওয়াটাকেই যথেষ্ট সোচ্চার হওয়া বলে মনে করি।অ্যাকশন ইস মোর ইম্পরটেন্ট দ্যান  টকিং।

NO COMMENTS