শিকারে বাঘের বদলে ২০০০ বছরের লুকোনো অমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদ

ব্রিটিশ সেনা আফিসার শিকারে বাঘ হয়তো মারতে পারেননি‚ কিন্তু জন স্মিথ যা করেছিলেন‚ তা অমূল্য | ১৮১৯ সালে তিনি ছিলেন মাদ্রাজ রেজিমেন্টের তরুণ আধিকারিক | মহারাষ্ট্রের ঘন জঙ্গলে গিয়েছিলেন বাঘ শিকারে | স্থানীয় রাখাল বখশিসের বিনিময়ে রাজি হয়েছিল বনে বাঘের ডেরা দেখিয়ে দেবে |

অওরঙ্গাবাদ জেলার ওয়াঘোরা নদীর পাশে দঁড়িয়ে আঙুল তুলে দেখিয়েছিল বালক | নদীর পাড়ে একটা খাড়াই ঢিপির দিকে নির্দেশ করেছিল বালকের আঙুল | দূর থেকে স্মিথ যা দেখেছিলেন তা হল কিছু থামের আড়ালে সোনালি লালচে রঙের প্রলেপ | সাহেবের অভিজ্ঞ চোখ বুঝল‚ নদীর অশ্বক্ষুরাকৃতি বাঁকের ধারে ওখানে গাছের আড়ালে আছে গুহার সারি | টর্চ‚ কুঠার‚ বর্শা দিয়ে জঙ্গল কেটে পথ তৈরি করা হল‚ গুহায় যাওয়ার |

বেশ কিছুক্ষণ কসরতের পরে যখন তিনি পৌঁছলেন‚ মনে হল আরব্য রজনীর গল্পও হয়তো এর থেকে কম বিস্ময়কর | অন্ধকার গুহায় চোখ সইয়ে স্মিথ দেখলেন তাঁর সামনে তথাগত বুদ্ধের বিশাল ভাস্কর্য | ব্রিটিশ অফিসার আবিষ্কার করেছিলেন ইতিহাসের দুর্মূল্য রত্ন | অজন্তা বা অজিন্ঠার গুহাসারি | যা তাঁর আগমনের আগে দীর্ঘ কয়েক যুগ মানুষের মুখ দেখেনি | 

দ্বিতীয় খ্রিস্টপূর্ব থেকে ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দ অবধি তিলে তিলে গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধ গুহামন্দির | যার ভিতরে আত্মগোপনকারী বৌদ্ধ শ্রমণরা গুহার দেওয়াল চিত্রিত করেছিলেন অবিস্মরণীয় চিত্রকলায় | সেই রত্নগুহায় তেরোশো বছর পরে প্রথম মানুষ হিসেবে পা দিয়েছিলেন স্মিথ | সেই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি এক নিন্দনীয় কাজ করে বসলেন | যাতে কেউ তাঁর কৃতিত্বের দাবিদার না হতে পারে‚ তিনি বোধিসত্ত্বের ছবির ফ্রেস্কোর উপরে লিখলেন নিজের নাম | অজন্তার ১০ নম্বর গুহায় সেই ফ্রেস্কোর উপরে এখনও খোদিত‚  ‘John Smith, 28th Cavalry, 28th April, 1819’ |

স্মিথের আবিষ্কারের কথা ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ল | স্কটিশ সেনা আধিকারিক স্যর জেমস আলেকজান্ডার ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে গিয়েছিলেন অজন্তা | তিনি এই গুহাচিত্র নিয়ে লিখলেন | তা প্রকাশিত হল Transactions of the Royal Asiatic Society of Great Britain and Ireland’-এ ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে | ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে অজন্তায় গিয়েছিলেন প্রাচ্যবিদ জেমস প্রিন্সেপ | এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায় তাঁর লেখায় দেখা যায়‚ অজন্তার গুহা থেকে নির্বিবাদে খুবলে তুলে নেওয়া হচ্ছে ফ্রেস্কোর অংশ | স্থানীয়দের সামান্য পয়সা দিয়ে এই জঘন্য কাজ করাচ্ছে খোদ ব্রিটিশরাই |

স্বজাতীয়দের এই কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখ হয়েছিলেন জেমস ফার্গুসন | তিনি ভারত নিয়ে বহু লেখালেখি করেছিলেন | তিনিই প্রথম অজন্তা গুহার সঙ্গে বুদ্ধের সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন | তাঁর কথায়‚ এই গুহা চিত্রিত হয়েছে খ্রিস্ট পূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দ অবধি | অর্থাৎ দীর্ঘ আটশো বছর ধরে | তাঁর দরবারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মাদ্রাজ সেনাবাহিনীর মেজর রবার্ট গিল-কে দায়িত্ব দিল | অজন্তা গুহার ফ্রেস্কোর কপি করতে | 

সে যুগে এই কাজ ছিল রীতিমতো চ্যালেঞ্জ | কারণ গুহার ভিতরে অসহনীয় গরম | তার উপর বাঘের আস্তানা ছিল ওই গুহার চারপাশের এলাকা | পাশাপাশি ছিল ভীল উপজাতির মানুষ | তারা মোটেও পছন্দ করেনি তাদের এলাকায় বহিরাগত ব্রিটিশদের আনাগোনা | বহু বাধা পেরিয়ে মেজর গিল তাঁর কাজ শেষ করেছিলেন | ১৮৪৪ সাল থেকে শুরু করে কুড়ি বছর ধরে তিনি এঁকেছিলেন অজন্তার সব ফ্রেস্কো |  তা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ইংল্যান্ডে | দুর্ভাগ্যজনকভাবে‚ কুড়িটি ছবি অগ্নিকাণ্ডে নষ্ট হয়ে যায় | এরপরেও হতাশায় না ডুবে নতুন উদ্যমে ফিরে এসেছিলেন মেজর গিল | ১৮৬৬ সালে‚ এবার তাঁর হাতে ক্যামেরা | কিন্তু এবারও বিধিবাম | অজন্তায় কাজ শুরুর এক বছরের মধ্যে তিনি প্রয়াত হলেন |

ইতিমধ্যে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে তৈরি হল রয়্যাল কেভ টেম্পল কমিশন | অজন্তার গুহায় এত নজর পড়ায় খারাপ দিকও ছিল | তস্করের দল দেওয়াল থেকে ফ্রেস্কো উপড়ে বাইরে বেচে দিল | বিশ্বের বেশ কিছু নামী জাদুঘরে রয়েছে সেসব ফ্রেস্কো | যা নিলাম হয়েছে বহু দামে‚ নানা সময়ে | পাশাপাশি‚ গুহাচিত্র সংরক্ষণের কাজও চলছিল পুরোদমে | বিভিন্ন দফায় কাজ করেছেন বিভিন্নজন | কোথাও রং-তুলি‚ কোথাও ক্যামেরা‚ ধরে রাখা হয়েছে অপূর্ব এই শিল্পকলাকে |

এই কাজে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল হায়্দ্রাবাদের নিজাম পরিবারের | কারণ‚ তখন‚ ব্রিটিশ আমলে এই এলাকা ছিল নিজামদের এক্তিয়ারভুক্ত | এশিয়াটিক সোসাইটির তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল স্যর জন মার্শালের সাহায্যে ও নিজামের উদ্যোগে অজন্তা গুহার সব ফ্রেস্কোর ছবি তুলে রাখা হয় | সেইসঙ্গে ইতালি থেকে বিশেষজ্ঞ এনে আনুমানিক তিরিশ লক্ষ টাকা‚ সেই সময়ে ব্যয় করে অজন্তার গুহাচিত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল নিজাম পরিবার |

মেজর গিল গুহাচিত্রকে সোঁদা আবহাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে এর উপরে বার্নিশের প্রলেপ দিয়েছিলেন | এর ফলে মুছে গিয়েছিল বৌদ্ধ শ্রমণদের তুলির সূক্ষ্ম টান | ইতালীয় বিশেষজ্ঞরা নিষ্ঠা ও অক্লান্ত ধৈর্যের সঙ্গে ফ্রেস্কো অটুট রেখে মুছলেন বার্নিশের আস্তরন | ১৯২০ থেকে ১৯২২ অবধি যা করলেন তাঁরা‚ তাতে অজন্তার গুহাচিত্র আরও দুশো বছরের জন্য নতুন জীবন পেল | অজন্তা গুহা সংলগ্ন এলাকারও বহু উন্নতিসাধন হয়েছিল নিজাম পরিবারের হাতে |

অজন্তা গুহাচিত্র আবিষ্কার নিঃসন্দেহে ইতিহাসের মাইলফলক | এরপর বাতাসের বেগে অজন্তা ঢুকে পড়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে | ফ্রেস্কোর নারীমূর্তির মুদ্রা দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় বিশ্ব | বিখ্যাত রুশ ব্যালে নৃত্যশিল্পী অ্যানা প্যাভলোভা ভারতে এসে দেখেন গুহার দেওয়ালে ওই নৈসর্গিক চিত্র | পরে তিনি তা নিজের নৃত্যভঙ্গিমায় ফুটিয়ে তোলারও চেষ্টা করেছিলেন | 

অওরঙ্গাবাদ জেলায় পশ্চিমঘাট বা সহ্যাদ্রি পর্বতমালার গায়ে অজন্তা গ্রাম | সেখানেই বিস্ময়কর এই গুহা |কার বা কাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়েছিল‚ জানা যায় না | তবে দীর্ঘ আটশো বছর ধরে এই গুহা ছিল বৌদ্ধ ধর্ম চর্চার প্রাণকেন্দ্র | বিহার বা মঠ‚ চৈত্য‚ প্রার্থনাকক্ষ থেকে শুরু করে ভিক্ষুদের থাকার জায়গা | সবই ছিল গুহায় | যুগে যুগে সাজানো হয়েছিল ফ্রেস্কো ও ভাস্কর্যে | গবেষকরা বলেন‚ এই দুর্গম গুহাকন্দরে বৌদ্ধ ও হিন্দু দুই ধর্মের মানুষই আসতেন প্রার্থনা করতে | তবে সৃষ্টির মতো এই রহস্যময় স্থানের পরিত্যক্ত হওয়ার কারণও এখনও অজানা |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here