‘এটাতে কোনও অফার নেই?’

প্রতি বছর সরস্বতী পুজোর আগের দিন স্কুলের এক দঙ্গল আধ দামড়া ছেলেদের নিয়ে পুজোর বাজার করতে বেরোতেন আমাদের পিনাকী স্যার। ভৌতবিজ্ঞান পড়াতেন। অত্যন্ত খুঁতখুঁতে এক মানুষ। পড়ানোর ফাঁকে ফাঁক প্রায়ই বলতেন, ‘শুধু পড়লেই হবে না। যাচাই করে নিতে হবে’। বিদ্যাদেবীর পুজো স্পেশাল বাজারে দমদমের মুদি দোকানে তাঁর একটি প্রশ্ন আজও অক্ষয় অমর হয়ে আছে। ‘চিনিওলা, অ্যাই চিনিওলা, চিনি মিষ্টি হবে তো?’ চিনির মিষ্টত্ব বাদ দিলাম। মুদি দোকানিকে কি ভেবে যে তিনি চিনিওলা বলেছিলেন, তা নিয়ে পুরনো বন্ধুদের মধ্যে আজও হাসিমাখা তর্ক চলে।

এই যাচাইযাত্রার সঙ্গী হওয়া হওয়া কিন্তু বেশ মজাদার একটা ব্যাপার। যিনি বাজার করছেন, তাঁর মধ্যে যদি একটা জিতলাম জিতলাম ভাব না থাকে, তা হলে ব্যাগ ভর্তি মন খারাপ আসে বাড়িতে। কয়েকটা চিরন্তন প্রশ্ন উড়ে বেড়ায় প্রতিদিনের বাজারে। ভাই তোমার পেঁপেটা ভাল হবে তো, পটলটা কচি হবে তো, বাঁধাকপিটা টাইট হবে তো, লঙ্কায় ঝাল হবে তো, বেগুনে পোকা নেই তো—এই ধরনের প্রশ্নে আজ পর্যন্ত কোনও বিক্রেতাকে বলতে শুনিনি, একদম নেবেন না বাবু। ও খারাপ মাল। দমদম রোডে এক মাছবিক্রেতা আছেন। রসিক মানুষ। কাতলাটা ভাল হবে কি না প্রশ্ন করায় এক বার শুনতে হয়েছিল, ‘আমার ক্যারেকটার নিয়ে মনে কোনও প্রশ্ন থাকলে করুন। ঝড় তুলুন। কিন্তু আমার মাছের চরিত্র নিয়ে কোনও প্রশ্ন করবেন না। আমি নিতে পারব না।’ তেলাপিয়াগুলো কখন মরেছে জিজ্ঞাসিলে তাঁর বরাবরের উত্তর, ‘এখনও ডেথ সার্টিফিকেট পাইনি।’

ম্যানেজমেন্টের পাঠক্রমে একটা পেপার ছিল—কনজিউমার বিহেবিয়ার। এক জন মানুষের বায়িং ডিসিশন, মানে কোনও জিনিস ব্যাগবন্দি করার আগে তাঁর মনে কি কি চলে, আর হবু ক্রেতার এই মানসিক অবস্থাকে একটু বিজ্ঞানসম্মতভাবে ছকে ফেলে কি ভাবে লাভের মুখ দেখা যায়, তা নিয়ে অনেক থিয়োরি, গ্রাফ ছিল ওই পেপারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যতই ‘গভীরে যাও, গভীরে যাও’ গাওয়া হোক, কোনও ক্রেতার মনের আসল দোলাচলটা আঁচ করা দুরূহ। তা যে কতটা সত্যি, রিটেল চেনের সঙ্গে যুক্ত আছেন যাঁরা, তাঁরা হাড়ে হাড়ে টের পান।

যে কোনও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের যে কোনও কর্মীকে জিজ্ঞেস করুন, কর্মজীবনে কাস্টমারের থেকে কোন প্রশ্নটা সব থেকে বেশি শুনতে হয়েছে? গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, উত্তর পাবেন, ‘এটাতে কোনও অফার নেই?’ বহু মানুষ আছেন, যাঁরা পাড়ার মাকালী স্টোর্স বা বাবা লোকনাথ ভান্ডার ছেড়ে বাসভাড়া খরচা করে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে আসেন শুধুমাত্র অফারের লোভে। কোনও জিনিসে অফার না থাকলে তাঁরা সেটা ছুঁয়েও দেখেন না। দু’জন কাস্টমারের কথা বলি। প্রথম জন পঞ্চাশ পয়সার চারটি শ্যাম্পুর পাউচ উঠিয়ে দোকানের এক কর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ভাই চারটে নিলাম, কোনও অফার নেই?’ উত্তর পছন্দ না হওয়ায় আশাহত হয়েছিলেন। যথারীতি শ্যাম্পু নেননি। আর ওই কর্মীকে বলেছিলেন, ‘অফার নেই তো রেখেছ কেন?’ এ বারে দ্বিতীয় জন। ছুরি-কাঁচির সেকশানে গিয়ে ফল কাটার ছুরির ধার যাচাই করছিলেন ছুরিটা নিজের আঙুলে টিপে। বেকায়দায় লেগে আঙুলটা যায় কেটে। ব্যান্ড এইড কিনতে রাজি হচ্ছিলেন না কারণ তাতে কোনও অফার ছিল না। শেষে স্টোর থেকে বিনা পয়সায় তাঁকে দেওয়া হয়। দু’টাকা বাঁচিয়ে ফিডব্যাক লেখার খাতা চেয়ে নিয়ে দু’শ শব্দের রচনা লিখেছিলেন। তোষামদি।

ডেইজিকে দেখলে ডোনাল্ড ডাকের চোখের তারায় যে ঝিলমিল খেলে যেত, অফার থাকলে সেই খুশিই মেখে থাকে এমন বহু কাস্টমারের শরীরে। সামলাতে না পেরে অনেকে এতগুলো জিনিস দিয়ে ঝোলা ভর্তি করে ফেলেন যা আসলে তাঁদের দরকারই নেই। একবার এক কাস্টমার স্টোরে এসে জানতে পারলেন, অফার দিয়েছে পাউরুটিতে। যেমন তেমন অফার নয়, জব্বর অফার। একটা কিনলে একটা ফ্রি। পাউরুটিগুলোর এক্সপায়ারি ডেট ছিল সেদিনই। কিন্তু কে পরোয়া করে! অফারটা দেখেই পত্রপাঠ পাউরুটিগুলো বাস্কেটে ভরতে শুরু করে দিয়েছিলেন তিনি। তাকে বারোটা ছিল। সবকটাই বাস্কেটে ঢুকল। ওনার বেটার হাফ ক্ষেপে গিয়ে শুধোলেন, আরে কর কি? এত পাউরুটি খাবে কে? ভদ্রলোক ফুঁসে উঠে বলেছিলেন, অফার ছেড়ে দেব নাকি তাই বলে? বাচ্চাদের ন্যাপিতে ফর্টি পার্সেন্ট অফ দেখে এক সদ্য বিবাহিত দম্পতিকে আটচল্লিশটা ন্যাপির মেগা প্যাক কিনে ফেলতে দেখেছিলাম আগেভাগেই। বাজার করতে গিয়ে তাঁদেরকে আগেও দেখেছি স্টোরে। মুখ চেনা ছিল। বলেছিলাম, ভাল খবরটা জানালেন না তো! বউমণি লজ্জায় রাঙা হলেন। আর দাদা বললেন, না মানে..একদিন না একদিন তো হবেই। তখন যদি ন্যাপির অফারটা না থাকে!

বিশ্বাস করতে হয়তো কষ্ট হবে, কিন্তু ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে কিছু কিছু লোক আসেন সন্ধেবেলার স্ন্যাক্সটা ফোকটে সারতে, বিশেষ করে শনি রবিবার। উইকএন্ডগুলোতে সবচেয়ে বেশি মানুষ আসেন এসব স্টোরে। বিভিন্ন কোম্পানির প্রোমোটাররা ব্র্যান্ডের লোগো দেওয়া টিশার্ট পরে এটা ওটা খাওয়ান, বিশেষ করে বাজারে নতুন এসেছে এমন প্রোডাক্ট। অনেককে দেখেছি, এই প্রমোটারদের চারপাশে ঘুরঘুর করেন। বাড়িতে খেতে বসে কোনও খাবার ‘কি ভাল হয়েছে’ বললেই শুনতে পাওয়া যায়, ‘আরেকটু দিই?’ শপিং মলের প্রমোটারদের কিন্তু এমন বলতে বলার ট্রেনিং দেওয়া নেই। তবে লজ্জা, ঘৃণা, ভয়, তিন থাকতে নয়। এক ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ছে। প্রতি শনিবার রবিবার নিয়ম করে তিনি স্টোরে আসতেন। বিশাল স্টোর। একদিকে স্যাম্পলিং চলছে ফ্লেভার্ড চায়ের। অন্যদিকে চিকেন নাগেট। আবার আরেক দিকে নলেন গুড়ের আইসক্রিম। ওই ভদ্রলোক প্রথমে দুই স্কুপ আইসক্রিম খেলেন। বললেন, ওয়াও। তারপরে এক কাপ চা-একটা চিকেন নাগেটের বৃত্ত হল পাঁচ বার। বললেন, উমমম্। পাঁচটা নাগেটের সদগতি করে ষষ্ঠটি চাইতে এসেছিলেন। সোনামুখ করে লেডি প্রমোটারকে বলেছিলেন, ‘কি ভাল করেছ গো মামণি, আরেকটা দাও।’ প্রমোটার আর থাকতে না পেরে বলেছিল, ‘এবার একটা প্যাকেট নিয়ে বিল করুন। ফোকটে আর কত, স্যার?’ ভদ্রলোককে আর কোনও দিন ওই স্টোরে দেখা যায়নি।

রাস্তার পাশের বাজারের মতো প্রতিটা ঢ্যাড়শের পশ্চাদ্দেশ ফাটিয়ে ফাটিয়ে যাচাই করার সুযোগ তো ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে নেই। তবে এর ফলে যাচাইবিশারদদের উৎসাহের জোয়ারে ভাটা পড়েনি। কিছু মানুষ আছেন, মেট্রো স্টেশনে ক্রেতা সুরক্ষা আইনের বিজ্ঞাপন দেখে দেখে যাঁদের একটু বদহজম হয়ে গিয়েছে। এফএসএসএআই আর আইএসও—এই দুটো শব্দ রক্তে মিশেছে, তবে অবশ্যই ভুল ওষুধের মতো। এক জন লোক খুচরো ডিমের কাউন্টারে প্রবল হল্লা করেছিলেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, ডিমের গায়ে লাল ডট কেন দেওয়া নেই? লাল ডট না দেওয়া থাকলে লোকে কিভাবে বুঝবে এটা আমিষ না নিরামিষ? ভাবনার বিষয় বটে! এমন একজন লোকের সন্ধান পেয়েছিলাম, যিনি প্রতিটা জিনিস কিনে বিল করার আগে ওজন করিয়ে নিতেন। তা বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট হোক কিংবা ভারতবিখ্যাত ব্র্যান্ডের মাখনের প্যাকেট। বাহিরে যা আছে, তা যে অন্দরেও থাকবে—এই ‘গ্র্যান্টি’ কই? তাই যাচাই করে নিতে হয়।

ম্যানেজমেন্ট গুরু স্টিভ লিওনার্ডের একটা বিখ্যাত কথা আছে। রিটেল ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে এই কথা গুরুবচন, বেদবাক্য হিসাবে মানা হয়। কথাটা হল, এক নম্বর নিয়ম, কাস্টমার সব সময় ঠিক (কথা বলেন)। নিময় নম্বর দুই, কাস্টমার যদি ভুল কথাও বলেন, তা হলে এক নম্বর নিয়ম দেখুন। তাই তো ভিতরে চিড়বিড় করলেও ঠোঁটের কোণে হাসিটুকু ধরে রাখতে হয়। তবে বিরক্তিরও তো বাঁধ ভাঙে কখনও কখনও। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজ করা আমার এক বন্ধুর ছোট্ট অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করি। এক আজন্ম-খিটখিটে কাস্টমার এসেছেন দিন তিনেক আগে কেনা একটা স্যান্ডো গেঞ্জি নিয়ে। সেটা নাকি তাঁর ছোট হয়েছে। আমার বন্ধু বলে, ‘অন্তর্বাস তো বদল হয় না স্যার। এটা কোম্পানি পলিসির বিরুদ্ধে যায়।’ ভদ্রলোক প্রবল চেঁচামেচি করলেন। তারপরে বললেন, ‘দশ বছর ধরে এখান থেকে শপিং করছি। আর আসব না। আসবই না। আজকে আমার শেষ দিন।’

আমি বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তার পর? ক্ষমা চাইলি?’

ও বলেছিল, ‘তার পর আর কি? নিজেরই এক হাতের মুঠো দিয়ে অন্য হাতে মারলাম এক ঘুষি। বললাম, ইয়েসস্। রিয়েলিটি শোয়ে প্রশ্ন পারলে যেমনটা করে!’

একটু থেমে ফের বলল, ‘বুঝলি ভাই। লিওনার্ড সাহেব প্রথমে কষে গাঁট্টা মারলেন একটা। তারপর নিজেই হাত বুলিয়ে দিলেন মাথায়। ও দিকে ওই কাস্টমার তখনও গেঞ্জি ঘুরিয়ে চলেছেন। সৌরভের জার্সির মতো।’

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী
অম্লানকুসুমের জন্ম‚কর্ম‚ধর্ম সবই এই শহরে|বাংলা ছোটগল্পের পোকা|একেবারেই উচ্চাকাঙ্খী নয়‚অল্প লইয়া সুখী|

3 COMMENTS

  1. চরম সত্য। হাস্যকরও চরম।,,,, সভ্যতার আরেক সংকট।

  2. Apnar lekha pore valo laglo, ja likhechen ta akebare nirjola shotti. Lekhar moddhye je kautuk ache setao upobhog korlam. Share korlam apnar lekha amar facebook er timeline – e.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here