সংসদ কি সেলেব্রিটিদের আফটার রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান?

রাজনীতিতে তারকাদের আবির্ভাব গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের ইতিহাসে খুব একটা নতুন বিষয় নয় | এমনকী ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে একাধিক তারকা ব্যক্তিকে ভিত্তি করে জন্ম হয়েছিল বহু রাজনৈতিক দলের |

যেমন তামিলনাড়ুতে এম জি রামচন্দ্রণ-এর সেলুলয়েডে ক্যারিশমাকে ভর করে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল ডিএমকে | পরে অবশ্য এমে জে আর বেরিয়ে এসে নতুন দল তৈরি করেছিলেন, যা আজ এআইডিএমকে নামে পরিচিত | ডিএমকে-র বর্তমান প্রধান করুণানিধি-ও তামিল চলচ্চিত্র ও নাট্য জগতের এক খ্যাতনামা নাট্যকার ও চিত্রনাট্যকার | এম জে আর-এর তৈরি করা দলের রাশ এখন যাঁর হাতে সেই জয়ললিতাও তামিল চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন |

বলতে গেলে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ভারতের রাজনীতির ময়দানে সেলিব্রিটিদের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, সেই ট্রেন্ড আজও অব্যাহত | পশ্চিমবঙ্গেও বহুদিন ধরে রাজনীতির ময়দানে সংস্কৃতি, ক্রীড়া, চলচ্চিত্র জগতের ব্যক্তিত্বদের আনাগোনা | এঁদের মধ্যে অনেকে ভোটেও দাঁড়িয়েছেন | সদ্য সমাপ্ত ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনেও এবার রাজ্য থেকে রেকর্ড সংখ্যক তারকা প্রার্থী ভোটের ময়দানে নেমেছিলেন | তারকা প্রার্থী তালিকায় সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস | তারপরই আছে বিজেপি | বহরম পুর ও দার্জিলিং ছাড়া তৃণমূলের সব তারকা প্রার্থী ভোটে জয়ী হয়েছেন | বিজেপির তারকা প্রার্থী বাবুল সুপ্রিয় আসানসোল কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন | কিন্তু এই তারকা প্রার্থীরা সংসদীয় রাজনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠতে পারেন তা নিয়ে আগেও প্রশ্ন ছিল, এখনও আছে | বিশেষ করে এক সমীক্ষায় যে তথ্য মিলছে তাতে সংসদে যাওয়া তারকা প্রার্থীদের আলোর পিছনের অন্ধকারটাই বেরিয়ে এসেছে |

The Citizen’s Report on Governance and Development-এ তারকা প্রার্থীদের সংসদে উপস্থিতি, বিতর্কে অংশগ্রহণ, প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে প্রাইভেট বিল প্রস্তাবের ক্ষেত্রে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা কপালে চোখ তুলে দেওয়ার মতো | The Citizen’s Report on Governance and Development-এর সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে তারকা প্রার্থীদের অধিকাংশই সংসদীয় অধিবেশনে অংশ নেন না | সংসদ হয়ে গোবিন্দা অনুপস্থিতির হারে তো রেকর্ড করেছিলেন, অভিনেতা ধর্মেন্দ্রও সংসদে প্রতিনিধিত্বকালে মাত্র ১.৫% সময় উপস্থিত ছিলেন | এমনকী কোনও দিন একটা প্রশ্নও করেননি | অভিনেতা বিনোদ খান্না এবারের লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হলেও দেখা যাচ্ছে মাত্র ৪টি প্রশ্ন করেছিলেন তিনি এবং উপস্থিতির হার মাত্র ৫.৫% | বাংলার দুই তারকা সাংসদ তাপস পাল এবং শতাব্দী রায়-এর উপস্থিতির হার যথাক্রমে ৭২% ও ৭৫% হলেও দুজনের কেউই কোনও প্রশ্ন করেননি | দুজনেই মাত্র ৬টি করে বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন |

এবার লোকসভায় তৃণমূলের তারকা সাংসদদের তালিকায় আছেন তাপস পাল, শতাব্দী রায়, দেব, সন্ধ্যা রায়, মুনমুন সেন, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্পিতা ঘোষ, সুগত বসু| এছাড়াও বিজেপির পক্ষ থেকে আছেন বাবুল সুপ্রিয় | তাপস-কে মাঝেমধ্যে সিনেমার পর্দায় দেখা গেলেও শতাব্দীকে সেভাবে আর সিনেমায় দেখতে পাওয়া যায় না | সন্ধ্যা রায় তো বিনোদন জগত থেকে কার্যত অবসর জীবনযাপন করছেন | বাবুল সুপ্রিয়-র প্লেব্যাক সিঙ্গিং কেরিয়ারে ভাটার টান | দেবের সামনে একাধিক সিনেমা | দেখতে গেলে এইসব ব্যক্তিদের কারওরই রাজনীতি প্রথম পেশা নয় | সুতরাং সংসদ অধিবেশনে হাজিরার ক্ষেত্রে তাঁরা কতটা সময় বের করতে পারবেন তা নিয়ে যথেষ্টই সন্দেহ আছে |

তার মধ্যে সন্ধ্যা রায় দীর্ঘদিন ধরে বয়সজনিত রোগে ভুগছেন | রাজনৈতিক পরিবারের ছেলে হলেও বিদেশে অধ্যাপনা করে সুগত বসু | সেইসঙ্গে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেন্টর গ্রুপের চেয়ারম্যান তিনি | একজন সংসদ শুধু লোকসভা অধিবেশনে হাজির থাকলেই হয় না, তাঁকে নিজ কেন্দ্রে জনসংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও করতে হয় | এছাড়াও তাঁকে এম পি ল্যাডের টাকা খরচের ব্যাপারে নজর রাখতে হয় |

Representation, Response and Responsibility এই তিনটি শব্দ একজন সংসদের কাছে বেদবাক্য | সুতরাং দেব, সুগত, তাপস পাল, সন্ধ্যা রায়দের মতো ব্যক্তিরা কীভাবে তাঁদের সংসদীয় দায়দায়িত্ব পূরণ করবেন? অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাই জানেন না সংসদ এবং বিধানসভার কাজ কী | তাঁরা শুধুমাত্র ভোটে জেতেন কিন্তু অঙ্কের ভিত্তিতে | অঙ্কের ভিত্তিতে নির্বাচনে জেতা এমন নেতা নয়, আমাদের দরকার এমন নেতা যাঁরা প্রকৃত অর্থেই রাজনীতিবিদ | অনুপস্থিতির বহরে থাকা সংসদ অধিবেশন একটাই কথা প্রমাণ করে যে আমাদের দেশে সত্যিকারে রাজনীতিবিদের অভাব আছে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here