ঋষিতুল্য দাদার মহিমা-মেঘে ঢাকা তারা হয়েই রয়ে গেলেন এই বিস্মৃত বিপ্লবী

একটি সন্তান চলে গিয়েছিল ভূমিষ্ঠ হওয়ার কদিন পরেই | বাকি তিন ছেলে‚ এক মেয়েকে এক এক করে নিয়ে গেছেন স্বামী | বিলিতি আদবকায়দায় বড় করা হচ্ছে তাদের | কাছে আছে কেবল কোলপোঁছা ছোট ছেলেটি | অনেকদিন ধরে তাকেও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন চিকিৎসক স্বামী | মরিয়া হয়ে তাঁকে রুখেছেন স্বর্ণলতা দেবী | তিনি নাকি হিস্টিরিয়া রোগী | তাঁর মতো মায়ের কাছে সন্তান বড় হতে পারে নাকি !

সন্তান বড় করতে পারবেন না | অথচ জন্ম দিতে পারবেন‚ সে বিষয়ে স্ত্রীর উপর ভরসা রেখেছিলেন চিকিৎসক কৃষ্ণধন ঘোষ | বিদেশফেরত ডিস্ট্রিক্ট সার্জেন তিনি | ব্রিটিশদের বিশেষ ঘনিষ্ঠ | ব্রাহ্মনেতা ও সমাজ সংস্কারক ঋষি রাজনারায়ণ বসুর গুণগ্রাহী ছিলেন | তাঁকে অভিভাবক হিসেবে পাওয়ার জন্য বাড়ির অমতে বিয়ে করেছিলেন রাজনারায়ণের ছোট মেয়ে স্বর্ণলতাকে |

বিয়ের কয়েক বছর পর থেকে কৃষ্ণধনের মনে হতে লাগল এমন হিস্টিরিয়াগ্রস্ত স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করা যায় না | এ কথা সত্যি জন্মসূত্রে স্বর্ণলতার বংশগত অসুখ হিস্টিরিয়া | তার প্রভাবে স্বর্ণলতা মাঝে মাঝে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেন | আবার যখন কাঁদতেন তখন মেঝেতে আছড়ে পড়ে চিৎকার করতেন | অথচ তিনিই স্বামীর মনের মতো করে গড়েছিলেন নিজেকে | স্বামী‚ সন্তান‚ কোলের শিশুকে নিয়ে পেরিয়েছিলেন কালাপানি | ইংরেজিতে কথা বলতেন | শাড়ির পাশাপশি সে যুগে পরেছিলেন পাশ্চাত্যের পোশাক‚ বিলিতি গাউন | সময়ের থেকে এগিয়ে থাকলেও তাঁর আধুনিকতা মেনে নিতে পারেনি বিদেশিনীদের সঙ্গে স্বামীর বন্ধুত্ব |

বড় তিন ছেলে বিনয়ভূষণ‚ মনমোহন এবং অরবিন্দ সবাই পড়ছেন বিদেশে | মেয়ে সরোজিনী এবং ছেলে বারীন্দ্রকে নিয়ে স্বর্ণলতা থাকতেন দেওঘরে এক ভাড়া করা বাগানবাড়িতে | ন মাসে ছ মাসে হয়তো আসতেন কৃষ্ণধন | বাবাকে কেমন দেখতে সেই ধারণা বহুদিন অবধি ছিল না দু ভাইবোন সরোজিনী এবং বারীন্দ্রকুমারের | 

তার বেশ কয়েক বছর আগেও এতটা আশাহত হননি কৃষ্ণধন | জাহাজে চেপেছিলেন ইংল্যান্ডের উদ্দেশে | সঙ্গে তিন ছেলে‚ কোলের শিশু মেয়ে সরোজিনী এবং অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী | লন্ডনের কাছে ক্রয়ডনে ভূমিষ্ঠ হল কৃষ্ণধন-স্বর্ণলতার ছোট ছেলে | বার্থ রেজিস্টারে নাম লেখা হল এমানুয়েল ম্যাথিউ ঘোষ | এর পাশাপাশি চিকিৎসাও চলেছিল স্বর্ণলতার | কিন্তু হিস্টিরিয়ামুক্ত হতে পারেননি | 

দেশে ফিরে কৃষ্ণধন এক রকম আলাদাই রেখেছিলেন স্ত্রী ও দুই সন্তানকে | ফলস্বরূপ দুই ভাইবোন স্কুলের পথ থেকে দূরেই থাকল | দশ বছর বয়স পর্যন্ত অক্ষরজ্ঞান হল না দুজনের | দিন কাটছিল বাগানে খেলা করে | 

কিছুটা ছলের আশ্রয় নিয়েই একে একে ছেলে ও মেয়েকে স্ত্রীর কাছ থেকে নিয়ে এলেন কৃষ্ণধন | মেয়ে সরোজিনীকে পাঠালেন খুলনা | ছেলে বারীন্দ্রকে ভর্তি করলেন দেওঘরের স্কুলে | কিন্তু বারীন্দ্র থাকতেন সদ্য ভারতে আসা এক ব্রিটিশ পরিবারে | ১৯০১ সালে এন্ট্রান্স উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন পাটনা কলেজে | 

তখন দেশ জুড়ে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি | স্বাধীনতা আন্দোলনের আঁচে তেতেপুড়ে রয়েছে ভারতবর্ষ | উত্তাপের স্পর্শ সবথেকে বেশি নিঃসন্দেহে বাংলায় | ইতিমধ্যেই এই ওমে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন বারীন্দ্রর সেজদাদা অরবিন্দ | আজীবন পাশ্চাত্য ঘরানায় বড় হয়ে তিনি ততদিনে উপলব্ধি করেছেন নিজের জন্মভূমিকেই চিনতে পারেননি | বাবার স্বপ্নের বিরুদ্ধে গিয়ে সিভিল সার্ভিসকে বঞ্চিত করে ততদিনে তিনি বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ | একই পথে হাঁটলেন ভাই বারীন্দ্রকুমারও | কৃষ্ণধনের স্বপ্নের কাছাকাছি গিয়েছিলেন মেজো ছেলে মনমোহন | ইংরেজি সাহিত্যে সুপণ্ডিত ও কবি মনমোহন অধ্যাপনা করেছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে |

সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে ভাই বারীন্দ্রকুমার তখন কলকাতায় জোট বেঁধেছেন বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখার্জি বা বাঘা যতীনের সঙ্গে | প্রকাশিত হল যুগান্তর পত্রিকা | অনুশীলন সমিতির অতি ঘনিষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে শুরু হল আর এক সংগঠন‚ যুগান্তর | বাংলা তথা সারা দেশে চরমপন্থী আন্দোলনের অন্যতম কাণ্ডারী ছিলেন অরবিন্দ-অনুজ |

১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী | এতে যেন ব্রিটিশদের মৌচাকে ঢিল পড়ল | শুরু হল চিরুণি তল্লাশি ও ধরপাকড় | বিপ্লবের ঘাঁটি ধরে উপড়ে ফেলতে চাইল ব্রিটিশ সরকার | আলিপুর বোমা মামলা বা মুরারিপুকুর ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হল অনুশীলন সমিতির প্রথম সারির নেতাদের | তাঁদের মধ্যে ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ‚ বারীন্দ্রকুমার ঘোষ-সহ অনুশীলন সমিতির ৩৭ জন মুখ |

রাজসাক্ষী নরেন গোসাঁইকে হত্যা করলেন কানাইলাল দত্ত এবং সত্যেন্দ্রনাথ বোস | এর ফলে অরবিন্দর বিরুদ্ধে অভিযোগ ধোপে টিকল না | তিনি মুক্তি পেলেন | কিন্তু বারীন ঘোষ ও অন্য নেতাদের কঠোর শাস্তি পেতে হল | 

বারীন ঘোষকে প্রথমে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় ‚ তারপর তা হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে আন্দামানে যাবজ্জীবন দীপান্তর | পরে কমে যায় শাস্তির মেয়াদ | ১৯০৯ সাল থেকে ১৯২০ সাল অবধি তিনি বন্দি ছিলেন সেলুলার জেল-এ | মুক্তির পর কলকাতায় ফিরে সাংবাদিকতা শুরু করলেন | কিন্তু মন বসল না | অস্থির মনকে শান্ত করতে আবার সেজদার কাছে | তখন আর তিনি বিপ্লবী নন | পণ্ডিচেরীতে ঋষি অরবিন্দ | অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য বারীন্দ্রকুমার গেলেন সেখানেই | কিন্তু দাদার মতো আধ্যাত্মিকতায় মুক্তি খুঁজে পেলেন না ভাই | আবার ফিরলেন কলকাতায় | 

১৯২৯ সালে নতুন করে শুরু লেখালেখি | চার বছর পরে প্রকাশ করলেন ইংরেজি পত্রিকা‚ ‘The Dawn of India’ | যুক্ত ছিলেন The Statesman পত্রিকার সঙ্গেও | ১৯৫০ সালে বাংলা সংবাদপত্র দৈনিক বসুমতীর সম্পাদনার দায়িত্ব নেন | ১৯৫৯ সালের ১৮ এপ্রিল প্রয়াত হন ৭৯ বছর বয়সে | 

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ঋষি হতে চাননি | আজীবন তাঁর মধ্যে বেঁচেছিল বিদ্রোহী বিপ্লবী সত্তা | তাই কি তাঁর অবদান আজ বিস্মৃত ? দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর অবদান কি যথার্থ মূল্য পেয়েছে ? ঋষিতুল্য দাদার মহিমা-মেঘে ঢাকা তারা হয়েই রয়ে গেলেন বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ | 

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.