চুমুতে কাঁচি, নগ্নতায় কাপড়

কথায় বলে, ‘ঘোমটার আড়ালে খ্যামটা নাচ’ — তা সে নাচ যেমনই হোক, মাঝে পর্দার আড়ালের প্রয়োজন হচ্ছে কেন ? এই রাখো-রাখো ঢাকো-ঢাকো গেল-গেল, রবটাই কি আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ? পর্দানসীন-প্রথা এখনও ঘুচল না। আর অন্যদিকে লজ্জা ও নারী-মর্যাদাকে ঠিক কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয় , তা আমরা আজও পারলাম জানতে, না পারলাম সামলাতে।

শুধুমাত্র অবিবেচকের মতো সেন্সরের ছুরি-কাঁচি আর কাপড় হাতে দৌড়াদৌড়ি করে মরছি । ভাবছি এতেই নারীর মর্যাদা রক্ষা হবে। অথচ দেশে যে প্রতি ১৩ মিনিটে একটি ধর্ষণের রিপোর্ট জমা পড়ে (NCRB তথ্য অনুযায়ী) সে দিকে কোনও মন নেই। সিনেমা দেখে কেউ ধর্ষন করেছে এমন নজির পাওয়া কঠিন ।

সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সর্বত্র একটা বিষয় নিয়ে সর্বদা নাড়াঘাঁটা হচ্ছে – পৃথিবী ছোট হয়ে গেছে বলে । আয়তনে সংকোচন নয় সারা পৃথিবীর মধ্যে আক্ষরিক অর্থেই ব্যবধান কমেছে । তাতে অনেক সুবিধে হয়েছে, কিছু অসুবিধেও । 

পিনুর কথাই ধরা যাক। পিনু , এখন কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে বাংলায় এম.এ করছে । পড়া-প্রেম-আড্ডা ছাপিয়ে যে সময়টা পড়ে থেকে সেই সময় পিনু সিনেমা দেখে । হলিউড , ইটালি , পোল্যান্ড , হল্যান্ড , ফ্রান্স , ইরানি ইত্যাদি ছবি দেখে । যতো রাজ্যের খোলামেলা সিনেমা দেখতে পারে । মা-বাবা , আত্মীয়-স্বজন , সেন্সরবোর্ড সকলকে কাঁচকলা দেখিয়ে মোবাইল , ল্যাপটপে পিনু যথেচ্ছ আনসেন্সর্ড ছবি দেখে । ইচ্ছে হলে ব্লু-ফিল্মও দেখে যখন-তখন। তবে দুপুরবেলা সে পাশের বাড়ির বৌদির সিকি খোলা বুক উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখে না ।

ভারতীয় সেন্সরবোর্ড আমাদের প্রকৃত অর্থে সিকি খোলা বুক , কোমরের খাঁজ , হাঁটুর ওপর কাপড় এটুকুই দেখতে শেখাচ্ছে । ‘‌রুচি গেল’‌, ‘‌শিল্প-বোধ গেল’‌— বলে বাবা-মায়েরা আন্দোলন করল সিনেমা হলের বাইরে, অথচ ছেলেমেয়েরা হাতের তালুতে মোবাইল রেখে দেখে ফেলছে সত্য মিথ্যের কতই না নগ্নতা। মুক্ত ইন্টারনেটে কী আটকাবে ? কে আটকাবে ?‌ পৃথিবীর সীমারেখা সেন্সর করবে কে ?

বরং ভাল জিনিসটা আসুক না । শরীর যে আসলে শিল্প, মনের মতোই তারও সুখ দুঃখ আছে, আকাঙ্খা ও তৃপ্তি আছে, সেও হাসে, কাঁদে সেও—সেটাও দেখে জানি না। সব থেকে ভাল পারে সিনেমা। নতুন প্রজন্ম ফারাকটাকে নিজেই বুঝতে শিখে নেবে। কোন শরীর প্রদর্শন কুৎসিত, কুরুচির কোনটাই বা প্রয়োজন, আবেগ-তাড়িত শিল্প । সিনেমা পাঠ্যপুস্তক নয়, নীতি শিক্ষাও দেয় না। জীবনের কথা বলে, সমাজের কথা বলে। কীভাবে বলতে হবে সে–ই জানে। আজ গোটা দুনিয়ার চলচ্চিত্র জগত জেনেছে,  চুমু, নগ্নতায় কাঁচি চালানো অর্থহীন | যত কাঁচি চলবে নতুন প্রজন্ম ইউটিউব, নেটফ্লিক্সে শুধুই বিদেশী ছবি বেশি দেখবে । তত ওয়েব-সিরিজের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠবে । মোদ্দা কথা উন্মুক্ত-মনের ছবি বেশি দেখবে । দেশীয় ছবির সীমাবদ্ধতার মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ করতে যাবে কেন ?   

হাতের মুঠোয় ইন্টারনেট আসার ঠিক আগে পর্যন্তও ফিল্ম-ফেস্টিভ্যালে এক শ্রেণীর মানুষ যেতেন শুধুমাত্র আনসেন্সর্ড ছবি দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মনস্কামনায় ।

যৌনতার আড় তো ভেঙেছে বহুদিন আগেই । বিশ্ব-সিনেমা-ভাণ্ডার থেকে ৭০-এর দশকের কিছু-কিছু শিল্পের ওম মনে পড়ে যায় ।

বার্তোলুচির ‘লাস্ট ট্যাঙ্গো ইন প্যারিস’-এ (১৯৭২) প্রেমিক ও প্রেমিকা পরস্পরের সম্পূর্ণ   অপরিচিত । এমনকি নামও জানে না । তাই নগ্ন শরীরই ছিল তাদের প্রেমের একমাত্র ভাষা ।

পাওলো পাসোলিনির ‘ওয়ান-টোয়েন্টি-ডেয়েজ অফ সোডম’ (১৯৭৫) ও (১৯৭৮) ফারনান্দো ডি লিও-র ‘টু বি টোয়েন্টি’ চলচ্চিত্রে নিরন্তর নগ্নতার পরম দৃষ্টান্ত ।

শৈল্পিক ভাষার মাধুর্যে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’- এ সকালবেলায় বাসি বিছানায় অপুর হাতে বউয়ের খোঁপার কাঁটা কিন্তু আদপে সঙ্গমের কথাই ইঙ্গিত করে । 

এই শতাব্দীর সিনেমায় নগ্নতা ‘রুম ইন রোম’ (২০১০) ও ‘ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার’ (২০১৩) । দুই নারী পরস্পরকে অতিরিক্ত চেনে, ভালবাসে, সেই কারণে নগ্ন শরীর ছিল তাদের প্রেমের অনিবার্য ভাষা । ‘ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার’ — এই শতাব্দীর বেদনা-বিধুর নগ্নতা ।

বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছনো এক কিশোরের যৌন চেতনা বিকাশের ইটালিয়ান ছবি ‘মলেনা’ (২০০০) । সেখানে ফ্রন্ট-নুডিটির দৃশ্যটি সাবলীন ভাবে যদি না থাকত তাহলে কোথাও গিয়ে ওই ছেলেটির কল্পনার জগৎটিই অধরা থেকে যেত ।  

আমাদের দেশের নীতিবাগিশদের কথা শুনলে তো পৃথিবী বিখ্যাত বহু ছবিকে পর্নোগ্রাফির আওতায় ফেলতে হয় । হায় রে !‌

তবে কি সেন্সর বোর্ড থাকবে না ?‌ অবশ্যই থাকবে । সেন্সরসিপের রক্তচুক্ষু যেন থাকে দেশ-বিরোধী বিষয়ের বিরুদ্ধে, কোনও জাতি-গোষ্ঠীকে আঘাত আনার বিরুদ্ধে , শিশুর উপর অত্যাচার বা নৃশংসতা বিপক্ষে । রোম্যান্টিকতা বা শরীরী-প্রেমের বিরুদ্ধে নয় ।

চুমু এবং নগ্নতায় কাঁচি মানে নর-নারীর সম্পর্কেও কাঁচি । সম্পর্কের আধ-খানা চালচ্চিত্রে অনেক সময়েই মূল বিষয়টা অর্থহীন হয়ে যায় । যা আমাদের মনকে দোঁ-আশলা, আধখেঁচড়া অন্তরসারশূন্য অনুভূতিতে ভরিয়ে দেয় ।

সিনেমাতে গল্পের প্রয়োজনে নায়ক-নায়িকা নগ্ন হয়ে থাকে তো আলবৎ থাকবে । সেন্সরবোর্ড সেখানে দর্শককের রুচি বা পছন্দের উপর বাটপাড়ি করতে যাচ্ছে কেন ? দর্শককে আটকে দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসা থেকে পিছপা হয়ে লাভ হচ্ছে কতটুকু ? যেখানে হাতে-হাতে যে কোনও সময়ে পর্নোগ্রাফি দেখার সুযোগ রয়েছে সেখানে এই গার্জেনগিরি হাস্যকর। আজকের যুগে ঠুলি-পরা দর্শকের অস্তত্বি নিয়েও সত্যি মনে প্রশ্ন ওঠে । আর তাছাড়া টেলিভিশনের কনটেন্ট কিন্তু সেন্সর নামক ছাঁকনির মধ্যে দিয়ে না গিয়েই ঘরে-ঘরে সন্ধে-প্রদীপের মতো জ্বলজ্বল করছে ।

এখনও অনেক চলচ্চিত্র পরিচালক বা শিল্পীরা আছেন যাঁরা সেন্সরশিপের রোষানলের কথা মাথায় রেখে দৃশ্যাবলী নির্মাণ করেন বা তাঁর শিল্প সৃষ্টি করেন ভারতীয় দর্শকের জন্য । শ্লীল ও অশ্লীলের তকমা খুব সহজেই লাগানো যায় । এক সময় কল্লোল যুগের কবিরা যৌনতাকে নিপুণভাবে সাহিত্যে স্থান দিতে গিয়েই চরম হেনস্থার মুখে পড়েছিলেন । তাঁদের প্রতিবাদের নতুন পংক্তি , নতুন ভাষা সমাজে রক্ষণশীলতা ও যৌনতা নিয়ে ছুঁৎমার্গের গণ্ডিকে কিছুটা হলেও নড়বড়ে করে দিতে সক্ষম হয়েছিল । কল্লোল যুগের কবিরা ছাড়া যাঁরা সাহিত্য-সভ্যতা ও কৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তাঁদেরকেও অশ্লীলতার অভিযোগকে সহ্য করতে হয়েছিল ।

‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসে ব্রজেশ্বর তার স্ত্রীকে চুম্বন করেছে — সেখানেও  নীতিপুলিশদের গা জ্বলে গেছে । কাজী নজরুল ইসলামের ‘মাধবী প্রলাপ’ কবিতাটির আদিরসকে বিষমবস্তুর নজরে দেখা হয়েছিল । অশ্লীলতার তালিকায় রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’-ও ছিল । এ-কথা ভাবতেও অবাক লাগে অশ্লীলতার দায়ে কবি জীবনানন্দ দাশকে অনেক আক্রমন সহ্য করতে হয়েছে। তাঁর ‘অবসরের গান’ কবিতাটিতে স্তনের ফোঁটা থেকে শিশিরের জল পড়ার মতো সূক্ষ্ম অনুভূতিকে নস্যাৎ করে কর্তৃপক্ষ রুষ্ট হয়েছিলেন ।

অন্নদাশঙ্কর রায় একবার এই প্রসঙ্গে বেশ খোলতাই করে বলেছিলেন , “personal immorality-তে মানুষের আর আস্থা নেই , race immorality-ই একমাত্র আশা । এবং এই সম্মিলিত অমরত্বের পথ হচ্ছে যৌনতা । সুতরাং যৌনতাকে আবার তার সমস্ত সম্মান দিতে হবে । একে যদি বিকারের লক্ষণ মনে করা যায় , তবে ভুল করা হবে । আসলে এটা হচ্ছে প্রকৃতির পুনরাবিষ্কার । মানুষের গভীরতম প্রকৃতি বহু শত বছরের কৃত্রিমতার তলায় তলিয়ে গিয়েছিলেন । এতদিনে পুনরাবিষ্কারের দিন এল ।”

মনের আদান-প্রদান হবে অথচ ছোঁয়াছুঁয়ি নেই এ কেমন কথা ? সেন্সরশিপের রক্তচক্ষু ও এক শ্রেণীর ভারতীয় দর্শকদের নাক-সিটকানোকে তোয়াক্কা না করে বা কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই আমাদের ‘‌বড়’‌ হওয়ার প্রয়োজন আছে । তবেই যৌনতা উত্তীর্ন হতে পারবে মহৎ শিল্পে । 

সুদেষ্ণা গোস্বামী
কখনও লেন্সে বা কখনও কলমে – তবুও জীবনকে কতোটুকু ধরা যায় ? এই প্রশ্নই তাড়া করে ফেরে । ক্যামেরার হাতেখড়ি স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের সিনেম্যাটোগ্রাফার সৌম্যেন্দু রায়ের থেকে । আর বাদবাকি জীবন-বোধ পেয়েছে গৌতম ঘোষের সঙ্গে খুব ছোট-বয়স থেকে কাজ করে চলার সুবাদেই । মিশনারি কনভেন্ট স্কুলে পড়াশুনা । প্রাণীবিদ্যায় স্নাতক । তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় । ২০১৫ থেকে নিয়মিত মূলধারার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ, গল্প, প্রতিবেদনে আত্মপ্রকাশ । স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র নির্মাণ ও সিনেম্যাটোগ্রাফির সঙ্গে-সঙ্গে সিরিয়াসলি লেখালেখি – অনেকটা অন্ধকারে যেন এক মুঠো আলো । অনেকটা ম্যাজিক রিয়ালিজমের মতো ।

5 COMMENTS

  1. UffffUffff, I couldn’t have expressed the same in better words. The maturity of the content and the selection of phrases and expression are commendable. ????Kudos to you Sudeshna Goswami, for this brave and time-apt write up. And #Grow_up or #Get_out_of_the_way Sensor Board. High time. ?

  2. চমৎকার লিখেছো সুদেষ্ণা। সেন্সরের কাটাকুটির কথার মাধ্যমে সুন্দর করে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, আমাদের কুদৃষ্টির স্বরূপ তুলে ধরলে। আসলে সমাজের মাতব্বরেরা এখনো একজন গরীব মহিলার জীর্ণ জামার ফাঁকে যৌনতা খোঁজে, ক্ষুধার্ত শিশুকে স্তন্যপান করানো অশ্লীলতার তকমা দেয়। তুমি তাদের কাছে পর্দার নগ্নতা সম্পর্কে শিথিল হওয়ার আশা করো না। যেদিন মানুষ মায়ের সন্মান বাঁচানোর বদলে ধর্ষক ও প্রশাসনের পারস্পরিক বোঝাপড়া আর গরু মায়ের সন্মানে প্রশাসনের সামনে মানুষ খুন বন্ধ হবে সেদিন হয়তো আলো ফুটবে। আশাকরি সেদিন আসবে খুব শীঘ্রই। আরো ধার হোক কলমে তোমার।

  3. Khub sundor tomar pratibad.amra sabai choto janis niye pore thaki.Eta bojha r jonnnoo je monta ke bisal akaser moto bisal korte hobe.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here