উল্লাস ! খ্রিস্টের জন্মের তিন হাজার বছর আগেও মেসোপটেমিয়ায় পাওয়া যেত বিয়ার

237

বিয়ার প্রায় মানবজাতির ইতিহাসের মতোই পুরনো। হাজার হাজার বছর ধরে বিয়ার তার নিজস্ব জনপ্রিয়তাকে ধরে রেখেছে। অনেক এলাকায় এই পানীয় স্থানীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ২৪ জানুয়ারি ছিল ‘বিয়ার ক্যান অ্যাপ্রিসিয়েশন ডে’। এই উপলক্ষে‌ আমেরিকার বেশ কিছু জায়গায় ছুটিও থাকে। আমরা কম বেশি অনেকেই বিয়ার পছন্দ করি। কিন্তু কীভাবে এর উদয় হল বলুন তো!

মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন সুমেরীয় অঞ্চলে পাওয়া কীলকাকার ফলকগুলো থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সেখানে খ্রিস্টের জন্মের তিন হাজার বছর আগেও বিয়ার পাওয়া যেত। এছাড়া সেই একই সময়কালে এই পানীয় মিশরীয়দের টেবিলেও পরিবেশন করা হত। একই সময়ে ব্যবিলনে পাওয়া যেত ১৯ রকমের বিয়ার। প্রাচীন মিশরে, বিয়ারের প্রস্তুতকরণ বা চোলাইকরণ ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল আর বিয়ার ছিল সেখানের এক অতি প্রিয় পানীয়। সেখানে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক দ্রব্যগুলির মধ্যে বিয়ার প্রস্তুত করার সবচেয়ে পুরনো লিখিত প্রস্তুত প্রণালীও পাওয়া গিয়েছিল।

বিয়ার প্রস্তুতকরণের প্রযুক্তিবিদ্যা শেষ অবধি ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়েছিল। কয়েকজন রোমান ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছিলেন যে, কেল্ট, জার্মান ও অন্যান্য উপজাতি বিয়ার পছন্দ করত। বিয়ার প্রথমে পরিবেশন হত শুধুই বোতল ও গ্লাসে। বোতল ছাড়া অন্য কিছুতে বিয়ার পরিবেশনের ক্ষেত্রে সামাজিক কিছু বিধিনিষেধও ছিল। ফলে অন্য কোনও উপায়ে বিয়ার দেওয়ার কথা কেউ ভাবেওনি। ১৯২০ সাল নাগাদ কিছু সংস্থা বিয়ারের প্যাকেজিং নিয়ে অন্যরকম কিছু উপায় ভাবতে শুরু করে। নিউ জার্সির গটফ্রায়েড ক্রুয়েগার ব্রিউইং কোম্পানি প্রথম দু’হাজার ক্যান বানায়। বিয়ারভর্তি এই ক্যান ছিল ৩৫০ গ্রাম ওজনের। তাতে থাকত ৩.২ শতাংশ অ্যালকোহল। সেই সময় বিয়ারের ক্যান ছিল ফেরতযোগ্য। এর ফলে ব্যবহারকারী কিছু টাকাও পেত। আর বিয়ার তৈরির সংস্থাগুলি সেই ক্যান পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে ফের ছাড়ত বাজারে।

ফরাসি রসায়নবিদ ও জীবাণুবিজ্ঞানী লুই পাস্তুর আবিষ্কার করেছিলেন যে, ইস্ট জীবিত জীবাণুর সমন্বয়ে গঠিত ছিল। এই জীবিত জীবাণুই বিয়ারকে গ্যাঁজাতে সাহায্য করে। এই আবিষ্কারের ফলে চিনিকে আ্যলকোহলে রূপান্তর করা আরও সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব করেছিল। ডেনমার্কের উদ্ভিদবিজ্ঞানী ইমিল ক্রিসটিয়েন হ্যানসেন চোলাইকরণের ইতিহাসে সর্বমহান ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হয়ে উঠেছিলেন। তিনি জীবনভর বিভিন্ন প্রজাতির ইস্ট নিয়ে গবেষণা ও শ্রেণীবিন্যাস করেছিলেন। হ্যানসেন আক্ষরিকভাবে প্রস্তুতকরণের ইতিহাসে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন।

সবচেয়ে বিখ্যাত বিয়ারগুলোর মধ্যে একটা হল পিল্সনার (বা পিলস্‌), এক ঐতিহ্যগত হালকা রঙের বিয়ার। এই ধরনের বিয়ার সারা পৃথিবীতে বহু জায়গায় উৎপাদিত হয়। কিন্তু, খাঁটি পিল্সনার কেবলমাত্র চেক প্রজাতন্ত্রে অবস্থিত প্লিজেন বা পিলজেন শহরে প্রস্তুত করা হয়। এটা উৎপাদনের গুপ্ত বিষয়টা শুধুমাত্র প্রযুক্তিবিদ্যায় নয় কিন্তু ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপরও নির্ভর করে—মৃদু জল, উচ্চমানসম্পন্ন মণ্ড এবং চোলাই করার জন্য সঠিক ধরনের ইস্ট।

আরেকটা চমৎকার ধরনের বিয়ার হচ্ছে গম থেকে প্রস্তুত করা ভাইস বিয়ার, যা বিশেষভাবে জার্মানিতে জনপ্রিয়। ব্রিটেনে বিশিষ্ট বিয়ার হচ্ছে পোর্টার এবং স্টাউট। পোর্টার হচ্ছে কড়া, ঊর্ধ্ব গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি বিয়ার, যেটা ঝলসানো মণ্ড থেকে তৈরি হয় আর তা এই পানীয়কে এক গাঢ়, কড়া রং এনে দেয়। পোর্টার বিয়ার প্রথমে অষ্টাদশ শতাব্দীতে লন্ডনে প্রস্তুত করা হত। স্টাউট গিনিস যা আয়ারল্যান্ড সহ গোটা বিশ্বে বিখ্যাত হয়েছিল, যা ঐতিহ্যগত পোর্টার বিয়ার থেকে আলাদা। কেন্টাকি ফলস সিটি ব্রিউইং কোম্পানি-র স্টে ট্যাব ক্যানই বর্তমানে ব্যবহার করা হয়। এই ক্যান সবদিক থেকেই নিরাপদ, এমনটাই বলছেন বিয়ারপ্রেমীরাও। বোতলের চেয়ে ক্যানের বিয়ারই সারা বিশ্বজুড়ে বেশি বিক্রি হয়।

বিয়ার হল এমন এক পানীয় যেটার নানা প্রকার রয়েছে। পরিমিত মাত্রায় পান করলে আপনি স্বাস্থ্যের কিছু উপকার পাবেন। বস্তুত, এতে বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে যেমন রিবোফ্লেভিন, ফলিক আ্যসিড, ক্রোমিয়াম এবং জিঙ্ক। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিমিত মাত্রায় বিয়ার পান করলে হৃদরোগ ও ত্বকের সমস্যা দূর করতে পারে। যে-ব্র্যান্ড ও প্রকারের বিয়ারগুলো পাওয়া যায়, সেখান থেকে আপনি যদি ভালটা বাছাই করেন আর ভারসাম্য বজায় রেখে গ্রহণ করেন, তা হলে আপনি হয়তো এই সতেজতাদায়ক পানীয় উপভোগ করতে পারবেন। তাই, পরের বার আপনি যখন ফেনিয়ে ওঠা বুদ্‌বুদে এই সোনালী পানীয়র গ্লাসের সামনে বসবেন, তখন এর  ইতিহাস অবশ্যই আপনার মনে পড়বে।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.