ও ডাক্তার! আজ হাসপাতাল বন্ধ !

doctors on strike West Bengal

গতকাল সন্ধেবেলা টিভির পর্দায় মুখগুলো দেখছিলাম আপনাদের। আপনারা মানে এন আর এস হাসপাতালের ইন্টার্ন আর জুনিয়র ডাক্তাররা। ভিড় করে সার বেঁধে নীরবে বসে আছেন এন আর এস হাসপাতাল চত্বরে। ঘামে ভেজা আর রোদে পুড়ে কালচে হয়ে যাওয়া ক্লান্ত, অবসন্ন, একইসঙ্গে ত্রাসগ্রস্থ এবং প্রতিবাদে অবিচল। হাতে হাতে চটজলদি লিখে ফেলা প্রতিবাদী শ্লোগানের প্ল্যাকার্ড আর পোস্টার। দেখে খুব কষ্ট লাগছিল, জানেন। বেশিরভাগই তো আমাদের মত মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়ে সব।

নিজেদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব দুচারজনের সন্তানসন্ততিদের এই পেশায় আসতে দেখেছি ফলে অল্পবিস্তর ধারণা আছে যে একজন চিকিৎসক হয়ে উঠতে গেলে কি পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়। কতটা কঠিন এই পেশাতে প্রবেশের চাবিকাঠি জয়েন্ট এন্ট্রান্স নামক প্রবেশিকা পরীক্ষা। কতখানি অধ্যবসায় লাগে এই দুর্গম প্রবেশিকা বাধা টপকাতে গেলে। আপনাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে কত আশা আর স্বপ্ন আপনাদের বাবা-মা, অবিভাবকদের। সে স্বপ্ন চারিয়ে গেছে, ছড়িয়ে গেছে আপনাদের চোখেও। ব্রাইট কেরিয়ার আর সমাজে দশজনের একজন হয়ে ওঠার একাগ্র আকাঙ্খা ! তবু সে সবকিছুকে এক লহমায়, এক ঝটকায় পিছনে ফেলে হাতে প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ড নিয়ে এই মুহূর্তে আপনারা হাসপাতাল চত্বরে। কারণটা খুব চেনা। সহপাঠীর প্রতি সহমর্মিতা ! যখন আপনাদেরই এক সহপাঠী আক্রান্ত হয়েছেন একদল সমাজবিরোধীর হাতে।

‘পেশেন্ট পার্টি’ নামক সেইসব সঙ্ঘবদ্ধ লুম্পেনদের ছোঁড়া ইঁটে মাথার খুলিতে মারাত্মক আঘাত পেয়ে বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে। অবস্থা গুরুতর – বলছেন সেখানকার চিকিৎসকরাই। ফলে খোলা চত্বরে অথবা উন্মুক্ত রাজপথে না নেমে আর উপায়ই বা কি ছিলো আপনাদের। ঘটনাটি ঘটার কিছুক্ষনের মধ্যেই আপনাদের এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন এই শহর এবং জেলার অন্যান্য সরকারি হাসপাতালগুলির জুনিয়র ডাক্তার এবং ইন্টার্ন ছাত্রছাত্রীরা। আপনাদের এই সমবেত লড়াইকে সমর্থন জানিয়েছেন সিনিয়র ডাক্তাররাও। এ সবকিছুই খুব ইতিবাচক দিক এই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের পক্ষে। শুধু ব্যক্তিগতভাবে এই প্পতিবেদকের খটকা লেগেছে একটি জায়গায় – আন্দোলনকারীদের কারো কারো হাতে অথবা হাসপাতালের গেটে ঝোলনো একটি প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা – ‘আজ হাসপাতাল বন্ধ !’ এখানেই আশঙ্কা ! শিড়দাঁড়া বেয়ে নেমে যাওয়া চাপা আশঙ্কার একটা চোরাস্রোত ! এই ‘আজ’-টা কাল, পরশু, তরশু বা আরো বেশি হয়ে যাবে না তো ?

কোনও কোনও হাসপাতালে তো আউটডোরের সঙ্গে এমারজেন্সি পরিষেবাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, দেখলাম টিভিতে কোন কোন চ্যানেলে। চিকিৎসা তো দুরস্থান মৃত রোগীদের ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু না হওয়ায় মৃতদেহ পর্যন্ত সৎকারের জন্য নিয়ে যেতে পারছেন না মৃতের বাড়ীর লোকজন। সুদূর মালদহ, মগরা অথবা মছলন্দপুর থেকে চিকিৎসা করাতে এসে ফ্যালফ্যালে হতাশ চোখে হাসপাতাল চত্বর আর ফুটপাতে বসে রয়েছেন ক্যান্সারে আক্রান্ত গৃহবধূ। রক্তের জটিল রোগে ভোগা শিশুর মা। অসহায়, একই সঙ্গে চূড়ান্তরকম বিভ্রান্ত সবাই, কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না কেউই। এমতবস্থায় আপনারা মানে ইন্টার্ন আর জুনিয়র ডাক্তাররা বলতেই পারেন – কই, এরকম আন্দোলন তো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসেই আকছার দেখা যায়। তা নিয়ে তো কারো সবিশেষ হেলদোল দেখা যায় না। তাহলে আমাদের বেলাতেই যত গেল গেল রব কেন? সেইসব আন্দোলনের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি আপনাদের এই পেশা অথবা বিশেষ ধরণের শিক্ষাপদ্ধতিটা যাকে ইংরিজীতে বলে গিয়ে – আবসলিউটলি ডিফারেন্ট ! মোর নোবল দ্যান মেনি আদার প্রফেশনস ! মেটিয়াবুরুজ বা কার্গিলে গুলি খেয়ে মরতে হচ্ছে তাই – ‘আমাদের নিরাপত্তা নেই !’ বলে যেমন সমগ্র পুলিশ অথবা ভারতীয় সেনাবাহিনী ধর্মঘটে চলে যেতে পারে না। ঠিক সেভাবেই আপনারা মানে ডাক্তারবাবুরা কোন শর্তেই সুদূর মালদহ থেকে এসে ফুটপাতে বসে থাকা ক্যান্সার আক্রান্ত ওই গৃহবধূ বা রক্তের জটিল রোগে ভোগা মছলন্দপুর নিবাসী ওই শিশুটির চিকিৎসা পাওয়ার দবিকে কয়েকটা লুম্পেনের জানোয়ারসুলভ কৃতকর্মের জন্য অস্বীকার করতে পারেন না । আপনাদের সহপাঠীর চরম দুর্ভাগ্যজনক এবং মর্মান্তিক পরিণতির পরও না।

একটা কথা মনে রাখা দরকার আমাদের এই দেশে অধিকাংশ সাধারণ মানুষেরই বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে ব্যায়বহুল চিকিৎসা করাবার ক্ষমতা নেই। হতভাগ্য দরিদ্র ওই গৃহবধূ বা ওই শিশুটির মত এরকম কোটি কোটি মানুষই সরকারি হাসপাতালের মানে আপনাদের মত ডাক্তারবাবুদের পেশেন্ট। আপনাদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন চলুক। লড়াই তীব্র থেকে তীব্রতর হোক। সঙ্গে চলুক এইসব হতদরিদ্র দিন আনা দিন খাওয়া প্রান্তিক মানুষজনের চিকিৎসাও ! কারণ আপনারা দূরে ঠেলে দিলে আক্ষরিক অর্থেই ওদের আর কোথাও যাবার যায়গা নেই।

* এই লেখা যখন শেষ করছি তখন অবস্থা আরো গুরুতর আকার ধারণ করেছে। একাধিক টি ভি চ্যানেলের তথ্য অনুযায়ী এন আর এসে তিনজন রোগী বলতে গেলে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। দুপুরের দিকে একদল বহিরাগত লাঠি, বাঁশ, হকিস্টিক নিয়ে আক্রমণ চালিয়েছে আন্দোলনরত ডাক্তারদের ওপর। প্রতিবাদে হাস্পাতালের গেট বন্ধ করে দিয়েছেন ডাক্তাররা। উচ্চপদস্থদ পুলিশ আধিকারিকদেরও ভিতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। একাধিক সরকারি হাসপাতালে সিনিয়র ডক্টররা তাঁদের জুনিয়রদের এই আন্দোলনকে শুধু সমর্থনই করেননি, গণ-ইস্তফা দিতে শুরু করেছেন পদ থেকে। ইস্তফার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিয়েছেন আরো অনেকে। ধর্মঘটে সামিল হয়েছেন নার্সরাও। অন্যদিকে প্রশাসনের সর্বচ্চ স্তর থেকে সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে চার ঘণ্টার মধ্যে ধর্মঘট তুলে নিয়ে কাজে যোগ দিতে। তাতে কাজ হবে কি ? কারণ সময় অতিক্রান্ত অনেকক্ষণ। ডাক্তাররা তাদের অবস্থানে অনড়। তাদের দাবি অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ৪ / ৫টা লোক দেখানো গ্রেফতার নয়, সব দোষীদের পাকড়াও করে উচিৎ শাস্তি দিতে হবে। ডাক্তারদের ওপর লুম্পেনবাহিনীর আক্রমণের সময় যে সব পুলিশকর্মী নিষ্ক্রিয় ছিলেন তাদের বিরুদ্ধেও যথাযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হবে। হাসপাতাল চত্বরে ডাক্তারদের যথাযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের মতে আগে বহুবার প্রশাসনের তরফ থেকে স্তোকবাক্য দেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছু হয় নি। এবার কাজ করে দেখাতে হবে। সেটা হলে চার ঘন্টা নয়, চার মিনিটের মধ্যে ধর্মঘট উঠে যাবে। এই প্রতিবেদকের মতে ডাক্তারদের দাবিগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার। অহেতুক বলপ্রয়োগের রাস্তায় গেলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা।

এমনিতেই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যথেষ্ট প্রতিকূল এবং সঙ্কটপূর্ণ। কোন অশুভ এবং স্বার্থান্বেষী শক্তি এর সুযোগ নিয়ে নিতে পারে। আশা করা যায় ডাক্তার এবং প্রশাসন দুপক্ষেরই শুভবুদ্ধির উদয় হবে। অর্থপূর্ণ সমাধান একটা কিছু বেরোবে বলেই বিশ্বাস। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার দাবি মেনে ডাক্তাররাও কাজে যোগ দেবেন অনতিবিলম্বে। প্রশাসনও কালক্ষেপ না করে তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো সমাধানে সচেষ্ট হবে। এই আশাটুকু ছাড়া আর কিই বা করা যেতে পারে এই মুহূর্তে। ভালো থাকুন সবাই। ভালো থাকুক বাংলা !

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.