শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব শুরুর আগেই ধর্মীয় মোড়ক থেকে বেরিয়ে সর্বজনীন উৎসব ছিল দোলযাত্রা

191

“ বৈকাল হইয়াছে । ঠাকুর পঞ্চবটীতে গিয়াছেন । মাস্টারকে বিনোদের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছেন । বিনোদ মাস্টারের স্কুলে পড়িতেন ।…এইবার ঠাকুর মাস্টারের সহিত কথা কহিতে কহিতে ঘরে ফিরিতেছেন । বকুলতলার ঘাটের কাছে আসিয়া বলিলেন—‘আচ্ছা, এই যে কেউ অবতার বলছে, তোমার কি বোধ হয় ?’…শ্রীরামকৃষ্ণ—তুমি কি বল?…মাষ্টার—আজ্ঞা, আমারও তাই মনে হয়। যেমন চৈতন্যদেব ছিলেন ।…শ্রীরামকৃষ্ণ—পূর্ণ, না অংশ, না কলা ?—ওজন বল না ?…মাষ্টার—আজ্ঞা, ওজন বুঝতে পারছি না । তলবে তাঁর শক্তি অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি ত আছেনই।…শ্রীরামকৃষ্ণ—হাঁ, চৈতন্যদেব শক্তি চেয়েছিলেন।…ঠাকুর কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন। পরেই বলিতেছেন—কিন্তু ষড়ভুজ ?…মাস্টার ভাবিতেছেন, চৈতন্যদেব ষড়ভূত হয়েছিলেন—ভক্তেরা দেখিয়াছিলেন । ঠাকুর একথা উল্লেখ কেন করিলেন ? ”

‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’-এর দ্বিতীয় ভাগে লিখছেন শ্রীম । সে এক দোলযাত্রার গুহ্যকথা । তবে দক্ষিণেশ্বরের ‘ঠাকুরের’ দোলপূর্ণিমা কিন্তু এমন যেত না । তিনি দোলের দিন সকাল থেকেই বেশ খুশি খুশি থাকতেন । আনন্দে কাটাতেন । শুধুমাত্র যে ফাগের ছোঁয়ায় মেতে উঠতেন তাই নয়, তিনি স্মরণ করতেন শ্রীচৈতন্যদেবকে । এখানে যেমন চৈতন্য প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি তাঁকে নিয়ে গভীর আলোচনায় যেতে চাইছেন । দোলপূর্ণিমা যে চৈতন্যের আবির্ভাব দিবস ।

কথামৃতে আছে পরমহংসের হোলি সেলিব্রেশন প্রসঙ্গ । ১৮৮৫ সালের পয়লা মার্চ । দক্ষিণেশ্বরে নিজের ঘরে ভক্তদের সঙ্গে কথা বলছেন শ্রীরামকৃষ্ণ । সেদিন কৃষ্ণের লীলা প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখছিলেন ‘ঠাকুর’। হঠাৎ উঠে তিনি গিয়ে রামমাধবের বিগ্রহে আবির দিয়ে এলেন। এরপর গেলেন ভবতারিণীর পায়ে আবির দিতে। বিভিন্ন পটচিত্রে এরপর আবির দিলেন। ফিরে এসে ভক্তদের রাঙিয়ে দিলেন ফাগের রঙে। সেদিন নরেন্দ্রনাথকে আবির দিয়ে পরমহংস বলেছিলেন, ‘বাবা কামিনী কাঞ্চন ত্যাগ না করলে কিছু হবে না।’

নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণের সেই কথা শুনেছিলেন । পরবর্তী সময়ে পদে পদে তা অনুসরণ করে গিয়েছেন। সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী হয়েছেন। সনাতন ধর্মের ভাবনায় এক অন্য দর্শন সামনে এসেছেন। বৈরাগ্যের বিবর্তন ঘটেছে তো তাঁরই হাতে। সে যাই হোক, বেলুড়মঠ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ফি বছর সেখানে দোলপূর্ণিমার উৎসবের আয়োজন হয়ে আসছে । ভক্তদের সঙ্গে দোলের আনন্দে মেতে ওঠেন সন্ন্যাসীরা । দোলের আগের দিন হয় ম্যাড়াপোড়া (ন্যাড়াপোড়া নয়)। আর দোলের দিন ভক্তদের আবির রঙে রাঙিয়ে দেন সন্ন্যাসীরা । সে এক অভিনব আয়োজন। ধনী-গরিব, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ, বড়-ছোট—এসবের কোনও বালাই নেই। দোল পূর্ণিমা মানে শুধু ফাগের রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার নয়, বেলুড় মঠের দোলযাত্রায় পালন করা হয় শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব তিথিও।

অনেকেই মনে করেন, দোলযাত্রাকে সাংস্কৃতির মেলবন্ধনের উৎসবে পৌঁছে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ । হ্যাঁ, সে ভাবনায় কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না । তবে তার অনেক আগেই দোল ধর্মীয় ভাবনার মোড়ক থেকে বেরিয়ে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছিল। সাবেক ভারতের কোণায় কোণায় দোল উৎসবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে সামিল হওয়ার তাগিদ ছিল মানুষের মধ্যে, তার থেকে বাদ ছিল না শহর
কলকাতা। সে কলকাতার দোলের বর্ণণা দিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্রনাথ
দত্ত—

‘ আগে কলিকাতার দোলটা খুব জাঁকিয়ে হ’ত । লোকে কথায় বলিত হিন্দুর বাটী, দোল-দুর্গোৎসব করতে হয় । দোল-দুর্গোৎসবে শাক্ত বৈষ্ণব ছিল না । সামর্থ্য অনুযায়ী উভয় দলই করিত । তখনকার দিনে দোলে রাত্রে খাওয়া-দাওয়া ছিল, বেশ নিমন্ত্রণ করে খাওয়ান। দোকেল তত্ত্ব করারও প্রথা ছিল—চিনির মুড়কি, চিনির মঠ, ফুটকড়াই, কিছু আবির ও কুমকুম এই ছিল তত্ত্বের অঙ্গ। দোলের দিনে আমোদ ছিল কোঁচড়ে চিনি মাখান ফুটকড়াই খাওয়া আর হাতে গায়ে আবির মেখে বেড়ান। এখন
ফুটকড়াই, মুড়কি খাওয়ার প্রচলন নেই, মঠ তো প্রায় উঠে গেল। নিমন্ত্রণ বাড়িতে রঙ খেলা চলে দিনের বেলায়, এখন ম্যাজেন্ডার গুলে খেলে। তখনকার দিনে ম্যাজেন্ডার ছিল না, আমরা আবির গুলে খেলতাম। আর কুমকুম—শোলার নুটির ভিতর আবির পুরে মুখে মারিতাম । আগেকার দিনে চাঁচর ও মেড়াপোড়া হ’ত । আমরা বলতাম ন্যাড়াপোড়া । বাঁশের গায়ে খড়ের ঘর মত করে মেড়া রেখে পোড়াত। পুজো-পাঠ ঠিক আছে, তবে আমোদ এখন কমে গেছে…’

মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা থেকে তখনকার কলকাতার দোলের একটি আন্দাজ পাওয়া যায়। সে সময়ের দোলের কথা লিখে গিয়েছেন ভগিনী নিবেদিতাও। তিনি লিখছেন—‘ ফাল্গুন পূর্ণিমার সুন্দর রাতে—যখন অশোক আর আম গাছে ফুল ফোটে, যখন নীল আকাশের নিচে বাদাম পাতার দীর্ঘ, পাতলা কুঁড়ি দেখা দেয়, পাতাবিহীন ডালে পলাশের লাল ফুল ফুটে ওঠে,—তখন আসে প্রাক হিন্দু কোনো প্রাচীন জাতির হোলি উৎসব বা দোল যাত্রা ।…হিন্দুধর্ম শিশুদের খেলার আনন্দকে গ্রহণ করেছে, নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছে, কিন্তু কখনো সমালোচনা বা অবজ্ঞা করেনি । নিম্ন বর্ণের লোকেরা ঋতু সংক্রান্ত প্রাচীন রীতি বজায় রেখেছে। মদন-উৎসবের বিশেষ দুটি মূল উপাদান রয়েছে। একটি হল স্ত্রী-পুরুষের স্বাধীন মেলামেশা, তার সঙ্গে হয়তো একটু অমার্জিত রঙ্গরস থাকে, ইউরোপের প্রাচীন সেন্ট ভ্যালেন্টিন উৎসবের মত ; অন্যটা হল পরবর্তী যুগের উচ্চতর সভ্যতার সামাজিক পার্থক্যকে অবজ্ঞা করে সব শ্রেণীকে একত্র মিলি করা । আজো নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের হোলিপূজা অনুষ্ঠানে এই দুটি বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে। পরিণতবয়স্ক হিন্দু ভদ্রলোকেরা বলেন, ছোটবেলায় তাঁদের মায়েরা মাথা নিচু করে হিন্দুস্থানী ভৃত্যদের হাতে আবীরের তিলক পরতেন ।’

এ ধরনের প্রথাকে সঙ্গে করে আজও বেঁচে আছে প্রাণের রঙের উৎসব । ফাগে ছোঁয়ায় শুভেচ্ছা বিনিময়ে এ শহরের প্রাণের দোলউৎসব ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.