রুমাল

274

খুব সুন্দর একটা ভোর হচ্ছে | হাতে কফির কাপ নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রথমেই নদীর এ কথাটা মনে হল | যে পাখিগুলো ডাকছে তাদের মধ্যে দু-একটা ছাড়া কোনও পাখির ডাককেই নদী আলাদা করে চিনতে পারে না | যদি না তারা সামনে এসে ডাকে, কেমন করে চিনবে সে? কটা পাখিই বা মানুষের সামনে এসে যেচে ডাক শুনিয়ে যায়? অপরাহ্ণ কি এখনো ঘুমোচ্ছে? ওর ভোরেও কি পাখি ডাকছে না? ফোন করে জিজ্ঞেস করলে অপরাহ্ণ কী বলবে? নদী জানে, অপরাহ্ণ বলতে পারবে কোন কোন পাখি ডাকছে; অপরাহ্ণ এমনই | আর কেউ যা বলতে পারে না, যা করতে পারে না অপরাহ্ণ তা বলতে পারে, তা করতে পারে | অপরাহ্ণ তাকে সব পাখি, সব ডাক চিনিয়ে দেবে |

কাল রাতে মাকে বলা হয়নি কথাটা | কফিতে একটা চুমুক দিয়ে ভাবল নদী | আকাশে এখন গোলাপি রং খেলতে শুরু করেছে | পাখির ডানায় সকাল আসছে | মার যে নিজের জানার খুব ইচ্ছে ছিল এমনটা নয় | বেশি প্রয়োজন ছিল নদীর বাবার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া | বাবা বড্ড বেশি জোর করছে | ভীষণ তাড়া মারছে | কিন্তু এ বাবাকে নদী যেন চেনে না | কেমন যেন দিন দিন পাল্টে যাচ্ছে | বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এই বাবাই মাকে কী অদ্ভুত ভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল | কতবার শুনেছে নদী রুমকির মুখে |

বাবা | কীভাবে নদীর সঙ্গে বাবার দূরত্বটা বেড়ে গেল নদী বুঝতে পারে না | অপরাহ্ণ এসেই কি দূরত্বটা বাড়িয়ে দিলো? অথচ যখন ছোট ছিল নদী, তখন বাবা তার একমাত্র পুরুষ বন্ধু ছিল | স্কুলের বাকি ছেলেরা কোনোদিনই নদীর ধারে কাছে ঘেঁষতে পারেনি | নদীর কোনোদিন মনেই হয়নি তাদের বন্ধু ভাবা যায় | পুরুষ বন্ধু | আর বাবা ছিল তার একমাত্র পুরুষ | আজকাল কি অপরাহ্ণ সেই জায়গাটা নিয়েছে? মাঝে মধ্যে মনে হয় বাবা যদি ওরকম দূরে চলে না যেত অপরাহ্ণ কি কোনোদিন নদীর জীবনে আসতে পারত? কে জানে, হয়তো পারত না | কিন্তু নদী বাবাকে অপরাহ্ণের কথাটা বলতেই পারছে না | বাবা বুঝবে না | মা হয়তো বুঝবে | ইদানীং মায়ের সঙ্গে নদীর একটা সখ্যতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে | কে যে কার কাছে এগিয়ে এসেছে বুঝতে পারে না নদী |

ভোর অনেকখানি সকাল হয়ে গেছে | কাপের কফি অনেকক্ষণ শেষ | মা কি ঘুম থেকে উঠে পড়েছে? উঠে পড়লে ঠিক নদীর খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে বারান্দায় পৌঁছে যেত | এই সাততলার বারান্দাটাকে নদী বলে ঘাটলা | মনে মনে | সারাদিন রাত ঘুরে ঘুরে বয়ে বয়ে এইখানে এসে আকাশের সঙ্গে তার মিতালি স্থাপিত হয় | আর ঝাঁকড়া কদম গাছটার মাথার সঙ্গে | যখন প্রথম এই ফ্ল্যাটে আসে নদীরা, কদম গাছটা ছিল খুব ছোটো | মাত্র দেড় ফুট | নদী স্কুল থেকে ফেরার সময় বোতলে বাঁচিয়ে রাখা শেষ জলটুকু গাছের গোড়ায় ঢেলে বলত, বড় হও, গাছ হয়ে ওঠো | সেই কদম বড় হতে হতেও নদীর সাততলা ছুঁতে পারেনি | নদী কিন্তু খুব চেয়েছিল | তবু নদী অপেক্ষা করে একদিন এই গাছ তার সাততলা ছুঁতে পারবেই | আর যেদিন ছুঁতে পারবে, সেদিন নদী এই কদম গাছের নাম দেবে অপরাহ্ণ | এখন নদী আর গাছটাকে জল খাওয়ায় না | অনেক দূর ওর শিকড় চারিয়ে গেছে | নদী জানে, শিকড় অনেক দূর চারিয়ে গেলে কিছুতেই বাইরে থেকে তাকে আর খাবার খাওয়ানো যায় না | বৃথা হয় সে খাওয়ানো | বাবারও কি শিকড় আছে? আর মায়ের? মায়ের আছে | আর সেটা অনেক দূর এখনো চারিয়ে যায়নি | তাই না মা এখনো অভিমান করে বাবার ওপর | কখনো বা তার ওপর | নদী এখন তার বোতলের শেষ জলটুকু অন্য কাউকে দেয় |

নদী পেছন ফিরল | তার অফিস আছে | আজ ছুটির দিন নয় | আর ছুটি নিতে চায়ও না নদী | বেশি ছুটি নিলে তার টাকা নষ্ট হবে | তার সংসার চলবে না | অপরাহ্ণের সঙ্গে | তার অপরাহ্ণ | মনে মনে একটা বিষণ্ণ হাসি হাসল নদী |

রুমকি চুপ করে তাকিয়ে দেখল নদী বারান্দা থেকে আস্তে আস্তে রান্না ঘরে গেল | কাপটা ধুয়ে রাখল | তারপর অনাবশ্যক ফ্রিজটা খুলল | নদীর কোনো প্রয়োজন নেই, রুমকি জানে | গত কদিন ধরেই রুমকি দেখছে নদী খুব অন্যমনষ্ক আর একটু যেন এলোমেলো | বিশেষ করে মৃদুল যেদিন প্রথম সম্মন্ধটার কথা রাতে খাবার টেবিলে তুলেছিল | রুমকি বুঝতে পরছে না | নদীর কি কোনও ছেলে বন্ধু-টন্ধু আছে? থাকলে বললেই তো পারে | না বলুক, রুমকি ভাবল, নিজেই একবার তুলবে প্রসঙ্গটা | এভাবে তো চলতে পারে না | নদীর এখন সাতাশ শেষ করে আঠাশ হতে চলল | এবার তো বিয়ে করে সংসারী হতে হবে | আর কতদিন? এরপর দেরি হলে তো সব দিক দিয়ে মুশকিল | যাই হোক এখন এসব নিয়ে ভাবতে বসলে রুমকির চলবে না | এখনকার কর্তব্যগুলো তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে হবে | নিজের, মৃদুলের আরা নদীর — তিনজনের খাবার তাকে তৈরি করতে হবে | প্রথমে নদী বেরোবে আটটা দশে | তারপর নিজে বেরোবে নটা কুড়িতে, শেষে মৃদুল বেরোবে পৌনে দশটা | নদীর সেক্টর ফাইভ, নিজের ব্যারাকপুর আর মৃদুলের পাইকপাড়া | তিনজনের তিন জায়গায় অফিস | সবচেয়ে আগে বাড়ি ফেরে রুমকি | ঠিক পৌনে ছটার মধ্যে | সংসারের তাগিদ তারই সবচেয়ে বেশি | মৃদুল সাতটা বাজিয়ে দেয়, আর নদী? কোনও ঠিক নেই | কখন বয়ে বয়ে ফিরবে | রুমকি মাঝে মধ্যে ভাবে নদী নামের সঙ্গে মেয়েটার ভাবনা, মন, চলা কেমন এক হয়ে গেছে | অথচ নামটা দেওয়ার সময় অত কিছু কি ভেবেছিল রুমকি? ভেবেছিল ফুটফুটে একটা মেয়ে হবে; হাসবে, নাচবে, পড়বে, খেলবে; এক সময়ে সুপাত্রে বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হবে | কোথায় কী? নদী আজকাল দিন দিন অবোধ্য হয়ে উঠছে |

এখন ঘড়িতে ছটা পঞ্চাশ | কাল রাতেও মৃদুলের সঙ্গে নদীর বিয়ে নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছে রুমকির | মৃদুলের এখন মাত্র সাতান্ন | ওর ইচ্ছা, অবসর গ্রহণের আগে নদীকে সুপাত্রে দান করে যাওয়াটা বাবা হিসেবে তার কর্তব্য | কোত্থেকে একটা পাত্র খুঁজে পেয়েছে | নিউজিল্যান্ড না অস্ট্রেলিয়া কোথায় থাকে | আমেরিকা নয়, ইউরোপ নয়, সেই কোথায় কোন অজানা অচেনা দেশে | ছেলে ডাক্তার | ছেলের জন্ম, ছোটোবেলা, পড়াশুনা সব দিল্লিতে | ডাক্তারি পাসও দিল্লি থেকে | তারপর কেন যে মরতে ও দেশে গেল! রুমকি ভেবে পায় না মৃদুল কী চায়! একটা মাত্র মেয়ে, কোথায় তাকে ঘরের কাছে বিয়ে দেবে, তা নয়… | আরও কী, নদীর কোনও প্রেমিক-ট্রেমিক আছে কিনা সে ব্যাপারে কোনও আগ্রহই নেই মৃদুলের | অদ্ভুত! মৃদুল এরকম সেকেলে ছিল না | রুমকি একবার বলেছিল, ‘নদীকে ভাল করে জিজ্ঞেস করে নিলে হত না | তুমি না পারো..; আমিই না হয়…’ | মৃদুল তাতে কী বলল? বলল, ‘সেরকম হলে নদী নিজেই তো বলবে সে কথা | বাবা হয়ে আমি জিজ্ঞেস করতে পারব না | সেই ভাল | তুমি মা, ওটা তোমারই কর্তব্য |’ আশ্চর্য! মানুষকে কি এভাবে বুড়ো হতে হয়? মৃদুল যেভাবে হচ্ছে, রুমকির রীতিমতো ভয় করছে আজকাল | নদী চলে গেলে সে এই বুড়োকে নিয়ে একা থাকবে কী করে? মনে মনে বলল, ‘তখনি বলেছিলাম, আর একটা বাচ্চা নিই, প্লিজ আর একটাই | শুনলই না আমার কথা | এখন আমারই মরণ | তোমার আর কী? রিটায়ারমেন্টের পর কী করো দেখব |’ এইসব কথা ভাবতে ভাবতে রুমকি ফ্রিজ থেকে বার করে রাখা খাবারগুলো মাইক্রো-তে ঢোকাবার বদলে আবার ফ্রিজেই ঢুকিয়ে দিল | মৃদুল যে খেয়াল করছে রুমকিকে সেটা রুমকি বোঝেনি | দরজা খুলে খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে দরজা বন্ধ করতে করতে মৃদুল বলল, ‘ও কী? খাবারগুলো আবার ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিচ্ছো কেন? নতুন করে রান্না করবে নাকি? তোমার আজ অফিস নেই? ছুটি নিয়েছ?’ বলতে বলতে বসার ঘরের দিকে চলে গেল মৃদুল | আড়চোখে দেখে নিল রুমকি আবার ফ্রিজ খুলে খাবারগুলো বার করতে করতে বলছে, ‘আমারই যত মরণ! তোমাদের আর কী! যত দায়িত্ব আমার একার | চলে যাব | সব ছেড়ে চলে যাব |’ এই চলে যাবার কথা রুমকি আগাগোড়া বলে আসছে বলে মৃদুল আজকাল আর রিঅ্যাক্ট করে না | প্রথম প্রথম যখন শুনত, বিব্রত হত, আহত হত, রুমকির মন মজাতে কখনও সখনও ফুলও কিনে আনত | এখন মনে হয় কানে শুনতেই পায় না | তাই এমনও হয়, মৃদুলের গায়ে প্রায় ধাক্কা দিয়ে রুমকি কোনও কোনও সময়ে বলেও ফেলে, ‘শুনতে পেলে, আমি চলে যাব!’ মৃদুল নিস্পৃহ হয়ে বলে, ‘এখন সরো, কাজ করতে দাও | যেতেই যদি হয়, কোথায় যাবে বোলো, টিকিট কেটে দেব | অনেকবারই তো বলেছি | সরো |’

রুমকি রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতে চিৎকার করল, ‘নদী |’ নদী নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে বলল, ‘কী?’ তার এক হাতে চিরুনি, অন্য হাতে মোবাইল | রুমকি বলল, ‘শোনো, আজ রাতে কিন্তু তোমাকে তোমার সিদ্ধান্ত জানাতে হবে | আমার ভাল লাগছে না | আমি আর পারছি না | তোমাদের দুজনের আচরণই আমার অদ্ভুত লাগছে | ও কী? হাতে ওটা কী? দেখি | এই রুমালটা কার? এত পুরনো রুমাল |’ নদী মার হাতে রুমালটা দিয়ে বলল, ‘এটা আমার প্রথম রুমাল | তোমার মনে নেই মা, আমি তখন প্রথম স্কুলে যেতে শুরু করেছি, তুমি এটা আমার স্কুলড্রেসে পিন করে দিতে | বুকের এইখানে, দেখো |’ বলে নদী আঙুল দিয়ে জায়গাটা দেখাল | তারপর মার হাত থেকে রুমালটা নিয়ে নদী নিজের বুকের নির্দিষ্ট জায়গায় ধরে যেন দেখাল রুমকিকে | রুমকি অবাক হয়ে বলল, ‘এটা তোমার কাছে ছিল? কই আমি তো জানি না | দেখি আর একবার দেখি |’ রুমকি রুমালটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল তাতের নদীর নাম সেলাই করে লেখা আর লেখা নার্সারি ওয়ান | নীল-সাদা ছোট ছোট চৌখুপি, তার ওপর কালো দিয়ে সেলাই | পুরো রুমালটার রং চটে গেছে | কিন্তু বোঝা যায় আসল রংটা | রুমকি নাকের কাছে রুমালটা নিয়ে গন্ধ শুঁকল | একটা পুরনো মিষ্টি গন্ধ তার গায়ে | নদী চুপ করে চেয়ে চেয়ে দেখল মাকে | অপেক্ষা করছে মা কী বলে শোনার জন্য | রুমকি মুখ তুলে বলল, ‘এটা তুমি রেখে দিয়েছ? কেন? কোথায় ছিল এটা?’ নদী মায়ের হাত থেকে রুমালটা নিয়ে বলল, ‘আমার স্মৃতির বাক্সে | আমার ছোটবেলার বাক্সে |’ রুমকি বলল, ‘কই, কোনওদিন তো দেখিনি ওই বাক্সটা | আমাকে তো দেখাওনি |’ নদী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘আজ রাতে দেখাব |’ আর ‘মা’ বলে পেছন ফিরে বলল, ‘তোমাকে অপরাহ্নের কথাও আজ বলব | না, এখন না মা | আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে | আর, আর বাবাকে বলার দরকার নেই | প্লিজ |’ রুমকি দ্রুত বলে উঠল, ‘নদী শোনো | অপরাহ্ন …’ নদী কোনও উত্তর না দিয়েই নিজের ঘরে চলে গেল | রুমকি খানিকটা দিশেহারা হয়ে পড়ল |

তখন ঘড়িতে সাড়ে চারটে হবে | নদী একটা প্রোজেক্ট নিয়ে কদিন ধরেই খুব হিমশিম | সেটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল | এমন সময়ে মোবাইলটা বেজে উঠতে নদী প্রায় চমকেই উঠল | টেবিলের ওপর ফোনটা রাখা ছিল | হাতে তুলে দেখল মায়ের ফোন | একটু বিরক্ত যেমন হল, অবাকও কম নয় | রিসিভ করে বলল, ‘কী হয়েছে মা? তুমি ঠিক আছ?’ রুমকি বলল, ‘তোমার কি বাড়ি ফিরতে দেরি আছে?’ নদী বলল, ‘জানি না মা | খুব ব্যস্ত এখন মা |’ রুমকি বলল, ‘এখনও তো বললে না অপরাহ্ন কে? কী করে? কোথায় থাকে? কলকাতায়?’ নদী চূড়ান্ত অবাক হয়ে গেল | রুমকি যে তার মাথার মধ্যে সারাদিন অপরাহ্নের কথা চালাচালি করে গেছে, সে কথা নদী আন্দাজ করেনি | রুমকিও সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকে | সরকারি অফিস হলেও রুমকিদের ডিপার্টমেন্টে কোনও ফাঁকি মারা যায় না | যতক্ষণ অফিসে থাকে চোখে মুখে এক করে কাজ করে যেতে হয় রুমকিকে | তার ওপর ও ডিপার্টমেন্ট-হেড | বিকেলে এই সময়টা একটু হালকা হয় সে, ছুটির আগ দিয়ে | অবাক হয়ে নদী বলল, ‘মা তুমি কি পাগল?’ রুমকি বলল, ‘না, আমি মা | দেরি করো না বাড়ি ফিরতে |’ বলেই ফোনটা কেটে দিল | নদী চেয়ারে এলিয়ে পড়ে বলল, ‘মা, অপরাহ্নের কথা আমি তোমাকে কী করে বলব? সে কোথায় থাকে, কী করে, এসব কথা আমি তোমাকে বললেও বিশ্বাস করবে না মা | ছেড়ে দাও না মা | তার চেয়ে তোমাদের কথাই আমি মেনে নেব |’ তার কিউবিকলে ঘটনাচক্রে এ সময়ে কেউ এসে দাঁড়ায়নি | আর এ সময়টা অফিস ফাঁকাই থাকে | সবাই চা-সিগারেট খেতে বাইরে যায় | নদীও যায়, তবে আজ সে সত্যিই খুবই ব্যস্ত | দুপুরের লাঞ্চ খাবার সময়ও সে আজ পায়নি | রুমকির ফোনটা আসাতে নদী তার কাজ থেকে অনেকটাই সরে এসেছে | হঠাৎই তার খুব খিদে পেল | চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে টয়লেটে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে এসে ব্যাগ থেকে খাবারের বাক্সটা বের করল নদী | জানে না ভেতরে কী আছে | মা কী দিয়েছে তার লাঞ্চে | ঢাকনাটা খুলতেই ভেতরে একটা কাগজের টুকরো দেখতে পেল নদী | তাতে লেখা ‘অপরাহ্ন কে?’ সেই জন্যই মা ফোন করেছিল নদীর কাছে থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে | কাগজটা সরিয়ে নদী যখন হাতে স্যান্ডউইচটা তুলে নিচ্ছে, তার দু’চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল | চশমার কাচটায় জমা হল কিছুটা |

রাত তখন দশটা বেজে গেছে | খাওয়া-দাওয়ার পরে কমপ্লেক্সের ভেতর রুমকি নদীকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছে | মৃদুলকে বোঝাতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি রুমকির | মৃদুল ধরেই নিয়েছে মা-মেয়ে বিয়ে নিয়ে কথা বলবে | একবার ইঙ্গিতে সে কথা মৃদুল রুমকিকে বলেও দিয়েছে | রুমকি শুধু বলেছে, ’হুঁ |’ মৃদুল এখন নিজের লেখাপড়া নিয়ে বা টিভিতে খবর শোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে | রোজের মতো | আগে বহুবার রুমকি আর মৃদুল এরকম করেছে | নদী তখন স্কুলের ছাত্রী | সে তখন রাত জেগে পড়াশুনা করত, আর মা-বাবা তকে পড়তে দিয়ে হাঁটতে বেরোত | কখনো নদীও যেত তাদের সঙ্গে | বসে থাকত বেঞ্চে, দোল খেত দোলনায় | মৃদুল তকে দোল দিতে দিতে গান গাইত – ’আমি কান পেতে রই ও আমার আপন হৃদয় গহন দ্বারে বরে বরে কান পেতে রই |’ কিশোরী নদী বুঝতে পারত না বাবা কার কথা ভেবে এ গান গাইছে | জিগ্যেস কোনওদিন করেনি নদী | আজ বুঝতে পরে | মনে মনে নদী এ গান গায় | কেউ শোনেনি, শুনতে পায় না | বাবা কিন্তু আর এ গানটা গায় না | নদীর জন্য কোনও গানই গায় না | কবে থেকে বাবা এমন বদলে গেল? নদী বড় না হলে কি বাবা বদলাত না?

একটা বেঞ্চে এসে বসল রুমকি আর নদী | নদীর পাজামার পকেটে সেই রুমালটা | নদী পকেট থেকে রুমালটা বার করে রুমকির দিকে চেয়ে বলল, ’মা অপরাহ্ণ কেউ নয় | এখনো তকে আমি চোখে দেখিনি | কিন্তু, অপরাহ্ণ আমার স্বপ্ন | আমার স্মৃতি | আমার ছোটোবেলা | মা, এই রুমালটা তোমাদের কাছে মূল্যহীন | আমার কাছে নয় | তুমি বারবার জানতে চাইছ অপরাহ্ণের কথা | তুমি বুঝতে পারছ না কেন, আমি তোমাদের ছেড়ে এখনই যেতে চাই না | আমি অপরাহ্ণের জন্য অপেক্ষা করতে চাই | অপরাহ্ণের কথা আমি কাউকে বলিনি মা |’ রুমকি খুব অবাক হয় | চেয়ে থাকে মেয়ের দিকে | এ মেয়েকে সে মোটেও চেনে না | এত বড় হয়ে গেছে কিন্তু এত বোকা কেন তার মেয়ে | অদেখা, অজানা একটা কাল্পনিক ছেলের জন্য অপেক্ষা করছে? নদী বলেই যায়, ’মা এই আকাশটা কিছু করে না | কিন্তু দেখো কেমন আমার দিকে চুপটি করে চেয়ে থাকে | না চাইতেই কেমন আলো দেয়, মেঘ দেয়, বৃষ্টি দেয়, মন খারাপ দেয়, স্বপ্ন দেয় আমাকে | এই আকাশটা ছেড়ে আমাকে এখনি যেতে না-ই বা বললে মা | আর অপরাহ্ণ, ও-ও তো কিছু করে না | শুধু স্বপ্ন দেখে | আর আমাকে স্বপ্ন দেখায় | ও একদিন আসবে মা | হয়তো ও কোনও চাকরি করবে না | করলেও হয়তো খুব সামান্য পয়সার চাকরি | কিন্তু আমাকে খুব আলো দেবে, মেঘ দেবে, বৃষ্টি দেবে, মন খারাপ দেবে | আমি তো আমার আকাশকে চাই | তার নাম অপরাহ্ণ | আর যে কদিন না অপরাহ্ণ আসে, আমি তোমাদের কাছে থাকতে চাই | মা, তারপর তো চিরকালের জন্য চলেই যাব | আর কটা দিন তোমাদের কাছে থাকতে দেবে না মা? এই আকাশটার কাছে | ওই কদম গাছটার কাছে, যাকে আমি বড় হতে দেখেছি | একদিন চলে যাব মা | চিরদিনের মতো | তখন তুমি, বাবা, এই এরা সব আমার আর একটা রুমাল হয়ে যাবে | তখন সেই রুমালটা আমি আমার এই রুমালের পাশে রেখে দেবো |’ রুমকি বুঝে উঠতে পরে না নদী তার মেয়ে না অন্য কারো মেয়ে | এভাবে ভাবে কেন নদী? কবে থেকে? ঈর্ষা হল রুমকির | সে তো কই এভাবে কোনওদিন ভাবতে পারেনি | এত নরম করে, এত মায়াবী করে, এত স্নিগ্ধ করে? নদী তার কাছে আচমকাই মহৎ হয়ে উঠল | অচেনা হয়ে উঠল | নিজের অচেনা মেয়েকে চিনতে চেয়ে রুমকি নদীর হাতদুটো ধরে বলল, ’নদী, মৃদুল তো বুঝবে না | ওকে কী বলব আমাকে বলে দে |’ চুপটি করে চেয়ে থাকল নদী তার মায়ের চোখের দিকে, মায়ের বুকের দিকে; মায়ের হাতের পাতায় কত দাগ, কত স্মৃতি জমা হয়ে আছে | নদী মায়ের হাতের মধ্যে, বুকের মধ্যে এই প্রথম স্রোতস্বিনী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.