যক্ষপুরাণ

256

বাঁ চোখের ছানিটা কদিন আগেই কাটা হয়েছে | এখনও ডানচোখের ছানি কাটা বাকি, দুটো হাঁটুই বাতে পঙ্গু, বাড়ি থেকে বেরোন না প্রায়, বেরোলে লাঠি নিতে হয় একটা, এরকম যার শরীরের অবস্থা, সেই সুবালাদেবী দুজন লেবার সঙ্গে নিয়ে ছুটেছেন ধানজমির মাঠে |

ছুটির দিন ছিল‚ সাতসকালে খবরটা শুনে তীর্থঙ্কর কী করে আর নিশ্চেষ্ট থাকে, অমনি ছুটল বাইক নিয়ে |

মাঠটা তাঁর বাড়ি থেকে বেশ দূরেই, তীর্থঙ্কর সেখানে গিয়ে দেখল লাঠিতে ভর করে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে সুবালা পৌঁছে গেছেন মাঠে | সঙ্গে দুজন লেবার, তাদের দুজনের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন দুখানা ধারালো কাস্তে |

তীর্থঙ্কর জানে তার শাশুড়ি ঠাকরুন পঁচাশি বছর বয়সেও এখনও ঘোর লড়াকু | বিঘেখানেক জমি আছে এখানে, সেই জমিতে ধান রোয়ার সিজিনে কে নাকি ধান বুনে দিয়েছে, তিনি তা জানতেও পারেননি এতদিন | মাত্র কালই কে এসে খবর দিয়েছে, ও মাসিমা, লবঙ্গডাঙায় আপনার একবিঘে জমি আছে না, সে জমি এখন কোথায়! পাশের প্লটের চাষি তার দু-বিঘের সঙ্গে আপনার একবিঘে জুড়ে ধান বুনে দিয়েছে! ও জমি আপনার ভোগে গেল |

শুনে ইস্তক তিনি ছটফট করছেন আর গজরাচ্ছেন, বলছেন, ধান বুনলেই হল! পালানের মুখে নুড়ো জ্বেলে দেব না!

তা সেই ধান এখন বেশ ডাগরপানা, সেই দৃশ্য দেখে সুবালা উত্তেজিত হয়ে দুই লেবারকে বলছেন, এখনই কাটতে লাগো | বেটাদের এত সাহস, আমার জমিতে আমার অনুমতি না নিয়ে ধান বুনেছে |

তীর্থঙ্কর দেখল একলপ্তে তিনবিঘে মতো জমিতে ধান বোনা, সবুজ ধান লকলক করছে, তাতে পাক দিতে এখনও ঢের দেরি | তিনবিঘের দু-বিঘে পালান দাসের, তার জমির ধান বুনে দেওয়ার পর পাশের একবিঘে ফাঁকা পড়ে আছে দেখে সে-ই চুপিচুপি বুনে দিয়েছে ধান | ভেবেছে পঙ্গু সুবালা জানতেও পারবেন না তার এই অপকীর্তির কথা |

সুবালা তখন লেবারদের হুকুম দিচ্ছেন, কাটো ধান, এ-বেলার মধ্যে কেটে সাফ করে ফেলো জমি |

দুই লেবার তখন কাস্তে উঁচিয়ে নেমেছে মাঠে, দু-চার গাছ কেটেছে কি কাটেনি, অমনি কোথা থেকে হনহন করে ছুটে এল পালান দাস |

সুবালা তখনও তড়পাচ্ছেন দেখে পালান দাস হাতজোড় করে বলে, গিন্নিমা, কাঁচা ধানগুলো এভাবে কাটবেননি | যা হয়েছে হয়েছে, পরের বছর আর হবে না | আপনার ভাগের ভাগ ধান আমি হিসেব করে বুঝিয়ে দে আসবো |

সুবালা কিন্তু একটুও নরম হচ্ছে না, বলছেন, এ ধানগাছ আমি কাটবই | ভেবেছ জোর করে ধানচারা বুনে জমির দখল নেবে!

শেষে তীর্থঙ্কর অনেক বুঝিয়ে নিরস্ত করে সুবালাকে, বলল, মা, কাঁচা ধান এভাবে কাটা ঠিক হবে না | আমি দেখছি |

পালান দাসের সঙ্গে কড়ার হল, যা ধান হবে, তার সবটাই সুবালার বাড়ির সামনে ফেলতে হবে, তার থেকে যতটা সুবালার ইচ্ছে হবে সেটুকু দেবেন পালানকে |

এত সব ঝকমারি মিটিয়ে সুবালাকে নিয়ে তীর্থঙ্কর যখন তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিল, বেলা এগারোটা | বাইকে উঠে বলল, কেন এই বয়সে ওই লোকগুলোর সঙ্গে লাগতে যান! ওদের তো কোনও হুঁশজ্ঞান নেই, রাগের মাথায় আপনাকে যদি ঠেলে ফেলে দেয়, তখন কী হবে!

সুবালা হাতের লাঠি উঁচিয়ে ক্রুদ্ধ মেজাজে বলেন, ঠেলে ফেলে দিলেই হল! থানা-পুলিশ নেই!

থানা-পুলিশও যে আজকাল থেকেও নেই সে-কথা সুবালাকে কে বোঝাবে! তবু বলল, দিনকাল ভাল নয়, মা, এত বড় বাড়িতে আপনি একলা থাকেন, রাতবিরেতে কে না কে এসে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়বে, আপনি সামলাতে পারবেন?

সুবালা তবুও তড়পাতে থাকেন, কেন, তোমার শ্বশুর একটা বন্দুক রেখে গেছে না! তুমিই তো রিনু করে এনে দিলে সেদিন |

তীর্থঙ্কর হেসে স্টার্ট দিল তার বাইকে |

সুবালার বাড়ি নয়তো বাড়াবাড়ি | দোতলা বাড়িতে দশ-বারোখানা বড় বড় ঘর, চারপাশে মস্ত বারান্দা | বাড়ির চৌহদ্দিতে এক বিশাল বাগান | বাগানের চারপাশ ঘিরে শুধু নারকেল গাছই আশিটা | তাছাড়া আম-জাম-কাঁঠাল-পেয়ারা-নোনা আতা-সবেদা, কী গাছ নেই চারবিঘের এই ভদ্রাসনে!

কিন্তু লোক বলতে সুবালা একদম একা | শ্বশুর মারা গেছেন তাও ন-দশ বছর হতে চলল | তিনি সেই কবে এখানে জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন, তখন তাঁর চাকরির মাঝ-বয়স | তাঁর শখ ছিল রকমারি ফলের গাছ করে সারা বছর সেই ফলফলারি খাবেন | তাঁর চার ছেলেমেয়ে নিয়ে তখন ভরভরন্ত সংসার | দুই মেয়ের বিয়ে তিনি নিজেই দিয়েছিলেন, যখন প্রয়াত হন, তখনও দুই ছেলেমেয়ে কলেজে পড়ে |

স্বামী চলে যাওয়ার পর প্রথমদিকে খুবই ভেঙে পড়েছিলেন সুবালা, কিন্তু পরে সামলে নেন | তাঁর ছেলে কলেজের বেড়া ডিঙিয়ে কম্পিউটারে পড়াশোনা করে পাড়ি দিয়েছে আমেরিকায় | ছোট মেয়ের বিয়েটাও দিয়ে ফেলেছেন ক-বছর আগে | লক্ষ ছিল ছোট মেয়ে যেন কাছাকাছি থাকে তাঁর, সেই কাজটাও করে ফেলে এখন অনেকটাই নিশ্চিন্ত |

তীর্থঙ্কর তার শাশুড়ির খুব মনের মতো জামাই | শাশুড়ি একটা মোবাইল কিনে আরও নিশ্চিন্ত | মোবাইলের সব কিছু না জেনে উঠতে পারলেও ছোটমেয়েকে কী করে ফোন করতে হয়, আর কী করে তার ফোন রিসিভ করতে হয় তা জেনে নিয়েছেন অনেক কসরত করে | ব্যস, এখন সারাদিনে অসংখ্য ফোন, সবই ছোট মেয়েকে |

— কেয়া, চারটে নোনা পেড়েছি, তেত্রিশটা সবেদা, তুই তীর্থকে পাঠিয়ে দিবি সন্ধ্য্বেলা |

— কেয়া, আমার হাঁটুর ব্যথাটা বেড়েছে, মালিশের তেল নেই, তীর্থকে বলিস তো অফিস থেকে ফেরার সময় কিনে আমাকে দিয়ে যেতে |

— কেয়া, ছাপ্পান্নটা পেয়ারা পেড়েছি, সব ডাঁশা, জমজম করছে রং, যা খেতে না! পেড়ে না নিলে বারোভূতে এসে লুটেপাটে খাবে! তীর্থকে বলিস এগুলো নিয়ে যেতে —

— কেয়া, গাছের ডাবগুলো সব ঝুনো হয়ে গেল, ডাব পাড়ার লোকটা অনেকদিন হল খোঁজ নিতে আসে না, তীর্থকে বলিস তো লোকটা যেন আমার সঙ্গে দেখা করে |
সুবালা এই বয়সেও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে দেখেন কোন গাছে কী ফলন হল, কোন ফলগুলো এখনই পেড়ে নেওয়া দরকার, কোন ফলের কী গতি হবে!

তীর্থকে অতএব প্রায় রোজই একবার করে ছুটতে হয় শাশুড়ির নানা বায়নক্কা মেটাতে | তাঁকে বুঝিয়ে পারা যায় না, এত পেয়ারা খাওয়ার কিছু নেই | কিন্তু সুবালা শুনবেন না, বলেন, পেয়ারা খেলে পেট পোষ্কার হয় | সবেদা খাওয়া খুব ভাল |

কিন্তু ডাবা-পাড়া লোকটাকে খবর দেওয়ার দিন দুই পরে ফোন করলেন, কেয়া, দুশো মতো ডাব পেড়েছি, তুই দুই দিদিকে খবর দে, যেন গাড়ি নিয়ে চলে আসে, গাড়ি ভর্তি করে কলকাতা নিয়ে যাক | কলকাতায় ডাবের যা দাম | আর তীর্থকে বল যা পড়ে থাকবে তা দুবারে হোক তিনবারে হোক, গাড়ি ভর্তি করে করে নিয়ে যাক | তোরা রোজ তিনটে-চারটে করে খাবি | শরীর ভালো থাকবে, মাথা ঠান্ডা থাকবে | তোর মেজদির বেশি করে খাওয়া দরকার, ওর যা মাথা গরম!

তীর্থঙ্কর সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে দেখল সুবালা যেন ডাবের দোকান দিয়েছেন বারান্দার উপর | সে কাঁচুমাচু মুখে বলল, মা, এত ডাব পাড়লেন! দুই দিদির কেউ আসতে পারবে না বলছে, ছেলেমেয়েদের সব পরীক্ষা! কী করবো দুশো ডাব!

সুবালাও মুখ কাঁচুমাচু করলেন, কী করব বল, না পাড়লে পাড়ার ছেলেপিলেরা রাতের বেলা গাছে উঠে সব পেড়ে নিয়ে চলে যাবে যে!

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.