পাশে বালক পুত্র ও ছদ্ম স্বামী‚ চলন্ত গাড়ি থেকে গুলিতে লক্ষ্যভেদ সদ্য স্বামীহীনার…স্বাধীন ভারতে বিস্মৃত এই বিপ্লবী

বাঙালির ঘরে দেবী দুর্গা যে সময়ে আসেন সেই শরৎকালেই জন্ম এবং মৃত্যু তাঁর | কাজে তো একশোবার | নামেও তিনি দুর্গা | অনেকের ধারনা তিনি বাঙালি | তা ঠিক নয় | তিনি ছিলেন গুজরাতি ব্রাহ্মণকন্যা | তাঁর বিস্মৃত-কথা স্মরণ না করলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে অক্টোবর মাস |

১৯০৭-এর ৭ অক্টোবর জন্ম হয়েছিল দুর্গাবতীর | শৈশবেই মাতৃহারা | শোকে সংসার ছেড়ে সন্ন্যাস নিয়ে চলে যান বাবা | অনাথিনী বড় হতে থাকেন আত্মীয়ার কাছে | পড়াশোনা পঞ্চম শ্রেণী অবধি | কারণ বিয়ে হয়ে গিয়েছিল এগারো বছর বয়সে | পনেরো বছর বয়সী কিশোরের সঙ্গে | বিয়ের পরে যেন নবজন্ম হল দুর্গাবতীর | স্বামী ভগবতীচরণ ভোহরার সান্নিধ্যে | দুজনের নামে মিল | কিন্তু মনের মিল যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল | স্বামীর চোখ দিয়ে নতুন করে জীবনকে চিনলেন দুর্গাবতী |

শ্বশুরবাড়ি অত্যন্ত সম্পন্ন গুজরাতি পরিবার | উপার্জনের চিন্তা করতে হয় না ভগবতীচরণকে | বাবা ছিলেন রেলওয়েজের বড় চাকুরে | রায়সাহেব উপাধি পেয়েছিলেন | বিস্তর সম্পত্তি | ছেলে কিন্তু বাবার পথে গেলেন না | বলা যায় সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে গেলেন | বাবার উপার্জন নিবেদন করলেন দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে | 

শাশুড়ি প্রয়াত বহুদিন আগে | স্বামীর যুবক বয়সে চোখ বুজেছিলেন শ্বশুরও | নতুন বৌ দুর্গাবতী প্রায় পিছুটানহীন | স্বামীর সঙ্গে তাঁরও ধ্যান জ্ঞান হয়ে উঠল স্বদেশ |

Hindustan Socialist Republican Association বা HSRA-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন ভগবতীচরণ | সংগঠনের বাকি সদস্যদের কাছে দুর্গাবতী দেবী ছিলেন দুর্গা ভাবি | সেটাই হয়ে যায় তাঁর প্রধান পরিচিতি | স্বামীর সঙ্গে তিনিও সক্রিয় সদস্য ছিলেন নওজওয়ান ভারত সভা বা NBS-এর | 

দুজনে সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলেন মুক্তিসংগ্রামে | কিন্তু দলের বাকি সদস্য প্রথম দিকে সন্দেহ করত | কারণ ওই দম্পতি বিত্তশালী | বেশ কিছু বছর পরে সবাই উপলব্ধি করেন দুজনের আত্মনিবেদন | আগুনপাখি হয়ে উড়তে উড়তেই সংসারে এল একমাত্র সন্তান‚ ১৯২৫ সালে | ছেলের নাম রেখেছিলেন শচীন্দ্র | মা হওয়ার পরেও পূর্ণ উদ্যোগে বিপ্লবীর ভূমিকা পালন করে গেছেন দুর্গা ভাবি |

১৯২৮ সালের ডিসেম্বর | ভগবতীচরণ লাহোর ছেড়ে কলকাতায় | কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে | লাহোর তখন অগ্নিগর্ভ | খুন হয়েছেন পুলিশ অফিসার জন সন্ডার্স | যদিও আসল নিশানা ছিলেন জে. এ স্কট | প্রকাশ্যে পোস্টার দিয়ে ঘটনার দায়স্বীকার করেছে HSRA | জানিয়েছিল‚ লাল লাজপত রাইয়ের মৃত্যুর প্রতিবাদ এটা | ব্রিটিশ পুলিশ পাগলের মতো খুঁজছে অভিযুক্তদের |

শিশুপুত্রকে নিয়ে বাড়িতে তখন দুর্গাবতী একা | উদভ্রান্তের মতো এলেন ভগৎ সিং‚ শুকদেব আর রাজগুরু | অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের সামনে কী করবেন‚ জানেন না | তাঁদের হাতে চার-পাঁচ হাজার টাকা ( সে যুগে পরিমাণ নিছক কম নয় ) বিনা সঙ্কোচে তুলে দিলেন দুর্গা ভাবি | রেখে গিয়েছিলেন তাঁর স্বামী |

পুলিশ ছেয়ে ফেলেছে লাহোর | তাদের সামনে দিয়ে স্টেশন থেকে টিকিট কাটলেন এক সুবেশ তরুণ | পরনে সাহেবি পোশাক | সঙ্গে স্ত্রী ও শিশুপুত্র আর চাকর | স্ত্রী পুত্র নিয়ে চেপে বসলেন ফার্স্ট ক্লাস কামরায় | চাকর উঠল থার্ড ক্লাসে | ট্রেন চলতে শুরু করল |

পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে চলে গেলেন বিপ্লবীরা | দুর্গা ভাবির পরামর্শে ভগৎ সিং সেজেছিলেন ব্রিটিশ কেতাদুরস্ত তরুণ | ছদ্মবেশ নিখুঁত করতে মস্তক মুণ্ডন করেছিলেন | যা তাঁর ধর্মে নিষিদ্ধ | কারণ ব্রিটিশ পুলিশ খুঁজছে দাড়ি গোঁফ সমেত শিখ যুবককে ! প্রথম যখন চুল দাড়ি বিসর্জন দিয়ে এসেছিলেন‚ স্বয়ং দুর্গা ভাবিও তাঁকে চিনতে পারেননি !

সব পরিকল্পনামাফিক করে এই মহীয়সী ছোট্ট শচীন্দ্রর হাত ধরে ট্রেনে উঠলেন | সঙ্গে স্বামীবেশী ভগৎ সিং | চাকর বেশে ছিলেন আর কেউ নন‚ বিপ্লবী রাজগুরু | সবার কাছেই লোডেড পিস্তল |

তিনজন নামলেন কানপুরে | সেখান থেকে ট্রেনে লখনৌ | লখনৌ থেকে ট্রেনে রাজগুরু চলে গেলেন বেনারস | ভগৎ সিং-এর সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে দুর্গা ভাবি পৌঁছলেন কলকাতা | সেখানে পুলিশ তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালাচ্ছে লাহোর থেকে আসা ট্রেনে | যদি কোনও শিখ যুবক থাকে | লখনৌ থেকে কে তাঁর স্ত্রী পুত্র নিয়ে কলকাতা এল‚ কে দেখতে গেছে !

কলকাতায় দলীয় কর্মীদের সঙ্গে দেখা করেন ভগৎ সিং-দুর্গাবতী | ভগবতীচরণ তো অভিভূত হয়ে যান স্ত্রীর কৃতিত্বে | কদিন পরে ছেলেকে নিয়ে একাই লাহোর ফিরে যান দুর্গাবতী | কলকাতায় বিপ্লবীদের কাছে বোমা তৈরি শিখেছিলেন ভগবতীচরণ ও দুর্গাবতী‚ দুজনেই |  

১৯২৯ এর এপ্রিল | দিল্লিতে বনভোজন করলেন ভগবতীচরণ-দুর্গাবতী-ভগৎ সিং-চন্দ্রশেখর আজাদ ও ভগবতীচরণের বোন সুশীলা | ভগৎ সিং-কে খাওয়ানো হল প্রিয় খাবার | সুশীলা পরিয়ে দিলেন রক্ততিলক | এরপর ভগৎ সিং-এর গন্তব্য সংসদ ভবন | আজাদ চলে যান বিদায় নিয়ে | ভগবতীচরণ স্ত্রী পুত্র আর বোনকে নিয়ে টাঙ্গায় উঠে বসেন | 

ডেকে ওঠে ছোট্ট শচীন | লম্বে চাচু

শুনে ঘাড় না ঘুরিয়ে পারেননি ভগৎ সিং | দ্রুতগামী টাঙ্গা চলে যায় | ভগৎ সিং ঢুকে যান অভীষ্ট পূরণে | সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন বটুকেশ্বর দত্ত | সেদিনই হয় সংসদে বোমা বিস্ফোরণ | ধরা দেন দুই বিপ্লবী | 

পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে স্বামীর সঙ্গে আত্মগোপন করেছিলেন দুর্গাবতী | সেই অবস্থাতেই সংগঠনের কাজ করে যেতেন | ভগৎ সিং-শুকদেব-রাজগুরুকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন |

এর মাঝেই মর্মান্তিক আঘাত পেলেন দুর্গাবতী | ১৯৩০-এর ২৮ মে প্রয়াত হলেন ভগবতীচরণ | রাভি নদীর তীরে বোমা পরীক্ষা করছিলেন | বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যান মাত্র ২৫ বছর বয়সে |

এরপর কয়েক বছর অন্তরালে থাকতে বাধ্য হন দুর্গাবতী দেবী | পুলিশের চোখে ধুলো দিতে বারবার ঠিকানা বদলাতে থাকেন | গোপনীয়তা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন যখন ভগৎ সিং-শুকদেব-রাজগুরুর ফাঁসির আদেশ হয় | নিজের সব অলঙ্কার দিয়ে দিয়েছিলেন | যদি মুক্ত করা যায় ত্রয়ীকে | দরবার করেছিলেন গান্ধীজির কাছে | সফল হননি |

কিন্তু ভেঙেও পড়েননি | এক বছর আগে যে দৃপ্ত ভঙ্গিতে লাহোর থেকে এনেছিলেন বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ দাসের দেহ‚ সেই ভঙ্গিতেই উঠে বসেছিলেন ভাড়া করা গাড়িতে | সুবেশা গুজরাতি তরুণীর সাজে | সঙ্গে বালক পুত্র এবং স্বামীর বেশে বিপ্লবী পৃথ্বী সিং | চলন্ত গাড়ি থেকে দুর্গাবতী দেবী গুলিবিদ্ধ করেছিলেন এক পুলিশ সার্জেন্ট এবং তাঁর স্ত্রীকে | ভগৎ সিংদের ফাঁসির আদেশের প্রতিশোধ নিতে | ১৯৩০-এর ৮ অক্টোবর | স্বামীকে হারানোর পাঁচ মাস এবং নিজের তেইশতম জন্মদিনের একদিন পরে |

সদ্য স্বামীহীনার এই কাজ স্তম্ভিত করে দিয়েছিল ভারতের রাজনৈতিক মহল এবং ব্রিটিশদের | তবে সার্জেন্ট টেলর দুর্গাবতীর নিশানা ছিলেন না | পঞ্জাবের তৎকালীন গভর্নর স্যর জিওফ্রে দ্য মন্টমরেন্সি বা প্রাক্তন গভর্নর হেইলিকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন তাঁরা | না পেরে হতাশায় গুলি করেছিলেন ওই ব্রিটিশ দম্পতির দিকে | দুজনেই মারাত্মক আহত হয়েছিলেন | তবে প্রাণে রাক্ষা পেয়েছিলেন | বিচারে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল দুর্গাবতী দেবীর |

পরাধীন দেশের এই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ স্বাধীন ভারতে যোগ্য সম্মান পাননি | রাজনীতি-ক্ষমতা থেকে শতহস্ত দূরে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটিয়েছিলেন সাধারণ ভারতবাসী হয়ে | উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে | জমিদান করেছিলেন শহিদ শোধ সংস্থানের উদ্দেশে | লখনৌয়ের পুরানা কিলা এলাকায় দরিদ্র শিশুদের জন্য একটা স্কুল চালাতেন | ১৯৫৬ সালে তাঁর স্কুলে গিয়েছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু | দুর্গাবতী দেবীর তৈরি স্কুল আজও আছে | নাম‚ সিটি মন্টেসরি স্কুল | দুর্গা ভাবি চলে গেছেন ১৯৯৯-এর ১৫ অক্টোবর‚ ৯২ বছর বয়সে | কোনওরকম প্রাপ্য শ্রদ্ধা-সম্মানের প্রত্যাশা না করেই |

(পুনর্মুদ্রিত)

6 Responses

  1. শিউরে উঠলাম।অসাধারণ একটি লেখা।ধন্যবাদ।

  2. Eirakm anek agnisphulingo hariye gechen samayer atale,keu tader khoj rakheni.desher Lok khabr rakheni,sarkar joggyo samman deyni.setai swadhin bharater sobcheye bara prahoson!!jara jibonpat krln desher jonno tader keu chinlo e na!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

afgan snow

সুরভিত স্নো-হোয়াইট

সব কালের জন্য তো সব জিনিস নয়। সাদা-কালোয় উত্তম-সুচিত্রা বা রাজ কপূর-নার্গিসকে দেখলে যেমন হৃদয় চলকে ওঠে, এ কালে রণবীর-দীপিকাকে দেখলেও ঠিক যেমন তেমনটা হয় না। তাই স্নো বরং তোলা থাক সে কালের আধো-স্বপ্ন, আধো-বাস্তব বেণী দোলানো সাদা-কালো সুচিত্রা সেনেদের জন্য।স্নো-মাখা প্রেমিকার গাল নিশ্চয়ই অনের বেশি স্নিগ্ধ ছিল, এ কালের বিবি-সিসি ক্রিম মাখা প্রেমিকাদের গালের চেয়ে।