মেনোপজের সময় অনেক মহিলাদের যৌন আকাঙ্খা বেড়ে যায়

কাকে বলে মেনোপজ

মেয়েদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন অনেকটা জোয়ার-ভাটার মতো | এরোপ্লেন ওড়বার সময় ও নামার সময় যেমন খানিকটা ঝাঁকুনি লাগে তেমনি নারীজীবনে বয়ঃসন্ধি ও ঋতুনিবৃত্তি এই দুই অধ্যায়ে শারীরিক ও মানসিক চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা | সাধারণভাবে প্রোঢ়ত্বের শেষে ৪৮ থেকে ৫২ বছর বয়সের মধ্যে মেনোপজ হয় | এই বয়সে যদি সম্পূর্ণ এক বছর টানা পিরিয়ড বন্ধ থাকে তাহলেই তাকে বলা হবে মেনোপজ | জীবনের অপরাহ্নে যখন যৌবনের রূপলাবণ্যে খানিকটা ভাটা পড়ে তখন অনেক উচ্চশিক্ষিতাও এ সময়কার বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন মেনে নিতে পারেন না, অকারণ অহেতুক সচেতন ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, মানসিক দ্বন্দ্ব ও আত্মনিপীড়নে ভোগেন | ছেলে, মেয়ে, জামাই, পুত্রবধূ ও অন্যান্য অল্পবয়স্ক আত্মীয়স্বজন থেকে মানসিক দূরত্ব সম্পর্কে অনাবশ্যক ভাবনায় সহজেই ব্যথিত হন এবং ক্লান্তি ও বিষাদে মন ভারাক্রান্ত করে ফেলেন | অথচ এই সময়কার পরিবর্তন জীবনের আর একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ভেবে নিয়ে উপযুক্ত পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণ করলে বিগত যৌবনের জন্য আকাঙ্ক্ষা ও উদ্বেগ ভুলে যাওয়া সহজ হয় | পিরিয়ডের ঝামেলা নেই, কম বয়সের সংগ্রাম নেই, সন্তানরা বড় হয়ে গেছে — এখনও তো জীবন উপভোগ করার আসল সময় | স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্কও বিঘ্নিত হওয়ার কারণ নেই, বরং নিশ্চিন্ত কারণ সন্তান সম্ভাবনার ভয় থাকে না | এটা হৃদয়ঙ্গম করা সবচেয়ে দরকার যে পরিণত বয়সের একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে — ঠিকমতো রুটিন ও যত্নে থাকলে চেহারা খারাপের ভয়ও থাকে না — বরং ভাবুন না কেনে হেমা মালিনী, রেখা বা অপর্ণা সেনের কথা, এনারা যেন এখন আরও বেশি সুন্দরী, আরও আকর্ষণীয়া | তাই বলি এই বয়সে মনকে অকারন মোহ বা আক্ষেপ থেকে মুক্ত করা দরকার |

কি কি পরিবর্তন হয়

পরিপূর্ণভাবে ঋতুনিবৃত্তি বা Menopause হয়ে গেলে মেয়েদের প্রজনন ক্ষমতা থাকে না, দারুণ বাঁচোয়া | এ সময় কিছু কিছু দৈহিক পরিবর্তন হয়, হাতে, পায়ে, ঘাড়ে, নিতম্ব ও থাইতে চর্বি জমার সম্ভাবনা থাকে, ওজন বেড়ে যেতে পারে, কেউ কেউ আবার বেশি রোগা হয়ে যায়, কারও ত্বকের মসৃণতা কমে যায়, বলিরেখা পড়তে পারে | শরীরে কোথাও ব্যাথা অনুভূত হতে পারে | এই সকল অস্পষ্ট উপসর্গে মানসিক দুর্বলতা ও আত্মগ্লানি দেখা দেওয়া সম্ভব | উদ্বেগ, রাগ ও শুচিবাই দেখা দিতে পারে, ম্যানিয়া হতে পারে | যে কথা হয়তো বলতে চাই না কোনওমতেই, আবেগের বশে সেই কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে |

রক্ত চলাচলের ক্রিয়ায় পরিবর্তন হয় তাই মাঝে মাঝে আকস্মিক গরম বা শীতলতার অনুভূতি সারা অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে | দিনে দিনে চার-পাঁচবর শরীর ঘেমে ওঠে, যাঁদের হাই ব্লাড প্রেসার ও ডায়াবিটিস আছে, তাদের এসব উপসর্গ বেশি হয় | এই সময় শরীরে হরমোন নিঃসরণের ক্রিয়ার বিশেষ পরিবর্তন হয় | ওভারি শুকিয়ে ছোট হয়ে যায়, ডিম্বাণুও থাকে না, তাই স্বভাবতই ওভারি থেকে নিঃসৃত স্ত্রী হরমোনের পরিমাণ কমতে থাকে — তাই যৌবনশ্রী কমে যায় | ওভারির নিঃসৃত হরমোন হ্রাস পাওয়ার ফলে পিটুইটারি ও অ্যাডরেনাল গ্রন্থিসমূহের হরমোন বৃদ্ধি পায়, তাই কারও কারও মুখে বা চিবুকে চুলের মতো লোম দেখা দিতে পারে| এই সকল উপসর্গ কিন্তু সকলের হয় না | যাঁরা ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক পূর্ণতার সঙ্গে এসব পরিবর্তন গ্রহণ করেন তাঁদের মেনোপজ আবার আবার উপসর্গবিহীন হতে পারে | ২-৩ বছরের মধ্যেই শরীরের গতি স্থিতিলাভ করে |

চিকিৎসা

অনেকেরই তেমন কোনও চিকিৎসা দরকার হয় না, তবে ডাক্তারের পরামর্শ অবশ্যই নিতে হবে | শরীরের যত্ন, ত্বকের যত্ন, ব্যায়াম এই তিনটি ব্যাপার বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে | সুষম আহার, কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসা আর ঠিকঠাক ঘুম দরকার | নিয়মিত হেলথ চেক আপ জরুরি | খুব বেশি উপসর্গ থাকে যাঁদের, যেমন বার বার কান মাথা জ্বালা করছে, কমছে না বা গাঁটে গাঁটে খুব ব্যথা যা একেবারে ঘুম হচ্ছে না, অসম্ভব টেনশন, সেই সকল ক্ষেত্রে HRT বা hormone replacement therapy দরকার হতে পারে তাও Short term অর্থাৎ অল্পদিনের জন্য | এছাড়া এই সময় স্ত্রীরোগ বিশেষঞ্জরা ত্বক, চুল ও শরীর ভাল রাখার জন্য কয়েকটি ওষুধ দিয়ে থাকেন — ক্যালসিয়াম ব্যবহারও দরকার, হাড়ের ক্ষয় রোধের জন্য তবে তা একেবারেই চিকিৎ্সকের নির্দেশের অধীন |

কয়েকটি তথ্য

মেনোপজ হঠাৎ একদিন হয় না — প্রথমে হয়তো তিন মাস বন্ধের পর আবার একবার হল, তারপর আবার কিছুদিন বন্ধ থেকে একমাসে দু-বার পিরিয়ড হল, আবার বন্ধ এইভাবে ক্রমশ একেবারে বন্ধ হয়ে যায় | এসময় যদি অত্যধিক ব্লিডিং হয় তাহলে বা তা না হলেও গাইনোকোলজিস্ট দেখিয়ে নেবেন — কারণ এই বয়সে মেনোপজ ছাড়াও জরায়ুর টিউমার বা অন্য অসুখ হতে পারে | মা, মাসী বা দিদিদের যদি কম বয়সে অর্থাৎ ৪০-এর নীচে মেনোপজ হয়ে থাকে তাহলে সেই মহিলারাও early menopause হতে পারে (genetic make up)| গরম দেশের মহিলাদের মেনোপজ আগে হয়, ঠান্ডার দেশগুলিতে আবার মেনোপজের বয়স বেশি | আজকাল মেয়েদের ১০ বছর বয়সের আগেই পিরিয়ড হয়ে যায়, তার মানে কিন্তু এই নয় যে তাড়াতাড়ি মেনোপজ হয়ে যাবে, আবার এও বলা যায় না যে যাদের প্রথম পিরিয়ড শুরু হয়েছে দেরিতে, তাদের মেনোপজ আরও দেরিতে হবে | delayed menopause হলে তলপেটের অন্য কোনও অসুখ আছে কিনা দেখতে হয় |ডায়বেটিস থাকলে মেনোপজের দেরি হতে পারে |আগেই বলেছি menopause-এর কারণে স্বাভাবিক শারীরিক মিলন বাধাপ্রাপ্ত হয় না | আসল কথা পারিপার্শ্বিকতা, মনন | দেখা গিয়েছে মেনোপজের সময় অনেক মহিলাদের sexual desire বেড়ে যায় — অনেক পরের দিকে হয়তো কমতে পারে |এখন আলট্রাসোনোগ্রামের মাধ্যমে মেনোপজের ডায়াগনসিস খুব সহজে করা যায় |এ সময় মহিলারা নিয়মিত পার্লার ও জিমে যাবেন — তা না হলে আত্মবিশ্বাস যাবে চলে |
মনে রাখবেন মনের জোর ও সঠিক চিকিৎসায় মেনোপজের উপসর্গগুলি অতিক্রম করা যায় এবং নিশ্চিন্ত দাম্পত্যজীবন কাটানো যায় |

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

spring-bird-2295435_1280

এত বেশি জাগ্রত, না থাকলে ভাল হত

বসন্ত ব্যাপারটা এখন যেন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে। বসন্ত নিয়ে এত আহ্লাদ করার কী আছে বোঝা দায়! বসন্তের শুরুটা তো